ভোটের হাওয়া চট্টগ্রাম ১০আ'লীগে আফছার বা মনজুর নোমানে আস্থা বিএনপিরহেলাল উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম
বন্দর নগরীর তারকা আসন খ্যাত চট্টগ্রাম-১০ আসনে শাসকদল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে কে লড়বেন এ নিয়েই চলছে জোর জল্পনা-কল্পনা। সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারম্নল আমিন না সাবেক সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। এ আলোচনার মধ্যে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তরম্নণ আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ মাহমুদ। বিএনপি নির্বাচনে আসলে ধানের শীষের প্রার্থী হবেন সাবেক মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতা আবদুলস্নাহ আল নোমান। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আবু জাফর মোহাম্মদ কামাল মনোনয়ন পেতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম ১০ আসনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরে জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা তিনটি থেকে চারটিতে উন্নীত করেছিল নির্বাচন কমিশন। এর পূর্বে এ এলাকা চট্টগ্রাম ৮ ও ৯ আসনেই একীভূত ছিল। এ আসন ডবলমুরিং (আংশিক), হালিশহর, পাহাড়তলী, খুলশী, আকবরশাহ থানা নিয়ে গঠিত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আটটি ওয়ার্ড রয়েছে এ নির্বাচনী এলাকার আওতাধীন। এই নির্বাচনী এলাকাতেই সাবেক সিটি মেয়র আলহাজ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী আবদুলস্নাহ আল নোমান, সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারম্নল আমিন, সাবেক সিটি মেয়র আলহাজ এম মনজুর আলম থাকায় আসনটি ভিভিআইপির মর্যাদা পেয়েছে। আবার কেউ কেউ এ আসনকে মামা-ভাগ্নের আসনও আখ্যা দিয়ে থাকেন। আবদুলস্নাহ আল নোমান এবং এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী পরস্পর মামা-ভাগ্নের সম্পর্কের কারণেই এ পরিচিতি।
নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসনটিতে মহাজোট এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে লংকাকা ঘটে যায়। এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী করা হয়েছিল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিমকে। কিন্তু তৎকালীন সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে আওয়ামী লীগের ডা. আফছারম্নল আমিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াননি। নির্বাচনে বিএনপির আবদুলস্নাহ আল নোমানকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ডা. আফছারম্নল আমিন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ডা. আফছারম্নল আমিন প্রথমে বন্দর ও নৌ-পরিবহনমন্ত্রী এবং পরে গণশিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রিত্বকালীন সময়েই মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এতে মহানগর আওয়ামী লীগ ও স্পষ্ট বিভক্ত হয়ে পড়ে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃতু্যর আগ পর্যন্ত দুজনের অহিনকুল সম্পর্ক বহাল ছিল। দশম সংসদ নির্বাচনে ডা. আফছারুল আমিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে গণশিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে আসীন হলেও মহানগরের সাংগঠনিক কর্মকাে এমনকি দলের নির্বাহী কমিটি, বর্ধিত সভা ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন। সে জন্য সংগঠনের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দিন একাধিকবার সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। ডা. আফছারুল আমিন জবাবে বলেছেন নিজ সংসদীয় আসনেই সাংগঠনিক কর্মকাে রয়েছেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা নিয়ে মুখে মুখে গুঞ্জন, প্রার্থী হবেন কে? ডা. আফছারুল আমিন নাকি সাবেক সিটি মেয়র এম মনজুর আলম। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণের দুই ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন মনজুর আলম। কিন্তু মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী তাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনেন। নিজ এলাকায় প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে পুনর্মিলনী ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেন। উল্লেখ্য, এর আগে মনজুর আলম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। তার আলোচিত প্রত্যাবর্তনের পর থেকে জোর গুঞ্জনের শুরু। এর জন্মও দিয়েছিলেন প্রয়াত জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। সেই গুঞ্জন এখন আরও ঢালপালা বিস্তার করেছে।
ডা. আফছারুল আমিন ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে রয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিলেন। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। মহানগর আওয়ামী লীগে তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরী ঘরানার নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন বিরোধে জড়ানোর আগ পর্যন্ত। অবিভক্ত চট্টগ্রাম ৯ আসনে দুবার নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। নবম সংসদ নির্বাচনেই জয়ী হন। সংসদীয় আসনে তার সমর্থন নেতাকর্মীর আধিক্য রয়েছে। তারা ডা. আফছারুল আমিন এর বিকল্প নেই বলে দাবি করছেন।
