পূর্ববর্তী সংবাদ
শৈশবের ঈদঅরণ্য প্রভা মাঘের কনকনে শীত, ছোটনদের টিনের চালে টুপটাপ করে কুয়াশা পড়ার শব্দ শোনা যেত তখন। বড়আপা এসব শব্দকে ভূতে ঢেলা ফেলছে বলে ভয় দেখাতো। এসব ভীতিকে উপেক্ষা করে ঠিক ঠিক ঘুম ভেঙে জেগে উঠতো ছোটন, যখন কাফেলার দল মাইকে গজল গাইতে গাইতে তাদের বাড়ির সামনে চলে আসত। বড়আপা কখনো-সখনো চুপি চুপি উঠে সেহরি সেরে ঘুমিয়ে পড়ত রনির অজান্ত্মে। তাই আজ কাফেলারা চলে যাওয়ার পরও লেপের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকে ছোটন। কিন্তু বড়আপার বিভোর ঘুমের কারণে সেহরিতে ওঠা হয় না তার।
ঈদের এক সপ্তাহে আগে বাবার দোকানের সারা বছরের ঝাড়ু দেয়া ধুলিগুলো বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যেত তাতেই ছোটনদের পাঁচ ভাই-বোনের ঈদের কেনাকাটা হয়ে যেত। ছোটনের স্কুলগেটের শিউলিফুল ছিল বড়আপার খুব প্রিয়। ছোটন সঙ্গ না দিলে বড়আপার কপালে সে ফুল জুটতোই না। সেহরি সেরে বাবা নামাজের জন্য বেরিয়ে গেলেই আপা জেগে উঠে বলত-ছোটন, ছোটন, আই ছোটন, ওঠ্‌ ওঠ্‌, আজ খুব দেরি হয়ে গেছে সোনাভাই আমার। আজ নিশ্চয়ই সদ্য সুবাস ছড়ানো গরম গরম নরম ফুলগুলোর আর আমাদের কপালে নেই। দেখিস এতক্ষণে অন্যরা এসে ফুলগুলো সব কুড়িয়ে নিয়ে গেছে।
এবার ঈদে চট্টগ্রাম থেকে নোটনরা আসায় বাড়িতে একটা ফুরফুরে মেজাজ বিরাজ করছে। ছোটনের মনেও একটা বাড়তি আনন্দ যোগ হয়েছে। কারণ নোটন আর ছোটন প্রায় সমবয়সী। ঈদের পর ফাইনাল পরীক্ষা শেষে দুজনেই ক্লাস থ্রি-তে উঠবে। বড়আপা মন ভারী করে বসে থাকে। নোটন জানতে চাইলে ছোটন বলে-আর বলিস না। ওপাড়ায় যে বড়মা আছে, সেখানে আপার জামা বানাতে দিয়েছে, দুবার গিয়ে ঘুরে এসেছে। একবার বলেছে ফলস লাগানো হয়নি, আরেকবার বলেছে বোতামঘর কাটা হয়নি, তাই আপা রেগে বসে আছে। তার পরপরই একদৌড়ে গিয়ে শপিং ব্যাগগুলো বের করে এনে বলে, নোটন দেখি তুই কেমন প্যান্ট-শার্ট কিনেছিস? নোটন কিছুতেই ঈদের কাপড়গুলো বের করতে চায় না, বলে কিনা-ঈদের আগে এসব দেখালে আনন্দটাই তো মাটি। চল আমরা বরং বড়আপার দর্জিবাড়িতে যাই, দেখি জামাটার কাজ শেষ হয়েছে কিনা?
আজ ছোটন ও নোটন দুজনেই রোজা রেখেছে। দুজনকেই বেশ কয়েকবার বড়আপা বলেছেন- দুজনেই সত্যি করে বল, লুকিয়ে লুকিয়ে কিচ্ছু খাসনি তো? মিথ্যা কথা বলিস না, রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলতে নেই। ছোটন মাথা দুলিয়ে না-সম্মতি জানায়, সঙ্গে সঙ্গে নোটনও। দুজনের মলিন মুখ দেখে বড়আপারও মনটা ব্যথাতুর হয়ে ওঠে। শুকিয়ে যাওয়া দুটো শিশুর মুখের দিকে তাকানো যায় না। তবুও যেন তাদের চোখেমুখে আনন্দের কমতি নেই। আপা বলে- এই তো আর মাত্র দুই ঘণ্টা, তারপরই আমরা ইফতার করব। কি মজা হবে, তাই না নোটন? কাঙ্ক্ষিত অপেক্ষা শেষে এক বিশাল আয়োজন করা হয়েছে ইফতারের। কয়েক পদের শরবত; জুস, খেজুর, আপেল, আঙুর, মুড়ি, পিঁয়াজু, গাভীর খাঁটি দুধের ফিরনি, খেজুর রসের পিঠা আরও অনেক রকমের আয়োজন।
সংযমের মাস শেষে সন্ধ্যায় আকাশে যে চাঁদটা দেখা যাবে সেটাই তো শাওয়াল মাসের প্রথম চাঁদ, মানে ঈদের চাঁদ। নোটন আর ছোটন ইফতার শেষ করেই স্কুলমাঠে ছোটে। পিছু পিছু বড়আপাও। হাত উঁচিয়ে কেউ কেউ দেখাতে চেষ্টা করে ওই-যে তালগাছের ফাঁক দিয়ে অস্ফুট দেখা যাচ্ছে, ওটাই তো ঈদের চাঁদ। চাঁদটাকে একপলক দেখেই দুজনে আবার ভোঁ-দৌড়। চারদিকে আতশবাজির শব্দে গ্রামটা কেঁপে কেঁপে ওঠে।
নামাজ শেষে ঈদগা থেকে বেরিয়ে ছোটন ও নোটন রাস্ত্মার দুপাশে গরিবদের বিলিয়ে দিতে থাকে চকচকে দুই টাকার নোট। নতুন টাকা পেয়ে তারাও খুশিতে দোয়া করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। পথে পথে স্বজনদের সঙ্গে কোলাকুলি। বাসায় অপেক্ষা করছে এক নতুন আনন্দ। সেমাই, পোলাও, ফিরনি খাওয়া পর্বের মধ্যেই শুরম্ন হয় পারিবারিক লটারি। ছোট-বড় ২৬ জন সদস্যের জন্য ২৬টি পুরস্কার। টিকিট তোলার জন্য নোটনকে নির্বাচন করা হয়। নোটনের হাতে প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত ভাগ্যবান ব্যক্তির নাম ছোটন। সবাই বিস্মিত! হিরো বাইসাইকেল এখন ছোটনের। নোটন বিন্দুমাত্র অখুশি হয় না তাতে। শৈশবের সেই ঈদের কথা ছোটন কি ভুলে থাকতে পারে?
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close