পাকিস্ত্মানের কূটনৈতিক বিপর্যয় শুরম্নযাযাদি রিপোর্ট বিজয়ের মাসের সপ্তম দিন আজ। ইতোপূর্বে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার মধ্যে দিয়ে শুরম্ন হয় পাকিস্ত্মানের কূটনৈতিক বিপর্যয়। ভারতের পথ ধরে প্রতিবেশী ভুটানও এদিন স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। নয়াদিলিস্নতে স্বাক্ষর করা হয় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সহযোগিতা চুক্তি।
চুক্তি অনুযায়ী মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক নিযুক্ত হন ভারতে ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। এদিন তদানীন্ত্মন সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে যায় এমন কোনো প্রস্ত্মাব জাতিসংঘ গ্রহণ করলে তারা ক্রেমলিন মেনে নেবে না।
এদিকে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলায় নাস্ত্মানাবুদ পাকিস্ত্মান বাহিনীকে রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্ত্মাব করে, ভারত যেন পূর্ব পাকিস্ত্মান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে। প্রস্ত্মাবে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্ত্মানে (বাংলাদেশ) যা ঘটছে তা পাকিস্ত্মানের অভ্যন্ত্মরীণ বিষয়। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিলে এ প্রস্ত্মাব নাচক হয়ে যায়।
এদিন যুদ্ধ পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে পাকিস্ত্মানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজি গোপন বার্তা পাঠিয়েছেন রাওয়ালপিন্ডি হেড-কোয়ার্টার্সে। রিপোর্টে তিনি উল্নেখ করেন, চারটি ট্যাংক রেজিমেন্ট সমর্থিত আট ডিভিশন সৈন্য নিয়ে আক্রমণ শুরম্ন করেছে ভারত। তাদের সঙ্গে আরো আরো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬০ থেকে ৭০ হাজার বিদ্রোহী (মুক্তি-যোদ্ধাদের পাকিস্ত্মানিরা তখন

বিদ্রোহী বলে সম্বোধন করত)। তিনি আরো উলেস্নখ করেন, স্থানীয় জনগণও আমাদের বিরম্নদ্ধে। দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, চাঁদপুর ও যশোর প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে। তিনি লিখেছেন, গত নয় মাস ধরে তাদের সৈন্যরা কার্যকর অপারেশন চালিয়েছে এবং এখনও তীব্র যুদ্ধে অবতীর্ণ। গত ১৭ দিনে যেসব খ-যুদ্ধ হয়েছে, তাতে জনবল ও সম্পদের বিচারে পাকিস্ত্মানের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে গেছে। রাজাকারদের অস্ত্রসহ শটকে পড়ার সংখ্যাও বাড়ছে। ট্যাংক, ভারি কামান ও বিমান সমর্থন না থাকার ফলে পরিস্থিতির দ্রম্নত অবনতি ঘটেছে।
গোপন এ বার্তা পেয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে ৭ ডিসেম্বর সম্মুখসমরের সৈন্যদের পিছিয়ে এনে প্রতিরোধ ঘাঁটিতে সমবেত করার জন্য নিয়াজির পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। তবে অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে থাকেনি যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্ত্মানি সৈন্যরা। ঘাঁটি ছেড়ে তারা ৬ ডিসেম্বর রাতে অন্ধকারেই পালিয়ে যায়। একদল যায় ফরিদপুর-গোয়ালন্দের দিকে। বড় দলটি যায় খুলনার দিকে। সেখানকার প্রধান ব্রিগেডিয়ার হায়াত তখন ঢাকার দিকে না গিয়ে বস্ত্মুত খুলনার দিকে একরকম পালিয়ে গিয়েছে।
এদিন নিয়াজির সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী 'দুর্গ' যশোরের পতন ঘটে। ভারতের ৯ম ডিভিশনের প্রথম কলামটি এক রক্তাক্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে যশোর সেনাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে দেখতে পায়, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারম্নদ ও রসদ ভর্তি সুরক্ষিত বাঙ্কার সম্পূর্ণ জনশূন্য। পাকি চার ব্যাটালিয়ন সৈন্যের এইরূপ অকস্মাৎ অন্ত্মর্ধানে দেশের পশ্চিমাঞ্চল কার্যত মুক্ত হয়। যশোর থেকে ঢাকা অথবা খুলনার দিকে বিক্ষিপ্ত পলায়নপর পাকিরাই অন্যান্য স্থানে স্বপক্ষীয় সৈন্যদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। দু-তিনটি স্থান বাদে সর্বত্রই পাকিস্ত্মানিদের প্রতিরক্ষার আয়োজনে ধস নামে।
যশোরের পতন পাকিস্ত্মানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের মূল কেন্দ্রকে নাড়া দেয় প্রবলভাবে। ৭ ডিসেম্বরই গভর্নর আবদুল মালেক পূর্বাঞ্চলের সৈন্যাধ্যক্ষ লে. জে. নিয়াজির অভিমত উদ্ধৃত করে এক বার্তায় ইয়াহিয়াকে জানান, যশোরের বিপর্যয়ের ফলে প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের পতন প্রায় সম্পন্ন এবং মেঘনার পূর্বদিকের পতনও কেবল সময়ের প্রশ্ন। এই অবস্থায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্রতিশ্রম্নত বৈদেশিক সামরিক সহায়তা না পৌঁছায়, তবে জীবন রক্ষার জন্য বরং ক্ষমতা হস্ত্মান্ত্মরের ব্যাপারে আলোচনা শুরম্ন করা বাঞ্ছনীয়।
এদিকে যৌথ বাহিনীর যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার পর একাত্তরের এদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্যারাট্রুপার বা ছত্রীসেনা নামানো শুরম্ন হয়। পলায়নপর পাকিস্ত্মান সেনাবাহিনীর ঢাকায় আশ্রয় নেয়ার সব পথ বন্ধ করতে রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে মিত্রবাহিনীর ছত্রীসেনারা অবস্থান নেয়।
এদিন বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনী টাঙ্গাইল মুক্ত করে। সন্ধ্যায় কাদেরিয়া বাহিনী ও মিত্রবাহিনী ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়। সারাদিন সম্মুখযুদ্ধের পর নড়াইল, কুড়িগ্রাম, ছাতক ও সুনামগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যায় দখলদার পাকসেনারা।
সারাদেশের মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা দলে দলে এসে রাজধানীর আশপাশের গ্রামে অবস্থান নিতে শুরম্ন করেন। কারফিউর রাতে তারা দু'চারজন করে নদী পেরিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করে অপারেশন চালাচ্ছে। গেরিলাদের চোরাগোপ্তা হামলায় সন্ত্রস্ত্ম পাকসেনারা রাতে ক্যাম্প থেকে বের হয় না। গেরিলারা যখন রাতের অন্ধকারে রাজধানীর বিভিন্ন গুরম্নত্বপূর্ণ স্থানে বোমা হামলা ও ফাঁকা গুলি বর্ষণের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, তখন ঢাকা সেনানিবাসে দখলদার বাহিনী তাদের দোসরদের নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের হিটলিস্ট তৈরি করছে।
এ হিটলিস্ট ধরে আত্মসমর্পণের আগ মুহূর্তে ১৩ ডিসেম্বর রাতে ঘাতক আলবদর, আলশামস বাহিনী নির্মম-নৃশংসভাবে হত্যা করে দেশমাতৃকার কৃতী সন্ত্মান বুদ্ধিজীবীদের।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close