পূর্ববর্তী সংবাদ
নাবি বোরো আবাদে করণীয়আউশ-আমন ধানের চেয়ে বোরো ধানের হেক্টরপ্রতি বা বিঘাপ্রতি ফলন বেশি হওয়ায় বোরো উৎপাদনের সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। তবে নাবিতে বোরো চাষের ক্ষেতে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য না রাখলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এ জন্য উফশী জাতের ধান নির্বাচনের পাশাপাশি উন্নত কলা-কৌশল ব্যবহার করার দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এ নিয়ে লিখেছেন কৃষিবিদ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলামনাবি বোরোতে আবাদের জন্য ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন ধানের জাত নির্বাচনের জন্য কৃষিবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন - যাযাদিধান বাংলাদেশে প্রধান খাদ্যশস্য। বাংলাদেশে দুই মৌসুমে তিন ধরনের ধানের চাষ হয়ে থাকে। খরিপ মৌসুমে আউশ ও আমন ধান এবং রবি মৌসুমে বোরো ধানের চাষ হয়। আউশ-আমন ধানের চেয়ে বোরো ধানের হেক্টরপ্রতি বা বিঘাপ্রতি ফলন বেশি হওয়ায় বোরো উৎপাদনের সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। তবে নাবিতে বোরো চাষের ক্ষেতে কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য না রাখলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এ জন্য উফশী জাতের ধান নির্বাচনের পাশাপাশি উন্নত কলা-কৌশল ব্যবহার করার দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

রোপণ সময়সীমা ও জাত নির্বাচন
সাধারণভাবে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝির পর বোরো বীজতলা তৈরি করা হয় এবং নভেম্বরের শেষ থেকে মাঠে রোপণ শুরম্ন হয়। এভাবে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত্ম বোরো ধানের বীজ বপন করে যে চারা তৈরি করা হয় তা দিয়ে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত্ম বোরো রোপণ করা হয়। কিন্তু নাবিতে বোরো চাষের জন্য মধ্য মার্চ পর্যন্ত্ম চারা রোপণ করা যায়। নাবি বোরো চারার বয়স সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের বেশি না হওয়াই ভালো। উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা রবি মৌসুমে শীত থেকে ধানকে রক্ষার জন্য বা আলু চাষের পর সেই জমিতে ধান চাষের জন্য নাবি বোরো ধানের চাষ করে থাকেন। নাবিতে বোরো উৎপাদনে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য না রাখলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। নাবি বোরোতে চাষের জন্য ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন জাতের প্রয়োজন। এ সময় সাধারণত ব্রিধান ২৮, ব্রিধান ৫৮, বিধ্রান ৬৩, বিনাধান ১৪ এবং কিছু হাইব্রিড জাত রোপণ করা যায়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের রংপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিধ্রান ৪৮ নাবি বোরো হিসেবে বেশ ভালো ফলন দিয়ে থাকে।

সার প্রয়োগে সতর্কতা
নাবিতে বোরো আবাদের একটি বড় সমস্যা হলো ফল আসার সময় হটাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ধানে চিটার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। এ ছাড়া নাবি বোরো ধান চাষে ইউরিয়া বেশি প্রয়োগ করে নন-ইউরিয়া সার কম পরিমাণে অর্থাৎ সুষম পরিমাণে সার প্রয়োগ না করাও একটি অন্যতম সমস্যা। বেশি মাত্রায় ইউরিয়া প্রয়োগ করলে সেই জমিতে ফসফরাস ও পটাশ সারের পরিমাণ মারাত্মক হারে কমে যায়। এ জন্য সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের পাশাপাশি জৈব সারও প্রয়োগ করতে হয়। দানা ইউরিয়ার পরিবর্তে মেগা গুটি ১টি বা ৩টি ছোট গুটি চারা রোপণের ৮ থেকে ১০ দিন একবার মাটির ৪-৫ সেন্টিমিটার গভীরে প্রয়োগ করতে হয়। জিপসাম, দস্ত্মা ও বোরণ সার বোরো জমিতে প্রয়োগ না করলে চারার বৃদ্ধি কমে গিয়ে চারার নতুন কুশির কচি পাতা সাদা হয় ও পুরনো পাতা ও গাছে মরিচা পড়া বাদামি রং দাগ পড়ে, গাছের বাড়-বাড়তি সুষম হয় না। মূল জমিতে চারা রোপনের ২০ থেকে ২২ দিন পর প্রথমবার এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর দ্বিতীয়বার প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে জিংক ও ২ গ্রাম হারে বোরন সার মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। নাবি বোরো ধান যেহেতু ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন হয় তাই এর জন্য সারও কিছুটা কম প্রয়োগ করতে হয়। বিঘাপ্রতি টিএসপি ১২ কেজি, এমওপি ২০ কেজি, জিপসাম ১৫ কেজি ও দস্ত্মা ১.৫ কেজি হিসেবে পুরোটাই শেষ চাষের সময় জমিতে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। ইউরিয়া সার প্রতি কিস্ত্মিতে ১২ কেজি করে তিন কিস্ত্মিতে প্রয়োগ করতে হয়। চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম কিস্ত্মি, ৩০-৩৫ দিন পর দ্বিতীয় কিস্ত্মি এবং কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন আগে তৃতীয় কিস্ত্মির সার প্রয়োগ করতে হয়।

