একুশের চেতনা এবং বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামতারাপদ আচার্য্য ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরপরই স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রোপিত হয়েছিল। সেই রোপিত বীজের নাম ভাষা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রতিবাদ উঠেছিল। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে এ সম্ভাবনাময় দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে 'বাংলাদেশ' নামে এক ভূখ-ের লড়াইয়ে লিপ্ত বাঙালি ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়েছে বাংলাদেশের ভাষাপ্রাণ মানুষ সালাম, রফিক, শফিক, জব্বারসহ অনেকেই। মূলত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনই বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের প্রকৃত ভিত্তি।
তবে এ ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসব্যাপী ভাষা আন্দোলনের পক্ষে গণসংযোগ ও আইন পরিষদ সদস্যদের সঙ্গে তমদ্দুন মজলিস মতবিনিময় কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তমদ্দুন মজলিস দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমর্থন আদায়ে মাঠে নেমেছিল। সেজন্য কয়েকটি মেমোরেন্ডামে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে তারা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির প্রতি সমর্থন আদায় করেছেন।
১৯৪৭ সালের ১২ ডিসেম্বর উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিদার একদল সন্ত্রাসী বাস ও ট্রাকযোগে সস্নোগান দিতে দিতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে হামলা করলে, সে ঘটনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে পলাশি ব্যারাকে তমদ্দুন মজলিস প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সন্ত্রাসীদের নগ্ন হামলার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন নেতারা এবং বাংলাকে অবিলম্বে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। ওই ঘটনার প্রতিবাদে পরের দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সরকারি অফিসে ধর্মঘট আহ্বান করে তমদ্দুন মজলিস। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ তারিখে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটি নামে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দেশব্যাপী পাকিস্তান-উত্তর প্রথম হরতাল কর্মসূচি পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মঘট চলাকালীন ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে কয়েকজন ছাত্রকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির দাবিতে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তারই উদ্যোগে ১৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এমনিভাবে বাঙালির ভাষা সংগ্রাম এগিয়ে চলে।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে বহু অমর গান। গীত হয়েছে সংগ্রামী গণসঙ্গীত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় ভাষাসৈনিক গাজীউল হক রচিত ও সুরারোপিত গান 'ভুলবো না, ভুলবো না একুশে ফেব্রুয়ারি' কবিয়াল রমেশ শীল লিখলেন ও গাইলেন, 'ভাষার জন্য জীবন হারালি/বাঙালি ভাইরে রমনার মাটি রক্তে ভাসালি।' আবদুল লতিফ লিখলেন ও গাইলেন 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।' আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত ও শহীদ আলতাফ হোসেন সুরারোপিত 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি'। অতুল প্রসাদের গানে রয়েছে ভাষার কথা, যে ভাষার জন্য শহীদ হয়েছে বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানরা। সে গানের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় সম্ভাবনার বাণী। তার অমর সেই গান_ মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা। তোমার কোলে তোমার বোলে কতই শান্তি ভালোবাসা। কি জাদু বাংলা গানে, গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে; গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা। গণসঙ্গীত 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে এই জনতা।' 