বিজ্ঞান ও কথাসাহিত্যের চমৎকার অন্ত্মপ্রবাহপৃথিবীতে যেন আর কোনো যুদ্ধের পটভূমি তৈরি না হয়, পৃথিবী যেন আর কখনো প্রত্যক্ষ না করে হিরোসিমা ও নাগাসাকির মতো ধ্বংসলীলা। সুইডিশ একাডেমি উপযুক্তভাবেই বাছাই করেছেন এবার সাহিত্যের নোবেল বিজয়ীকে। সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছি কাজুও ইশিগুরোকে।মাছুম বিলস্নাহ আধুনিক সময়ের সমাজ ও বিশ্ববাস্ত্মবতার কথাকার জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো সাহিত্য জগতের বিরল সম্মান অর্জন করেছেন এবার। 'তার জোরালো আবেগের উপন্যাসগুলোতে জগতের সঙ্গে ব্যক্তির ভ্রমাত্মক সংযোগের নিচে থাকা শূন্যতার উন্মোচন ঘটে।' তার রচনার তিন উপজীব্য হচ্ছে- স্মৃতি, সময় ও আত্মবিভ্রম। তার আলোচিত উপন্যাসগুলোর ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয় এই তিন বিষয়কে কেন্দ্র করে।সুইডিশ একাডেমির মতে, তার আবেগমথিত উপন্যাসগুলো বাস্ত্মবের পৃথিবীর মায়ার আড়ালে গভীর শূন্যতা ও হাহাকারকে উন্মোচন করে। ইশিগুরো ১৯৮৯ সালে তার 'দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে' উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার পান। ওই বছরই বইটি প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে তিনি সম্মানজনক অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার পুরস্কার পান। সুইডিশ একাডেমির পারমানেন্ট সেক্রেটারি সারা দানিউস বলেন, এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন মেধাবী ও সূক্ষ্ণ ঔপন্যাসিক। দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে-র গল্পটি সময়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে, হারিয়ে যাওয়া একটি সমাজের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।১৯৯৩ সালে উপন্যাসটি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এতে অভিনয় করেন ব্রিটিশ অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিনস ও এম থম্পসন। চলচ্চিত্রটাও অস্কারের আটটি বিভাগে মনোনীত হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নয় বছর পর ১৯৫৪ সালের ৮ নভেম্বর জাপানের নাগাসাকিতে জন্মগ্রহণ করেন ইশিগুরো। তার বয়স যখন পাঁচ বছর তিনি তখন তার দুই বোনসহ পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তার বাবা সিজুয়ো ইশিগুরো একজন সমুদ্রবিজ্ঞানী ও মা সিজুকো। ১৯৭৮ সালে ইশিগুরো ইংরেজি সাহিত্য ও দর্শনে গ্রাজুয়েশনের পর ১৯৮০ সালে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের ওপর মাস্টার্স করেন। তিনি একটি কন্যা সন্ত্মানের জনক, ১৯৮৬ সালে বিয়ে করেন সমাজকর্মী ললনা ম্যাকডুগালকে। পরিবারের সাথে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে এলেও জন্মভূমির স্মৃতি তার পিছু ছাড়েনি। যুদ্ধের আগের ও পরের সময়টাই তার গল্পের উপাদান হয়ে উঠেছে। আমরা জানি মানবসভ্যতার ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে এবং তিন দিনের ব্যবধানে ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার লোক মারা যান, নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার লোক মারা যান। এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত্ম হয়ে মারা যান আরও ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে বিভিন্ন রোগে যা বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল হিরোশিমায় মোট ২ লাখ ৩৭ হাজার এবং নাগাসাকিতে ১৩৫০০০ লোকের মৃতু্য ঘটে। তারা