প্রথম শহীদ মিনারের কথামাহমুদুল বাসার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বৃস্পতিবার। অপরাহ্নে অর্থাৎ ৩ থেকে ৪টার মধ্যে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে। গুলি করেছিল ঢাকার তদানীন্তন অবাঙালি ডিসি কোরেশী এবং সিটি এসপি মাসুদের অধীনস্থ পুলিশ বাহিনী।
২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল হোস্টেলের সামনে, ১২ নাম্বার ব্যারাকের কাছে, যেখানে শহীদদের প্রথম রক্ত ঝরেছিল, সেখানে শহীদদের তাৎক্ষণিক মূল্যায়নের তাগিদে, রাতের অন্ধকারে অসমাপ্ত কলেজ বিল্ডিংয়ের মিস্ত্রিদের সহায়তায় এবং ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনার। এই শহীদ মিনারের নকশা এঁকেছিলেন ডা. বদরুল আলম। তিনি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তিনি শুধু মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন না, বহুমুখী শৈল্পিক গুণের অধিকারী ছিলেন। ভাষাসংগ্রামী, লেখক, রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিক বলেছেন, 'অভিনয়ের পাশাপাশি রঙতুলি, কালি-কলম, রেখা পেনসিলে কৃতিত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন জনাকয়েক মেডিকেল কলেজের ছাত্র। মেডিকেল কলেজের এই পটুয়া ছাত্রদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বদরুল আলম।'
তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ সংসদের ভিপি ছিলেন গোলাম মাওলা, জিএস ছিলেন শরফুদ্দিন আহমদ। ২৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে বদরুল আলমকে ঘুম থেকে তুলে বেশ কয়েকজনের উপস্থিতিতে গোলাম মাওলা বদরুল আলমকে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভের নকশা করে দিতে বলেন। তিনি ভালো অাঁকতে পারতেন বলেই তাকে বলা হয়েছিল।
প্রথমে বদরুল আলম যে নকশাটি দাঁড় করিয়েছিলেন, সেটি বাল্যকালে দেখা একটি স্মৃতিস্তম্ভ। সেই স্মৃতিস্তম্ভের যে ছবি তার মনে ছিল, তারই আদলে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে নকশাটি এঁকেছিলেন। নেতৃস্থানীয় ছাত্ররা এই নকশাটির আরেকটু পরিবর্তন করতে বলেন বদরুলকে। এবারে বদরুল আলমের মনে পড়েছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের মিনারের নকশা। এটিই সবার অনুমোদন লাভ করেছিল।
তখন মেডিকেল কলেজে নির্মাণ কাজ চলছিল। একটা গুদামঘরে নির্মাণসামগ্রী রাখা হতো। মিস্ত্রিরা সাগ্রহে এই নির্মাণসামগ্রী দিতে রাজি হয়েছিল। সেখান থেকে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সংঘবদ্ধ ও সারিবদ্ধ হয়ে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে শুরু হয়েছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনারের কাজ। অন্যতম ভাষাসংগ্রামী ড. আনিসুজ্জামান বলেছেন, 'একজনের হাত থেকে আরেক জনের হাতে হাতে ইট পেঁৗছে গেল। স্ট্রেচারে করে নেয়া হলো বালি আর সিমেন্ট। বালতিতে করে হাতে হাতেই বয়ে নেওয়া হলো পানি। দুটি রিকশাও লাগানো হলো নির্মাণসামগ্রী বহন করতে। কন্ট্র্রাক্টরদেরও পাওয়া গেল। কন্ট্রাক্টরদের পরোক্ষ সাহয্যে দু'জন রাজমিস্ত্রিকেও পাওয়া গেল। তবে কায়িক পরিশ্রম সবটাই ছাত্ররাই করল।'
সূর্য উঁকি দেয়ার আগে দেশের প্রথম শহীদ মিনার তৈরি হয়ে গেল। তার উচ্চতা ছিল ১০ ফুট, চওড়া ৬ ফুট, তার ভিত্তি ছিল ৭ ফুট। ৩ ভাগ বালি, ১ ভাগ সিমেন্ট আর ইট দিয়ে সদ্য নির্মিত শহীদ মিনার কাঁচা ছিল বলে চারপাশে দড়ি টানানো হয়েছিল। তখনই মিনারের গায়ে দুটো পোস্টার লাগানো হয়েছিল। লেখা ছিল, 'শহীদ স্মৃতি অমর হোক', রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।'
দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে যারা অংশগ্রহণ করে ইতিহাসের সোনালি পাতায় নাম লিখিয়েছেন, তাদের একটা তালিকা দিয়েছেন ড. আনিসুজ্জামান তার প্রবন্ধে। তারা হলেন, আবদুর রশীদ আবদুস সামাদ, আবদুস সালাম, আবুল হাশিম, আলী আসগর, আলীম চৌধুরী, আশেক, আসাদুজ্জামান, আহমদ রফিক, ইসমাইল, কবির, কাজী আনওয়ারুল হক, কাদের, গোলাম মাওলা, জহুরুল হক, জাহেদ, জিয়া, জেকো, তাহের, নওয়াব হোসেন প্রধান, ফজলুল মতিন, ফরিদুল হুদা, বদরুল আলম, মকসুদ, মনজুর হোসেন, মর্তুজা, মামুনুর রশীদ, রাবি্ব, শরফুদ্দিন আহমদ, শাজাহান, সাঈদ হায়দার, সিরাজ জান্নাত, হাবিবুর রহমান, হুমায়ুন ও আবদুল হাই।
২৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রভাতে একটু বেলা করে, দেশের প্রথম শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন ২২ ফেব্রুয়ারি নিহত সফিউর রহমানের বাবা মাহবুবুর রহমান। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি আবার উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। তিনি মুসলিম লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে তিনি পরিষদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
