বিদু্যৎ খাতের অনিশ্চিত যাত্রা অসহায় ভোক্তা, সংকটে অর্থনীতি২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান বা সরকারের নিকট থেকে ভর্তুকি প্রাপ্য ছিল ৩০০ কোটি টাকা অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই দেনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৯৯৪ কোটি টাকায়। ইতিমধ্যে গত এক বছরেই সরকার বেশ কিছু রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎকেন্দ্রের অনুমতি দিয়েছে যাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট। এগুলোর সবকটিই ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। বিপিডিবির প্রাক্কলনে দেখা যায়, এসব বিদু্যৎকেন্দ্র থেকে উচ্চ মূল্যের বিদু্যৎ ক্রয়ের কারণে চলতি অর্থবছরে (২০১৭-১৮) প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ৪,৫০০ কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ৮,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।আবদুল আউয়াল মিন্টু সনাতনী পদ্ধতিতে সঞ্চালন ও ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খলা, সিস্টেম লস, বিদু্যৎ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, অতিমাত্রায় লোডশেডিং ও বিদু্যৎ বিভ্রাট, গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মিটার রিডিং, বিল প্রণয়ন ও সংগ্রহে নানা রকম কারচুপি ও দুর্নীতি, মিটার রিডারদের অনিয়ম, অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতা, বিদু্যৎ উৎপাদনে লুট-পাট, ঘন ঘন দাম বৃদ্ধি, দরপত্র বা প্রতিযোগিতা ছাড়া স্বাক্ষরিত বিদু্যৎ ক্রয় চুক্তির জন্য দায়মুক্তি আইন, ইত্যাদি সমেত বিদু্যৎ খাত জনগণের ওপর এক বিরাট আপদের মতো চেপে বসেছে। যদিও বিদু্যৎ উৎপাদনের কিয়দাংশ এখন বেসরকারি খাতে তবে সঞ্চালন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এবং বিদু্যৎ নিয়ে নাগরিকদের দুর্ভোগ সীমাহীন। এ দুর্ভোগ হরেক রকমের। যেমন মাঝে মাঝে বিদু্যৎ সংযোগের জন্য দরখাস্ত্ম নেয়া বন্ধ করে দেয়া, দরখাস্ত্ম নিলেও সময়মতো সংযোগ না পাওয়া, সংযোগ থাকলেও বিদু্যৎ ঘন ঘন চলে যাওয়া, হাই-ভোল্টেজ ও লো-ভোল্টেজ সমস্যা, ইত্যাদি। উচ্চমাত্রায় পদ্ধতিগত অপচয় (সিস্টেম লস) ও বিদু্যৎ চুরির সমস্ত্ম দায় বহন করতে হচ্ছে বিল প্রদানকারী গ্রাহকদের। ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা এবং দুর্নীতি প্রশ্রয়দানকারী পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্ত্মবায়নের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে ঘন ঘন বিদু্যতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। ফলে ভালো গ্রাহকরা ন্যায্যমূল্য থেকে অতিরিক্ত হারে দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে ক্রমাগত ভর্তুকি দিতে দিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার যেমন বিপর্যস্ত্ম, তেমনি বাংলাদেশ বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ডের ক্রমাগত লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তার আর্থিক যোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে। বিল বাবদ বিদু্যৎ ক্রেতার নিকট থেকে প্রত্যক্ষ ও জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে পরোক্ষভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিপিডিবিকে প্রদানের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। গত ১০ বছরে বিদু্যতের দাম গ্রাহক পর্যায়ে প্রায় দ্বিগুণ (৯০ শতাংশের বেশি) বাড়ানোর পরেও ২০০৬-০৭ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত্ম বিপিডিবিকে মোট ৩৯,৬১০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। সরকারি হিসেব গুলোতেই এমন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান বা সরকারের নিকট থেকে ভর্তুকি প্রাপ্য ছিল ৩০০ কোটি টাকা অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই দেনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৯৯৪ কোটি টাকায়। ইতিমধ্যে গত এক বছরেই সরকার বেশ কিছু রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎকেন্দ্রের অনুমতি দিয়েছে যাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট। এগুলোর সবকটিই ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। বিপিডিবির প্রাক্কলনে দেখা যায়, এসব বিদু্যৎকেন্দ্র থেকে উচ্চ মূল্যের বিদু্যৎ ক্রয়ের কারণে চলতি অর্থবছরে (২০১৭-১৮) প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ৪,৫০০ কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ৮,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে বিদু্যতের গড় উৎপাদন মূল্য ৫.