প্রায় সবাই বেসামরিক লোক। বোমার তেজস্ক্রিয়তা এবং বিষাক্ততা আজও সেখানকার মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে। কতবড় নারকীয় ঘটনা যে, ৬৭-৬৮ বছর পরেও তার বিষ মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছে। সুন্দর পৃথিবীকে যারা বীভৎস বানিয়েছে এবং বানানোর পাঁয়তারা করছে এখনও, তারাই মানবতার শত্রম্ন। এই শত্রম্নরাই বাঁধিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পৃথিবী যুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয় এভাবে- ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোলান্ড আক্রমণ করে বসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজয় ও অপমানের প্রতিশোধ নিতে। শুরম্ন হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধে জাপান জার্মানির পক্ষে অবস্থান নেয়। জার্মানি, জাপান, ইটালি, রোমানিয়া ও বুলগেরিয়াকে নিয়ে গড়ে ওঠে অক্ষ শক্তি। অপরদিকে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, নরওয়ে ডেনমার্ককে নিয়ে গড়ে ওঠে মিত্রশক্তি। টানা ছয় বছরের যুদ্ধে জাপান, জার্মানি ইটালির নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তি পরাজিত হয়। কিন্তু জাপান আত্মসমর্পণ করতে বিলম্ব করায় জাপানকে সমুচিত শিক্ষা দেবার জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্ত্মিক ঘটনার জন্ম দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা। মার্কিন বোমারম্ন বিমান বি-টুয়েন্টি নাইন ইনোলা গে 'লিটল বয়' নামে একটি পারমাণবিক বোমা হিরোশিমার ওপর বর্ষণ করে ১৯৪৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে। হিরোশিমা শহর থেকে ৫০০ মিটার ওপরে সেটি বিস্ফোরিত হলে মুহূর্তের মধ্যে শহরটির প্রায় ষাট শতাংশ ধ্বংসস্ত্মূপে পরিণত হয়। মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে তিনিয়ন দ্বীপ থেকে বি-টুয়েন্টি নামে একটি বিমান দ্বিতীয় বোমাটি নিয়ে নাগাসাকির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এ বোমাটির নাম দেয় হয়েছিল 'ফ্যাটম্যান'। বোমাটি ছিল গোলাকার পস্নুটোনাম ক্ষেপণাস্ত্র যা লম্বায় ছিল ৪ মিটার এবং ব্যস ছিল ২ মিটার। নাগাসাকি শহরে ৯ আগস্ট রাতে ঘুমন্ত্ম মানুষদের ওপর নিক্ষেপ করা হয় এই অভিশপ্ত বোমা। মাটি থেকে ৫০০ মিটার ওপরে। নিমিষে ঝরে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার প্রাণ। বোমার তেজস্ক্রিয়তায় শিশুদের মাথার চুল পর্যন্ত্ম উঠে যায়। শিশুরা খাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে। আর বোমার আঘাতে আহতরা দীর্ঘদিন কষ্ট ভুগতে ভুগতে এক সময় মৃতু্যর কোলে ঢলে পড়ে। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত্ম মৃত্যের সংখ্যা দেড় লাখে পৌঁছেছিল।
এসব হৃদয়বিদারক ঘটনার ছাপ ইশিগুরোর লেখায় থাকতে হবে কারণ তার আসল জন্মভূমি জাপানের সেই নাগাসাকি। শুধু জাপানি নাগরিক হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে, একজন খ্যাতিমান লেখক হিসেবে নাগাসাকিতে বোমাবর্ষণের আগের ও পরের ঘটনাবলি তাকে অবশ্যই নাড়া দেবে। ইশিগুরো এ পর্যন্ত্ম তিনি আটটি বই লিখেছেন, বইগুলো বিশ্বের চলিস্নশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আরও লিখেছেন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকের চিত্রনাট্য। অথচ বড় হয়ে তিনি হতে চেয়েছিলেন রকস্টার। নাগাসাকিতে জন্ম নিলেও এই নাগসাকির আণবিক বোমার ধবংসযজ্ঞের ইতিহাস ইশিগুরো প্রথম জানতে পারেন যুক্তরাজ্যে