সেচ প্রদানে করণীয়
যেহেতু রবি মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে, তাই বোরো ধান সম্পূর্ণভাবেই সেচের পানির উপর নির্ভরশীল। আবার বোরো ক্ষেতে সেচের অতিরিক্ত পানি জমিতে প্রয়োগকৃত সারের অপচয় ঘটায়। বিশেষ করে ইউরিয়া ও পটাশ সার ধূয়ে বা চুইয়ে মাটির নিচের দিকে চলে যাওয়ায় বোরো ধানের গাছের শিকড় এসব খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, কৃষক সেচ দেয়ার পর পরই জমিতে যখন ৪-৫ সেন্টিমিটার পানি থাকে, তখন উপরি সার হিসেবে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয় যা মোটেও ঠিক নয়। জমিতে সার প্রয়োগের সময় এবং কুশি গজানোর সময় ছিপছিপে পানি থাকাই যথেষ্ট। এজন্য কাইচ থোড় আসার পর থেকে দানা পুষ্ট হওয়া পর্যন্ত্ম জমিতে ৭-১০ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে হয়। জমি ভালোভাবে চাষ করার পর নরম ও আলগা করতে যতটুকু পানি রাখা দরকার ততটুকু পানিই রাখতে হয়। এর পর মই বা কলাগাছ টেনে জমির উপরিভাগ সমান করতে হয়। নাবিতে বোরোর জন্য ৩৫-৪০ দিন বয়সী চারা সারিতে প্রতি গুছিতে ১টি বা ২টি করে সুস্থ-সবল চারা রোপণ করতে হয়। বেশি বয়সী চারা রোপণ করলে ফলন কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং সারিতে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রাখতে হয়। প্রতি দশ সারি পর পর এক সারি ফাঁকা রাখলে আলো-বাতাস চলাচল স্বাভাবিক থাকায় চারার বৃদ্ধি ভালো হয়। পোকা ও রোগের উপদ্রবও কম হয়।

রোগ-পোকা এবং আগাছা ব্যবস্থাপনা
নাবি বোরোতে রোগ-পোকা এবং আগাছার উপদ্রব হতে পারে। বিশেষ করে মাজরা পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং, শীষকাটা লেদা পোকা, লেদা পোকা, ছাতরা পোকা বা মিলিবাগ এবং বস্নাস্ট রোগ, খোল পোড়া ও খোল পচা রোগ, বাদামি দাগ রোগ দেখা দেয়। মাজরাসহ অন্যান্য পোকা নিয়ন্ত্রণে ক্লোরোপাইরিফস, কার্বোফুরান, কারটাপ বা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হয়। বস্নাস্ট রোগ নিয়ন্ত্রণে ট্রাইসাইক্লাজল বা টেবুকোনাজল জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন- ট্রুপার বা নাটিভো বা নভিটা ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয়। বিশেষ করে ধানে ফুল আসার সময় যদি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে আগাম ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়। এ ছাড়া খোল পোড়া ও খোল পচা রোগ নিয়ন্ত্রণে টেবুকোনাজল বা টেবুকোনাজল+ট্রাইফ্লোক্সিট্রবিন বা হেক্সাকোনাজল জাতীয় ছত্রাকনাশক প্রয়োগ বেশ কার্যকর। পোকা নিয়ন্ত্রণে নাবি বোরো ক্ষেতে পার্চিং এর ব্যবস্থা করলে অর্থাৎ ডাল বা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে পোকা খেকো পাখি বসার ব্যবস্থা করলে অনেক পোকা এমনিতেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর ক্ষেত থেকে একটু দূরে আলোক ফাঁদের ব্যবস্থা করে ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়।

ফসল কর্তনে করণীয়
নাবিতে বোরো চাষে একটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হয়, আর তা হলো ক্ষেতের ধান শতকরা ৮০ ভাগ পুষ্ট ও পাকলেই কেটে নেয়ার ব্যবস্থা করা। কারণ নাবি বোরো ধান যখনকাটা হয় তখন হটাৎ কালবৈশাখি বা শিলাবৃষ্টি বা টর্নেডো আঘাত হানতে পারে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। তাই দেরি না করে ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গেই কেটে ফেলার ব্যবস্থা করতে হয়। নাবিতে বোরো ধান চাষে বিভন্ন সমস্যা দেখা দেয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এজন্য যে কোনো পরামর্শ বা বিশেষ কোনো সমস্যার সমাধানে নিকটবর্তী উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি বস্নকের উপসহকারী কর্মকর্তাগণের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে।

লেখক : উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close