সাবেক সিটি মেয়র এম মনজুর আলম পিতা আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টরের হাত ধরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। আবদুল হাকিম ছিলেন পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মৃতু্যর আগ পর্যন্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। রাজনীতির চেয়ে মনজুর আলম সমাজসেবা, শিক্ষা প্রসারের কর্মকা-েই বেশি সময় দেন। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন নগরে ও নগরের বাইরে। প্রতিষ্ঠা করেছেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ট্রাস্ট। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের টানা তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এবং ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন সবচেয়ে বেশিবার। এক এগারো সরকারের সময়েও তাকে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সময়েই মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তার সম্পর্কের চিঁড় ধরে। যা মেয়র নির্বাচনে দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গড়ায়। বিএনপির সমর্থনে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না হওয়ায় দলে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। দলে তৎপর করার জন্য তাকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই মেয়র মনজুর আলম এবং এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। মেয়র মনজুর আলম তার কার্যকালীন পাঁচ বছরের কর্মকা-ে ক্লিন ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। বিএনপির হয়েও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন এবং ১৫ আগস্ট শোক দিবস পালন করে আলোচনার ঝড় তোলেন। দলীয় সমালোচনার মুখেও তিনি শেষ পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করে যান। বর্তমানে মোস্তফা হাকিম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৫৪টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং চলতি রমজানে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের মধ্যে ইফতারসামগ্রী বিতরণ করেছেন। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ মাহমুদ গত পাঁচ বছর ধরে মাঠে তৎপর রয়েছেন। তিনি বর্তমানে মহানগর আওয়ামী যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। নির্বাচনী এলাকায় আটটি ওয়ার্ডেই রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাে অংশ নিচ্ছেন। নিজস্ব তহবিল থেকে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া সংগঠনের সহায়তা প্রদান করেন। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নগরজুড়ে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরে প্রচারপত্র, পোস্টার প্রকাশ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন চলছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরছেন এবং মতবিনিময় করেন বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে। রমজানজুড়েই এলাকায় ইফতারসামগ্রী বিতরণ করছেন। দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত্মদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। ফরিদ মাহমুদ ছাত্র রাজনীতি থেকেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে কাজ করে চলেছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চট্টগ্রাম মহানগরের শক্তিশালী অবস্থান ও জনসমর্থন রয়েছে। অষ্টম সংসদ পর্যন্ত মহানগরের তিনটি আসনই ছিল তাদের দখলে। নবম সংসদ নির্বাচনে চারটি আসনই হারায় বিএনপি। তবে চট্টগ্রাম ১০ আসনে আবদুল্লাহ আল নোমানের পরাজয় ছিল কম ভোটের ব্যবধানে। অসুস্থতার কারণে তার ছেলে সাঈদ নোমানই ভোটের জন্য মাঠে নেমেছিলেন। আবদুল্লাহ আলম নোমান মন্ত্রিত্বে থাকাকালে এবং নবম সংসদ নির্বাচনের পরও চট্টগ্রামের রাজনীতিতেই সময় দেন বেশি। রমজানজুড়েই নগরীতে ইফতার মাহফিল, ইফতারসামগ্রী বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে এলাকায় তৎপর রয়েছেন। নোমানের প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে নিজ দলের বাইরেও গ্রহণযোগ্যতা। মন্ত্রিত্বে থাকাকালে চট্টগ্রামের বিভিন্নমুখী উন্নয়ন কর্মকাে তাকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এলাকায় নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ছিল তার একক অবদান। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে আবদুল্লাহ আল নোমানের দলীয় অবস্থান এখানে সবচেয়ে সুদৃঢ়। দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে চট্টগ্রাম ১০ আসনে আবদুল্লাহ আল নোমানই ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন বলে দলীয় সূত্র জানায়।
এ আসনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম। বর্তমানে তার সহধর্মিণী মহাজাবিন মোর্শেদ সংসদ সদস্য। একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নতুন প্রার্থীর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে দলীয় সূত্র। মহানগর জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি আবু জাফর মোহাম্মদ কামাল মনোনয়ন পেতে পারেন এ আসনে।
চট্টগ্রাম ১০ আসনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোটও প্রার্থী দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম দলগুলোর চিন্ত্মাভাবনায়ও রয়েছে এই আসন। সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে ভোটাররা। তাদের দুঃখ গত সংসদ নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। নগরে পিছিয়ে পড়া এলাকা হিসেবে এলাকার মানুষ চান ভোটারদের মূল্যায়নের সুযোগ।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close