বিমান থেকে লিফলেট ফেলে আত্মসমর্পণের আহ্বানযাযাদি রিপোর্ট আজ ৮ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই সময়ে দিনের আলোয় ও রাতের আঁধারে ঢাকার আকাশে বিনা প্রতিরোধে উড়ে বেড়িয়েছে যৌথ বাহিনীর জঙ্গি বিমান। প্রতিপক্ষের বিমান হানা দেয়ার সময় জনসাধারণকে সতর্ক করার জন্য সাইরেন বাজানোরও ফুরসত পায়নি তারা। তবে বিমানের লক্ষ্যবস্তু কেবল সামরিক অবস্থান হওয়ায় ঢাকাবাসী নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরিবর্তে রাস্ত্মায় নেমে এসে দু'হাত নেড়ে বিমানগুলোকে অভিনন্দন জানায়।
এ সময় জঙ্গি বিমান থেকে হাজার হাজার লিফলেট ফেলে পাকিস্ত্মানি সেনাদের আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ভারতীয় বেতার থেকে বারবার ঘোষণা দেয়া হয়, পাকিস্ত্মান যদি বাংলাদেশে তাদের পরাজয় মেনে নেয়, তাহলে ভারতও পাকিস্ত্মানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করতে প্রস্ত্মুত।
এ দিন পাকিস্ত্মানের গভর্নর মালিকের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মুখ্য সচিব পশ্চিম পাকিস্ত্মানি অফিসার মুজাফফর হোসেন ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে বিস্ত্মারিত আলোচনা করেন এবং ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে 'আত্মসমর্পণের' আবেদন হস্ত্মান্ত্মর করেন। এতে অবশ্য কৌশলে আত্মসমর্পণ শব্দটি বাদ দিয়ে অস্ত্রসংবরণ কথাটি ব্যবহার করা হয়। এই আবেদনে আরও লেখা ছিল, যেহেতু সংকটের উদ্ভব হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, তাই রাজনৈতিক সমাধান দ্বারা এর নিরসন হতে হবে। এতে বলা হয়, 'আমরা তাই পাকিস্ত্মানের প্রেসিডেন্ট দ্বারা অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্ত্মানের
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঢাকায় সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাই। শান্ত্মিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্ত্মান্ত্মরের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানাই।'
এই আবেদন ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধি পল মার্ক হেনরির হাতে দেয়া হয়, যদিও পরদিন তা আবার প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। বস্তুত রাও ফরমান আলীর প্রস্ত্মাবের সংবাদ ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকার এই প্রস্ত্মাব রদ করার পরামর্শসহ ইয়াহিয়াকে জানান যে, পাকিস্ত্মানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য সপ্তম নৌবহর ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হয়েছে। এর ফলে ইয়াহিয়ার মত পরিবর্তিত হয়।
এদিকে নিজের অস্ত্মিত্ব সংকটের আশঙ্কায় লে. জেনারেল নিয়াজি পালানোর পাঁয়তারা করে। তার এই গোপন অভিসন্ধি সংবাদ মাধ্যম বিবিসি ফাঁস করে দেয়। নিয়াজি স্বীয় দুর্বলতা ঢাকার জন্য এদিন ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দম্ভভরে বলেন, কোথায় বিদেশি সাংবাদিকরা, আমি তাদের জানাতে চাই, আমি কখনো আমার সেনাবাহিনীকে ছেড়ে যাব না।
তবে মুখে যাই বলুক, নিয়াজির বুঝতে বাকি নেই, বাঙালির বিজয় আসন্ন। পাকিস্ত্মানি সমরনায়করাও বুঝে গেছে, পূর্ব পাকিস্ত্মান তাদের হাতছাড়া হতে চলেছে। রণাঙ্গনের পাশাপাশি কূটনৈতিক যুদ্ধে বিপর্যয় নেমে এসেছে পাকিস্ত্মানের।
এদিন স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বাংলাদেশের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য গণতান্ত্রিক বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্ত্মাব পাস করে ভারতীয় পার্লামেন্ট। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টে ভাষণে বলেন, পাকিস্ত্মানের জেলখানায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা করছে সামরিক সরকার। তিনি বলেন, একমাত্র বিশ্ব বিবেকই এ সময় বাংলাদেশের নেতার প্রাণ রক্ষা করতে পারে। তিনি আরও বলেন, দখলদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে বাংলাদেশের অসহায় জনসাধারণকে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে।
এদিকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী যশোর, সুনামগঞ্জ, ফেনী ও লক্ষ্ণীপুর বিজয়ের পর এদিনে মুক্ত করে চাঁদপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরিশাল, নোয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও শেরপুর জেলার বেশির ভাগ এলাকা। সন্ধ্যায় যৌথবাহিনীর দুটি দল মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে অবস্থান নেয়। মুক্তিবাহিনীর হাতে মার খেয়ে পাক সেনারা দলে দলে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরম্ন করে।
বিজয়োলস্নসিত ডিসেম্বরের এদিনে এসে চূড়ান্ত্ম বিজয়ের দ্বারপ্রান্ত্মে বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকা ছাড়া অধিকাংশ জেলা শত্রম্নমুক্ত। ঢাকায় পরিকল্পিত চূড়ান্ত্ম হামলা চালিয়ে শত্রুদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে যৌথবাহিনী। এদিন মিত্রবাহিনীর জঙ্গি বিমানগুলো ঢাকা বেতার কেন্দ্র স্ত্মব্ধ করে দেয়। বোমা-রকেট ছুড়ে বিধ্বস্ত্ম করে দেয় কুর্মিটোলা বিমানবন্দর। মিত্রবাহিনীর বিমান আক্রমণে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটি জাহাজভর্তি পাকিস্ত্মানি বাহিনী বঙ্গোপসাগর দিয়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে।
সম্মিলিত বাহিনী উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধে সর্বাত্মক সাফল্য অর্জন করে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরের শত্রম্নবাহিনীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যৌথবাহিনী এই তিন শহর ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুর জেলা সম্পূর্ণ শত্রম্নমুক্ত করে। রাতে পাকিস্ত্মানি বাহিনী জামালপুর গ্যারিসন ছেড়ে ঢাকার দিকে পালানোর সময় শহরের অদূরে যৌথবাহিনীর মুখোমুখি হয়। এ যুদ্ধে প্রায় এক হাজার ৫০০ পাকিস্ত্মানি সেনা হতাহত হয়। বাকিরা আত্মসমর্পণ করে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close