প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বছর ২০১৭ড. আশরাফ আহমেদ প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেল আরও একটি বছর। নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরম্ন হবে নতুন বছরের। পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করে নেয়াই মানুষের সহজাত প্রবণতা। জাতীয় জীবনে অধিকাংশ কাজই খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি মনে করা হলেও খ্রিস্টীয় বর্ষ ঘটা করে পালন করা হয় না। তবে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বছরটি কেমন গেল তার হিসাব-নিকাশ সবাই করে থাকেন। আমাদের জাতীয় জীবনে ২০১৭ একটি গুরম্নত্বপূর্ণ বছর। নানা ক্ষেত্রে উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে পার হয়েছে। অনেক সিদ্ধতার মধ্যেও সবার চেষ্টা ছিল এগিয়ে যাওয়ার। নতুনের মধ্যেই নিহিত থাকে অমিত সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্ত্মবে রূপ দিতে সুযোগ করে দেবে নতুন বছর।
২০১৭-এ আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতি। ইউনেসকোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা ৩০ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেসকো সদর দপ্তরে এ স্বীকৃতির কথা জানান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে 'মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে' (এমওডবিস্নউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডবিস্নউ-তে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। বাঙালির শ্রেষ্ঠতম কবিতা অভূতপূর্ব জাগরণের বিশুদ্ধ সংগীত ৭ মার্চের ভাষণ। পৃথিবীর নানা দেশের ৪২৭টি অতি গুরম্নত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হলো ৭ মার্চের ভাষণ। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের আগমুহূর্তে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা সারা পৃথিবীর মানুষের তথ্যভিত্তিক ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করল।
২০১৭ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতার কারণে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৈথিল্যের সুযোগে তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল। টানা চারদিনের অভিযান শেষে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় আতিয়া মহলের জঙ্গি আস্ত্মানা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল। এ অভিযানে নিহত হয়েছে এক নারীসহ চার জঙ্গি। ২৫ মার্চ রাতে এ জঙ্গি আস্ত্মানার অদূরে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি বোমা বিস্ফোরণে দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ নিহত হয়েছেন ছয়জন। অর্থাৎ এ অভিযানকে কেন্দ্র করে চারদিনে মোট নিহতের সংখ্যা ১০। এর আগে চট্টগ্রামের সীতাকু-ে আস্ত্মানায় অভিযানে চারজন নিহত হয়। রাজধানীর আশকোনায়র্ যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে আত্মঘাতী হামলায় একজন, খিলগাঁওয়ের্ যাবের চেকপোস্টে হামলার চেষ্টাকালে একজন এবং শাহজালাল আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে এক জঙ্গি নিহত হয়। গুলশানের হলি আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যায়ক্রমিক অভিযানে জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্য এসেছে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, জঙ্গিরা কৌশলগত কারণে এতদিন নিষ্ক্রিয় ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৈথিল্যের সুযোগে তারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এবার পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা দেশবাসীকে ব্যথিত করেছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ১৫৮ জনের প্রাণহানির শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০ জুলাই রাতে চট্টগ্রামের সীতাকু-ের সলিমপুরে গভীর রাতে পাহাড়ধসে ৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বর্ষা মৌসুমে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে ১৬৫ জনকে প্রাণ দিতে হলো মনুষ্যসৃষ্ট এ সংকটের কারণে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সর্বগ্রাসী থাবার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে দিনের পর দিন লাশের সারি দীর্ঘ করার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এটা অজানা নয়, পাহাড় ও পাহাড়ি বন কেটে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার জন্য কিছু অসাধু মানুষ দায়ী। এদের অপকর্মের ফলে প্রকৃতি সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে প্রতিশোধ হিসেবে।
গত বছরের ১৬ জানুয়ারি বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন এবংর্ যাবের তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৬ আসামির বিরম্নদ্ধে মৃতু্যদ-াদেশ দিয়েছে আদালত। উলেস্নখ্য, এ মামলায় আসামি ছিল মোট ৩৫ জন। বাকি ৯ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়েছে আদালত। নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। যদিও এটি নিম্ন আদালতের রায়, তারপরও তা ভিকটিমদের স্বজনদের মনে স্বস্ত্মি এনে দিয়েছে। স্বস্ত্মি পেয়েছে সর্বস্ত্মরের মানুষ।
দেশে গত মে মাসের শুরম্ন থেকেই দেখা দিয়েছিল চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তখন বিষয়টিতে তেমন গুরম্নত্ব না দিলেও পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে শুরম্ন করে। এর মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে চিকুনগুনিয়া। ঢাকায় একরকম ঘরে ঘরে আক্রান্ত্ম হয় মানুষ। ছুটতে শুরম্ন করে হাসপাতাল ও ডাক্তারের কাছে। তোলপাড় লেগে যায় সবদিকে। উচ্চ আদালতে গড়ায় এ রোগের প্রকোপের ঘটনা। জাতীয় সংসদে পর্যন্ত্ম আলোচিত হয়ে ওঠে চিকুনগুনিয়া। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জবাব দিতে হয় বারবার। সরকারের তরফ থেকে চালানো শুরম্ন করা হয় জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন তৎপরতা।
কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। থামছে না মৃতু্যর মিছিল। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট কারণ। সে হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা পরোক্ষভাবে হত্যারই শিকার হন। কিন্তু হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্ত্মমূলক শাস্ত্মির আওতায় আনার জনকাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ নেই বাংলাদেশে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে জ্যামিতিক হারেই বেড়ে চলছে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে না, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে না। রাস্ত্মায় নামলেই মৃতু্যদূত তাড়া করছে যাত্রী বা পথচারীকে। প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় রক্তাক্ত হচ্ছেন, ছিন্নভিন্ন লাশে পরিণত হচ্ছেন।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর ধনকুবেরদের বিরম্নদ্ধে অর্থ পাচার, কর ফাঁকির মতো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। আধুনিক যুগে উনিশ শতকের অর্থনৈতিক মুক্তির আর অগ্রগতির সময় থেকেই ধনী আর ক্ষমতাশালী শ্রেণি নিজেদের সম্পদ গোপন করে আসছে। কিন্তু এই অঙ্কের হিসেবে অনিয়মের পরিমাণটি আসলে কত বড় তা ছিল সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। গত বছর তা ফাঁস হয়েছে।
১১ নভেম্বর বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের মধ্যদিয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের ঘটনা ঘটল। ১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী অবৈধের রায় প্রকাশের পর থেকে সরকার সমর্থক আইনজীবীরা তার বিরম্নদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলেন।
বর্তমান কমিশনের অধীনে কুমিলস্না, নারায়ণগঞ্জ ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ যে কটি নির্বাচন হয়েছে, তাতে কমিশন সমালোচনা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
বদলে যাচ্ছে সমাজ, বদলে যাচ্ছে রীতিনীতি। পরিবার ভেঙে হচ্ছে টুকরো টুকরো। ভালোবাসার বন্ধন ছিঁড়ে হচ্ছে খান খান। বড় পরিবার বা যৌথ পরিবার এখন সবার কাছেই ঝামেলা। ছোট পরিবার বা সংসার গড়তে এখন উদগ্রীব সবাই। শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্র একই অবস্থা। ধর্ষক পুত্রের পক্ষ নিচ্ছেন বাবা। বলছেন, এ বয়সে এমন একটু আধটু হয়ই, তাতে দোষের কী! মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সমাজ আজ থর থর করে কাঁপছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এসএসসি উত্তীর্ণ কিশোরীকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ, তারপর ওই মেয়ে ও তার মায়ের সঙ্গে বর্বর আচরণের ঘটনায় হতবাক সারাদেশ। গত বছর মুখে মুখে ফিরছে তুফান এবং বনানীতে ছাত্রী ধর্ষণের অপকর্মের কথা। তুফান সরকার, তার স্ত্রী, স্ত্রীর বড় বোন ও শাশুড়ির বিচার দাবিতে বগুড়া শহরে মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। উঠেছে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রম্নমকিকে পৌরসভার নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ারও দাবি। তারা বলছে, অসহায় এক মেয়ে ও তার মাকে মাথা ন্যাড়া করার অপরাধটি ক্ষমার অযোগ্য। বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন মা-মেয়ের খোঁজ নিয়েছে। এমন ঘটনা সমাজে প্রায়ই ঘটছে।
বিগত বছরে আমরা বেশ কয়েকজন গুণী মানুষকে হারিয়েছি। যাদের অভাব পূরণীয় নয়। প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক, রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রকৃতিবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা, মেয়র আনিসুল হক, মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, রাজনীতিক এম কে আনোয়ার, গোলাম মোস্ত্মফা আহমেদ এমপি : গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ), নায়করাজ রাজ্জাক, মিজু আহমেদ, লাকী আখান্দ, আব্দুল জব্বার, বারী সিদ্দিকসহ অনেককেই।
দেশের উন্নয়ন যেমন সাধারণ মানুষকে আশান্বিত, আপস্নুত করে, মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়ায়- তেমন ব্যর্থতাও গ্রাস করে। দেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা না যায় তাহলে একটি দেশের শান্ত্মি ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যারা রাষ্ট্র চালান এবং সহযোগিতা করেন, সেসব রাজনৈতিক দল কোনোভাবেই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না। কেননা সাধারণ মানুষের শান্ত্মি ও কল্যাণের জন্য যে রাজনীতি করার কথা, সেখানে রাজনৈতিক মতবিরোধে সাধারণ মানুষই জিম্মি হয়ে পড়লে তার মতো পরিতাপের আর কিছুই হতে পারে না। তারপরেও বলব আগামী দিনগুলো সমৃদ্ধি বয়ে আনুক জাতির জীবনে।
আমাদের প্রত্যাশা হোক নতুন বছর বয়ে আনবে সমৃদ্ধির বার্তা, প্রতিহিংসামুক্ত গণতান্ত্রিক চেতনাসমৃদ্ধ সুস্থ পরিবেশ। আমরা সব সময় আশাবাদী।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close