জীবনের অমীমাংসিত আখ্যানসায়মন স্বপন কথাসাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো নামটি আমাদের কাছে নতুন মনে হলেও ইংরেজিভাষা সাহিত্যে নতুন নয়, বরং বেশ আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। সাহিত্যে এ বছর নোবেল পেলেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো। সুইডেনের রয়েল সুইডিশ একাডেমি এই বিজয়ের ঘোষণা দেন। নির্দিষ্টভাবে কোনো একটি সাহিত্যকর্মের জন্য নয় বরং তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের জন্য তাকে এ পুরস্কারে মনোনীত করা হয়। ১৯৫৪ সালে জাপানের নাগাসাকিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পরে ইশিগুরোর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার পরিবার জাপান ছেড়ে ইংল্যান্ডে চলে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরম্ন করেন। ইশিগুরো একাধারে চিত্রনাট্যকর, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিত।
তার প্রথম উপন্যাস অ্যা পেইল ভিয়ু্য অব হিল্‌স ১৯৮২ সালে প্রকাশ পায়। দ্বিতীয় উপন্যাস অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড (১৯৮৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক হামলার প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা যা চমকপ্রদভাবে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি চারবার ম্যান বুকার পুরস্কার পান চারটি উপন্যাসের জন্য। যার মধ্যে ১৯৮৯ সালে বুকার পুরস্কার পান দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে উপন্যাসের জন্য। অন্যান্য উপন্যাস হলো দি আনকনসোল্ড (১৯৯৫), হোয়েন উই আর অরফ্যান (২০০০)। ২০০৯ সালে তার একমাত্র ছোট গল্পগ্রন্থ নকটার্নস : ফাইভ স্টোরিজ অব মিউজিক অ্যান্ড নাইটফল প্রকাশিত হয়। বইয়ের সংখ্যা দিয়ে নয় বরং লেখার গুণগত মান বা মানোত্তীর্ণতার বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য। হয়তো বা এজন্য এ যাবৎ তিনি মোট আটটি গ্রন্থ লিখেছেন যা চলিস্নশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার সর্বশেষ উপন্যাস ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় দ্য বু্যরিড জায়ান্ট। যা এক বৃদ্ধ দম্পতির যাপিত জীবন নিয়ে লেখা, যারা এক বুক আশা নিয়ে হেঁটে চলেছেন তাদের যোগাযোগহীন এক সন্ত্মানের দেখা পেতে। এ ছাড়া দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে এবং নেভার লেট মি গো (২০০৫) এই দুটো উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তিনি টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছেন অ্যা প্রোফাইল অব আর্থার জে. ম্যাসন (১৯৮৪), দ্য গোরমেট (১৯৮৭), দ্য স্যাডেস্ট মিউজিক ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (২০০৩) শিরোনামে।
প্রত্যেকটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়াস হলো অতীত ও ভবিষ্যৎ। কারণ অতীতের খোলা জানালা খুলে বেরিয়ে আসে বর্তমানের এক বিশদ রসদ; যা ভবিষ্যতের দরোজায় কড়া নাড়ে। এই বিশ্বাস নিয়ে মানুষ এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনে চলে। আর সেই স্বপ্ন বাস্ত্মবায়নে একটি ছোট ভূমিকা রাখতে পারে লেখকের একটি শব্দচয়ন বা কথামালা। অতীতের দগ্ধতা বা সুখানুভূতি মানুষকে আবেগতাড়িত করে তোলে। তাই অতীতকে মুছে ফেলা একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। এরই ধারাবাহিকতায়, অতীতের পুনর্পাঠ ও পুনর্নিমাণ ইশিগুরো তার যাবতীয় লেখায় সংযোগ রক্ষা করেছেন। আধুনিক সময়ের দহন কীভাবে বাস্ত্মবতার সামনে হাজির হয় তা নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে তার গল্প ও উপন্যাসে। যার ধারাবাহিকতায় অতীতের সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করেছেন। এ ক্ষেত্রে অতীতের যাবতীয় ইন্দ্রজাল ধরা দিয়েছে তার লেখার অধিকাংশ চরিত্রে। ফলে চরিত্ররা ফুটে উঠেছে এক অনবদ্য ভঙ্গিমায়। তার লেখায় পাঠক খুঁজে পেয়েছে- অতীতের কথামালা কীভাবে বর্তমানের ওপর ভর করে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেয়।
ইশিগুরো তার কল্পনাশক্তি দিয়ে পার্থিব জগতের সঙ্গে মানুষের সরলরৈখিক সংযোগ ঘটিয়েছেন। বিশ্বের মানুষ তার লেখায় খুঁজে পেয়েছে এক জীবনবোধের অনবদ্য কাব্যভঙ্গি। যার বিশ্বাসের ডানায় ভর করে মানুষ ভেঙে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে মেরামত করার স্বপ্ন দেখেছে এবং এখনো দেখে যাচ্ছে। বিষাদ আর সুখগুলোকে পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক পার্থক্য খোঁজার প্রয়াস পেয়েছে ইশিগুরোর পাঠকেরা। যখন কোনো লেখক জীবন ও জীবিকার রসায়ন দৈনন্দিন গল্পের শরীরের সঙ্গে গেঁথে দেয় তখন তার পাঠকরা ভিন্নধর্মী স্বাদ খুঁজে পায়। যার ফলে পাঠক ও লেখকের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়। সে ক্ষেত্রে ইশিগুরো স্বার্থক হয়েছেন, পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা। এজন্য হয়তো-বা সুইডিশ একাডমি বলেছেন, 'জোরালো আবেগীয় শক্তির প্রকাশ ঘটে তার উপন্যাসে, যেখানে দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের কাল্পনিক অনুভূতির প্রকাশ পায়।'
ইশিগুরোর উপন্যাসের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো উপন্যাসর বিষয়বস্তু কোনো সমাধেয় সমাধানে পৌঁছায় না। বিশেষ করে, উপন্যাসের চরিত্ররা একটি অতীতভিত্তিক যাপিত-সমস্যার রসায়নে বরাবরই পড়ে থাকে যা শেষাব্দি সমাধানযোগ্য হয়ে ওঠে না। বিষণ্নতায় ভোগে তার চরিত্ররা, এভাবেই তিনি শেষ করেন এক বিষণ্নভরা হৃদয় নিয়ে। সমাজের দুঃখবোধ, জীবনবোধ, দৃশ্যকল্প বা ছায়াচিত্র আমরা রঙিন রোদচশমা দিয়ে দেখলে তার বাস্ত্মবিক রূপ অনুভব করা কঠিন। সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েই তাদের দুঃখকাতরতাকে অনুভব করা সম্ভব। খুঁজে নেয়া যায় তাদের হারিয়ে যাওয়া সুখগুলোকে। মেরামত করা যায় তাদের ব্যথাতুর দরদকে। সুতরাং, সমাজের যাবতীয় জলজ ও জঞ্জালকে একই দৃষ্টিতে অবলোকন করা জরম্নরি। যা আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রায় বেশ খানিকটা এখনো ঘাটতি। এসব বিষাদময় রসায়ন ইশিগুরোর গল্প-উপন্যাসে বিস্ত্মর খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষের সমাজকে গভীরভাবে আত্মস্ত্ম করার এক একটি পরিশীলিত জলছাপ পাওয়া যায় ইশিগুরোর লেখায়। তিনি মানুষের রঙিন সুখগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে ধূসর দুঃখগুলোর পিছনে বেশি সময় দিয়েছেন রঙিন সময়ের পেছনের গল্প বলতে। কেননা, সুখের স্বল্পতায় মানুষ বেশি ভোগে দুঃখের কাতরতা নিয়ে। ইশিগুরোর প্রত্যেকটি দৃষ্টিকোণ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণের অবতারণা করে বটে কিন্তু সাংঘর্ষিক নয়। জীবনবোধের তলায় যে হাহাকার আমরা দেখতে পাই না, সে হাহাকারের তলদেশ তিনি ওপরে তুলে এনেছেন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মেরামত করতে। সঙ্গে সঙ্গে সুপারিশ রেখেছেন পাঠকধর্মী দৃষ্টিকোণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। আবার কখনো কখনো চেতনার অতলকে মেলে ধরেছেন বিবেকের দরোজায়। বিশ্ববিবেক আর অসাম্প্রদায়িকতাও স্থান করে নিয়েছে তার লেখায়। শ্রেণির জাঁতাকলে পিষ্ট না হয়ে অবিচ্ছিন্ন মমতার দ্বীপে দাঁড়িয়ে চারপাশকে ডেকেছেন দুহাত মেলে। বিনিময়ে পেয়েছেন মানুষের বিশুদ্ধ ভালোবাসা ও স্বচ্ছ বিশ্বস্ত্মতা। কেবল লেখকের রামাবলি গায়ে জড়িয়ে তিনি অহমিকায় ভোগেননি কোনোদিন। সাধারণের সঙ্গে সাধারণের বিশেষ বিশেষণে এগিয়ে নিয়েছেন নিজেকে।
আধুনিক সময়ের বাস্ত্মবতার কথাকার ইশিগুরো। কেননা, সমকালীন সমাজে মানুষের দহনবেলার কথামালা তিনি তার গল্প-উপন্যাসে তুলে ধরেন। বিচিত্র উপলব্ধি রয়েছে তার প্রত্যেকটি কলমের আঁচড়ে। সমকালীন বিবেচনাবোধ ও তুলনামূলক সূক্ষ্ণ বিশেস্নষণের সুপারিশ করে তার লেখনী। বিশ্ব-বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতার বিষয়টিও দাবি করে ইশিগুরোর লেখা। কাজুও ইশিগুরো যথেষ্ট পরিশীলিত ও পরিমিত পরিসরে তার প্রকাশভঙ্গি করে থাকেন। উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। ঘটনার প্রবাহমানতায় তিনি পক্ষে কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। সেখানে কোনো পক্ষপাতদুষ্টে প্রভাবিত হন না। অনেকে লেখকের গল্প-উপন্যাস-কবিতার শরীরে একটি দৃষ্টিকোণে সিদ্ধান্ত্ম প্রয়োগ করার ফলে পাঠকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত্ম প্রণয়নের সুযোগ থাকে কম। অথচ, দৃশ্যকল্প নির্মাণ বা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ইশিগুরোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তার লেখায় কোনো সিদ্ধান্ত্ম প্রয়োগ করেন না। লেখকের নিজস্ব মতামত বা সিদ্ধান্ত্ম উপস্থাপন না করায় পাঠক তার নিজের মতো করে দৃশ্যকল্পের সিদ্ধান্ত্ম নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
সবশেষে এ কথা বলতে হয় যে, অমীমাংসিত এক প্রণোদনার তৃতীয় মাত্রা তুলে ধরে সমাজের সময়কে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন আধুনিক মানুষের চৌকাঠে। বিষণ্নতা, সমস্যা আর সংঘাতের উপকূল ধরে পথ চলে গেছে এক নির্বিকার কথামালার পিঠে চড়ে, যেখানে কেবল লেখক নয় পাঠকের মতামতের ওপর নির্ভর করে ইশিগুরোর চরিত্ররা।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close