৫০ টাকার বিপরীতে নতুন এসব বিদু্যৎকেন্দ্র হতে কিনতে ব্যয় হবে ইউনিট প্রতি ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রে ৮ টাকা এবং ডিজেলের ক্ষেত্রে ২০ টাকা। বিশ্ব বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে বা তার স্বাভাবিক মূল্য মানে স্থিতি লাভ করলে এ বাবদ সরকারের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ইউনিট প্রতি ১৮ থেকে ৩২ টাকা।
অর্থবছর ভর্তুকি (টাকা)
২০০৬-০৭ ৩০০ কোটি
২০০৭-০৮ ৬০০ কোটি
২০০৮-০৯ ১,০০৭ কোটি
২০০৯-১০ ৯৯৪ কোটি
২০১০-১১ ৪,০০০ কোটি
২০১১-১২ ৬,৩৫৭ কোটি
২০১২-১৩ ৫,৫৭১ কোটি
২০১৩-১৪ ৬,১০০ কোটি
২০১৪-১৫ ৭,৭০০ কোটি
২০১৫-১৬ ৩,৫০০ কোটি
২০১৬-১৭ ৩,৯৯৪ কোটি
মোট ৩৯,৬১০ কোটি
টেবিল : বিপিডিবির লাভ-ক্ষতির বিশেষ প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০১৭

বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটা সহজেই অনুমেয় যে এই সংস্থাটি কখনো এই দেনা পরিশোধ করার যোগ্যতা অর্জন করবে না। সব দায়-দেনা শেষ পর্যন্ত্ম সরকার তথা জনগণের ঘাড়ে এসে পড়বে। মোট কথা হলো শেষ পর্যন্ত্ম জনগণকেই এ টাকা পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে বিদু্যৎ আমদানি ও ভাড়াভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ার ফলে এই খাতে নিজ সামর্থ্যে উন্নয়ন কাজ প্রায় বন্ধ। বিপিডিবি নিজস্ব উৎপাদনের পরিবর্তে বেসরকারি খাত থেকে বিদু্যৎ কেনা বা আমদানি করতে বেশি উৎসাহী। বর্তমানে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন চুক্তির আওতায় যেমন কুইক রেন্টাল, রেন্টাব চুক্তির আওতায় উৎপাদিত বিদু্যৎ ক্রয়ে বেশি আগ্রহী। ২০০৯ সালের জুন মাস নাগাদ মোট ৩৩টি বিদু্যৎকেন্দ্রের মধ্যে সবমিলে বেসরকারি খাতে ছিল মাত্র ১৩টি ও সরকারি খাতে ছিল ২০টি। ঐ সময় মোট ৫,১৬৬ মেগাওয়াট বিদু্যৎ উৎপাদনের ৭০ শতাংশ ছিল সরকারি খাতে। অর্থাৎ বিপিডিবি-এ নিজস্ব উৎপাদন ছিল ৩,৬০০ মেগাওয়াটের বেশি। জুন ২০১৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২,৯২১ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বিপিডিবি ও অন্যান্য সরকারি উৎপাদন কোম্পানির ক্ষমতা ৬,৪৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে জাতীয় বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতায় সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ কেবল সক্ষমতার মানদ-েই যে কমেছে তা নয়, বরং সে সক্ষমতা ব্যবহারেও দেখা যায় ব্যক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিদু্যৎ বিভাগ থেকে প্রকাশিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় ৬,৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৪৩টি সরকারি বিদু্যৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে ২,৬৫৯.৬৬ কোটি ইউনিট (কিলোওয়াট-আওয়ার) অথচ বেসরকারি খাতের সমান সক্ষমতার ৩৭টি উৎস হতে (ভারত থেকে আমদানিসহ) সরকার ৩,০৬৭.৯৪ কোটি ইউনিট। অর্থাৎ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি খাত বিদু্যৎ সরবরাহ করেছে ৪৬.৪৪ শতাংশ বাকি ৫৩.৫৬ শতাংশ দিয়েছে বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাতের মধ্যেই রয়েছে রকমফের। বেসরকারি খাতের মধ্যে দেখা যচ্ছে সরকার অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের উৎসের তুলনায় উচ্চ মূল্যের উৎস হতে বিদু্যৎ কিনতে অধিক আগ্রহী। দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় বেসরকারি খাতের প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি বিদু্যৎকেন্দ্র থেকে সরকার গত অর্থবছরে ১,৫১১.৮০ কোটি ইউনিট বিদু্যৎ ক্রয় করেছে। অন্যদিকে স্বল্প মেয়াদি চুক্তির আওতায় বেসরকারি খাতে স্থাপিত ২,৪৮২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৭টি উৎস হতে (আমদানিসহ) সরকার ১,৩৬২.২ কোটি ইউনিট বিদু্যৎ ক্রয় করেছে। এখানে বলে রাখা দরকার, স্বল্পমেয়াদি উৎস হতে বিদু্যৎ কিনতে সরকার দীর্ঘ মেয়াদি বিদু্যৎকেন্দ্র কেন্দ্রের তুলনায় ক্ষেত্র বিশেষে (গ্যাস-ভিত্তিক) দ্বিগুণের বেশি হারে (ইউনিট প্রতি) অর্থ পরিশোধ করে থাকে। তেলভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই ব্যয় হার (সরকার/বিপিডিবি যে দামে ক্রয় করে সে হিসেবে) ৩০-৪০ শতাংশ বেশি। আর সরকারি বিদু্যৎকেন্দ্রের তুলনায় স্বল্প-মেয়াদি (রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল) বেসরকারি খাতের গ্যাসভিত্তিক উৎসসমূহের বিদু্যতের মূল্য দাঁড়াচ্ছে তিন গুণ যা তেলভিত্তিক বিদু্যৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ৫০-৬০ শতাংশ বেশি। উৎপাদন ব্যয়ের এই ব্যবধান আরও বেশি হতো যদি সরকারি খাতের অদক্ষ ও পুরনো বিদু্যৎকেন্দ্রসমূহ বন্ধ করার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত দক্ষ বিদু্যৎকেন্দ্র সমূহের উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হতো।
সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার কমছে
সরকারি মালিকানায় মোট বিদু্যৎ উৎপাদনের যে সামর্থ্য আছে তার ৩০% থেকে ৪০% উৎপাদিত হয় খুবই প্রাচীন অথবা সেকেলে প্রযুক্তির জেনারেটর থেকে। সেকেলে প্রযুক্তির জেনারেটরে ইউনিট প্রতি বিদু্যৎ উৎপাদন মূল্য অত্যন্ত্ম বেশি। বহু জেনারেটর প্রতিনিয়ত খারাপ থাকে। কিছু মেরামতেরও অযোগ্য। বিপিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৬-১৭ তে দেখা যায়, ২০০০-২০০১ অর্থবছরে উৎপাদনক্ষম (উবৎধঃবফ ঈধঢ়ধপরঃু) বিদু্যৎকেন্দ্রসমূহের সম্মিলিত ক্ষমতা ৪,০০৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নির্ভরযোগ্য বিদু্যৎ প্রাপ্তি ছিল ৩,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে। অর্থাৎ সক্ষমতার প্রায় ৭৫ ভাগ নির্ভরযোগ্য বলা যেতো। গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) উৎপাদনক্ষম (উবৎধঃবফ ঈধঢ়ধপরঃু) বিদু্যৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ১২,৬৪৪ মেগাওয়াট যার মধ্যে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ক্ষমতা ৮,০০০ মেগাওয়াটের বেশি নয়। অর্থাৎ ওই অর্থবছরে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬৩.২৭ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। একদিকে বছর বছর নতুন নতুন বিদু্যৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের হার কমছে। এই চিত্রটি দেশের বিপিডিবি তো বটেই, বিদু্যৎগ্রাহক এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য ভয়ঙ্কর প্রবনতা। এটি বিদু্যৎ মাথাপিছু উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং ওই বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের জন্য বিদু্যতের মূল্য বাড়িয়ে এবং জনগণ প্রদত্ত ট্যাক্সের অর্থ থেকে ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। এর বাইরে আরও একটি দিক রয়েছে, যা সরাসরি অন্যান্য খাতে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদু্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বেপরোয়া মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে স্থানীয় ব্যাংকগুলো বিদু্যৎ খাতে ঋণ দিতে অধিক আগ্রহী বা বাধ্য হচ্ছে। এর অবশ্যম্ভাবি পরিণতি হিসেবে এ দেশের অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাংক ঋণ দুর্লভ ও অধিক ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার, আর তা হলো বিদু্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জাতীয় অর্থনীতির সক্ষমতার সামঞ্জস্যতা রক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে বিদু্যৎ উৎপাদনের এই সক্ষমতা বৃদ্ধি সমস্যার সমাধান নয় বরং সংকট আরও ঘণীভূত করবে বলে মনে হয়।
এদিকে বাংলাদেশ পলস্নী বিদু্যতায়ন বোর্ড খুবই দ্রম্নততার সঙ্গে বিদু্যৎ সংযোগ প্রদান করছে। গত দুই-আড়াই বছর যাবত প্রতিষ্ঠানটি গ্রামাঞ্চলে মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ নতুন গ্রাহককে সংযুক্ত করছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এ ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সামঞ্জস্যহীনতা লক্ষ্য করা যায়। দুর্বল বিতরণ অবকাঠামো আর সরবরাহ ঘাটতিজনিত কারণে গ্রামাঞ্চলে দিনে খুব কম সময়েই বিদু্যৎ সরবরাহ থাকে। দৃশ্যত বিদু্যৎ সংযোগের ক্ষেত্রে এই অগ্রগতি কেবল আবাসিকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে নতুন সংযোগের বৃদ্ধির হার অত্যন্ত্ম কম। ফলে বিদু্যতের মতো একটি ইনপুট কেবল এক স্ত্মরে ভোগে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ শিল্পে ও বাণিজ্যিক খাতে বিদু্যতে অধিকতর ব্যবহার লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ ও মান সম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে বড় আকারের ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। এ দিক বিবেচনা করলে বিদু্যৎ খাতের উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশলে বড় ধরনের অসামাঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয়। 'আমরা এত কোটি বিদু্যৎ সংযোগ দিয়েছি বা এত মেগাওয়াট বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছি' গোছের দাবি করবার সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া এর আর কোনো ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাচ্ছে না।
নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত ও বাস্ত্মবতা
২০০১ সালে বলা হতো যে দেশে বিদু্যতের চাহিদা ৩০০০ থেকে ৩৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে। সাম্প্রতিককালে বলা হচ্ছে তখন চাহিদা ছিল ৪,৪৬৫ মেগাওয়াট। এসব তথ্য কখনো সঠিক বলা যায় না। কেননা চাহিদা নিরূপণে আনুমানিক 'চেপে রাখা' (ংঁঢ়ঢ়ৎবংংবফ ফবসধহফ) চাহিদা ও "পিক আওয়ারে" অতিরিক্ত বিদু্যতের চাহিদাকে বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত্ম জরম্নরি। যে কোনো দেশের জন্য বিদু্যৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে জরম্নরি বিষয় হলো সত্যিকারের চাহিদা নিরূপণ করা। যেমন সবাই বিদু্যৎ চাইতে পারে। এটা হলো আকাঙ্ক্ষা। তবে আকাঙ্ক্ষা (ফবংরৎব) ও চাহিদা (ফবসধহফ) এ দুয়ের পার্থক্য বুঝে নিতে হবে। কেননা বিদু্যতের জন্য গ্রাহককে দাম দিতে হবে। যাদের মাসে মাসে বিল পরিশোধের সামর্থ্য নেই তাদের বিদু্যতের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তাদেরকে বিদু্যৎ সংযোগ দেয়া হবে না। বিদু্যৎ সবার প্রয়োজন হলেও "রাস্ত্মার বাতির" মতো এটা কোন জনহিতকর পণ্য হিসেবে গণ্য নয়। অতএব, যারা মূল্য পরিশোধ করতে পারবে, তারাই কেবল তার আকাঙ্ক্ষাকে চাহিদাতে পরিণত করতে পারবে। তাই দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, দরিদ্রতার হার, মানুষের আয় ও সামর্থ্য, শিল্পায়ন, জীবনমান ইত্যাদিকে বিবেচনায় এনে কেবলমাত্র চাহিদা নিরূপণ করা যায়।
বিদু্যতের উৎপাদন, ব্যবহার ও চাহিদা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তথা জিডিপি, দারিদ্র্য বিমোচন, নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের উৎকর্ষতা, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ইত্যাদির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নিচের সারণিতে ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের একটা হিসাব দেয়া হলো। এ দেশগুলো উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে আছে। এতে দেখা যায় সিঙ্গাপুর সবচাইতে উন্নত দেশ, তার বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহারও সর্বাধিক। নেপাল সবচেয়ে গরিব দেশ, সে হিসেবে দেশটির মাথাপিছু বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহারও সবচেয়ে কম। ভারত ও পাকিস্ত্মান মধ্য আয়ের দেশে না পৌঁছলেও এ দুই দেশে মাথাপিছু বিদু্যৎ ব্যবহার বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি।
বিপিডিবির ২০১৬-১৭'র বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় বাংলাদেশের মাথাপিছু বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহার যথাক্রমে ৩৫১.২১ ইউনিট ও ৩০৮.২২ ইউনিট। সম্প্রতি বাংলাদেশ নিম্ন মধ্য আয়ের দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অন্ত্মর্ভুক্তির দাবি করা হয়েছে। পরিকল্পনা করা হয়েছে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের তালিকায় নাম লেখানো। তবে এ যাবত বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের যে চিত্র দেখা যায় তাতে এই অগ্রযাত্রাকে কোনো ভাবেই টেকসই বলা যায় না।

আবদুল আউয়াল মিন্টু
সাবেক সভাপতি
এফবিসিসিআই
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close