পরবর্তী সংবাদ
কথানির্মাতা রাহাত খানের এক আকাশড. ফজলুল হক সৈকত রাহাত খান সাংবাদিক। রাহাত খান (জন্ম : ১৯ ডিসেম্বর ১৯৪০, কিশোরগঞ্জ) কথানির্মাতা। সাংবাদিকতার তথ্যময় ও তত্ত্বপূর্ণ কথার চালে চালে চলে তার জীবন। মানুষের সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে, সম্পাদকীয় রচনার সময় বিশেস্নষণ ও পরামর্শ প্রদানের কালে তার চেতনায় হয়তো জেগে থাকে শেষপর্যন্ত্ম কেবল মানুষ। আর তাই, সামাজিক মানুষের অবস্থান ও পরিক্রম প্রসঙ্গ কথাসাহিত্যের ক্যানভাসে সাজিয়ে তোলেন তিনি। পাঠকের গভীর ও একটানা মনোযোগ ধরে রাখার যে কৌশল ও সাফল্য, তা সম্ভবত আয়ত্ত করতে পেরেছেন তিনি। স্বাভাবিক বর্ণনায়, আটপৌরে কথামালা সাজিয়ে তিনি তৈরি করেন উপন্যাসের ক্যানভাস।
অন্য অনেকের মতো গল্প লেখার মাধ্যমে কথাসাহিত্যে তার প্রবেশ। আনন্দমোহন কলেজের বার্ষিকীতে ছাপা হয়েছিল তার 'নিভুনিভু' নামের একটি গল্প। তবে ১৯৬৪ সালে ২৪ বছর বয়সে পূবালী পত্রিকায় 'চুড়ি' গল্প প্রকাশ রাহাত খানের কাহিনীকার হিসেবে আবির্ভাবের সূত্র। এই গল্পেই তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন। এরপর শুরম্ন হলো তার ভ্রমণ-পরিভ্রমণের কাল। সাংবাদিকতার সূত্রে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ আর পরিচিত-অপরিচিত মানুষের প্রবণতায় পরিভ্রমণ রাহাত খানকে দিনে দিনে সাহিত্যিক করে তুলেছে। শিল্পের সৌন্দর্য আর আনন্দের প্রতি একপ্রকারের দায়বদ্ধতা থেকে তিনি লিখে চলেছেন বিরামহীনভাবে। নারী-পুরম্নষের সম্পর্ক, সমাজের বিত্তবিভাজনের ঘাত-প্রতিঘাত, প্রকৃতির অপার শোভা আর বয়ে-চলা জীবনে যে সব রহস্যের কোনো সমাধান নেই- সে সবের ছবি ও প্রতিচ্ছবি তুলেছেন তিনি কথাশিল্পের ক্যামেরা কণিকায়।
আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গ রাহাত খানের আকাশের ওপারে আকাশ (প্রথম প্রকাশ : ফেব্রম্নয়ারি ২০০৪, অনন্যা, ঢাকা) উপন্যাসটির একটি সাধারণ পাঠ ও পর্যবেক্ষণ। কাহিনীর ভেতরে প্রবেশের আগে, আমরা, প্রসঙ্গত কবি ও কথাশিল্পী জীবনানন্দ দাশের 'আকাশলীনা' কবিতাটির কথা একটু স্মরণ করতে চেষ্টা করব-
সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সঙ্গে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা :
নক্ষত্রের রম্নপালি আগুন ভরা রাতে;

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে- আরো দূরে
যুবকের সঙ্গে তুমি যেয়ো নাকো আর।

কী কথা তাহার সঙ্গে? তার সঙ্গে!
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজ :
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।

সুরঞ্জনা,
তোমার হৃদয় আজ ঘাস :
বাতাসের ওপারে বাতাস-
আকাশের ওপারে আকাশ।
(শ্রেষ্ঠ জীবনানন্দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ সংকলিত ও সম্পাদিত, অবসর, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ১৯৯৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা- ৬৯-৭০)
আর হঁ্যা, আমাদের বর্তমান আলোচ্য উপন্যাস রাহাত খানের আকাশের ওপারে আকাশ। প্রেম-প্রকৃতি, মানুষ মন-খারাপ-করা অফুরন্ত্ম প্রহরের আলো আর অন্ধকার ছায়া ফেলেছে এখানে নিজ নিজ কাঠামোয়। জীবনানন্দ অনুভবের যে গভীরতায় এবং চিন্ত্মার যে উচ্চতায় তার পাঠককে হাজির করেন 'আকাশলীনা' কবিতার পাঠকালে, রাহাত সম্ভবত তার নিবিড়তা ও মহত্ত্বকে স্পর্শ করতে চেষ্টা করেছেন মনে মনে। ইউসুফ কাদির নামের 'আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন বড় নেতা'র সামাজিক ও মানসিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটির ক্যানভাস তৈরি হতে থাকে। বিস্ত্মৃত হতে থাকে এর সৌকর্য ও সুর। যদিও কার্যত কাহিনীর শুরম্ন ইলাহী-বর্ষার প্রেমকথন-দৃশ্যেপটে। পাশাপাশি যুবক-যুবতীর শরীর ও রূপ বাড়তি যোগ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে এখানে।
'ছেলেরা ভালোবাসতে জানে না। বড়জোর ভালোবাসার ভান করে।'- কথাগুলো বলছিল বৃষ্টি- হঁ্যা, সোশিওলোজির মাস্টার্সের ছাত্রী আনজুমান আরা বৃষ্টি (না-কি বর্ষা!) 'কুমিলস্না-দাউদকান্দির মেয়ে'। এই মেয়েটির 'প্রেমপ্রেম'-এর প্রতি তেমন আস্থা নেই, যদিও পরিণয়মুখি সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ প্রবল। 'মোটামুটি একটা ভালো বিয়ে হয়ে গেলে সে বেঁচে যায়।' রাহাত খান এই 'লোয়ার মিডল ক্লাস ফ্যামিলির' মেয়েটিকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তার খানিকটা পরিচয় পাওয়া যায় ইলাহীর ভাবনার ভেতর দিয়ে-
ইলাহী ভাবছিল মেয়েটা বেশ ম্যাচিউরড আছে। কথা বলতে জানে, ফটাফট উত্তর দেয়, জড়তা-ফড়তা কিছু নেই। শারমিন কিছুটা এই ধরনের ছিল। এই ধরনের মেয়ে সহজে বাগে আসতে চায় না। তবে একবার এসে গেলে প্রেমিককে ম্যালা দেয়-টেয়। দিতে কৃপণতা করে না। ইলাহীর চোখ দুটি তৃষ্ণা ভারাক্রান্ত্ম হয়ে ওঠে। সে তাকায় লিপস্টিক না-ছোঁয়ানো বৃষ্টির সামান্য মোটা ও কিছুটা কালচে ঠোঁটের দিকে। (পৃষ্ঠা- ৯)
ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া সমাপ্ত-করা 'জামালপুরের ছেলে' আখতার ইলাহী 'তক্কে তক্কে আছে শেষপর্যন্ত্ম বিয়ে করা যায় এমন কোনো মেয়ের জন্য'। রাহাত খান ইলাহীনামা পরিবেশন করছেন এভাবে-
ইন্টার পাস দিয়ে জামালপুর থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে অব্দি তিনটা মেয়ের সঙ্গে মিশতে পেরেছে সে। রেহানা তো কিছুটা তার প্রেমেই পড়ে গিয়েছিল। সেটা বছর দুই আগের কথা। রেহানাকে সে পড়াত। তবে শেষের দিকে কয়েকটা দিন মোটে টেকে তাদের সম্পর্ক। পরে রেহানা তার মা-বাবার সঙ্গে চলে যায় চট্টগ্রামে বদলি হয়ে। তবে সে যা-ই হোক, ইলাহীর মুরোদ তো একটা পেটানো স্বাস্থ্য, আর হাইট আর ছেলেবেলা থেকে মেয়েদের সঙ্গে সহজে মেলামেশা করতে পারার অভিজ্ঞতাটুকু। এইটুকু নিয়ে সম্পর্কের বেশিদূর যাওয়া সম্ভব না। বড়লোকের মেয়েরা তো যথাসময় কাট মারে। যেমন শারমিন ও রেহানা। যারা সম্পর্কেও জালে ধরা পড়ে টিকে যেতে চায় তাদের আবার ইলাহীর পছন্দ নয়। (পৃষ্ঠা- ১৩)
মেয়েদের হলজীবন এবং অপ-রাজনীতির ছত্রছায়ার একটা ছবি আমরা পাই বর্তমান উপন্যাসে। রাহাত খান তার সম্ভবত দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতার আলো প্রক্ষেপণ করেছেন এই বিবরণে। কোনো একটা প্রাসঙ্গিকতাকে আশ্রয় করে কাহিনীতে প্রবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশের ওপারে আকাশ উপনাসের একটি চরিত্রের নাম মুন্নী। হলের 'মার্কামারা' মেয়ে মুন্নী 'এলাকার গড ফাদার ইউসুফ কাদিরের লোক' বলে পরিচিত। তার প্রভাবের কথা সবার জানা। মুন্নীর একটা গ্রম্নপ আছে হলে। মাদক গ্রহণ, অস্ত্রের ব্যবহার, মেয়েলোক সরবরাহ, চাঁদাবাজি, 'নিজেরাও এর-ওর সঙ্গে শোওয়াশোয়ি' এদের কাছে যেন সাধারণ ব্যাপার।
ইউসুফ কাদির আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোক। যাচ্ছেতাই জীবনযাপন করে সে। টাকা কামাতে যেমন নানান কৌশল-ফন্দি আঁটে, তেমনি খরচ করতেও বিচিত্র পথের সন্ধান তার জানা। মেয়ে-মদ কাদিরের নিত্যদিনের ব্যাপার। রাহাত খান জানাচ্ছেন এই ইউসুফ কাদিরের চরিত্রের একটা দিক সম্বন্ধে-
বিয়ের পর রীনাকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, বউ মানুষের কাজ হবে ঘরসংসার দেখা, বাচ্চা দেয়া, স্বামীর জন্য আলস্নাহ মাবুদের কাছে দোয়াজারি করা, ব্যস! এর বাইরে স্বামীর অন্যকিছুতে নাক গলানো যাবে না। রীনা খুবই অপছন্দ করে স্বামীর অন্য মেয়ে মানুষের সঙ্গে শোয়া। এ নিয়ে বিয়ের পর লুকিয়ে লুকিয়ে কত যে কান্নাকাটি করেছে সে। লোকটার টাকা-পয়সা রোজগারের ধান্দাগুলিও রীনা পছন্দ করে না। (পৃষ্ঠা- ২০)
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড, সিন্ডিকেট, নারী- এইসব ইউসুফ কাদিরের নিত্যদিনের ব্যাপার-স্যাপার। 'বেঁটে হলেও সুগঠিত স্বাস্থ্য' আছে ৪০-পার-হওয়া ইউসুফের। ইউসুফের প্রতিদিনের কার্য-কলাপের ভেতরে ঔপন্যাসিক রাহাত খান কৌশলে প্রবেশ করিয়েছেন বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, সাংবাদিকতা, অর্থনীতির নানান হালচাল। আছে কালেকশান নামে পরিচিত চাঁদাবাজির কথা। একজন বিদেশি অধ্যাপকের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত্মবর্র্তী গ্রামে অবস্থানের প্রসঙ্গও আছে এখানে। আমলাদের সম্পর্কেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চেষ্টা করেছেন আখ্যানের ডিটেইলসের সুযোগে। 'দুর্নীতি ও দূষণে আমলাদের সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিয়েছে রাজনীতি'।, 'আমলাতন্ত্রের সহায়তা নিয়ে টু পাইস কামাই করে নিচ্ছে মন্ত্রীরা'।- এই জাতীয় নিরাবেগ কথার সমাবেশ ঘটিয়েছেন কাহিনীকার। উন্নয়নশীল এই দেশে আমাদের নিজেদের দোষে যে আন্ত্মর্জাতিক সহায়তা এবং বিনিয়োগের সুযোগ প্রত্যাশিতরকম সম্প্রসারিত হচ্ছে না, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় বর্তমান উপন্যাসের ক্যানভাসে।
এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি অপ্রধান চরিত্রের উপস্থিতি ও বিকাশ বেশ উজ্জ্বল ও প্রাতিস্বিকতায় আভাময়। রীনা, মুন্নী, রিপোর্টার ইউনুস, হাসান মীর, ইলাহী, বৃষ্টি, শফিক, মুরতাজাকে পাঠক সহজেই পাঠ করে নিতে পারে।
চমকপ্রদ ব্যাপার হলো- এই উপন্যাসে আরাকান এবং রাখাইন প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে। আমরা আজকে যে রাখাইন-সংকট দেখছি, তা কিন্তু কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রায় শতাব্দীকালের পুরনো এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে গত শতকের সত্তরের দশকে। এই কাহিনীর ক্যানভাসে আমরা নব্বই দশকের আরাকানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা ছায়াচিত্রও পেয়ে যাই। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ব বিভাগের প্রফেসরের গবেষণার অন্ত্মরালে আমরা প্রবেশ করতে দেখি লেখকের অন্ত্মর্দৃষ্টি। পত্রিকার বার্তা সম্পাদকের কাছে লেখা দীপংকর হাজরা নামের এক আদিবাসী সমাজচিন্ত্মকের চিঠি থেকে একটা বর্ণনা আমরা দেখে নিতে পারি-
সাহেব রাখাইন পরিবারের যে বাড়িটাতে থাকে তার প্রধান সদস্যের নাম মং সম্প্রু। সে স্থানীয় খ্রিস্টান চার্চের একজন সম্মানিত লোক। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টা জানার চেষ্টা করেছিলাম। সে একেবারেই মুখ খুলতে চায় না। শুধু বলে ডেক্সটার সাহেব খাদে যান এখানকার উদ্ভিদ এবং লতাপাতার ওপর জরিপ করতে। এটা নাকি তার গবেষণা প্রজেক্টের একটা এরিয়া। তবে মং যাই বলুক, আমি নিশ্চিত সুন্দরপাড়া খাদে এমন কিছু একটা চলছে- যা হয়তো দেশের জন্য ক্ষতিকর। অথবা হয়তো খুব মূল্যবান কোনো সম্পদের সন্ধান পেয়েছে বিদেশিরা সুন্দরপাড়া খাদে। তা নইলে পত্রিকায় এ নিয়ে একটু লেখালেখি করায় আমাকে হুমকি দেয়া হয় কেন? (পৃষ্ঠা- ৪৭)
আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য যে জীবন, পরিচিত যে আকাশ, দেখা মানুষের চলাচল ও চিন্ত্মার যে সীমানা, তার ওপারেও- এসবের বাইরেও অন্যরকমের জীবন আছে। আছে অন্যভাবে দেখার কোনো আকাশ। চলার পথের যে প্রত্যাশিত পরিবর্তন, ভাবনার ভুবনে জেগে-ওঠা যে অমিত জিজ্ঞাসা, তার কিছুটা অন্ত্মত রাহাত খান তার পাঠকের সামনে হাজির করতে পেরেছেন ইউসুফ কাদির নামক চরিত্রটির পরিবর্তন ও বিকাশধারার ভেতর দিয়ে। লেখক বলছেন-
সিঙ্গাপুর থেকে মন খারাপ করে ঢাকা ফিরেছে ইউসুফ কাদির। এই বখেড়া কোনোদিন তার ছিল না। সিঙ্গাপুর একটানা এগারদিন কাটিয়ে এই মন্দ জিনিসে সে আক্রান্ত্ম হয়েছে। ঢাকা ফিরে পুরো একদিন চুপচাপ বাসায় কাটিয়ে দিল। সবাইকে বলেছে জেট লেগ, বিমান ক্লান্ত্মি। আসলে ক্লান্ত্মিটস্নান্ত্মি কিছু না। তার মন বিষণ্ন ও ভারি হয়ে আছে। (পৃষ্ঠা- ৯২)
ঘটনাক্রমে ইউসুফ কাদির সিঙ্গাপুরের হরীতকী দ্বীপে যায়। সেখানকার নির্জনতাঘেরা নির্মল জীবন কাছ থেকে দেখে। যেন ফেসো-আসা কোনো গ্রামীণ শৈশব। যেখানে মানুষের প্রত্যাশা কম। কেউ কারও শত্রম্ন নয়- সবাই সবার আত্মীয় ও বন্ধু। 'এই দ্বীপে মানুষের বসবাস একটা এক্সপেরিমেন্ট বটে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়ে প্রকৃতি ও মানবিক সৌন্দর্যের মধ্যে সন্তুষ্ট থেকে মানুষ জীবনযাপন করতে পারে কিনা এক্সপেরিমেন্টে সেটাই দেখার বিষয়।' এখানে ঢাকা শহরের মতো অস্থির জীবন নেই। যে কোনো বড় শহর কিংবা আধুনিক কোনো গ্রামের মতো মেয়েলোক ও মদ নেই। আছে নিস্ত্মরঙ্গ শ্বাস গ্রহণের অফুরন্ত্ম প্রহর। এই দ্বীপের মানুষ স্বাভাবিক সুখি। 'সময় কাটাবার জন্য তারা অধীর হয় না। কারণ প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে বা চলতে-ফিরতেই তাদের হাতে অবসর সময়টুকু ফুরিয়ে যায়। কেউ কেউ দিনেরবেলা বা রাতেরবেলা নির্জনে, যুগলে বা দল বেঁধে তীরে বসে সমুদ্র চাঁদ বা অন্ধকার দেখে। সময় কোন দিকে যে গড়িয়ে যায়, তারা টের পায় না।' ইউসুফ কাদির সম্ভবত এই দ্বীপের জীবন দেখে মানুষ এবং যন্ত্রের সম্পর্ক ও পার্থক্য বুঝতে পারে। তার মনের ভেতরে পাক খেতে থাকে 'রিলেশনশিপ বিটুউন ম্যান অ্যান্ড মেশিন'-বিষয়ক চিন্ত্মারাজি। সম্ভবত লেখক রাহাত খান আমাদের সীমাবদ্ধ জীবনে আবদ্ধ হয়ে-পড়া অন্ধকার থেকে কোনো বৃহৎ-সুন্দর জীবনের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন।
কথার ভঙ্গি, শব্দ-নির্বাচন, বাক্য-প্রক্ষেপণ প্রভৃতি ব্যাপারে রাহাত খান নিরাবেগ এবং অকুণ্ঠ। 'গল্প মারে', 'চালস্নু ছেলেরা', 'বিকেলটা অন্ত্মত মরম্নক', 'কাট মারে', 'তক্কে তক্কে', 'হন্দাইতে', 'বুড়া বাপটাকে'- এইসব শব্দ প্রয়োগ রাহাত খানের অভিজ্ঞতা ও জীবন-উপলব্ধির স্বাভাবিক ছবি বলেই মনে হয়।
বইটির প্রকাশনা-ব্যবস্থাপনা ভালো হয়নি। প্রধান চরিত্র ইউসুফ কাদিরকে ফ্ল্যাপের লেখায় ইউসুফ হায়দার বলে মেনশান করা হয়েছে। অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র বৃষ্টিকে গ্রন্থের একেবারেই প্রথম দিকে বর্ষা নামে উপস্থাপিত হতে দেখি। আবার দীপংকর হাজরাকে কোথাও দীপংকর বড়ুয়া বলা হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু বাক্যের এবং বর্ণনার রিপিটেশন পাঠককে বিব্রত করে। এই সব ব্যাপারকে মুদ্রণ প্রমাদ কিংবা ছাপাখানার ভুল বলে চালিয়ে দেয়ার একটা রীতি আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। কিন্তু বর্তমান লেখকের সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদাকে বিবেচনায় নিলে বলতেই হয় যে, গ্রন্থটি প্রকাশের সময় সম্পাদনা করা হয়নি। রাহাত খান বড় সম্পাদক- এই দায় ও দায়িত্ব একান্ত্মই তার।
পাঠ শেষে সরল-নিয়মমাফিক পর্যালোচনার খাতিরে নয়, বরং সমালোচনার পর্যবেক্ষণের জায়গা থেকে বলতে পারি- জীবনের বিশালতা, নিবিড়তা ও গভীরতাকে স্পর্শ করার প্রবল বাসনা আছে এই উপন্যাসের পাতায় পাতায়।
একজন অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফারের মতো লেখক রাহাত খান চারদিক থেকে স্ন্যাপ নিয়েছেন জীবনযাপন-কলা আর মনের জানা ও অজানা জানালার। আর সেগুলো কালারল্যাব থেকে প্রিন্ট করে যেন সোয়া চার ইন্টু নয়-এ সাজিয়ে দিয়েছেন পাঠকের জন্য।
 
পরবর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin