একুশে ফেব্রুয়ারি ও বিশ্বের অন্যান্য ভাষাজোবায়ের আলী জুয়েল ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির প্রধান বাহন। মানুষের মনে স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশ চেতনা উৎসারনে ভাষা এক উল্লেখযোগ্য শক্তি। যুগে যুগে প্রবল প্রতাপশালী আগ্রাসী শক্তির সামনে অসহায় দুর্বল জাতিসমূহ কেবল তাদের স্বাধীনতাই হারায়নি, সেসব বৈদেশিক শক্তির ভাষার আক্রমণে তাদের মাতৃভাষাও হারিয়েছে। বিজয়ী প্রতাপশালীরা সব সময়ই তাদের ভাষা বিজিত জাতিগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এভাবে পৃথিবী থেকে অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে। একটি ভাষার বিলুপ্তি মানে সভ্যতার একটি অমূল্য অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত কমবেশি ২৫ হাজার ভাষা আছে, ভাবা যায়? ভাষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনালগ; ল্যাংগুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের ২০০৯ সালে প্রকাশিত হিসাবমতে সারাবিশ্বে প্রায় সাত হাজার ৩৫৮টি ভাষা এবং প্রায় ৩৯ হাজার ৪০০টি উপভাষা রয়েছে। এর মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা আছে প্রায় পাঁচ হাজার। পৃথিবীর কিছু ভাষা আছে যে ভাষায় মাত্র কয়েক হাজার মানুষ কথা বলে। বিভিন্ন ভাষাভাষী জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সারাবিশ্বের ভাষাগুলোকে বেশ কটি ভাষা পরিবারে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ লোক ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা নানাবিধ মজার তথ্য দিয়েছে ভাষা সম্পর্কে। ইউনেস্কো বলছে, প্রচলিত হাজার ছয়েক ভাষার মধ্যে কোনো কোনো দেশে প্রচলিত আছে একাধিক ভাষা। আবার এমন দেশও আছে বৈকি, যাদের কোনো মাতৃভাষা নেই। প্রতিনিয়ত অযত্ন, অবহেলা ও সংগ্রহের অভাবে ভাষার মৃত্যু ঘটছে। আবার আগ্রাসী ভাষার হুমকির মুখে পড়ে, যাকে বলে আগ্রাসন, কোনো কোনো ভাষার চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে, রূপ বদল হচ্ছে। ছয় হাজার ভাষার মধ্যে ৯৬ শতাংশ ভাষা ব্যবহার করে মাত্র ৪ শতাংশ লোক। ইন্টারনেট সার্চ করলে ৯০ শতাংশ ভাষার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। আফ্রিকার ৮০ শতাংশ ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণর্মালা ও বানানরীতি নেই। প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপ পাপুয়া নিউগিনির ৫০ লক্ষ মানুষ কথা বলে ৮২০ রকম ভাষায়। ইন্দোনেশিয়ার মানুষ কথা বলে ৭৪২টি ভাষায়। নাইজেরিয়ার মানুষ ৫১৬টি ভাষায় এবং ভারতে ব্যবহৃত হয় ৪২৭টি ভাষায়। ১৫৩০ সালে পর্তুগিজরা ব্রাজিলে উপনিবেশ স্থাপনের পর এখন পর্যন্ত দেশটির ৫৪০টি বা ৭৫ শতাংশ ভাষার অপমৃত্যু ঘটেছে। অষ্টাদশ শতকে অস্ট্র্রেলিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর ইতিমধ্যে দেশটির ২৫০টি অর্থাৎ ৯০ শতাংশ ভাষার বিলুপ্তি ঘটেছে।
ধ্বনি ভাষার আদি প্রাণ। ভাষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পৃথিবীর ভাষা বিকাশ ও প্রসারের সূচনালগ্ন থেকে কোনো একসময় ভাষা ছিল কমপক্ষে পাঁচ লাখ। তবে এর মধ্যে মোট ভাষার ৭৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। মজার ব্যাপার, সভ্যতার এই আধুুনিক যুগেও প্রতি ১৫ দিন পর একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। বিশ্বের ভাষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার শব্দ আছে ইংরেজি ভাষায়।
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি লোক কথা বলে কোন ভাষায়? এ নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান ভাষা হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক লোক কথা বলে মান্দারিন চীনা ভাষায়। চীনা ভাষাভাষীর সংখ্যা ১০২ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার। দ্বিতীয়: স্প্যানিশ, ৩৫ কোটি ২০ লাখ। তৃতীয়: ইংরেজি, ৩৩ কোটি ২০ লাখ। চতুর্থ: বাংলা, ১৯ কোটি ৯০ লাখ। অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি ৩৬ জনে একজন কথা বলে বাংলায়। পঞ্চম স্থানে রয়েছে হিন্দি/উর্দু-১৯ কোটি ২০ লাখ। আরবি: ১৮ কোটি ৪০ লাখ। পর্তুগিজ, ১৮ কোটি। রুশ: ১৭ কোটি। জাপানি: ১০ কোটি ১০ লাখ। ফ্রেঞ্চ: ৮ কোটি ৬০ লাখ। তবে ভারতে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরেজি ও মাতৃভাষা ছাড়াও কাজ চালানোর মতো হিন্দিও জানে অনেকে। তাদের ধরা হলে হিন্দি ভাষাভাষীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ। অর্থাৎ মান্দারিন চীনা ভাষার পরেই স্থান পায় হিন্দি ভাষা। তবে হিন্দি ভাষার প্রভাব-প্রতিপত্তি যে ক্রমশ বাড়ছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এর একটি প্রধান কারণ হলো বলিউড ছবির অপ্রতিহত উত্থানজনিত প্রভাব। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় বাড়ছে হিংরেজি (হিন্দি+ইংরেজি) ভাষায় লিখিত ছায়াছবির দোর্দ- প্রতাপ।
ইংরেজি, আরবি, চীনা (মান্দারিন), স্প্যানিশ, ফরাসি এবং রাশিয়ান_এই ছয়টি হলো জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা। এ ছাড়া হিন্দি, বাংলা, পর্তুগিজ এবং এস্পেরান্তো ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে ৫৮টি স্বাধীন দেশের অফিসিয়াল ভাষা ইংরেজি। এ ছাড়া আরও ২৬টি অসার্বভৌম দেশে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ ও আমেরিকান কলোনির অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ইংরেজি ব্যবহার হয়। তেমনি ২৪টি দেশে আরবি, ৩০টি দেশে ও ১৬টি ফ্রেঞ্চ কলোনিতে ফ্রেঞ্চ, ৯টি দেশে পর্তুগিজ এবং ২০টি দেশে স্পেনিশ অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় সিয়েরা লিওন, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম রাজ্যের কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলাতে। এ ছাড়া আন্দামান ও নিকোবর দীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা হলো বাংলা।
আমাদের মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানিয়ে চরম আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ইউনেস্কোভুক্ত ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব সমর্থন করে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও ৬৫তম অধিবেশনে 'এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ' এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করা হয়। বাংলাদেশের এই প্রস্তাব আইভরি কোস্ট, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ওমান, গাম্বিয়া, চিলি ডোমিনিয়ন, বাহামাস, বেলারুশ, ভানুআতু, ভারত, সাইক্রোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সস্নোভাকিয়া ও হন্ডুরাস সমর্থন করে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে এটি একটি মহৎ অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের পরে বোধ হয় এত বড় অর্জন আর আমাদের হয়নি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু বাংলাদেশের নয়, সকল দেশের সকল ভাষাভাষীর। তবুও দিবসটি পালনের জন্য যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বেছে নেয়া হলো, তার জন্য বাংলাদেশের মানুষ গর্ববোধ না করে পারে না।
সবশেষে একটি প্রশ্ন_ কোনো একদিন আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা কি হারিয়ে যাবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে? না তা যাবে না। আধুনিক প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া সর্বোপরি তথ্যপ্রযুক্তির যুগে চেষ্টা-চরিত্র করলে কোনো ভাষাই হয়তো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে না শেষ পর্যন্ত। তবে প্রতিনিয়ত নিয়মিত ভাষাচর্চার ব্যাপারটা অব্যাহত রাখতে হবে প্রতিদিন। ভাষা হলো বহতা নদীর মতো। তার মুখে পলিমাটি জমতে দেয়া যাবে না কোনো কিছুতেই।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close