ভাষার গানমুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংগীতের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনে উদ্দীপিত ভূমিকা পালনের শক্তি সংগীত। বাংলা ভাষার গান ভাষা আন্দোলনকে প্রাণ দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বাণী শুনিয়েছে এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত রেখেছে।'মোবারক হোসেন খান একুশ আমাকে বারবার 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো'র কথা মনে করিয়ে দেয়। একুশ আমাকে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' দুর্বার আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। একুশ আমাকে 'বায়ান্ন'র কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে প্রাণ হারাল সালাম, বরকত, রফিকের মতো বীর ভাষাসৈনিকরা। ঢাকার পিচঢালা পথ শহীদের রক্তে রঞ্জিত হলো। কিন্তু বাঙালি জাতি সব প্রতিবন্ধকতাকে দলে-মুচড়ে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সোচ্চার কণ্ঠে সমস্বরে ধ্বনি তুলল_ 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'।
ভাষা আন্দোলনের ঢেউ কুমিল্লা শহরেও এসে দমকা হাওয়ার মতো ঝড় তুলল। আমি তখন প্রবেশিকা পরীক্ষার্থী। ভাষার তরঙ্গায়িত ঢেউ সেদিন আমার মনেও প্রচ- ঝড় তুলেছিল। মনের ভেতর আগুনের ঝড়। চোখের দৃষ্টিতে রোষের অগি্নশিখা। পড়ার টেবিল ছেড়ে মিশে গেলাম প্রতিবাদী মিছিলে। মনে যে আগুনের রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল সেই রোষাগি্নতে ভাষা আন্দোলনের প্রতিপক্ষকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাইছিলাম। আর এভাবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে মফস্বল শহরের একজন নাম না জানা ভাষাসৈনিকে পরিণত হয়ে গিয়েছিলাম, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্মরণে এলে কেমন যেন মনটা গর্বে ভরে ওঠে। মন ফিরে যায় সেদিনের জীবনে। বায়ান্নর প্রতিটি দিনে ছাত্র-জনতা ভাষার দাবিতে শহরের পথে পথে মিছিল করেছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রের দল এ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে। মিছিলের পুরোভাগে ছোট একটা হারমোনিয়াম কাঁধে ঝুলিয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ করেছি। কণ্ঠে তুলেছি গণসংগীতের সুরে ও বাণীতে_
নওজোয়ান নওজোয়ান
বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান
কোটি প্রাণ একই প্রাণ
একই স্বপ্নে মহীয়ান।
আমাদের মুক্তি স্বপ্নে সূর্যে রং লাগে
যৌবনের অভ্যুদয়ে হিমালয় জাগে
আমাদের শান্তিমিছিলে সিন্ধু চলমান
যুদ্ধখোর সভ্যতার শত্রুরা সাবধান।
আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে মিছিলের সারি উদাত্ত কণ্ঠে কোরাস গেয়েছে। রক্ত গরম করা গানে শহরের জনতাও শামিল হয়ে কণ্ঠ মিলিয়েছে।
শহরের প্রতিটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গণসংগীত পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গেই অনুষ্ঠানের পটপরিবর্তন হয়ে যেত। গণসংগীতের ধারাই ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে রেখেছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে গান সোচ্চার, যে গান সুন্দর জীবনের পথ, সে গান এবং যে গান ভাষার মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিবাদের ঝড় তোলে, তা-ই গণসংগীত। ভাষা আন্দোলনে গণজাগরণের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে গণসংগীতই জনতার কণ্ঠে সরবে ধ্বনিত হয়েছিল_
'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা_
আজ জেগেছে এই জনতা।'