পাঠ্যবইয়ে। যুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়। নিজের পিতৃভূমিতে এসেছিলেন প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর। তুলে ধরেন যুদ্ধ-পরবর্তী পরিবর্তন। ইংরেজিতে লেখেন বলে তার লেখার সঙ্গে সাধারণ জাপানি নাগরিকদের পরিচয় খুব একটি নেই। যদিও তিনি চারবার খ্যাতিমান ম্যান বুকার পুরস্কার অর্জন করেছিলেন চারটি উপন্যাসের জন্য। দ্য টাইমস ম্যাগাজিন তাকে ১৯৪৫ সালের পরের শ্রেষ্ঠ ৫০ জন ব্রিটিশ লেখকদের তালিকায় ৩২তম বলে সম্মান জানিয়েছিল। ইশিগুরোর প্রথম উপন্যাস 'অ্যা পেল ভিই অব হিলস' প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। তার চার বছর পর ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় 'অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড'। সত্যি বলতে কি তার উপন্যাসগুলোর নামগুলোও বিচিত্র। এ দুটি উপন্যাসেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পরের নাগাসাকিকে তুলে ধরা হয়েছে। তার তৃতীয় উপন্যাস 'দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে'-এর মাধ্যমে তিনি সাহিত্য সমাজের পরিচিতি পান। ইশিগুরোর লেখায় আবেগের এবং ঘটমান যে কোনো কিছুর স্বাধীন সযত্ন উপস্থাপনা পরিলক্ষিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী বম্বকে দেওয়া ১৯৮৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে ইশিগুরো বলেছিলেন, 'যুদ্ধ-পরবর্তী ও পরবর্তী সময়ের প্রতি আমার ঝোঁক রয়েছে।' ১৯৯১ সালে জাপানের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক কেনজাবুরো ওয়েকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড' উপন্যাসে তিনি তার ব্যক্তিগত, কাল্পনিক জাপানের বর্ণনা দিয়েছেন। একজন উঁচুমাপের লেখক অবশ্যই তার কল্পনার জগতে বিচরণ করে অনেক কিছু দেখতে পান যা সাধারণেরা পারেন না। তিনি বলেন, ছোটবেলায় আমাকে দাদা দাদি, বন্ধু-বান্ধবদের মতো চেনা মানুষগুলো থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আমি জাপানকে ভুলতে পারিনি কারণ সেখানে ফিরতে আমাকে নিজেকে প্রস্তুত করতে হতো। কাজেই বিষয়টি খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ যে, অন্য একটি দেশের সাথে আমার বন্ধন রয়েছে দৃঢ়, তার প্রতিচ্ছবি আমি মাথার মধ্যে নিয়ে বড় হয়েছি। ১৯৯৫ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমি যে জাপানকে ছেড়ে গিয়েছিলাম বড় হতে হতে একটি জটিল উপায়ে সেই জাপানকেই কল্পনা করতে লাগলাম।'
জেন অষ্টিন ও কাফকার সংমিশ্রণ ঘটানো সাহিত্যের যে উপাদান ইশিগুরোর উপস্থাপনা ও উপাদান অনেকটাই সেরকম, তারপরেও তিনি যেন সম্পূর্ণ আলাদা একজন লেখক, যিনি একটি নৈতিক পৃথিবীর কথাই বলেছেন তার উপন্যাসে। তিনি অতীতকে দারম্নণভাবে বর্তমানের জন্য কখনও এককভাবে কখনও পুরো সমাজের জন্য তুলে আনেন। মূলত মানুষের সমাজকে গভীরভাবে দেখতে চাওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন ছাপ পাওয়া যায় তার গল্পগুলোতে। উত্তম পুরম্নষে লেখা তার সব রচনাতেই চরিত্রগুলো জীবন্ত্ম। তার প্রায় সব উপন্যাস বা গল্পে এক ধরনের ভবিষ্যৎবাদী স্বর পাওয়া যায়। যাতে আধুনিক সময়ের বিপন্নতাকে পৃথিবীর কঠিন বাস্ত্মবতার আলোকে নির্মাণ করেন ইশিগুরো। তবে উপন্যাসের চরিত্র ও বর্ণনায় সমাজের অনুপুঙ্খ বিবরণ প্রতিষ্ঠা করলেও তিনি সমাজের চেয়ে সময়কেই জোরালোভাবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন বলা যায়। তাই কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন যে, তিনি শ্রেণিসচেতন নয়, কাল সচেতন। তিনি মার্কসিস্ট নন, তবে রাজনীতি নিগূঢ়ভাবে তার রচনায় উপস্থিত। তাতো হবেই, কারণ হিরোসীমা ও নাগাসাকির ঘটনা তো ইতিহাস ও রাজনীতিকে আশ্রয় করেই ঘটেছে। নাগাসাকির ধ্বংসাত্মক লীলা তো নিষ্ঠুর রাজনীতিরই খেলা। সরাসরি রাজনীতিক না হয়েও একজন ঔপন্যাসিক তার লেখায় তুলে ধরেন রাজনীতির কুটিল ও জটিল খেলা। সমকালীন বিভিন্ন বিবেচনায় তিনি আলোড়িত হন, যেমন আলোড়িত হয়েছেন সর্বশেষ সিরিয়ার উদ্বাস্তু ইসু্যতে। রোহিঙ্গা ইসু্যতেও নিশ্চয়ই তার নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ মতামত থাকবে, যা বিশ্বের কল্যাণে লাগানো যেতে পারে। তীক্ষ্ন ও তীব্র পর্যবেক্ষণে তিনি এই বিষয়ে কলম ধরেছেন। চোখকে অশ্রম্নসিক্ত করার মতো ছবি প্রত্যক্ষ করছে গোটাবিশ্ব বিভিন্ন গণমাধ্যমের বদৌলতে। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে। শিশুবিষয়ক আন্ত্মর্জাতিক সংস্থা ' সেভ দ্য চিলড্রেন' আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, মিয়ানমার সরকারের যে জাতিগত নিধনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তাতে চলমান সহিংসতায় বাংলাদেশে চলে আসা শিশুদের সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তারা সেখানে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে নিজেদের চোখে। যে বয়সে তাদের থাকার কথা মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনদের আদরের ছায়াতলে আর নিরাপদ ও খেলাময় স্কুলগৃহে তখন তারা প্রত্যক্ষ করছে কিভাবে তাদের বাবা-মাকে, বোনকে ভাইকে গুলি করে, গলা কেটে কিংবা বুটের লাথি দিয়ে মেরে ফেলতে। তাদের নিজ ঠিকানা ও গৃহ জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের সামনেই, ছোট ভাই বা বোনকে সেই আগুনেই পুরে মারা হয়েছে। তাদের বাকি জীবনটাই হয়তবা কাটাতে হবে শরণার্থী পরিচয়ে। বিশ্বের এসব নাগরিকদের প্রতি নূ্যনতম আচরণ তো দূরের কথা, নিষ্ঠুরতার ছাপ দিয়ে তাদের আলাদা করে রাখা হয়েছে। এই শিশুদের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত্ম। তারপর দিনের পর দিন হেঁটে হেঁটে শরীরের অসম্ভব ক্লান্ত্মি তাদেরকে প্রায় মৃতু্যর কাছাকাছি নিয়ে গেছে। ইশিগুরোর উপন্যাস বিশ্বের এসব অসংগতির কথাই বলছে যে, পৃথিবী আজ উপস্থিত হয়েছে অনিশ্চিত এক সময়ে। এই পরিস্থিতিতে নোবেল পুরস্কার পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য শক্তি জোগাবে, এটিই তার আশা, আমাদেরও একই আশা।
কাহিনী বর্ণনা ও গল্প নির্মানে ইশিগুরোর আরেকটি গুরম্নত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বা স্টাইল হচ্ছে তিনি সিদ্ধান্ত্ম দেন না। গল্পের স্বাভাবিকতাকে তার মতোই নির্মাণ করেন, সেখানে লেখকের নিজস্ব মতামত বা সিদ্ধান্ত্ম তৈরির প্রচেষ্টা তার লেখায় পাওয়া যায় না। পাঠকের হাতে তিনি সিদ্ধান্ত্ম গ্রহণের ভার ছেড়ে দেন। অর্থাৎ পাঠককে বেশি ব্যস্ত্ম, বেশি এনগেজ রাখেন। পাঠককেই সিদ্ধান্ত্মে পৌঁছতে দেন, সমাধানে পৌঁছতে দেন। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে তিনি অতীতের পুনরম্নত্থান ঘটান। কখনও ঘটনায়, কখনও চরিত্র বা প্রেক্ষাপটে। বৃহত্তর মানবিকতা তার কথাসাহিত্য ও লেখকসত্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। আধুনিক মানুষের বিপন্ন বিষয় তার চেতনাকে আচ্ছন্ন রাখে। অনেকটা কাফকার জগতের মতো-বিপন্ন, উদ্ভট এক বাস্ত্মবতার জালে তিনিও বন্দি, তবে আর সব ছাপিয়ে মানবিকতার অতুল ব্যখ্যাকার হিসাবেই তাকে অভিহিত করা যায়। অতীত ভবিষ্যত বাস্ত্মবতার নিরিখে তিনি তার কথাসাহিত্যে বিশ্বমানবিকতার বিচিত্র উপলব্ধিকেই তুলে ধরেন। সেখানে হাহাকার ও বিপন্নতা ছাপিয়ে নতুন দিনের প্রতি দৃষ্টি থাকে, যা কিছুই ঘটুক-মানবতার চেয়ে বড় কিছু নেই।
