অতিথিমূল : এইচ আর লান্ডো প্যাটারসন অনুবাদ : মনির তালুকদার লোকটা অদ্ভুত। তার ধূসর ফেল্ট হ্যাটের নিচে অনিশ্চিত হাসিটি আমাকে খানিকটা ঘাবড়ে দিয়েছিল। কেননা আমার একটা আশ্চর্য ধারণা হয়েছিল যে, আমি তাকে অস্বস্ত্মিতে ফেলেছি। দীর্ঘ সময় ধরে সে নীরব ছিল। তার সম্পর্কে কেমন একটা অশুভ কিছু আমার মনে হতে লাগল।
সহসা সে বলল প্রায় ক্ষমা প্রার্থীর স্বরে, 'তুমি কি মিস গস্ন্যাডিসের ছেলে?' মদ এবং টুথপেস্টের হালকা গন্ধ। ঘার নাড়লাম। সে তাকিয়ে রইল আমার দিকে, মুখ খানিকটা খোলা। তার চোখ দুটো ছলছলে, কৌতুহলী ও কিছুটা বিমর্ষ।
"আপনি কি চান আমি তাকে ডেকে দিই।" আমি জিজ্ঞাসা করলাম। "কি বললে?" মনে হলো সে অবাক হয়েছে এই ভেবে যে আমিও তাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি, অথবা আমার এতই সাহস যে তাকে প্রশ্নটি করে ফেলেছি। সে ঢোক গিলল, বর্ধিত কৌতূহল নিয়ে তাকাল আমার দিকে, তার পর বিড়বিড় করে বলল, "ওহো, তাকে ডাকবে? আচ্ছা আচ্ছা তাই করো।" কী মজার লোক, দরজার দিকে যেতে যেতে ভাবলাম আমি।
"মা"-
"কি?"
"বাইরে একজন লোক তোমাকে ডাকছে।"
"লোক? কে লোকটা?"
"চিনি না। আগে কখনো দেখিনি।"
মা উঠে জানালা দিয়ে উঁকি মারল। এতক্ষণে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইছি আগন্তুক কে হতে পারে এবং সে জন্যই যখন বাইরে উঁকি মেরে দেখছিলাম আমি মাকে খুব ভালো করে লক্ষ্য করলাম। মা তাকিয়েই আছে, তাকিয়েই আছে। একেবারেই নড়ছে না, মনে হচ্ছে যেন জানালার সঙ্গে একদম সেঁটে গেছে। ভেতরে ঢুকলাম এবং মায়ের অভিব্যক্তি দেখে মৃদু নাড়া খেলাম।
'মা কি হয়েছে?'
মা উত্তর দিল না। বুঝলাম বেশ ভালো রকম গড়বড় হয়েছে। আমি এমন কোনো পরিস্থিতি দেখিনি, যা মা কোনো না কোনো ভাবে মোকাবিলা করতে পারে না। এ মুহূর্তটি আসার আগে পর্যন্ত্ম।
"মা...?"