গণসংগীতের বাণীতে ও সুরে প্রতিবাদের যে সুর ধ্বনিত তার যেন মৃত্যু নেই। যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে, যে কোনো ষড়যন্ত্রের মুহূর্তে জনগণের গান গণসংগীত যেন নতুন আশার বর্তিকা নিয়ে মানুষের মনে জেগে ওঠে। কারণ জনতাই সব শক্তির উৎস। জনতাই স্বৈরাচারের বিচারক। এটা যেন একটা ন্যায়ের দ-। এ ন্যায়ের দ-ের ধারক জাগ্রত জনতা। এ জাগ্রত জনতাই গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। ভাষা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিই ছিল জাগ্রত জনতা। এ সত্যের প্রকৃত দৃষ্টান্ত ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধ একসূত্রে বাঁধা। তেমনি মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষার সঙ্গে রয়েছে নাড়ির যোগ। আমরা বাংলা মায়ের সন্তান, মায়ের কোলে লালিত হয়ে যে ভাষায় কথা বলি সে আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণে মিশে আছে আমাদের চেতনা। মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা আমাদের জীবনে প্রতিবছরের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বয়ে আনে এক নতুন চেতনা। তাই জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার দিন একুশ। একুশ আমাদের নতুন করে শপথ নেয়ার দিন। গণসংগীতের মর্মবাণীতেই নিহিত রয়েছে সেই শপথ নেয়ার শক্তি। তাই দেশের ক্রান্তিমুহূর্তে মানুষের কণ্ঠের সুরে ভেসে ওঠে_
'ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে
আমার জীবন-মরণে তোমায় চাই না ভুলিতে।
আমি তোমার তরে স্বপ্নে রচি আমার যত গান
তোমার কারণেই দেব জীবন বলিদান।'
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের জীবন বলিদান এ সত্যেরই স্বাক্ষর বহন করে। ভাষাসৈনিকরা রক্ত দিয়ে সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এ শক্তিই মুক্তিযুদ্ধে দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।
বায়ান্নর বাংলাদেশ, যে বছর সমগ্র বাঙালি জাতি একযোগে ভাষা আন্দোলনকে ক্ষুরধার করে তুলেছিল, যার ফলে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামে একযোগে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ হিসেবে পত্তন করেছিল; সেই জাতি চলি্লশ বছর যেতে না যেতেই কীভাবে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হলো তা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়! যে দেশের জেলে, চাষি, মজুর, ছাত্র-শিক্ষক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিসেবী, রাজনীতিক সবাই ভাষা এবং স্বাধীনতার জন্য একই সুরে সংগ্রাম করেছিল; সে জাতি আজ শতধাবিভক্ত হয়ে গেল কোন 'জাদুবলে', তার ইতিহাস লেখা হবে কেমন করে? তবে কি সেলুকাসকে উদ্দেশ করে সম্রাট আলেকজা-ারের ঐতিহাসিক উক্তি_ 'কী আশ্চর্য এই দেশ' বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য? কী জানি, হয়তো ইতিহাসই সে বিচার করবে।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলাদেশের মাটি হয়েছিল শহীদের রক্তে রঞ্জিত। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংগীতের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনে উদ্দীপিত ভূমিকা পালনের শক্তি সংগীত। বাংলা ভাষার গান ভাষা আন্দোলনকে প্রাণ দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বাণী শুনিয়েছে এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে উজ্জীবিত রেখেছে।' এখন সেই সংগীতের কথা বলছি।
বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় রচিত বাণীতে সুরারোপ করেই সংগীতের সৃষ্টি। আর এ সংগীতই বাংলাদেশের মানুষের প্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের পরিবেশ ও আবহাওয়া সংগীতের উপযোগী বলে সংগীতের প্রতি এ দেশের মানুষের একটা আজন্ম আকর্ষণ। বাংলাদেশের মাটিতে গান, সবুজ প্রান্তরে গান_ তাই বাংলাদেশ গানের দেশ। বাংলাদেশের সংগীত আবহমানকালের সংগীত। এ সংগীতের সঙ্গে মানুষের প্রাণের টান আছে, নাড়ির যোগ আছে; আর এ আকর্ষণ আছে বলেই রাষ্ট্রভাষার জন্য গানের সুরে এবং মুক্তিযুদ্ধের গানের সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে এ দেশের মানুষ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদ হতে পেরেছিল।
একুশের প্রতীক সংগীত। একুশের চেতনা বাংলাদেশ। একুশ স্বাধীনতার আন্দোলন। একুশ সার্বভৌমত্বের প্রতীক। একুশ বাংলা ভাষা। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আর মাতৃভাষা আমাদের চেতনা। আমাদের বাঁচার শক্তি। বাংলা ভাষাকে ভালোবেসেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে হাসিমুখে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছে এ দেশের বীর সন্তানেরা। বুলেটবিদ্ধ বুকে হাত চেপে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগের মুহূর্তেও ভাষার জয়ধ্বনি করে গেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধিকার আন্দোলনের শুরু। বায়ান্নর শহীদদের রক্তে রাঙানো দিন আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের অনুপ্রেরণা। তাদের শাহাদাত আমাদের পথিকৃৎ। বাংলা ভাষার অনুপ্রেরণা থেকে, কবির লেখনী থেকে উৎসারিত হয়েছে একুশের গান। সেই গানে সুর দিয়েছেন সুরকার। কবি গান লিখলেন, সুরকার সুর দিলেন। গান আর সুর একসূত্রে গ্রথিত হলো। কথা ও সুর। সুর আর গান। দুয়ের মেলবন্ধন হলো। সেই গানের বাণী ও সুর একুশ এলেই আমাদের চেতনায় ঝঙ্কার তোলে। এ সুরের মৃত্যু নেই। যে সুরের মৃত্যু নেই সে সুর অমর। তেমনি বুকের রক্ত দিয়ে ভাষার জন্য শহীদ হয়েছে যারা তাদের মৃত্যু নেই, তারা চির-অমর।
বাংলা ভাষার গান লিখে মাতৃভাষার চিরন্তন বাণী এবং জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসার চিরন্তন রূপ প্রকাশ করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লিখেছেন_
'আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালবাসি।'
এ গান আমাদের জাতীয় সংগীত। বাংলা ভাষা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের গর্ব। বাংলা ভাষার গানের ভেতর যে রূপ, যে সুর, যে ঐশ্বর্য_ এ রূপ-সুর-ঐশ্বর্য বাংলাদেশের ঐতিহ্য। এ দেশেই যুগ যুগ ধরে জন্মগ্রহণ করেছেন কত কবি, শিল্পী আর সুরকার। তাদের গানে বাংলাদেশ হয়ে আছে বাঙালির কবিতীর্থ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তীর্থদেশ সম্পর্কে লিখেছেন_
'ও আমার দেশের মাটি, তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা,
তোমার বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের অাঁচল পাতা।' এবং
'আজি বাংলাদেশের হৃদয় থেকে কখন আপনি
তুমি অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।'
গীতিকবি-সুরকার-শিল্পী অতুলপ্রসাদ সেন গানের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের মর্মবাণীটিই প্রকাশ করেছেন তার সেরা বাংলা গানের ভাষায়। তিনি লিখেছেন_
'মোদের গরব মোদের আশা,
আ-মরি বাংলা ভাষা।'
নাট্যকার-গীতিকার-সুরকার-শিল্পী দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যিনি ডি এল রায় নামে সুপরিচিত তিনি জন্মভূমিকে দেশের রানীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তার রচিত বিখ্যাত গানে_
'ধন ধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা।
...................