তার প্রথম উপন্যাসে ব্রিটেনে বসবাসকারী এক নারীর জীবন ও সংগ্রাম বর্ণনা করেছেন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানে ছিলেন। তার বইগুলোতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নাগাসাকির প্রেক্ষাপট ঘুরে ফিরে বার বার এসেছে। ইশিগুরেরা লেখায় বিজ্ঞান ও কথাসাহিত্যের একটা চমৎকার অন্ত্মপ্রবাহ তৈরি করেন যা 'নেভার লেট মি গো' উপন্যাসটি পড়লেই বোঝা যায়। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সালে। তার লেখাগুলোর মধ্যে সংগীতের সুরেলা প্রবাহও সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার ছোটগল্পগ্রন্থ 'নকাচারনেস: ফাইভ ষ্টোরিজ অব মিউজিক অ্যান্ড নাইটফল'-এর পরতে পরতে সংগীতের সুরেলা প্রবাহ রয়েছে। দ্য আনকনসোল্ড প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে, হোয়েন উই আর অরফান প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। ১৯৮৪ সালে ইশিগুরো প্রথম টেলিভিশন নাটক লেখেন ' অ্যা প্রোফাইল অব আর্থার জে. ম্যাশন' শিরোনামে। পরে আরও লিখেন 'দ্য গোরমেট (১৯৮৭ সালে), ও দ্যা স্যাডেস্ট মিউজিক ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (২০০৩ সালে)। কাজুও ইশিগুরোর গল্প ও স্কিপ্ট অবলম্বনে বিখ্যাত' দ্য হোয়াইট কাউন্টিজ' শিরোনামে ২০০৫ সালে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস নেভার লেট মি গো অবলম্বনে পরিচালক মার্ক রোমানিক নির্মান করেন আরেকটি সিনেমা। সবশেষ প্রকাশিত ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার 'দ্য বেরিড জায়ান্ট' উপন্যাসটি এক বৃদ্ধ দম্পতির জীবন নিয়ে লেখা যারা ইংলিশ ল্যান্ডস্কেপ আর্কটিকের পথ ধরে হেঁটে চলছিলেন একবুক আশা নিয়ে যে তারা তাদের ছেলের সঙ্গে মিলিত হতে পারবেন, যার সঙ্গে অনেক দিন কোনো যোগাযোগ নেই। তার উপন্যাসের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা কোনো সমাধানে পৌঁছায় না। তার চরিত্ররা অতীতে যে সমস্যা-সংঘাতে পড়ে, তা অমীমাংসিতই থেকে যায়। বিষণ্নতায় কাটে তার কাহিনী।
গোটা বিশ্বজুড়ে চলছে সংঘাত বিভিন্ন আকৃতিতে, বিভিন্নভাবে। আজও বিশ্বের লক্ষ কোটি শিশু অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায়, না খেয়ে ঘুমোতে যায়, বিনা চিকিৎসায় মারা যায় আর যুদ্ধবাজরা কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে সামরিক খাতে, অস্ত্র ও যুদ্ধ বিমান ক্রয়খাতে। উদ্দেশ্য নিজেদের প্রভুত্ব বজায় রাখা লক্ষ-কোটি নিরীহ মানুষের জীবন সংহারের মাধ্যমে। আসুন এগুলো নির্বাসনে দিয়ে বিশ্বের লক্ষ কোটি নিরন্ন মানুষদের মুখে খাবার তুলে দেই, অসহায় মানুষদের মুখে হাসি ফোটাই, দুস্থদের পাশে দাঁড়াই চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে, সত্যিকারের ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিই সকল অসহায় মানুষদের দিকে।
পৃথিবীতে যেন আর কোনো যুদ্ধের পটভূমি তৈরি না হয়, পৃথিবী যেন আর কখনও প্রত্যক্ষ না করে হিরোসীমা ও নাগাসাকির মতো ধ্বংসলীলা। সুইডিশ একাডেমি উপযুক্তভাবেই বাছাই করেছেন এবার সাহিত্যের নোবেল বিজয়ীকে। সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছি কাজুও ইশিগুরোকে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close