একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনআওয়ামী লীগে কোন্দল বিএনপিতে বিভাজনচুয়াডাঙ্গা-১ আসন (সদর ও আলমডাঙ্গা)রেজাউল করিম লিটন চুয়াডাঙ্গা আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বেশি তৎপর আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। অনেকটা আগেভাগেই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরম্ন করেছেন তারা। অন্যদিকে বিএনপি জেলা শহর থেকে শুরম্ন করে তৃণমূলে কোন্দল ও উপদলের কারণে তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। অনেকে আবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হামলা মামলার কারণে আগাম প্রচারণায় নামছেন না।
চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন। এ আসনে মোট ইউনিয়ন ২০টি। পৌরসভা রয়েছে ২টি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯৩ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন মহাজোট প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চারদলীয় জোট প্রার্থী অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮৮৯ ভোট।
আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের প্রার্থী আছেন ৭ জন। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান শামসুল আবেদীন খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদী।
এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বর থেকে প্রচারণায় নামবেন চুয়াডাঙ্গার মেয়ে এমপি শিরিন নাঈম পুনম এবং মহাজোটের অন্যতম শরিক জাসদের (ইনু) প্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা এফবিসিসিআই পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা ও জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় আছেন ৫ জন। তারা হলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক যুগ্ম সচিব ড. মো. আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ উয়ুথ ফোরামের উপদেষ্টা বিডিআর বিদ্রোহে বেঁচে যাওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ কামরম্নজ্জামান ও জেলা বিএনপি নেতা শরিফুজ্জামান শরিফ।
উলেস্নখ্য, চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দারের সঙ্গে যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপুর বিরোধ দীর্ঘদিনের। এ কারণে বিগত পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রার্থী হুইপ ছেলুন জোয়ার্দ্দারের সহোদর রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার দাঁড়িয়ে ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। বর্তমানে এ আসনে একপক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন ও অপরপক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু।
বর্তমান সংসদ সদস্য সোলাইমান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন দীর্ঘ ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগকে এক সুতায় গেঁথে রাখলেও বর্তমান সময়ে সেই পরিস্থিতিতে অনেকটা পাল্টে গেছেন। সে হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী থাকছেন না, এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশেস্নষকরা।
এ ব্যাপারে সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন বলেন, তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং বিগত দুই সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে বিজয়ী হওয়ার পর চুয়াডাঙ্গায় যে উন্নয়ন হয়েছে তা বিগত দিনে হয়নি। আওয়ামী লীগের একটি মহল তার বিরম্নদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও চুয়াডাঙ্গার উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে দলীয় সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকে আবার এ আসনে মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি আশাবাদী।
এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুল হক বিশ্বাস নতুন করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দলীয় কোন্দলের কথা স্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো গ্রম্নপে নেই, কৃষক শ্রমিক জনতার জনপ্রিয়তা এবং তিনি দীর্ঘ ১৯ বছর চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর পলস্নীবিদু্যৎ সমিতির সভাপতি ছিলেন। এরপর তিনি বিগত দুটি উপজেলা নির্বাচনে জনপ্রিয়তার কারণে ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করেছেন। এ ছাড়া বর্তমান সময়ে চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগের যে অবস্থান বা কোন্দল দানা বেঁধেছে তাতে কে মনোনয়ন পাবেন তা বলা অনিশ্চিত। তাছাড়া আওয়ামী কেন্দ্রীয় ফোরাম থেকে তাকে মাঠে কাজ করার জন্য বলা হয়েছে, এলাকার জনগণও তাকে চাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সামসুল আবেদীন খোকন বলেন, তিনি গত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন, এবারও চাইবেন।
জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক প্রফেসর ডা. মাহবুব হোসেন মেহেদীও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি তার পেশাগত দক্ষতা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা। মাঝে মধ্যে তিনি চুয়াডাঙ্গা-১ আসনভুক্ত যে কোনো জায়গায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করে অসহায়-দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবাসহ ওষুধও বিতরণ করছেন।
অন্যদিকে জোর গুঞ্জন আছে, হেবিওয়েট প্রার্থী হয়ে আসছেন ব্যবসায়ী নেতা এফবিসিসিআই পরিচালক, বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দলের সুযোগেই বর্তমান সংসদ সদস্যের পাশাপাশি মাঠে নেমেছেন সরকারি দলের প্রায় আধাডজন নেতা। তবে সরকারি দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় না নামলেও তার পক্ষে বিগত দিনের নানা উন্নয়নের ফিরিস্ত্মি তুলে ধরছেন তার কর্মী-সমর্থকরা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলে উন্নয়নসহ নানা ফিরিস্ত্মি তুলে ধরে সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিজের পক্ষে ভেড়াতে চালিয়ে যাচ্ছেন নানা কার্যক্রম। বিশেস্নষকদের ধারণা আওয়ামী লীগের কোন্দল মেটাতে না পারলে দীর্ঘদিন বিএনপির দখলে থাকা আসনটি আবার তাদের ঘরে চলে যাবে।
অন্যদিকে ভিন্ন চিত্র বিএনপির ক্ষেত্রে। অনেকটা হ-য-ব-র-ল ভাবে চলছে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। নিজেদের মধ্যে কোন্দল, উপদল ও গ্রম্নপিংয়ের কারণে বিপর্যস্ত্ম তারা। দলের কোন্দল মেটানোই তাদের জন্য অনেকটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত ৮ বছরে বিএনপির সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম ঠিকমতো পরিচালিত না হওয়ারও অভিযোগ সাধারণ নেতাকর্মীদের। আর এ নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের ক্ষোভেরও অন্ত্ম নেই।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির রাজনীতি চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েক দফা উদ্যোগের পরও ৮ বছরে এর থেকে উত্তরণ ঘটেনি। এর পাশাপাশি সরকারি দলের হামলা মামলা তো আছেই। আর এ কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একসময়ের বিএনপির দুর্গ খ্যাত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীর মাঠ পর্যায়ে তেমন নির্বাচনী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তবে তাদের পক্ষে নির্বাচনী ব্যানার-ফেস্টুন নির্বাচনী এলাকায় শোভা পাচ্ছে।
বিএনপিতে হঠাৎ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব একাদশ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ড. আব্দুস সবুর বলেন, তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়ার আদর্শকে বুকে লালন করে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কর্মী-সমর্থকদের মন জয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া তিনি বলেন, যদি মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে নির্বাচনী এলাকার শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিসহ রাস্ত্মাঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ ও জেলাতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবেন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বিএনপির বিভাজন ও মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে বলেন, তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপিকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কেন্দ্রীয় বিএনপির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর কারণে তা করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, তৃণমূল বিএনপি তার সঙ্গে আছে। আর বিএনপির দুর্গে তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে দলীয় চেয়ারপারসন অবগত আছেন, বিধায় তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে তিনি আশাবাদী।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তবে তার ভাই জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকট ওয়াহেদুজ্জামান বুলা বলেন, জেলা বিএনপি বলেন আর কেন্দ্রীয় বিএনপি বলেন তার মতে যোগ্য নেতা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। আর চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে তিনিই মনোনয়ন পাবেন। তিনি বিগত দুটি নির্বাচনে এ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
বিএনপির অপর আহ্বায়ক যুগ্ম আহ্বায়ক মজিবুল হক মজু বলেন দলীয় যে বিভাজন দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে তা মেটাতে না পারলে ধানের শীষ প্রতীকের পরাজয় নিশ্চিত। তিনি আরও বলেন, দলের বিভাজন জেলা পর্যায় থেকে মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, যত দ্রম্নত সম্ভব কেন্দ্র থেকে তা মেটানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close