পূর্ববর্তী সংবাদ
সিটি নির্বাচন : খুলনা থেকে গাজীপুরজাতীয় নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গুরম্নত্ব কোনো অংশে কম নয়। স্থানীয় সরকারের একটি গুরম্নত্বপূর্ণ অংশ সিটি নির্বাচন। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস শহর এলাকায়। এর আগে আমাদের দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো নির্দলীয়ভাবে। প্রার্থীরা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিএনপি বারবার বলে আসছে এই সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সরকার রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিএনপির যত অভিযোগই থাকুক না কেন বাস্ত্মবতা হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি অংশ নিচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেবে।সালাম সালেহ উদদীন জনপ্রতিনিধি মানে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী বিশেষ ব্যক্তি, যিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। তাদের সরকারের কাছে যতটা না তার চেয়ে বেশি জবাবদিহিতা করতে হয় জনগণের কাছে। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দেখা ও লাঘব করার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদেরই। জনগণ উপেক্ষা বা বঞ্চনার শিকার হলে তারা ভবিষ্যতে আর ওই ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেয় না। এ জনপ্রতিনিধিদের কদর আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, জনগণের স্বার্থকে সংরক্ষণ না করা অথবা প্রধান্য না দেয়া এবং চুরি, দুর্নীতির দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়া। বিশেষ রাজনৈতিক আনুকূল্য না পাওয়ার কারণেও অনেকেই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পান না। তবে রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েও অনেকেই বাজিমাত করে দিয়েছেন, কেবল জনগণের ভালোবাসা ও ব্যাপক সমর্থন পাওয়ার কারণেই। জনপ্রতিনিধি হয়ে জনগণের ও দেশের সেবা করা অতি উত্তম কাজ। কারণ যার মধ্যে দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে সে ব্যক্তিই মহৎ। কিন্তু এ মহত্বের আড়ালে যদি লোভ কিংবা অসৎ উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে সেখানেই যত বিপত্তি।
এ দেশে দুভাবে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জনগণ তাদের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত্ম ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য অনুরোধ করে। প্রার্থী অসামর্থ্যবান হলে তাকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে থাকে। দেখা গেছে, এমনও জনপ্রতিনিধি রয়েছেন, যিনি একটানা ৩০ থেকে ৩৫ বছর জনপ্রতিনিধিত্ব করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা পাওয়ার কারণেই। জনপ্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে এ প্রবণতাই আগে বেশি ছিল। যাদের জনগ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। বেশ ক'বছর ধরে আমরা ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখতে পাচ্ছি। যার অর্থবিত্ত, পেশিশক্তি বা ক্ষমতার দাপট রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার যিনি মহাপরাক্রমশালী তিনিই সাধারণত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকেন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচনের প্রাক্কালে সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিশেষ গুরম্নত্ব বহন করছে। গত ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামনে রয়েছে আরও চারটি সিটি নির্বাচন। গাজীপুর ছাড়াও তিন সিটি নির্বাচন একই তারিখে অনুষ্ঠিত হবে।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। তিনি পেয়েছেন ১,৭৬,৯০২ ভোট, বিপরীতে বিএনপি প্রার্থী নজরম্নল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১,০৮,৯৫৬ ভোট। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যা-ই বলুক না কেন, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু এবং সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রম্নপসহ অন্যান্য নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থার মতেও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল শান্ত্মিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক। তারা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেননি। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি যে কিছু সংগঠন যাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি নেই তারা প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করার নামে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। যেহেতু এ সব সংস্থার সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য নেয়ার সুযোগ নেই সেহেতু তাদের তথ্যসূত্র নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। সুতরাং যথাযথ কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অন্যতম একটি অভিযোগ ছিল বিএনপির নেতাকর্মীদের কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। কিন্তু তাদের নেতাকর্মীদের তো কেন্দ্রের বাইরে বা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। বস্তুত এ সব নেতাকর্মী দলের প্রতি প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ নয়। বিএনপির যে কোনো কর্মসূচিতে জনশূন্যতাই এটার প্রমাণ করে। নেতাকর্মীরাও উপলব্ধি করতে পারছে যে তাদের দীর্ঘদিনের সহিংস ও গণবিরোধী কর্মকা-ই তাদের জনগণ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে বিএনপি যদি তার নেতাকর্মীদের মাঠে নামাতে না পারে তার দায়ও কি সরকারের ওপর পড়ে? বিএনপির পক্ষ থেকে যত কথাই বলা হোক না কেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার কোনো সুযোগ নেই।
এ কথা সত্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেছে। এই অগ্রযাত্রা শুরম্ন হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষার হাত থেকে মুক্ত করে একটি সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম এ সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্যদিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। কিন্তু পঁচাত্তরে অগণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির উত্থানের ফলে তা ব্যাহত হয় যা দীর্ঘ ২১ বছর পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার পুনরম্নজ্জীবিত হয় দেশ ও জনগণ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৎ, বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী দশ নারীনেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন। অভ্যন্ত্মরীণ জনপ্রিয়তার দিক থেকেও শেখ হাসিনা অনন্য উজ্জ্বল ও অদ্বিতীয়। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায় যে ৭৭.৭ শতাংশ বিশ্বাস করে বাংলাদেশ সঠিক নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, যা ২০১৫ সালে ছিল ৬২ শতাংশ। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা দিন দিন অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে বেড়েই চলছে। এমন নেতৃত্বের কারণেই মহাকাশে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগতভাবে তার অগ্রসরতা জানান দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের বিরম্নদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর 'জিরো টলারেন্স' নীতি দেশের অভ্যন্ত্মরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে মাদকবিরোধী যে অভিযান চলছে, এই অভিযানের ফলে দেশ মাদকমুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সামগ্রিক উন্নয়ন এবং অগ্রসরতার প্রতি জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসাই খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণ খুলনা নগরীকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছে। দেশের মানুষ বিগত বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের সঙ্গে তুলনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত্ম নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে। গাজীপুরসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জনগণ আবার উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গুরম্নত্ব কোনো অংশে কম নয়। স্থানীয় সরকারের একটি গুরম্নত্বপূর্ণ অংশ সিটি নির্বাচন। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস শহর এলাকায়। এর আগে আমাদের দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো নির্দলীয়ভাবে। প্রার্থীরা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিএনপি বারবার বলে আসছে এই সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সরকার রাজনৈতিকভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিএনপির যত অভিযোগই থাকুক না কেন বাস্ত্মবতা হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি অংশ নিচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেবে।
এর আগে পৌর নির্বাচনে দেশের ৭টি বিভাগের মধ্যে ৪টিতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির কাছে ধাক্কা খেয়েছিল। আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে পরিচিত জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও ফরিদপুরে বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এলাকায় দলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবি আমরা দেখেছি। কেবল তাই নয়- এর আগে সিটি নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থীরা জয় লাভ করেছে। সেই ধারণা থেকে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় বর্তমান সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও স্বাধীন। কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়নের কথা বলেছে। নির্বাচন যাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় সে জন্যই এই উদ্যোগ।
আমরা চাই স্থানীয় সরকার কাঠামো আরও শক্তিশালী হোক। কারণ স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে দেশের আঞ্চলিক ও নাগরিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভিতও শক্তিশালী হয় না। স্থানীয় সরকারকে বলা যায় তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের সরকার। গণতন্ত্রচর্চার জন্য এটি সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার মাধ্যমেই কেবল দেশের সামগ্রিক শাসনপ্রণালি ও উন্নয়ন মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে।

সালাম সালেহ উদদীন: কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close