"গিয়ে বল আমি এখানে নেই... গিয়ে বল... না দাঁড়া, বল... বল গিয়ে আমি আসছি।"
আগন্তুক যেই হোক না কেন আমি বুঝলাম সে আমাদের কোনোভাবে ভয় দেখাচ্ছে এবং আপনা আপনি তাকে ভয় পেতে লাগলাম। তবু যখন তার কাছে ফিরে গেলাম তার চেহারা আমার মধ্যে অল্পই আশঙ্কার উদ্রেক করল। তার হাবভাব কেমন যে অনিশ্চিত আবছা ও দূরবর্তী। আমার ধাতের বিরম্নদ্ধেও তা আমাকে প্রত্যয় জোগাল। এমন কি, এক লহমার জন্য। আমার কেমন যে আবছা ধারণা হলো লোকটা আমাদের ভয় পাচ্ছে। এবং এটিই আমার শিশুসুলভ অহঙ্কারকে উসকে দিচ্ছে।
"মা বলল আসছে" তাকে বললাম।
মৃদু স্বরে সে ধন্যবাদ জানাল। আমার মা দরজার বাইরে বেরিয়ে এল, তার পর থামল এবং তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। লোকটা তার দিকে এগিয়ে গেল এবং কয়েক গজ দূরে থামল। একটা নীরবতার ষড়যন্ত্র যেন তাদের মধ্যে, বরং বলা যায় আমাদের মধ্যে রাজত্ব করতে লাগল, কেননা, এতক্ষণে আমিও তাকিয়ে আছি ফ্যালফ্যাল করে। ভাবছি এসব কী ঘটছে। শেষটায় লোকটাই নীরবতা ভাঙল। "হি, গস্ন্যাডিস, আশা করি খুব একটা অবাক হওনি।"
"আমি যে এখানে থাকি খুঁজে পেলে কি করে।"
মায়ের স্বর খুবই সংযত, তবু তার মধ্যেও একটু খানি ধমক মেশানো ছিল।
"এ শহর দিয়ে যাচ্ছিলাম চীনাদের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোমাকে তারা চেনে কিনা পরে তারা পথ দিখেয়ে দিল"
পুনরায় দীর্ঘ নীরবতার পর মা তাকে ভেতরে যাবার ইঙ্গিত করল। দরজাটা আধখোলা এবং আমি সেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম পরবর্তী পনের মিনিট। তারপর শুনলাম মা আমাকে ডাকছে। আমার হৃৎপি- লাফিয়ে উঠল এই ভেবে যে শেষ অব্দি আগন্তুক রহস্যের সমাধান হতে ছলেছে। ভদ্রভাবে আমি আমার শার্ট প্যান্টের মধ্যে গুছে নিলাম। মা আবার ডাকল অধৈর্যভাবে।
একছুটে চলে গেলাম ভেতরে। আমাদের একমাত্র চেয়ারে লোকটা বসে আছে। মা বিছানার ধারে বসে আছেন। যখন ঢুকলাম দু'জনেই আমার দিকে তাকাল। আমি লোকটার চোখদুটো এড়িয়ে মায়ের দিকে তাকালাম আশ্রয়ের জন্য। আবার এক দীর্ঘ নীরবতার পর খানিকটা ইতস্ত্মত করে লোকটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বিড়বিড় করে বলল, "তোর বাবা।"
আমি খানিকটা বিস্মিত হলাম অবশ্যই, তবে চমকালাম না। বোধ হয় বিভ্রান্ত্ম হলাম সব চাইতে বেশি। জানতাম আমার বাবা কোথাও কোনো একটা আকারে আছে। কিন্তু তার সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল আবছা, অবয়হীন। সে ছিল আমার ব্যক্তিগত লোকবৃত্তের অংশ হিসেবে কিছু একটা যাকে আমি ভালোবাসি এবং কখনো কখনো স্বপ্ন দেখি, যেন খুব দামি সোনালি মাছ-কিন্তু কখনো কামনা করিনি তাকে সত্যি সত্যি, কখনো নিইনি তাকে গভীরভাবে। তাকে আমার সামনে দেখে আমি নিশ্চিতই এমন স্ত্মম্ভিত হয়ে গেলাম যে মনে হলো আমি যেন হাট্টিমা টিম দেখছি। কী আমি বলতে পারিই কী বলার জন্যে আমার কাছে আশা করা হচ্ছে। তারা চাইছে আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি। বেশ তো আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। তার ভুরম্নর ওপর দাগটা গাল দুটো এবড়ো থেবড়ো। ভাবলাম রোজ তার দাড়ি কামানো উচিত। আমার বন্ধুরা বলে তাদের বাবা নাকি তাই করে। আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা ভারি মজার হতো যদি আমার জননীও রোজ দাড়ি কামাত। আমার গবেট ধারণা সম্পর্কে আমি অবশ্য অচেতন ছিলাম না।
আমার দিকে তাকিয়ে সে পছন্দের ভঙ্গি করল। "চমৎকার ছেলে তুমি" সে বলল, আমি ভাবলাম সে কী বোঝাতে চাইছে। তখন সে তাকাল আমার মায়ের দিকে। একই রকম অনিশ্চিত দুর্বল স্বরে আবার বলল, "চমৎকার ছেলেটা।"
সায় জানাতে মা বিড়বিড় করে কিছু বলল, তারপর তাকাল আমার দিকে। আমাকে কেউ এভাবে প্রশংসা করলে তার চোখ যেমন সচরাচর গর্বে চকচক করে ওঠে সে আলো তার চোখে এখন নেই। বরং যেন খানিক খুঁত খুঁতে। তার চোখ দুটোতে যেন রাগের ছোঁয়াই খুঁজে পেলাম এবং আমার বোধগম্য হলো না মায়ের প্রতিক্রিয়া কেন এমন হচ্ছে। তাকিয়ে থাকার সময় তার মুখ ছিল নোয়ানো এবং আমি যদি তাকে বেশ ভালো করে না জানতাম তা হলে আমার নিশ্চিত ধারণা হতো যে তার দু-চোখে লজ্জা মাখানো। তার পর মা কনুই হাঁটুর ওপর রাখল, চিবুক আঙুল দিয়ে ধরা। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি জানতাম এ দীর্ঘশ্বাস তার নীরব অভিব্যক্তির পুনরাবৃত্তির শারীরিক প্রকাশ, যখন তার ঠোঁটে সবসময় থাকত, "হায় আলস্নাহ, এ কী জীবন"
আমি ভাবতে লাগলাম কী সব চলছে। আগেও খেয়াল করেছি বড়রা কেমন যেন অদ্ভুত কাজ করে কিন্তু আমার অন্ত্মঃশায়ী অজ্ঞতার মধ্যেও কিছু বোধের আলো থাকত কিন্তু অচেতনতা, যত সামান্যই হোক না কেন, যে তারা যাই করম্নক না কেন তার ভেতরে কোনো মানে আছে। কিন্তু আমার মা ও ওই আগন্তুকের ব্যবহার আমায় পুরোপুরি ভেবড়ে দিল। ওরা কিছু বলছে না কেন? ওরা কি পরস্পরকে অপছন্দ করে? তার মানে এই লোকটা যে আমার বাবা তাতেই কি মায়ের সব কিছু জানানো হয়ে গেল?
সহসা একটা ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, লোকটা নিশ্চয়ই আমার কাছ থেকে মাকে কেড়ে নেবার জন্য এসেছে। বোধ হয় এ ব্যাপারটাই দুজনকে দুর্ভাবনায় ফেলেছে। তারা জানে না আমাকে এ কথাটা কেমন করে বলবে।
আমার মা আমাকে একা ফেলে রেখে চলে যাবে। এক লহমায় তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সার, তার উপস্থিতির গুরম্নত্ব নিজে নিজেই আমার ওপর পড়ল। আমি তাকে ভালোও বাসি না ঘৃণাও করি না। আমি তাকে একটু ভয় পাই, কেননা প্রায়শই সে আমাকে নিষ্ঠুরভাবে পেটায়। কিন্তু চোখের জলে যে রাগটা তখন প্রকাশ করি, তা পুরোপুরি আমার ব্যথা বোধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কীভাবে আমি যেন নিশ্চিত হয়েছিলাম আমার মার খাওয়াটা আমার থেকেও তাকে কষ্ঠ দেয় বেশি। দুনিয়াটা কঠিন একথা আমাকে প্রায়ই বলে সে। আমি তার সন্ত্মান, পুরোপুরি তারই দয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং সেটাই তো স্বাভাবিক। সব কিছু ছাপিয়ে একটি শক্ত বাঁধন আমাদের ধরে রেখেছে। শুধু এই ভয়, আমরা যদি পরস্পরকে হারাই তাহলে সবকিছুই হারাব। আমার কাছে সে একজন ব্যক্তি যাকে আমি ডাকি মা বলে; আমাকে খাবার, জামা কাপড় আর স্কুলে পড়ার বই দেয় সে। আমাকে ভালো হতে শেখায়। অবশ্য স্পষ্ট করে বুঝি না ভালো বলতে কী বোঝায়। বেশির ভাগ সময়ই আমার মনে হয়েছে তার কাছে অকৃতজ্ঞ না হওয়া। আমার মনে হয় মা নিজের মতো করেই উষ্ণ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মা অচেতনভাবেই আমাকে শিখিয়েছে যাতে আমার চাহিদা বেশ কম। না হয় এবং সে কারণে আমার চাহিদা বেশ কমই। আমার একমাত্র কামনা হলো, মা যেন আমার কাছে থাকে। শুধু আমার কাছেই থাকে। আর এখন তার চলে যাবার ভয় দেখা দিয়েছে।
কিন্তু তা কখনই সম্ভব নয়। নিজেকে বুঝ দিলাম এ ঘর ছেড়ে আমার চলে যাবার সিদ্ধান্ত্মটা বোকামি হবে না। হয়তো তারা এখন বুড়োদের উপযোগী কথা বলতে চায়। যখনই দরজার দিকে গুটি গুটি রওনা দিয়েছি তখনই শুনতে পেলাম লোকটা বলছে ভঙ্গিটা এমনই যেন মনে হচ্ছে, এক কথাই সে আবার বলছে 'হঁ্যা, অনেক দিনই কেটে গেল গস্ন্যাডিস।' সিদ্ধান্ত্ম করলাম আমার উপস্থিতিই তাদের আপাত অস্বস্ত্মির কারণ, তাই দরজার দিকে খুব একটা না লুকিয়েই এগিয়ে চললাম। সহসা শুনলাম মা আমার নাম ধরে ডাকছে। তার স্বর তীক্ষ্ন ও কঠোর; তাকে বলতে হলো না আমাকে থাকতে হবে। তার গলার স্বরই যথেষ্ট।
আগন্তুক আমার দিকে তাকাল জিজ্ঞাসুভাবে, তারপর মায়ের দিকে, তারপরই সহসা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। রীতিমাফিক ভঙ্গি করল যাতে বোঝাল সে চলে যেতেই চাইছে: তবু ইতস্ত্ম করল সে। তারপরই তার যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল। প্যান্টের পকেট থেকে একটা পাঁচ শিলিংয়ের নোট নিয়ে সে আমার হাতে দিল।
"এটা দিয়ে কিছু একটা কিনে নিয়ো" বলল সে। নোটটার দিকে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, খানিকটা চোটও পেলাম যেন, এতগুলো টাকা একসঙ্গে পেয়েও বটে, আবার আর কেউ নয় ওই লোকটাই আমাকে তা দিচ্ছে বলে। মায়ের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য আমি তার দিকে তাকালাম। একটুও অবাক হলাম না যখন সে বলল 'ফিরিয়ে দে।' পর পর লোকটার দিকে ফিরে বলল, "তোমার সাহায্য ছাড়াই এতদিন ওকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। এখন আর তোমার সাহায্য চাই না।"
সঙ্গে সঙ্গেই আমি টাকাটা তাকে ফেরত দিয়ে দিলাম কেননা আমি বুঝলাম এখন এনিয়ে তক্কাতক্কি করার মতো মেজাজ মায়ের নেই। কেননা এরপরে মায়ের সঙ্গে একা পড়তে হবে ওই ভয় তখন শুরম্ন হয়ে গেছে।
লোকটা প্রতিবাদ জানাতে শুরম্ন করল, তারপর সহসা হাল ছেড়ে দিল। আমার কাছ থেকে নোটটা ফিরিয়ে নিল সে। আমি তার জন্য কষ্ট পেতে শুরম্ন করলাম, কেননা তাকে তখন মনে হচ্ছিল অপমানিত, ব্যথিত। তার ছোট ফেল্ট হ্যাটটা তুলে নিয়ে সে মাথায় পরল, তারপর একটি কথাও না বলে বেরিয়ে গেল। আর কোনোদিন তাকে আমি দেখিনি।

লেখক পরিচিতি
জামাইকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জন্ম ১৯৪০ সালে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে লেখাপড়া সাঙ্গ করে লন্ডন অব ইকোনমিকস থেকে সমাজবিদ্যায় পিএইচডি পান। কিছু ভালো গল্প এবং গুটি দুয়েক উপন্যাস লিখেন তিনি।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close