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।'
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মভূমি পল্লীজননীকে অবলোকন করেছেন অপরূপ রূপে সজ্জিত মাতৃরূপে। তিনি জন্মভূমিকে উদ্দেশ করে লিখেছেন_
'একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী।
ফুলে ও ফসলে কাদা-মাটি-জলে ঝলমল করে লাবণি'
বাংলাদেশের সি্নগ্ধরূপের বর্ণনা করছেন তার রচিত গানে। সেই গানে তিনি এ দেশের বীর দামাল ছেলেদের বীরত্বের কথাও বলেছেন_
'এই আমাদের বাংলাদেশ এই আমাদের বাংলাদেশ।
যে দিকে চাই সি্নগ্ধ শ্যামল চোখ জুড়ানো রূপ অশেষ।'
প্রকৃতির কথা সুন্দর-কোমল ভাষায় বর্ণনা করেছেন দেশের মাটির সঙ্গে। প্রকৃতির তুলনামূলক চিত্রে। বলেছেন_ বাংলাদেশের জিয়ন-কাঠি এ দেশের মাটি। মানুষ, প্রকৃতি, মাটি অভিন্ন সুতোয় গাঁথা। তিনি গানের ভাষায় লিখেছেন_
'ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।'
কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন_ 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজতে চাই না আর।' গীতিকার আজিজুর রহমান লিখেছেন_ 'পলাশ ঢাকা, কোকিল ডাকা, আমার এই দেশের ভাই/ধানের মাঠে ঢেউ খেলানো, এমন কোথাও নাইরে।' গীতিকার নঈম গহর লিখেছেন_ 'জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো।' এমনি আরও অনেক গান আছে। লিখেছেন আমাদের দেশের গীতিকবি আর গীতিকারেরা।
ভাষা আর সংগীত পরস্পরের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। ভাষা আন্দোলনে সে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছিল। গানের সুরের ভেতর দিয়ে এই সম্পৃক্ততা আরও অন্তরঙ্গ হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণার এক দুর্বার অস্ত্র ছিল সংগীত। সংগীতের শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে এ আন্দোলনকে ছাত্র-জনতা করে তুলেছিল দুর্নিবার। গানের বাণী আর সুর যে কোনো আন্দোলনেরই এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ছাত্র-জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার মতো এমন শক্তি আর নেই। বায়ান্নর একুশের আন্দোলনের সময় সংগীত সেই শক্তির পরিচয় দিয়েছে। 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' আন্দোলনের গোড়ার দিকের তীক্ষ্নধার একটা সস্নোগান। এ সস্নোগানটিকে অবলম্বনে রচিত ভাষার গান, প্রথম ভাষার গান। গানের বাণীর সঙ্গে সুর একাত্ম হয়ে ছাত্র-জনতাকে উদ্দীপ্ত করে তুলল ভাষা আন্দোলনে। রাষ্ট্রভাষার এ গানটি একুশের আন্দোলনের এক মহাঅস্ত্র। ভাষাসৈনিক গাজীউল হক ভাষা আন্দোলন এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে জাতিকে আরও দুর্বার করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রভাষার গান লিখে সুরারোপ করলেন। সে গানের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ যেন বুলেট। গানের বুলেট উপহার দিয়ে তিনি সমগ্র বাঙালি জাতিকে উদ্দীপিত করতে লিখলেন_
ভুলব না, ভুলব না এ একুশে ফেব্রুয়ারি, ভুলব না,
লাঠি, গুলি আর টিয়ারগ্যাস, মিলিটারি আর মিলিটারি
ভুলব না।
'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' এ দাবিতে ধর্মঘট,
বরকত সালামের খুনে লাল ঢাকার
রাজপথ_
ভুলব না
স্মৃতিসৌধ ভাঙিয়াছে জেগেছে
পাষাণ প্রাণ,
মোরা কি ভুলিতে পারি খুনে রাঙা
জয় নিশান?
ভুলব না।
বায়ান্নর একুশের ভাষা আন্দোলনে যেসব গীতিকার-শিল্পী গান রচনা, সুরারোপ এবং গান গেয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ রেখেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ, রমেশ শীল, শেখ লুৎফর রহমান, আবদুল লতিফ, সুখেন্দু চক্রবর্তী, ফজলে নিজামী, জাহেদুর রহিম, নিজামুল হক এবং আরও অনেকে।
ভাষা আন্দোলনের সরব সংগ্রামী ছিলেন শিল্পী-গীতিকার আবদুল লতিফ। ভাষা আন্দোলন আবদুল লতিফের লেখনীকে ক্ষুরধার করে তুলল, তার কণ্ঠকে করে তুলল উদাত্ত। মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তিনি জ্বালাময়ী ভাষায় লিখলেন সেই গান যে গান শুনে জনগণের শিরা-উপশিরার রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিল। গানে সুরারোপ করলেন শিল্পী নিজে। তারপর গান গেয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে নেমে পড়লেন শিল্পী স্বয়ং। আবদুল লতিফ রচিত সেই গান_
'ওরা আমার মুখের কথা
কাইড়া নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায়
আমার হাতে পায়।
................
শোন শোন গঞ্জের সোনা ভাই
একবার বুক ফুলাইয়া কওরে দেখি
'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'।'
বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল রমেশ শীল। কবিয়ালের ভাষায় তিনি বাংলা ভাষার গান রচনা করে এবং গেয়ে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগালেন গ্রামে-নগরে-বন্দরে। তার জাগরণী গানে বাংলা ভাষার প্রতি পল্লী জনগণও সচেতন হয়ে উঠল। তাদের কণ্ঠেও অনুরণন তুলল কবিয়াল রমেশ শীলের গান। গানের রচয়িতা, সুরকার ও শিল্পী তিনি নিজে এবং তার দল। তিনি মূল গান গেয়ে মুখে এলে/ধুয়া ধরে তার দলের দোহাররা। একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করে তিনি লিখলেন অনেক গান। সেসব গান গেয়ে উজ্জীবনী বাণী শোনালেন দেশের মানুষকে। ভাষার জন্য প্রাণ বলি দিয়ে যারা অমর হয়ে রইল তাদের কথা বললেন তার লেখা 'ভাষার জন্য জীবন হারালি গানে'_
ভাষার জন্য জীবন হারালি,
বাঙালি ভাইরে, রমনার মাটি রক্তে ভাসালি;
(বাঙালি ভাইরে) বাঙালিদের বাংলা ভাষা জীবনে মরণে
মুখের ভাষা না থাকিলে জীবন রাখি/কেনে।'
বাংলা ভাষার গান রচনায় ব্যাপৃত হয়েছিলেন দেশের কবি ও গীতিকারেরা। তাদের রচনার সম্ভারে বাংলা ভাষার গান সাহিত্যভুবনে পৃথক ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। তাদের গানের মধ্যে চিরজীবী হয়ে রইল ভাষার জন্য শহীদেরা এবং অমর হয়ে রইল তাদের জীবন বলিদান। ভাষার গান রচয়িতার মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফজল-এ খোদা, সৈয়দ শামসুল হুদা, আলিমুজ্জামান চৌধুরী, আনিসুল হক চৌধুরীসহ আরও অনেক গীতিকবি ও গীতিকার।
সংগীত একুশের চেতনা। সে চেতনাই গানের উৎস। একুশ আর সংগীত একে-অন্যের পরিপূরক। একুশ ভাষা আন্দোলনের রক্তিম স্বাক্ষর। একুশ মাতৃভাষার প্রতীক। একুশ বাঙালি জাতির জীবনের চেতনা। একুশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ভাষার জন্য আত্মাহুতি বিশ্বের এক বিরল ইতিহাস। একুশ জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার দিন।
একুশ নতুন করে শপথ নেয়ার দিন। একুশ শান্তির দূত। একুশই পথ দেখাবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে শান্তির নীড়। একুশ এলেই আমরা ঐকতানে গাইব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত ও শহীদ আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত শহীদ দিবসের অমর গান_
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি!
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রুগড়া এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি!
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি!
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close