পূর্ববর্তী সংবাদ
বাংলা আমার বাংলামুস্তাফা নূরউল ইসলাম প্রায়ই আমরা বলে থাকি হাজার বছরের বাংলা, হাজার বছরের বাংলা কবিতা গান, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। ইত্যাকার উচ্চারণ আমাদের গর্বের সম্পদ। হিসাবটা অবশ্য অঙ্ক গণনায় নয়, আসলে বোঝাতে চাই যে, সুদূর অতীত কালাবধিই বিপুল সমৃদ্ধ আমাদের পিতৃপুরুষের তাবৎ মহান কৃতির অর্জন। সচেতন জনের জানা রয়েছে, একটি জাতির জন্য সুস্থ সুন্দর জীবনে বেঁচে থাকার স্বার্থে এবং সেইসঙ্গে উত্তর-প্রজন্মের মানসভাবনায় তা বাহিত করে দেয়ার লক্ষ্যে আপন ঐতিহ্যজাত গর্বচেতনার বড় প্রয়োজন। সেটাকে আবিষ্কার করতে হয়, সুস্পষ্ট পরিচিতিতে চিহ্নিত করতে হয়। কালে কালে দেশে দেশে এমনটিই হয়েছে।
এশিয়া ভূখ-ে যেমন ইরান। সপ্তম শতাব্দীর হজরত উমরের সময়কালে ইরানে আরব আধিপত্য স্থাপিত হয়। সেটা কেবল রাজনৈতিক অধিকার মাত্র ছিল না, স্বল্পকাল ব্যবধানে সমগ্র ইরানেরই চরিত্রবদল ঘটে_ধর্মে, ভাষায়, এবং সংস্কৃতির অঙ্গনেও। শ' দুই বছরের অন্তে ইরানের যখন নবজাগরণ, পরাধিপত্য বিতাড়িত, ইরান তখন আবিষ্কার করতে চাইছে তার আপন ঐতিহ্যের গৌরব-সম্পদকে। এক্ষেত্রে উজ্জ্বলতম নিদর্শন মহাকবি ফেরদৌসীর (খ্রি. ৯৪০-খ্রি. ১০২০) 'শাহনামা'। রচনার ভাষা স্বদেশের ইরানি, বিষয়বস্তু পুরাণের_ইতিহাসের ইরান খ্রি. পূ. ৩৬০০ অব্দ থেকে প্রাক্-আরব বিজয় কালাবধি তা প্রসারিত। আরবাধিকারমুক্ত ইরান অবলম্বনে খুঁজছে তার অতীত গর্বের ভুবনে। পিছিয়ে গিয়ে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়, এগিয়ে যাওয়ার প্রাণ-প্রেরণার উৎস সন্ধানে। ইউরোপে তেমনি ইতালিতে, রেনেসাঁর সূতিকাগার যেখানে। অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের অবসানে ধ্রুব নক্ষত্রের আলোকের দিশা পেয়েছিল ওই হাজার বছরের আকাশে। তাই নতুন করে আপন সভ্যতা নির্মাণের কর্মকা-ে ইতালি উপকরণ সংগ্রহ করেছিল প্রাচীন গ্রিক রোমান সভ্যতার আদল থেকে। প-িত, চিন্তাবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক সবাই দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই প্রাচীনের উৎসভা-ারে_তাগিদটা ছিল নতুনের সৌধ নির্মাণ। তারপর সমগ্র পশ্চিম ইউরোপেই কী বিস্ময়কর অর্জন জীবনের সর্বত্র_ভাষায়, সাহিত্যে, সঙ্গীতে_শিল্পে, মানসভাবনায়, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সমুদয় ক্ষেত্রে। তদাঞ্চলে ইহজাগতিক চেতনায় উদ্বোধন বিকাশ ঘটেছে। ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার নতুন করে ব্যাখ্যা হয়েছে এবং রক্ষণশীলতার অন্ধত্বকে চ্যালেঞ্জ করে যুক্তির কথা উঠেছে। মৌলবাদের বিধিনিষেধাজ্ঞা তীক্ষ্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে।