দেশের প্রথম শহীদ মিনার দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল। শহীদ মিনার নির্মাণকারী ছাত্ররা সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। মিনারের সামনে একটি চাদর বিছানো হয়েছিল। সেখানে মানুষ অকাতরে টাকা-পয়সা এমন কি সোনার গহনা পর্যন্ত দান করেছিল। ড. আনিসুজ্জামান তার প্রবন্ধে জানিয়েছেন, তার মাও একটি সোনার হার দান করেছিলেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে পাকিস্তান সরকারের পুলিশ রাতারাতি প্রাণের আবেগে গড়ে ওঠা শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। সেখানেই ক্ষান্ত হয়নি, ইট, বালু, সিমেন্ট ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। দেশের প্রথম শহীদ মিনার তখনকার মতো অবলুপ্ত হয়। কিন্তু তার রক্তমাখা স্মৃতি রয়ে যায় জাতির হৃদয়ে। তাই কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ কবিতায় বলেছেন, 'স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?/ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো সাড়ে চার কোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো!'
বদরুল আলমের নকশাকে ভিত্তি করে রাতারাতি মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে প্রথম শহীদ মিনার গড়ে না উঠলে এখনকার জাতীয় শহীদ মিনার কখন হতো, তা বলা মুশকিল। অবশ্যই প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের প্রেরণায় কাজ করেছে আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা প্রণেতা হামিদুর রহমান ও ভাস্কর নভেরাকে মানুষ যতটা স্মরণ করে, দেশের প্রথম শহীদ মিনারের নকশা প্রণেতা বদরুল আলমকে ততটা স্মরণ করা হয় না। এই প্রজন্মের অনেকেই তার নাম জানে না। বদরুল আলম শুধু শহীদ মিনারের নকশাকার ছিলেন না, ভাষাসংগ্রামীও ছিলেন। একজন ভাষাসংগ্রামী ও বদরুলের সতীর্থ বলেন, 'বদরুল আলম শুধু প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের স্থপতি নয়, ভাষা আন্দোলনের একেবারে শুরু থেকে সেই ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালের দিনগুলোতেও সে এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। ... ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাজপথে বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম। পুলিশের লাঠিচার্জে মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। এক সপ্তাহ পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম। তাছাড়া বদরুল আলমসহ আমরা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য কাজ করেছি। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করলে বদরুল আলম যে প্রতিবাদী পোস্টারগুলো লিখেছিল তা ছিল বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী। সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, ভাষাসংগ্রামী ও চিকিৎসক বদরুল আলম চির অমর হোক।'
বদরুল আলম ভাষাসংগ্রামী, জাতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, দেশের প্রথম শহীদ মিনারের স্থপতি। তাকে জাতীয়ভাবে স্মরণ করা উচিত আমাদের। একুশের পদক পুরস্কার তার প্রাপ্য ছিল। আমরা সরকারকে অনুরোধ জানাব, তাকে যেন মরণোত্তর একুশের পদক প্রদান করা হয়।
বদরুল আলম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালের ৮ এপ্রিল। মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। তার পিতার নাম আলহাজ মৌলভী নাসিরুদ্দীন-স্কুল ইন্সপেক্টর ছিলেন। মাতার নাম তহুরুন্নেসা। ১৯৪৪ সালে গণিতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে। মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে আইএসসি পাস করেন। ১৯৫৭ সালের ২০ জানুয়ারি বদরুল আলম ডা. আফজালুন্নেসাকে বিয়ে করেন। তিনিও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ছিলেন, ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি এক প্রবন্ধে বলেছেন, "ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধিকার অন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার ডা. বদরুল আলমের যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি।'
মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। নাহলে নিজেরাই ছোট হয়ে যাবে।

(সূত্র : প্রথম শহীদ মিনারের স্থপতি ডা. বদরুল আলম স্মারক গ্রন্থ- অনিন্দ্য-২০১৩)।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close