'নওজোয়ান নওজোয়ান বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান'/'যখন প্রশ্ন ওঠে যুদ্ধ না শান্তি, আমরা জবাব দিই শান্তি, শান্তি।' এমনি ধরনের গানে সম্ভাবনার বাংলাদেশের রূপই ফুটে ওঠে। আর এ রূপটি একাত্তরের ২৬ মার্চ বাস্তবায়িত হয়ে 'বাংলাদেশ' নামে, আমাদের প্রাণপ্রিয় এই দেশের অভ্যুদয় ঘটে। যার মূল প্রেরণা বাঙালির ভাষা অন্দোলন।
একুশের মাসে বাংলা একাডেমির বইমেলায় এখন দেখা যায় বিপুলসংখ্যক বাংলা বইয়ের উপস্থিতি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধসহ অসংখ্য বিষয়ের বাংলা বই। অতিশয় আনন্দের কথা। এনসিটিবি প্রতি বছর প্রকাশ করছে বাংলায় লেখা বিভিন্ন বিষয়ের কোটি কোটি বই। সেগুলো পড়ছেও লাখ লাখ ছেলেমেয়ে। শত শত বাংলা পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিদিন। দেশের কোটি কোটি মানুষ কথা বলছে বাংলায়। আলোচনায়-সভায়-মিছিলে ব্যবহার করছে বাংলা। বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গণজুড়ে হাজার হাজার আবালবৃদ্ধবনিতা বাংলায় কথা বলছে প্রাণের আবেগে। এটাই আমাদের ভাষা আন্দোলনের অর্জন ও সফলতা।
মানতেই হবে যে, ভালো মনে হলেও গণতন্ত্রের বাজার এখন মোটেই ভালো নয়। সারাবিশ্ব নয়, বাংলাদেশে তো নয়ই। কিন্তু তবু আমাদের ভাষা আন্দোলন তো রয়েছে। সে কেবল অতীতের স্মৃতি নয়। বর্তমানের ঘটনাও বটে এবং ভবিষ্যতের জন্য পথপ্রদর্শক। বাংলাভাষা কতটা প্রচলিত হচ্ছে তার নিরিখে বিচার করলেই বোঝা যাবে গণতন্ত্রের দিকে আমরা কতটা এগিয়েছি, কিংবা এগোইনি। দেশের শিক্ষা মোটেই সর্বজনীন হয়নি এবং শিক্ষিতরাও বাংলা ভাষা চর্চায় যে অত্যন্ত অধিক আগ্রহ দেখাচ্ছেন তা নয়। বীর এখন তিনিই যিনি ইংরেজি ভালো জানেন। না, উর্দুর পক্ষে এখন কেউ বলবে না; কিন্তু বাংলার পক্ষে আন্তরিকভাবে কথা বলবেন, কাজ করবেন এমন মানুষও সমাজে কম।
একুশে ফেব্রুয়ারির লক্ষ্য একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং গড়ার পরেও এগিয়ে যাওয়া_ স্বাধীনতা, মৈত্রী ও সাম্যের লক্ষ্যে। সে আপস করে না, কেননা সে জানে কোনো আপসই নিজের শর্তে হয় না, হয় নিঃশর্তে। ভাষা আন্দোলনের পথই আমাদের প্রকৃত মুক্তির পথ। আমাদের ভাষা আন্দোলন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের জন্য পথপ্রদর্শক। বাংলা ভাষা কতটা প্রচলিত হচ্ছে তার নিরিখে বিচার করলেই বোঝা যাবে গণতন্ত্রের দিকে আমরা কতটা এগিয়েছি, শিক্ষা মোটেই সর্বজনীন হয়নি এবং শিক্ষিতরাও বাংলা ভাষা চর্চায় যে অত্যন্ত অধিক আগ্রহ দেখাচ্ছে তা নয়। যিনি ইংরেজি ভালো জানেন বাংলাদেশে তারই কদর বেশি। আর যারা বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করে তাদের এ দেশে কোনো কদর নেই। তারা ভালো চাকরিও পায় না। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে সর্বস্তরে কীভাবে বাংলা প্রচলন হবে, আর কীভাবেই বা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না বলে যে দুঃখ, সেটা কিন্তু মূলত প্রমিত বাংলার জন্য। মাতৃভাষা তো শিখতে হয় না। দেশের নিরক্ষর মানুষরাও মাতৃভাষায় কথা বলে অনর্গল। তা নিয়ে কারো কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু আনুষ্ঠানিক পরিবেশে আনুষ্ঠানিক শোভন পোশাকের মতো শোভন ভাষাটা আমরা চাই। ঘাটতি আমাদের সেখানে। আর এটা যদি আমরা সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি তা হলে বাংলা ভাষার জন্য আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম বৃথা হয়ে যাবে। আমরা কি তা চাই?
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin