পূর্ববর্তী সংবাদ
লোভমো. মাঈন উদ্দিন কালিম উদ্দিনের চোখ দুটি সেদিন খুশিতে চিকচিক করছিল। মুখভর্তি স্ফীত হাসি। হৃদয়ে সুখের দোলা। দুপুরের পর পরই সে বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ ধরেছিল। আর ভিক্ষা করতে মন চাইছিল না। মনে মনে ভাবছিল-আজ কার মুখ দর্শনে যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। এমন সু'দিন আমার জীবনে খুব কমই এসেছে। আজ চৌধুরী বাড়ি পার হবার সময় খোদ চৌধুরী তাকে নাম ধরে ডেকেছে। চৌধুরীর মুখে তার নাম শোনা আর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া সমান কথা। কি যে ভালো লেগেছে চৌধুরীর মুখে 'কালিম উদ্দিন' নামটি শুনে, তা সে বলে বোঝাতে পারবে না। চৌধুরী তাকে বলেছে- কালিম উদ্দিন, বাড়ির ভেতরে আস। তখন কালিম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল চৌধুরীর মুখ পানে। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আসলেই চৌধুরী তাকে ডেকেছে, নাকি অন্য কাউকে? সে এককদম-দু'কদম করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেছিল। চৌধুরী তাকে খাটে বসতে বলেন। কিন্তু সে খাটে বসার সাহস পায়নি। ফ্লোরে বসেছিল। সাদা ভাত আর রম্নই মাছের মাথা দিয়ে তাকে খেতে দেয়া হলো। গোগ্রাসে খেল কালিম। কতদিন ধরে এমন সুস্বাদু খাবার খায় না সে। তার মন চেয়েছিল পাতিলের সমস্ত্ম ভাত-তরকারি খেয়ে ফেলতে। চৌধুরীর মুখে তার নাম শুনে, রম্নই মাছের মাথা দিয়ে সাদা ভাত খেয়ে, সে যতটা খুশি হলো, তার চেয়ে দ্বিগুণ খুশি হলো যখন চৌধুরী তার হাতে দুটি কম্বল সঁপে দিল। আহা! চকচকে আর দামি দুটি কম্বল। তার বউ কম্বল দুটি পেয়ে কতই না খুশি হবে। বউ কতদিন ধরে প্যানরপ্যানর করছে- এই, শীত আয়া গেল। শীতে রাত্রিরে ঘুমাতে বেশ কষ্ট অয়। কারো কাছে চায়া একখান কম্বল-কাঁথা আনতে পার না? তোমার মতোন নিমোরাইদ্যা সোয়ামির ঘর করা থাইক্যা মর্ইযা যাওন অনেক ভালা, অন্ত্মত তহন আর শীতে কষ্ট করন লাগব না। কালিমের খুশির যেন বাঁধ মানছে না। এই শীতে কম্বল দুটি গায় দিয়ে আরামচে ঘুমাবে সে। বউয়ের প্যানপ্যান ধ্বনি আর শুনতে হবে না। এবার আর গত শীতের মতো মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যাবে না। কম্বলের অভাবে হাড় কাঁপবে না।
এত আনন্দের মাঝেও তার মনে একখ- সন্দেহের দানা উঁকি দেয়। চৌধুরী তাকে এত খাতির যত্ন করল কেন? ভিক্ষুক জীবন তো আর একদিন দুদিন ধরে নয়। চৌধুরী এমন খাতির যত্ন তো আর কোনো দিন করে না। তাহলে আজ কেন? আনন্দ আর দ্বিধার পালে দোল খেতে খেতে কালিম উদ্দিন বাড়ি ফিরে আসে।
দু'দিন পর চৌধুরী কালিম উদ্দিনের বাড়িতে হাজির। স্বয়ং চৌধুরীকে তার বাড়িতে দেখে যারপরনাই খুশি কালিম উদ্দিন। চৌধুরী রক্ত-চুষা। গরিবের রক্ত চুষে চুষে বড়লোক হয়েছে। পাষা-। হৃদয়হীন- চৌধুরীর উপস্থিতি দেখে কালিম উদ্দিনের এই কথাগুলো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। কত বড়লোক আর বিদ্বান লোক হয়েও চৌধুরী নিজ পায়ে হেঁটে তার বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে। কালিম উদ্দিনের বাড়িতে চৌধুরীকে বসতে দেওয়ার মতো কোনো চেয়ার নেই। সে দৌড়ে রান্নাঘর থেকে একটি পিঁড়ি নিয়ে আসে। কাঁধের গামছা দিয়ে পিঁড়ি মুছে সে বাড়িয়ে দেয়-সাব, বসেন। আপনি স্বশরীরে আমার বাড়িতে এসেছেন, এতে আমি কত যে খুশি হয়েছি তা আপনাকে বলে বুঝাতে পারব না। কিন্তু তার এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ধাবমান ঘনকালো মেঘে ঢাকা পড়ে যায় চাঁদের চিকচিকে আলো। চৌধুরী গম্ভীরমুখে বলেন, কালিম তোমাকে যে এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। কালিম কিছু বুঝতে পারে না। বলে, চৌধুরী সাব কী ঠাট্টা করছেন? চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দেন- না, ঠাট্টা করছি না। তিনি একটি রেজিস্ট্রি পত্র দেখিয়ে বলেন, এই যে জমির দলিল, তিনি একটি কাগজ বের করে। তুমি তো আবার পড়তে পারো না, তোমাকে দেখিয়ে কী হবে? এই জমি তুমি আমার কাছে বিক্রি করেছ। কালিম, জায়গাটা বেশ উঁচু। এখানে আমি লেয়ার মুরগির ফার্ম দিব। তোমাকে আমি বর্তমান বাজার দরে টাকা দিয়ে দিব, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকো। কালিম এবার বুঝতে পারল কিছুদিন আগে চৌধুরীর ছোট ছেলে কেন তাকে মোবাইল কিনে দেবার কথা বলে শহরে নিয়ে গিয়েছিল। কেনই বা মোবাইল সিম রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে তার টিপ সহি নিয়েছিল। আসলে সে মোবাইল রেজিস্ট্রেশনের আড়ালে জমির দলিলে টিপ সহি নিয়েছিল। সে মনে মনে বলে, মৃত গবাদি পশুর হাড়ও ক্ষুধার্ত শকুনের দৃষ্টি সীমার বাহিরে নয়। তাই বলে এত বড় প্রতারণাটা করতে পারল চৌধুরীর ছোট ছেলে? সে ভেজা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে, চৌধুরী সাহেব, আমার বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে আমি কোথায় গিয়ে থাকব? দাড়ি-গোঁফের ফাঁক গলে চৌধুরীর মুচকি হাসির রেখা দেখা যায়। বলেন, সে নিয়ে তুমি চিন্ত্মা করো না। আমার বাড়ির গোয়াল ঘরটা আছে না? ওটাতো এখন পতিতই পড়ে থাকে। তুমি ইচ্ছে করলে সেখানে না হয়...। মাথা নিচু হয়ে আসে কালিম উদ্দিনের। এ জীবন তো আর একদিন দুদিনের নয়। কতবার কতজনের কাছে কত মারপঁ্যাচে পরাজিত হয়েছে কালিম, তার হিসাব মিলানো কঠিন। অর্থ, লোভ, ক্ষমতার কাছে তাকে আরও একবার পরাজিত হতে হলো।


মো. মাঈন উদ্দিন
সদস্য, জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
হময়মনসিংহ
ঊসধরষ: সড়রহ৪১২৯০২@মসধরষ.পড়স
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close