রাত্রি অবসানশারমিন সুলতানা রীনা গভীর রাতে একটানা কুকুরের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় রাত্রির। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে আবার ঘুমের চেষ্টা করে ও। ঘুম কিছুতেই আসছে না। কুকুরগুলোর চিৎকার বাড়তে থাকে। একসময় ওর শরীরে লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। কিছুক্ষণের জন্য ভয় ওকে গ্রাস করে। কুকুরের কান্না নাকি অমঙ্গলের চিহ্ন। কিন্তু রাত্রি জানে ও আজ এসব কিছুরই ঊর্ধ্বে। ঘরের মধ্যে প্রচ- গরম। ফ্যানের বাতাসও গুমোট হয়ে গেছে। একসময় বিছানা ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করে। পুরো শরীর ব্যথা, উঠতে গিয়েও পারে না। অস্বস্ত্মিতে ভরে যায় শরীর-মন। তারপর এক ঝটকায় বিছানা থেকে উটে বেলকুনিতে গিয়ে বসে রাত্রি। আহ! কি আরাম। ঠা-া বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে ওর চোখেমুখে। ঘরের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মা তার সঙ্গেই ঘুমায়, আজ তিনি অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। রাত্রি পাশ থেকে উঠে আসে তিনি টের পান না।
বাইরে তাকায় ও। প্রকৃতির নিস্ত্মব্ধতা প্রাণভরে উপভোগ করে, তার মনে হয় সে এবং এই নীরব প্রকৃতি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারায় তারায় আকাশভরা। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাত্রি। কি অপূর্ব লাগছে রাতটি। অন্ধকারে চাঁদকে ঘিরে মেঘের লুকোচুরি দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে যায় রাত্রি। মাঝেমধ্যে পাহারাদারের বাঁশির শব্দ কানে আসছে। কুকুরের ডাক থেমে গেছে। বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে থাকলেও শরীরের ব্যথা কমছে না। মনে হচ্ছে তা আরও বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন প্যাথেড্রিন ইনজেকশন দিয়ে ওকে ঘুম পাড়ানো হয়। প্রথমদিকে বুঝতে পারেনি কেন তাকে এভাবে ইনজেকশন দেয়া হয়। রাতে শরীরের ব্যথায় ও যখন চিৎকার করে তখন ব্যথা কমানোর জন্য দেয়া হয় এটা, ও জানতো না। এগুলো প্যাথেড্রিন। প্রথমদিকে বাবা-মা বলেছেন ব্যথা কমানোর ইনজেকশন। কিন্তু ব্যথা কমছে কিনা তা বোঝার আগেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায় ও। তারপর সকালে উঠে আবার ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন, পরীক্ষার জন্য রক্ত নেয়া। রাত্রি তখন বুঝতে পারেনি ওর কি হয়েছে। তবে এটুকু বুঝেছিল বড় কোনো অসুস্থতা ওকে পেয়ে বসেছে। তিনমাস হাসপাতালে থেকে কিছুদিন হলো বাসায় এসেছে।
হঠাৎ একদিন পড়তে পড়তে চেয়ার থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। ডাক্তার এসে কি কি বলে গেল, তারপর বিভিন্ন পরীক্ষা। অবশেষে হাসপাতাল। উঃ শরীরের মধ্যে স্যালাইন চলছে অবিরাম, ওষুধ ইনজেকশন আর ভাবতে পারে না। অসহ্য যন্ত্রণা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এখন ওর মনে হচ্ছে এভাবে কষ্ট না পেয়ে মরে গেলে ভালো হতো তাকে নিয়ে বাসার সবার কত উৎকণ্ঠা। মা সারারাত ঘুমান না। ওর শিহরে বসে কত দোয়া-দরম্নদ পড়েন। মাকে অসুখের কথা জিজ্ঞেস করলে বলেছেন, অ্যাপেনটিসাইড ব্যথা অপারেশন করলে ভালো হয়ে যাবে। রাত্রির আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। কত ওষুধ খাওয়া যায়, স্যালাইন নেয়া যায়।
ইনজেকশনে ওর পুরো শরীর ফুটো হয়ে গেছে। বাবা-মা, ভাইবোন কাছের আত্মীয়-স্বজন কারও ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া নেই, নেই বিশ্রাম। সবার চোখেমুখে দুশ্চিন্ত্মার ছাপ। একটা করম্নণা ঝরে পড়ে রাত্রির জন্য। রাত্রির এসব ভালো লাগে না। সে এখন সবার করম্নণার পাত্রী। শরীরের মধ্যে সেদিন প্রচ- ব্যথায় ও কোঁকাচ্ছিল। ওর হাত-পা কাঁপছিল। নার্স এসে ওকে তখন ইনজেকশন দেয়। শরীরের এই যন্ত্রণার মধ্যে খেয়াল করে মার চোখের পানিতে ঘুম ঘুম ভাব। আসলে রাত্রি তখনও ঘুমায়নি। বাবাকে বলেছেন ডাক্তার-বড়জোর আর মাসখানিক বাঁচবে ও। বস্নাড ক্যান্সারে আক্রান্ত্ম হয়েছে। মা চিৎকার করে ওঠেন। কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না। রাত্রির। ততক্ষণে ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে গেছে।
আস্ত্মে আস্ত্মে যখন চোখ মেলে, মার চোখের পানি তখনও শুকায়নি। মা আঁচল দিয়ে চোখের পানি মোছার চেষ্টা করেছেন, রাত্রি মাকে বলে, মা আমাকে বাসায় নিয়ে চলো, এখানে আর থাকতে ইচ্ছা করছে না। ওষুধের গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। মুক্ত বাতাসে এবার আমাকে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে দাও। দেখো বাসায় গেলে আমি ভালো হয়ে যাবো, মা নিরম্নত্তর চোখের পানিতে বুক ভেসে যাচ্ছে। মা ওমা তুমি এভাবে কেঁদো না তো! আমি তো ভালো হবো। তোমার দোয়া বিফলে যেতে পারে না। তুমি আর কেঁদো না। ইনশালস্নাহ আমি ভালো হবো। নিজের মধ্যে তখন ভেঙেচুরে যাচ্ছে, তারপর ও মাকে মিথ্যা সান্ত্ম্বনা দেয়। ও যখন জানতে পারে ওর আয়ু আর মাত্র কিছুদিন, তখন বেঁচে থাকার কি আকুলতা ওর মধ্যে। কিন্তু রাত্রি জানে বস্নাড ক্যান্সারে আক্রান্ত্ম রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা নেই। কাউকে বুঝতে দেয় না ওসব জেনে গেছে। অনেক বলার পর হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে ওকে বাসায় আনা হয়। অনেকদিন পর বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় রাত্রি। হাসপাতালের পরিবেশ ওকে পাগল করে ফেলেছিল- বেশির ভাগ সময় কাটাতো ঘুমিয়ে। যখন ঘুম ভাঙতো শুনতো কারও না কারও স্বজন হারানোর আর্তচিৎকার। বাসায় এসেও আবার সেই ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন, ইচ্ছা করে না আর এত তেঁতো তেঁতো ওষুধ খেতে। কি হবে এগুলোতে? এগুলো তো ওর অবশ্যম্ভাবী মৃতু্যকে রোধ করতে পারবে না। তারপর কাউকে কিছু না বলে সবার সাজেশন শোনে আর সারাদিন রাত কাটে বিছানায় শুয়ে শুয়ে।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবী রাত্রিকে দেখতে আসে। রাত্রি ওদের হাস্যোজ্জ্বল মুখের অন্ত্মরালে বুঝতে পারে বিষাদের করম্নণ ছায়া। রাত্রির কোনো উৎকণ্ঠা নেই, নেই ভয়, নেই স্বপ্ন, নেই আশা। কেউ কেউ মার সঙ্গে কথা বলে আর রাত্রির কাছে থেকে বিদায় নিতে আসে না। কেউ হয়তো কপালে হাত রেখে সান্ত্ম্বনা দেয় 'রাত্রি তুই ভালো হবি' রাত্রি হাসে। কষ্টের হাসি। এর কি কোনো উত্তর দেয়ার প্রয়োজন আছে। ওর তখন মনে পড়ে পৃথিবীর মানুষরা এত ভালো কেন? ওর কষ্ট সবাই ভাগ করে নিতে চায়। কিন্তু এটাই কি সে কাউকে দিতে পারে?
রাত্রির সব অস্ত্মিত্বজুড়ে আছে একটি মুখ। রাতুল, সেই রাতুলের জন্য রাত্রি নিজেকে গড়ে তুলেছে। তিল তিল করে নির্মাণ করেছে নিজেকে। তিনটি বছর। উঃ আর ভাবতে পারছে না রাত্রি। রাতুল আসার কথা। খুব দ্রম্নত আসবে ও। হয়তো রাত্রির সঙ্গে দেখা হতে পারে আবার নাও পারে। পুরোটাই ভাগ্যের হাতে সমর্পণ। রাত্রির মনে হয় রাতুল আসা পর্যন্ত্ম কি ও বাঁচবে? খোদার কাছে প্রার্থনা করে আর মাত্র কয়েকটি দিন ওর আয়ু বাড়িয়ে দিতে। মৃতু্যর আগে একবার শুধু রাতুলকে দেখতে চায়। রাতুলের জন্যই এখন ওর অপেক্ষা।
রাতুলের সঙ্গে রাত্রির পরিচয় ছিল খুব মজার। ইউনিভার্সিটিতে একটা বিতর্ক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল ওরা। দুজন ছিল দুইপক্ষের। সবার কি জোরালো যুক্তি। কেউ কাউকে হারাতে পারছিল না। কোন দল জিতবে উৎকণ্ঠায় থাকে সবাই। রাত্রি ছিল তাদের দলের দলনেত্রী। অবশেষে বিচারকম-লীর রায়ে রাত্রির দল বিজয়ী হয়। শান্ত্মশিষ্ট রাত্রির ছিল সেদিন কি উচ্ছলতা। আজ সবকিছু স্বপ্ন। সত্যি আজ মৃতু্যকে আলিঙ্গন করা। পরদিন ইউনিভার্সিটিতে রাতুলের সঙ্গে দেখা হয়। মিষ্টি একটু হাসি দিয়ে চলে যেতেই রাতুল ডাক দেয়। গতকাল তো তার্কিক নয় যেন গ্রামের একজন নামকরা ঝগড়াটে মেয়ে বলে মনে হয়েছিল, আর আজকে এতটা শান্ত্ম যে গতকালের পরিবেশের সঙ্গে আপনাকে আজ মোটেই মানাচ্ছে না।
: তাই বুঝি?