এখন প্রসঙ্গ আমাদের আপন ভুবন বাংলাদেশ। একালে, পূর্বকালে। জিজ্ঞাস্য, এতদাঞ্চলে ওই প্রভাবের কর্মকা- কতোটা সাধন করা গেছে? বাংলাদেশের মানুষের জীবনেও কি ইরানের অনুরূপ দশম শতাব্দীর কাল কিংবা ইতালি-পশ্চিম ইউরোপের চতুর্দশ-সপ্তদশ শতাব্দীর কাল আসেনি? স্বদেশভূমির এবং জনপদবাসীর 'হাজার বছরে'র সন্ধানে কদাপি কী উদ্যোগী হয়ে ওঠা গেছে? বিবেচনা করি যে, প্রশ্নটি পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে জানা কথা, মানুষ বলেই তার স্বভাব বোধহীন, নিরেট, জড়বস্তু মাত্র নয়। আর মানুষ বলেই সে অনুসন্ধিৎসায় তাড়িত হবে এবং কালপ্রবাহের কোনো এক মাহেন্দ্রলগ্নে জনগোষ্ঠীর সবাই মিলে ইতিহাসের পালাবদলের কর্মযজ্ঞে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করবে।
এটি যথার্থ বটে। আমাদের ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। সার্থক সেই কর্মকা- অতি সাম্প্রতিককালের। অনেকেরই আপন অভিজ্ঞতা_শতাব্দীর মধ্য প্রহরে আমাদের ভাষা আন্দোলন দিয়ে তার সূচনা। বলা বাহুল্য, সুস্পষ্ট করে মাতৃভাষা চেতনার উদ্বোধনের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কিত হয়ে এসেছে স্বজাত্যবোধ আর ওই 'হাজার বছরে'র ঐতিহ্য-উত্তরাধিকারের প্রেরণা। সবটা মিলিয়ে অবশেষে উত্তরণ মুক্তিযুদ্ধের একাত্তরে। স্মরণ করি পাকিস্তানি দুঃশাসনের নিষ্ঠুর দিনগুলো। আগ্রাসী শক্তির দাপট আমরা মেনে নিইনি, আমরা হার মানিনি। এখনো প্রত্যক্ষ করি ছবিটা ছিল এই রকমের_ 'বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারদিকে।' ততদিনে এই বাংলার কোটি মানুষ নিশ্চিত করে চিনে নিয়েছে আপন ঠিকানাটি_'তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা'। সেটা অবশ্যই নয়,হাজার দেড় হাজার মাইল ব্যবধানের দূরস্থির বৈরী প্রকৃতির ঊষর এক বিদেশভূমির সঙ্গে কৃত্রিম জোড়-দেয়া অবস্থান। কদাপি বিস্মৃত হব না ওই কোটি মানুষ পবিত্রতম আন্তর-বিশ্বাসেই মাতৃভূমি স্বদেশের জয়ধ্বনি উচ্চারণ করেছিল 'জয় বাংলা'। সে ছিল নিবেদিতপ্রাণের মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র। সেই কঠিন সময়ে বীর বাঙালি অস্ত্র ধরেছিল, মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন করেছিল।
এ তো শেষের অধ্যায়। পূর্বকথা কী?
আমাদের পিতৃপুরুষের কর্মকা-ের ইতিহাস অধ্যয়নের প্রয়োজন বোধ করছি। আসলে বংশ পারম্পর্যের প্রবহমানতার সঙ্গেই তো অবিচ্ছেদ্য আমরা। অন্যথায় বর্তমানের আমাদের সত্তা ভাসমান, তৃণমূলচ্যুত।
অতএব পিতৃপুরুষের কথা। লক্ষণীয় যে, তাদেরও আত্মপরিচিতিবোধের জাগরণ ওই মাতৃভাষাচেতনা দিয়েই। মাতৃভাষাচেতনা এবং তৎসহ স্বদেশচেতনা। সেই প্রমাণ-সাক্ষ্য পাই চার শ' বছর আগের কবি সৈয়দ সুলতানের লেখায়_'যারে যেই ভাসে প্রভু করিল সৃজন। সেই ভাসা তাহার অমূল্য যত ধন।' প্রশ্ন, কবিকে এমন চরণ কেন রচনা করতে হয়? তাহলে সেইকালেও বৈরী ক্ষমতার ছিল এই প্রকারের নির্দেশ-উদ্যোগ যা সাধারণ বাঙালি মুসলমানের জন্য মাতৃভাষা বর্জনে প্রয়াসী হয়েছিল। অন্যথায় সৈয়দ সুলতানকে সৃজনকর্তা 'প্রভু'র দোহাই দিতে হচ্ছে কেন? একই কবিতাংশে তিনি নানা মুসলিম দেশের নামোল্লেখ করে সেই সমস্ত দেশের মানুষ_পরিচিতি এবং তাদের মাতৃভাষা-পরিচিতির উল্লেখ করে জানাচ্ছেন যে আরবের বাসিন্দার জন্য রয়েছে আরবি, খোরাসানের জন্য খোরাসানি, রোম দেশের জন্য রুমি, তুর্কস্তানের তুর্কি, শামের শামি ইত্যাদি। অতঃপর কী আমাদের পিতৃপুরুষ ওই বাঙালি কবির কথন_উদ্দেশ্য অস্পষ্ট থাকে? পরের শতাব্দীতে আবদুল হাকিম অধিকতর স্পষ্টবাক্ হয়েছেন। তিনি 'দেসি ভাসা'র (দেশি ভাষা) কথা বলেছেন, এবং আরও যোগ করছেন পুরুষানুক্রমে স্বদেশের কথা 'মাতাপিতা মোহো ক্রমে বঙ্গেত বসতি'। কী দুর্ভোগ আমাদের পিতৃপুরুষের রীতিমতো ঘোষণা করেই তাদের জানাতে হয়েছিল_ এই আমার মাতৃভূমি এই আমার মাতৃভাষা। সঙ্কট চরমতর পর্যায়ে উঠেছিল পরবর্তীকালে, বিশেষ করে উনিশ শতকে। ধর্মীয় সামাজিক নেতারা ফতোয়া জারি করে বাঙালি মুসলমানকে প্রতীচীমুখী করে তোলার সর্বাত্মক প্রয়াস পেয়েছিলেন। অবশ্য তখনকার রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ওহাবি-ফারায়েজি আন্দোলনের ইতিবাচক একটি জোরালো দিক নিশ্চয় ছিল। সেটি বিদেশি সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা তিতুমীরের, দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনের আরও ছিল তৃণমূলবিস্তারী প্রতিবাদী চরিত্র সামন্ত-আর্থশোষণের ক্ষেত্রে। তবে অশনিসঙ্কেত দেখা দিচ্ছিল অন্যত্র_ স্বাদেশিকতার ক্ষেত্রে, মাতৃভাষাচেতনার ক্ষেত্রে এবং উভয়কে মিলিয়ে উত্তরাধিকারের রক্তসম্পর্ক থেকে উন্মূল হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। দেশজ মানুষের জন্য বিপর্যয় যে আসন্ন গভীর সে ব্যাপারটি মোটে বিবেচনা করা হয়নি। বরং পূর্বোক্ত প্রতীচীমুখিনতার অস্বাভাবিকত্বকেই উৎসাহিত করা হতো। সরল সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রচার ছিল যে, এই দেশ 'দার-উল-ইসলাম' নয়, 