সম্ভাবনায় ভরা বাংলাদেশের ই-কমার্স সেক্টরবর্তমানে আমাদের ই-কমার্স সেক্টরে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেসব সমস্যা ছাপিয়েও চলে এসেছে অনেক সম্ভাবনা। এই সমস্যাগুলো দূর করতে পারলে এবং সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলে ই-কমার্স সেক্টর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেক্টরে পরিণত হবে। শুধু তাই নয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ ২০২১-এর রূপকল্পকেও বাস্ত্মবে রূপ দিতে পারবে।রাজিব আহমেদ বাংলাদেশের ই-কমার্স সেক্টর এখন আর নতুন কিছু নয়। যদিও ১৯৯৯ সালে এটি শুরম্ন হয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর পর অর্থাৎ ২০১৪ সালে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে এই সেক্টরটিতে সত্যিকারের প্রাণের সঞ্চার ঘটে। ওই বছরের নভেম্বর মাসের ৮ তারিখে ই-ক্যাব তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরম্ন করে। বিগত তিন বছরে দেশব্যাপী ই-কমার্সকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে ই-ক্যাব ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে আমাদের ই-কমার্স সেক্টরে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেসব সমস্যাগুলো ছাপিয়েও চলে এসেছে অনেক সম্ভাবনা। এই সমস্যাগুলো দূর করতে পারলে এবং সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে পারলে ই-কমার্স সেক্টর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেক্টরে পরিণত হবে। শুধু তাই নয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ ২০২১-এর রূপকল্পকেও বাস্ত্মবে রূপ দিতে পারবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০০০-১২০০-এর মতো ওয়েবসাইটে ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ১০-১৫ হাজার ফেসবুক পেজ নানা ধরনের পণ্য ও সেবা বিক্রি করছে। এ ছাড়াও ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান, অনেকগুলো পেমেন্ট গেটওয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা প্রদান করছে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মিলিয়ে এই সেক্টরে অন্ত্মত ৫০,০০০ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এটা খুবই সামান্য এবং আশা করা যায় যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ই-কমার্স খাতে বৈপস্নবিক পরিবর্তন ও অগ্রগতি সাধিত হবে।
২০১৭ সালে ই-ক্যাবের ভাষ্যমতে, ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে ১৭০০-১৮০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। এ বছর এই সংখ্যাটি ৩০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন এবং ২০২০-২০১২ সাল নাগাদ বছরে ১ বিলিয়ন ডলার বা ৮০০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়ে যাবে। এসব কিছুই নির্দেশ করছে যে, বাংলাদেশে ই-কমার্স সেক্টরের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত্ম উজ্জ্বল।
আসলে ই-কমার্সই ভবিষ্যতের বাণিজ্য এবং এটির কোনো বিকল্প নেই। কারণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎটাই হচ্ছে এদিকে।
কুরিয়ার সার্ভিস বা ডেলিভারি নিয়ে ই-কমার্সে প্রথম থেকেই সমস্যা ছিল এবং বিশ্বের অনেক দেশেই এ সমস্যা রয়েছে। তবে ই-ক্যাবের আন্ত্মরিক প্রচেষ্টার কারণে এই সমস্যা অনেকখানি কমে এসেছে এবং স্থানীয় কুরিয়ার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের থেকে অনেক ভালো সেবা প্রদানের চেষ্টা করছে। ছোট ছোট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, যাদের অর্ডার বেশি আসে না তারা এসব কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর মাধ্যমে তাদের পণ্য ক্রেতার কাছে ডেলিভারি দিচ্ছে।
বাংলাদেশি ই-কমার্স সেক্টরে আসলে এখনো সেই অর্থে কোনো একক কোম্পানি রাজত্ব করছে না, বরং এই ই-কমার্স মার্কেটটা অনেক বেশি খ-িত, ইংরেজিতে যাকে বলে ঋৎধমসবহঃবফ সধৎশবঃ. কোনো কোম্পানি প্রতিদিন যে পরিমাণ পণ্যের অর্ডার পায়, এর ৫% অর্ডার পায় না। তাই ছোট ছোট কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা অনেক দরকার। আবার একই সঙ্গে খুব বড় একটি বা দুটি যদি ই-কমার্স কোম্পানি পাওয়া যায়, যারা প্রতিদিনের মার্কেটের ২০% বা ৩০% করে অর্ডার পাবে এবং তা ডেলিভারি করবে, তাহলেও তা ই-কমার্স সেক্টরের জন্য ভালো হবে।
এই মুহূর্তে ছোট-বড় সব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসলে কুরিয়ার ডেলিভারি সার্ভিস বা মানুষ ই-কমার্স নিয়ে সচেতন নয়, এসব না। কোম্পানিগুলোর এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ফান্ড। বিশ্বজুড়ে ই-কমার্স সেক্টরের জন্য আসলে ব্যাংকগুলো সেভাবে ঋণ দিতে এগিয়ে আসে না কারণ, কোম্পানির ভ্যালুয়েশন বা মূল্যস্থির করা খুবই কঠিন। তাই ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মতো ব্যতিক্রমধর্মী উপায়েই আসলে ই-কমার্সের ফান্ডিংটা আসে। বাংলাদেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল মাত্র শুরম্ন হয়েছে এবং এখনো তা খুব একটা পরিণত হয়নি। আশার কথা হলো, ইতোমধ্যেই ভেঞ্চার ক্যাপিটালের হাত ধরে ই-কমার্স সেক্টরে কিছু বিনিয়োগ এসেছে, কিন্তু সেটা খুব বেশি না এবং সেটাও মূলত সার্ভিস-ভিত্তিক ই-কমার্স কোম্পানিগুলোই বেশি পাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা ফিজিক্যাল গুডস নিয়ে কাজ করছে, তারা এদিক দিয়ে এখনো সেভাবে সুবিধা করতে পারেনি।
এই অবস্থা বদলানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি দুই দিকেই সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। সরকারি সেক্টরে যে আইডিয়া প্রজেক্ট আছে, তাকে আরও বেগবান করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-এই দুটি মন্ত্রণালয়কে ই-কমার্স সেক্টরের জন্য আলাদা একটি ফান্ডিংয়ের প্রজেক্ট হাতে নেয়া যায় কিনা, এ বিষয়টি নিয়ে খুব গভীরভাবে চিন্ত্মা করতে হবে। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ই-কমার্স সেক্টরের স্টেক হোল্ডার। এর মধ্যে রয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই চারটি মন্ত্রণালয় যদি এই খাতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের মতো যদি সামান্য কিছু ফা-ের ব্যবস্থা করে, তাহলে ই-কমার্সের অগ্রগতি অনেক দ্রম্নত হবে।
বেসরকারি সেক্টরের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ব্যাংকগুলো যেহেতু এই খাতে এগিয়ে আসছে না, তাই বেসরকারি খাতে যারা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নিয়ে কাজ করছেন, তাদেরও ই-কমার্স সেক্টরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি সেক্টরে অবশ্যই তারা নিজেদের লাভ প্রথমে দেখবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা চিন্ত্মা করলে বা ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা চিন্ত্মা করলে ই-কমার্স সেক্টরকে সহায়তা প্রদান করার এখনই সেরা সময়। এখন যদি এই খাতে কাজ শুরম্ন না করা হয়, তাহলে এক সময় পুরো ই-কমার্স ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত্ম হবে। ভারতের দিকে যদি তাকাই তাহলে আমরা দেখব যে, আইটি ইকোসিস্টেমের একটা গুরম্নত্বপূর্ণ অংশ ই-কমার্স সেক্টর দখল করে বসেছে। আর অনেক ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের কাছে থেকে আইটি স্টার্ট-আপ হিসেবে ফান্ডিং পাচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশই হচ্ছে ই-কমার্স বা অনলাইনে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করার পস্ন্যাটফর্ম। তাই ভারতের এই উদাহারণ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং এদিকে আমাদের আসলে এগিয়ে আসতে হবে।
ই-কমার্স সেক্টর কারও একার সম্পত্তি নয়। আসলে ই-কমার্স বলতে আলাদা কোনো ব্যবসা নেই। প্রচলিত যে কোনো পণ্য বা সেবাকে অনলাইনের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করে আয় করার প্রক্রিয়াকেই ই-কমার্স বলে। তাই ই-কমার্স বলতে আলাদা কোনো পণ্য বা সেবা নেই।
আর ই-কমার্স সেক্টরকে গুরম্নত্ব দিতে হবে শিক্ষিত লোকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে। বর্তমানে দেশে প্রচুর শিক্ষিত বেকার ?স্নাতক আছে। একই সঙ্গে যারা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত আছেন, তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে তাদের আদৌ কোনো চাকরি হবে কিনা- এটা নিয়ে দুশ্চিন্ত্মা করে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু ই-কমার্স সেক্টরের সম্ভাবনাকে যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে আগামী ১০ বছরে অন্ত্মত ১০ লাখ শিক্ষিত লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর বর্তমান সরকারের যে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ?রয়েছে, এর মূলে থাকা উচিত ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ই-কমার্স সেই ভিশনকে অনেক দ্রম্নতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

রাজিব আহমেদ
সাবেক সভাপতি, ই-ক্যাব
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close