: চলুন না ওদিকে গিয়ে বসি।
: ঠিক আছে চলুন।
এরপর আস্ত্মে আস্ত্মে দুজনকে দুজনের ভালোলাগা থেকে হয়ে গেল প্রেম। এক সময় স্কলারশিপ নিয়ে রাতুল চলে যায় আমেরিকায়, দুই পরিবারে কথা হয়। রাতুল ফিরে এলে ওদের বিয়ে হবে। এরপর প্রতীক্ষা। রাত্রি ভাবে কটা বছর কাটতে দেরি হবে না। যদিও কষ্ট হয় রাতুলকে না দেখে, তারপরও সান্ত্ম্বনা পায় চিঠি লিখে টেলিফোনে যোগাযোগ করে। নিয়মিত আসা-যাওয়া করে রাতুলদের বাসায়। সবাই ওকে আদর করে ওবাড়ির বউ হিসেবে। রাতুলের আম্মা রাত্রি গেলে ওকে আসতে দিতে চান না। প্রথম যখন শরীরের অনুভব করে অসুখের যন্ত্রণা একবার ইচ্ছা হয়েছিল রাতুলকে জানাবে। পরক্ষণে আর জানায়নি এবং সবাই বারণ করে দিয়েছিল রাতুলকে না জানাতে, পাছে ওর লেখাপড়ায় ডিস্টার্ব হয়। কিছুদিন আগে মার মুখে শুনে রাতুল আসবে এ মাসের ১৫ তারিখে। রাত্রির চোখ বেয়ে গড়িয়ে যায় অশ্রম্ন। কোনো কথা বলে না সে, কি বলবে? কয়েকটা দিন বেঁচে থাকা এখন শুধু রাতুলের জন্য। যদি রাতুলের দুটি হাত ওর কপাল স্পর্শ করে, মৃতু্যর আগে তা হবে ওর পরম পাওয়া। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাড়ি আছে। রাতুলের আসতে। যন্ত্রণায় ভরে ওঠে রাত্রির বুক। রাতুল আমার আনন্দ-বেদনায় রাত্রির দু'চোখ ঝাপসা। আর ভাবতে পারে না। গত রাতের ওষুধগুলো খাওয়া হয়নি। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে এখন শরীরে। আকাশের তারাগুলো আস্ত্মে আস্ত্মে মিলিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে শুরম্ন হচ্ছে ফজরের নামাজের আজান। কি মধুর আজানের সুর। মনপ্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে তার। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে এই আজানের সুর কি সে আর কোনোদিন শুনতে পাবে? আর কি দেখতে পাবে সুন্দর কোনো ভোর? পাখির ডাক? তারার ঝিকিমিকি দেখতে পাবে? নাহ্‌ আর বসতে পারছে না। মা এখনি উঠে পড়বেন। উঠলেই বকবেন কেন রাত্রি বিছানা ছেড়ে এখানে বসে আছে? মা কেমন করে বুঝবেন এখন রাত্রির কত কী করতে ইচ্ছা করছে! ভোর হচ্ছে আর রাতুলের আসার সময় ঘনিয়ে আসছে। একটা ভালোলাগা ওকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
ক্লান্ত্মিতে ভরে আসে পুরো শরীর। ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছে চোখ। উঠতে গিয়েও উঠতে পারে না। চিরদিনের ঘুম ভর করে ওর দু'চোখে। ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ে রাত্রি।
ঘুম থেকে উঠে রাত্রিকে বিছানায় না পেয়ে মা বিচলিত হয়ে পড়েন। খুঁজতে খুঁজতে বেলকুনিতে গিয়ে দেখেন দু'চোখ বন্ধ করে রাত্রি শুয়ে আছে। 'এই রাত্রি ওঠ, ওঠ মা! বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাক, গায়ে হাত দিতেই রাত্রির মাথা এক কোণে হেলে পড়ে যায়। মা চিৎকার করে ওঠেন, রাতের অন্ধকার মিলিয়ে যেতে না যেতেই রাত্রি মিশে যায় ভোরের আলো-আঁধারের সঙ্গে। নিজেকে একাত্ম করে ফেলে সে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin