বইমেলা প্রতিদিনবসন্ত্ম ফুটেছে প্রাণের মেলায়এজাজুল হক মুকুল মঙ্গলবার পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত্ম উৎসবের আমেজে মুখরিত ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলাও। ছবিটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে তোলা -যাযাদিকৈশোর পেরিয়ে প্রাণের মেলা এখন পূর্ণ যৌবনে। ভরা এ যৌবনে মঙ্গলবার লেগেছিল বসন্ত্মের ছোঁয়া; আর আজ ভরে উঠবে ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে। ভালোবাসা আর বই একই সূত্রে যেন গাথা। আমরা যে কথা মুখে বলতে পারি না, যে অব্যক্ত ভাষা প্রকাশ করতে পারি না। একজন লেখক-কবি সেই কথা অবলীলায় বলে দেন তার সৃষ্টিতে। ভালোবাসার দিনে আজ তাই প্রিয়জনকে বই উপহার দেবে অনেকেই। তাই তো অমর একুশে গ্রন্থমেলার দুই অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের শুধুই ছিল লেখক-পাঠক-দর্শনার্থী। যত দূর চোখ যায়- প্রায় সবার বসনেই বাসন্ত্মী আর হলুদের অপূর্ব মিতালী। মলাজুড়ে এই দৃশ্যপট বলে গেল কেবল একটি কথাই, 'বসন্ত্ম ফুটেছে প্রাণের মেলায়'। সত্যিই এ এক মন মাতানো দৃশ্য।
বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, মানুষ আসছে; প্রিয়জনের হাত ধরে, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দল বেঁধে। প্রতিটি মানুষকে দেখতেই ভালো লাগছে। কি সুন্দর করে বাসন্ত্মী রঙের শাড়ি, ফতুয়া-পাঞ্জাবি পরে তারা হাজির হয়েছিলেন অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। এত মানুষের আগমনে উড়ছিল ধূলা, তবে তাতে বাদ সাধেনি উৎসবের আমেজের। বেলা তিনটায় মেলার দ্বার উন্মোচনের সময় থেকে শেষ অব্দি পহেলা ফাল্গুনের আবির মাখানো মানুষেরা মেলায় ভিড় জমিয়েছেন। খুব যে বিক্রি হয়েছে, তা কিন্তু নয়; তবে পাঠক-দর্শনার্থীদের এই উচ্ছ্বল আগমনে খুশি প্রকাশকরা। এ ভিড় বিশ্ব ভালোবাসা দিবসেও অব্যাহত থাকবে, সেটি আর বলার অপেক্ষা থাকে না; এমনটিই মন্ত্মব্য তাদের।
এদিকে পাঠক-দর্র্শনার্থীদের 'বাসন্ত্মী' আগমনে মনে হচ্ছিল এ যেন হলুদ কোন ফুলের বাগান। শুধু পাঠকদের মাঝেই না, বসন্ত্মের এ আগমনী ছোঁয়া লেগেছিল স্টলগুলোতেও। বিক্রয়কর্মীরাও সেজে এসেছিলেন বসন্ত্মের রঙের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। প্রতিটি স্টলেই ছিল বইপ্রেমীদের ভিড়। বইপ্রেমীরা বসন্ত্মে রঙের সঙ্গে নিয়েছেন নতুন বইয়ের ভাঁজ খোলার সোঁদা গন্ধ। যাচাইবাছাই করে কিনে নিয়েছেন পছন্দের লেখকের নতুন বই। বসন্ত্মের রঙ মনে নিয়ে বই কিনে আর ঘুরে ফিরেছে পুরো মেলাজুড়ে। এ কারণে মেলায় গতকাল বেচাকেনা ছিল বেশ ভালো। সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাহী পরিচালক কামরম্নল হাসান শায়ক বলেন, 'বেচাকেনা যেমনই হোক এখন মেলা পরিপূর্ণ। কারণ, বসন্ত্ম আমাদের প্রাণের উৎসব। বিক্রি সঙ্গে একে মেলালে হবে না, উৎসবের এই পরিপূর্ণ আনন্দকে উপভোগ করতে হবে। আমরা সেটাই করেছি।'
এদিকে, গতকাল দুটি ভিন্ন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে মেলা প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তাদের সঙ্গী হয়েছিলেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। মোড়ক উন্মোচনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তারা গল্প করতে বসেছিলেন অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নের। হাজারও সরকারি কর্মব্যস্ত্মতা ভুলে দারম্নণ খোশগল্পে মেতেছিলেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলতে রাজি হলেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে বললেন, দারম্নণ লাগছে ফাগুনের প্রথম দিনের মেলা। মানুষ কি সুন্দর করে বাসন্ত্মী রঙে সেজে এসেছে মেলায়। এতটুকু বলেই বাসন্ত্মী রঙের পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে থাকা আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে রসিকতা করে বললেন, 'এই যে দেখেন, আমাদের সংস্কৃতিমন্ত্রী কী সুন্দর বাসন্ত্মী রঙের পাঞ্জাবি পরে আছেন।' সব মিলিয়ে মেলা ভালো লেগেছে জানান মন্ত্রী।
আর মেলা নিয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী বললেন, বেশ খোলামেলা, সুন্দর মেলা। মানুষ আসছেন, বই কিনছেন- এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে?' এবারের মেলায় তার সম্পাদিত 'বেলা অবেলা সারাবেলা' বইটির চতুর্থ খ- এসেছে। বইটি কেমন যাচ্ছে জানতে চাইলে এক গাল হেসে বললেন, 'আমি কি লেখক নাকি? সম্পাদক! বই কেমন বিক্রি হচ্ছে সেটা প্রকাশকই ভালো বলতে পারবেন।' একটু দুঃখ করে বললেন, চারপাশে এত মোবাইলের ক্যামেরা যে, ছবি তুলেই সময় পার হয়ে যাচ্ছে; বই কিনতে পারছি না। তবে তার প্রকাশকরা বন্ধুরা তাকে চমৎকার সব বই উপহার দেন বলেও জানিয়ে দিলেন সবার প্রিয় 'বাকের ভাই'।
আজ মেলা রাঙাবে ভালোবাসার রঙে: আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এ দিবস উপলক্ষে আজও মেলা জমজমাট থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন প্রকাশকরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গতকাল ফাগুনের প্রথম দিনেই অনেকে ভালোবাসার প্রিয় মানুষকে নতুন বই উপহার দিয়েছেন। তারপরও, ভালোবাসা দিবসে অনেকেই নতুন বই কিনে প্রিয়জনকে উপহার দেবেন এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।
নতুন বই: একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার ১৩তম দিনে নতুন ১৫০টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৬, উপন্যাস ২৭, প্রবন্ধ ৫, কবিতা ৫৭, গবেষণা ৩, শিশু সাহিত্য ৩, জীবনী ৬, মুক্তিযুদ্ধ ৩, ভ্রমণ ২, বিজ্ঞান ৪, রাজনীতি ১, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১, অনুবাদ ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর আরও ১৭টি বই প্রকাশ পেয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর 'ভূতের নয় ভবিষ্যতের' (রোদেলা), সঞ্জু খানের 'অসম প্রেম' (রিদম প্রকাশনা), মীর আল তারিকের 'নীলা' (বাঁধন পাবলিকেশন্স), আল মাহমুদের 'জীবন যখন বাঁক ঘোরে' (সরল রেখা), সাহাদাত পারভেজের 'গণহত্যা গজারিয়া : রক্ত মৃতু্য মুক্তি' (সাহিত্য প্রকাশ), অধ্যাপক এস এম আনোয়ারার 'বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব' (ন্যাশনাল পাবলিকেশন্স), হাসান আজিজুল হকের 'আমার যেদিন গেছে ভেসে' (যুক্ত), অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুলস্নাহ্‌র 'সুস্থ থাকুন' (ঐতিহ্য), মোহিত কামালের 'দুরন্ত্ম দুখু' (অনিন্দ্য প্রকাশ), আলফ্রেড খোকনের 'উড়ে যাচ্ছে মেঘ' (শ্রাবণ প্রকাশনী), ড. মাহবুবুল হকের 'রম্নশ বিপস্নবের বিজয়গাথা' (কথাপ্রকাশ), শামসুজ্জামান খানের 'ফোকলোর সংগ্রহমালা ১২১' (বাংলা একাডেমি), আহসান হাবীবের 'সত্যি অ্যাডভেঞ্চার' ও শানারেই দেবি শানুর 'ত্রিভুজ' (তাম্রলিপি)।
মেলামঞ্চের আয়োজন: গতকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'নারীর নিরাপদ পরিসর ও পরিবেশ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুশী কবির। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, হোসনে আরা শাহেদ, সুভাষ সিংহ রায় এবং নূরম্নন্নাহার মুক্তা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আয়েশা খানম। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী সন্দীপন দাস, আঞ্জুমান আরা শিমুল ও কাজী মুয়ীদ শাহরিয়ার সিরাজ জয়।
আজকের অনুষ্ঠান : আজ মেলা চলবে বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত্ম। বিকালে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'শিশু সংগঠন নিস্ক্রিয়তা ও শিশুর সাংস্কৃতিক বিকাশ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহিত কামাল। আলোচনায় অংশ নেবেন সুব্রত বড়ুয়া, দিলারা হাফিজ ও হাসান শাহরিয়ার। সভাপতিত্ব করবেন শিল্পী হাশেম খান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close