'দার-উল-হর্ব'। আবার ওদিকে ফতোয়া প্রদানকারী মওলানাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত নবাব-বাদশাহ, আমির-উমরাহ এবং তাদের বংশধররা। ফাঁপা আত্মাভিমানতৃপ্ত অবক্ষয়ী একটি সম্প্রদায়। দিলি্ল, আগ্রা, অযোধ্যা, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি কেন্দ্র থেকে অপসারিত হয়ে এসে বাসা বেঁধেছিলেন তারা নতুন রাজধানী নগরী কলকাতায়। তাদের খান্দান্ বিদেশি, ভাষা বিদেশি, আচার-আচরণ-সংস্কৃতি তাবৎ সমুদয় সম্পূর্ণতই দেশজ সম্পর্ক থেকে বহুদূরে অবস্থিত। অথচ তারাই তখন বাংলার মুসলমানের নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অন্যদিকে জন্মসূত্রে স্বদেশী যারা, সমাজের উচ্চতম স্তরে যাদের অবস্থান তাদেরও প্রবল অনীহা হাজার বছরের বাংলার প্রতি। অজ্ঞতাও ছিল। টাইটেলপ্রাপ্ত নবাব আবদুল লতিফের মতো তারা ইংরেজি শিক্ষিত, রাজপ্রভু ইংরেজ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত। তারা স্বদেশীদের বাঙালিত্বের বিরোধিতা করেছেন, মাতৃভাষার চর্চার ক্ষেত্রে মোটে উৎসাহ দেখাননি, বরং প্রতিবন্ধকতারই সৃষ্টি করেছেন। স্বাদেশীকতার চেতনার উদ্বোধন সমর্থন করেননি। এখানে একটি গ্রন্থের বিশেষ করেই উল্লেখ করি। মুর্শিদাবাদের দেওয়ান ফজলে রাবি্বর ফারসিতে লেখা 'হকিকত-ই-মুসলমানানে বাঙ্গালা' (ইংরেজি অনুবাদ ্তুঞযব ঙৎরমরহ ড়ভ গঁংংধষসধহং ড়ভ ইধহমধষ্থ, ১৮৯৫)। দেওয়ান সায়েব তার গ্রন্থটিতে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, বাঙালি মুসলমানের মূল উৎসভূমি কোথায়? অবশ্যই তা এই দেশে নয়, হাজার বছরের গাঙ্গেয় বাংলাভূমিতে নয়, বহু দূরস্থিত পশ্চিম এশিয়ার কোনো কোনো পুণ্যভূমিতে। পুরুষানুক্রমে বাঙালি মুসলমানের উদ্ভব 'হাজার বছরে'র বাংলার মানুষের বংশজাত নয়, তার খানদানি শরাফতি অন্যত্র, আসলে তারা বহিরাগত। প্রায় অনুরূপ প্রকৃতির ভূমিকা গ্রহণ করেছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত কতিপয় পত্রপত্রিকা। যেমন, 'মহাম্মদি' 'আখবার' (১৮৭৭), 'ইসলাম প্রচারক' (১৮৯১) ইত্যাদি। এসব পত্রিকা সাধ্যমতো প্রয়াস পেয়েছে বাঙালি মুসলমান চিত্তকে বাইরের মুসলিম বিশ্বের প্রতি আগ্রহী করে তোলার কর্মোদ্যোগে। স্বদেশভূমি, দেশের স্বজাতি মানুষ অপেক্ষা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো তুরস্কের ওসমানিয়া খিলাফতের প্রতি। পারস্য সম্রাট, বোখারার আমির, মরক্কো-হেজাজের সুলতান এবং ওইসব দেশের কথাই বিশেষ করে প্রচার করা হতো। এভাবে মুসলমানিত্বের নামে আপন দেশবিচ্যুত একটা জনমত গড়ে তোলার বিপুল প্রয়াস পাওয়া গিয়েছিল।
মোট কথা, স্বদেশ সূত্রে, বংশধারা সূত্রে, মাতৃভাষার সূত্রে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের পিতৃপুরুষ যে হাজার বছরের বাংলার সন্তান, এই পবিত্র বিশ্বাসটি মধ্যযুগ কালাবধিই মূল সম্পৃক্ত হতে দেয়া হয়নি। সমাজ-অবস্থানে উচ্চশ্রেণির মানুষ এবং মোল্লা নামধারী গোঁড়ারা বারংবার প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন উৎসে প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগের পথে। এসব কিছুই করা হতো ওই পবিত্র ধর্মের নামে। আর আমাদের জানা রয়েছে যে, কৃষিনির্ভর বাংলার সর্বস্বরিক্ত, সর্বপ্রকারেরই অসহায় মানুষের কাছে পারলৌকিক প্রাপ্তির আবেদন কতো গভীর এবং ব্যাপক। বোধগম্য যে, এই প্রতিকূল পরিবেশে ইহজাগতিকতার স্বদেশচেতনা-স্বাজাত্যবোধের উদ্বোধন ঘটানো বড় সহজ কর্ম ছিল না। বলতে গর্ব অনুভব করছি, আমাদের অভিজ্ঞতায় যেমন আটচলি্লশ থেকে বায়ান্ন, বর্তমান শতকের তৃতীয় দশক নাগাদ তেমনি আমাদেরই পূর্ব-প্রজন্ম একদল বিশ্বাসী আপসহীন কর্মী তৎপ্রকারের কঠিন দায়িত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। মাতৃভাষার প্রশ্নে, স্বাদেশিকতার প্রশ্নে তারা হাজার বছরের বাংলাকে চিহ্নিত করার মহৎ কর্মে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ১৯১৯-এ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত মুসলমান ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছেন, 'বাঙ্গালার আবহাওয়ায়, বাঙ্গালার মাটিতে, বাঙ্গালার শস্যে, বাঙ্গালার ফলে তোমাদের দেহ গঠিত, পুষ্ট, বর্ধিত। খুব সম্ভবত এই বাঙ্গালার ক্রোড়ে তোমাদের শরীর চিরনিদ্রায় শায়িত হইবে। মায়ের কোলে শুইয়া কি মা জিনিস বুঝা যায় না। দুদিন মা ছাড়া হইলে ছেলে বুঝিতে পারে মা কি নেয়ামত।... তোমাদিগকে বাঙ্গালার মুখোজ্জ্বলকারী সুসন্তান হইতে হইবে। শুন নাই কি_ হুব্বুল ওত্বনি মিনল ঈমান_ দেশপ্রীতি ঈমানের অন্তর্গত।' আমরা অবগত হচ্ছি, আজ থেকে দীর্ঘ পঁচাত্তর বছর আগে ড. শহীদুল্লাহ অতি স্পষ্ট করেই নির্দেশ করছেন স্বদেশভূমি বাংলাকে, বাঙালিকে, বলছেন দেশ 'মা' এমন কথা এবং এসব কিছুকেই সম্পর্কিত করছেন 'ঈমানে'র সঙ্গে। প্রসঙ্গত, আরেকটি উদ্ধৃতি নূরন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনীর লেখা থেকে_ 'পুরুষানুক্রমে যুগ যুগান্তর ধরে বাঙ্গালা দেশের গ-ির মধ্যে বাস করে আর এই বাঙ্গালা ভাষাতেই সর্বক্ষণ মনের ভাব ব্যক্ত করেও যদি বাঙ্গালি না হয়ে আমরা অপর কোনো একটি জাতি সেজে বেঁচে থাকতে চাই তাহলে আমাদের ত' আর কখনো উত্থান নাই-ই, অধিকন্তু চির তমসাচ্ছন্ন গহ্বর মধ্যে পতনই অবশ্যম্ভাবী।' ('আমাদের কাজ', 'সওগাত', ভাদ্র ১৩৩৬)। অতি গুরুত্বের সঙ্গেই লক্ষ্য করতে হবে_ওই এক কথাই বারবার উচ্চারিত হচ্ছে: পুরুষানুক্রমিক স্বদেশের চেতনা আর বাঙালিত্বের চেতনা। এইটেকেই বলছি হাজার বছর ধরে বহমান বাংলার চেতনা এবং তা আবিষ্কার করতে হয়, সুস্পষ্ট চিহ্নিত করতে হয়। ওইকালে তারা তা করেছিলেন।
হাজার বছরের বাংলা। কথাটা অবশ্যই আলঙ্কারিকার্থে নয়, সুভাষণ উক্তিও নয়। ইতিমধ্যে বারবার এসেছে সে কথা। এবং আমরা জেনেছি মাতৃভূমি দেশের প্রসঙ্গে জনপদবাসী পুরুষানুক্রমিক মানুষের প্রসঙ্গে, সেই মানুষের মাতৃভাষার প্রসঙ্গে 'হাজার বছরের বাংলা' সত্যটি উচ্চারিত হয়েছে।
পুনরায় বুঝতে চাই সহজার্থে এবং স্পষ্টার্থে বিষয়টা কী? হাজার বছরের প্রাচীনত্বের অতীতে প্রত্যাবর্তন এবং তাই নিয়ে আত্মগর্বের অভিমান, আস্ফালন? নিশ্চয়ই তা নয়। কেননা প্রকারান্তরে তা স্থবির অচলায়তনে ফসিলপ্রাপ্তির দশা। আসলে আমরা পূর্বোক্ত ওই ইরানের মতো, ইতালি-পশ্চিম ইউরোপের মতো আপন উৎসের সন্ধান করব, গৌরব সমৃদ্ধির উপকরণ-প্রেরণা আহরণ করব, অতঃপর বর্তমান-ভবিষ্যতে চলার পথনির্মাণে পাথেয় করে নেব। এটাই মূল কথা। পুনরায় বলি, আমাদের পিতৃপুরুষ বারবার যে পুরুষানুক্রমিকতার কথা বলেছেন, স্বদেশকে অবলম্বন করার কথা বলেছেন, মাতৃভাষাকে সার বলে জেনেছেন_ মনে করি, এইখানেই জবাবটা পাওয়া যাবে।
হাজার বছর বলতে সহজেই আসবে কালব্যাপ্তির প্রশ্ন। আর বাংলা বলতে তো দেশখ-। এবং এইকাল পটভূমিতে বাংলা নামক জনপদের অধিবাসী মানুষের প্রসঙ্গ। যা কিনা সূচনা-লগ্নাবধি কালে-কালান্তরে সেই বিশেষ মানবসৌধ গড়ে ওঠার কথা, সেই সব মানুষের কর্মকা--কীর্তির কথা, তাদের চারুকারু শিল্প, সঙ্গীত-নৃত্য, সাহিত্যকর্ম, তাদের জীবনাচরণ আর ধর্মাচরণ, তাদের মানসভাবনার কথা। এই সমস্তটা মিলিয়ে তবে স্বতোৎসারিত কেমন আমাদের গর্বের উচ্চারণ 'আবহমান বাংলা'।
কতো প্রাচীন এই বাংলা নামে দেশ? সে জবাব মহাকালের। তবে তিন হাজার বছরেরও অধিককাল পূর্বের ঋগ্বেদ আরণ্যকে 'বঙ্গ' শব্দটির উল্লেখ পাওয়া গেছে। পু-্রভূমির কথা জানা গেছে। তার সঙ্গে পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছে উপবঙ্গ, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি নামচিহ্নিত জনপদ। এই কয়েকটি জনপদের সমন্বয়ে যে অঞ্চল, সেইটেই আজকের পরিচিতিতে বাংলাদেশ। আর মানুষ? নৃতত্ত্বের ইতিহাসের প-িতজনের মতে বাংলাদেশের মানুষ সঙ্কর শ্রেণির। বহু রক্তের সংশ্রিণে গড়ে উঠেছে এখানকার জনসৌধ_ প্রত্ন প্রাচীনকাল থেকেই যেন 'কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে/শত মানুষের ধারা/ দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে/ সমুদ্রে হল হারা'। জানা গেছে, সেই প্রাগৈতিহাসিককালে আদিতে অধিবাসী যারা ছিল, উত্তর ভারতের আর্যকথিত তারা ব্রাত্য, তারা পতিত। সহজবোধ্য করে সাধারণ অভিধায় তারা অনার্য। উদ্ধার করা গেছে যে, দ্রাবিড়, আদি অস্ট্রেলীয়, আদি নর্ডিক, আল্পো-দীনারীয় ইত্যাদি গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত এতদঞ্চলে। উত্তরপুরুষে তাদের নিদর্শন হয়তো বা সামান্য পরিমাণে রয়ে গেছে রক্তে, দেহাঙ্গের কোথাও কোথাও। তবে স্পষ্টত রয়েছে বাংলার ভাষার শব্দভা-ারে, গ্রাম-নদী ইত্যাদির নাম-পরিচিতিতে এবং অনেক লোকাচারে।
দ্বিতীয় পর্বে এসেছে আর্যপ্রবাহ উত্তরাপথ থেকে মৌর্য যুগে। সেই থেকে বাংলাদেশের আর্যীকরণ বিশেষ করে ভাষায়, সংস্কৃতিতে, ধর্মাচরণে। তৃতীয় পর্বে দশম শতাব্দী নাগাদ এবং পরবর্তী তিনশ' বছরে আরও দূর থেকে আরব-আফগান-ইরানি-তুর্কি-মোগলদের আগমন। বাণিজ্যের স্বার্থে এসেছিল আরব বণিকেরা। এসেছিলেন সুফি দরবেশ মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশ থেকে, তারা ইসলাম প্রচারে ব্রতী ছিলেন। আর ছিল তুর্কি-পাঠান-মোগলদের রাজ্য বিস্তারের অভিযান। স্বভাবতই সেই সব অভিঘাতে এবং শেষ অবধি যারা এদেশে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল তাদের প্রভাবে প্রচুর পরিবর্তন আসে এতকালের দেশজ সমুদয় ক্ষেত্রে। পরিবর্তন আসে সংঘাত-সমন্বয়-মিশ্রণের মাধ্যমে। ভাষায় বিশেষ করে আরবি-ফার্সি-তুর্কি শব্দসম্ভারের সংযোজন, জীবন ও ধর্মের আচরণে লোকজ উপকরণের সঙ্গে মুসলিম দেশসমূহ থেকে আনীত ইসলামী উপকরণের সংমিশ্রণ। অন্যদিকে সুকুমার শিল্পসাহিত্য-চর্চার ক্ষেত্রেও সাধিত হয়েছিল মিথস্ক্রিয়া। স্পষ্টভাবেই সে নিদর্শন রয়ে গেছে কবিতায়, গানে, প্রবাদে, ছড়ায়, স্থাপত্যে ও অন্যান্য নির্মাণ কর্মে। আসলে ছয়-সাত শ' বছর ধরেই চলতে থাকে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে সমন্বয়ের পালা। মাঝে কিয়ৎকালে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ডাচ-পর্তুগিজ বণিক, ধর্মপ্রচারক মিশনারিদের। তারাও রেখে গেছে কিছু। অবশেষে উনিশ শতকাবধি ইংরেজবাহিত প্রভাব। এই করে করে সমগ্রতায় বাঙালি বৈশিষ্ট্যের সৌধনির্মাণ।
বলা গেছে, হাজার বছরের আমাদের সমুদয়। পুনরায় স্মরণ করি_সেই পরিচিতি বাস্তবেই ত' আমাদের এই আপন স্বদেশ ভূখ-ে। দ্বিতীয়ত, ভাষার সঞ্চয়ে শব্দরাজি সেই অনার্য কালাবধি। তৃতীয়ত, আমাদের উত্তরাধিকার পূর্বপুরুষের তাবৎ স্থাপত্যকর্মে মহাস্থানগড়-পাহাড়পুর-ময়নামতি-কান্তজীর মন্দিরে, মসজিদ নির্মাণগাত্রে, পীর দরবেশ আউলিয়ার অসংখ্য মাজারের নির্মাণশৈলীতে। তৃতীয়ত, সৃজনশীল সাহিত্যে সঙ্গীতে। চতুর্থত, আমাদের ধর্মাচারে-জীবনাচরণে।
এভাবে ধূসর অতীতের উৎসমুখ থেকে এবং কাল থেকে কালান্তরে বহমানতায় হাজার বছরের ঐশ্বর্য গর্বকে আমরা ধারণ করে থাকি।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close