বাংলাদেশের বিদু্যৎ খাত : একটি পর্যালোচনামাতারবাড়ী ও তার পার্শ্ববর্তী অধিকাংশ এলাকা পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত্ম সংবেদনশীল। মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব শুধু মহেশখালী দ্বীপ ও তার চারপাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটা চকোরিয়া সুন্দরবন, চকোরিয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলেও বিস্ত্মৃত হবে। সমুদ্রের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষেত্রেও তা মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। একইভাবে পায়রা ও তৎসংলগ্ন এলাকাও পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত্ম ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফসিল ফুয়েল বা খনিজ জ্বালানি বিশেষ করে তেল ও কয়লাকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী কয়লা ও তেলভিত্তিক নতুন বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে পুরনো কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।প্রকৌ. আ ন হ আখতার হোসেন পিইঞ্জ ১. বাংলাদেশের বিদু্যৎখাত একটি বহুল আলোচিত বিষয়। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন ইপি ওয়াপদা (ঊধংঃ চধশরংঃধহ ডধঃবৎ ধহফ চড়বিৎ উবাবষড়ঢ়সবহঃ অঁঃযড়ৎরঃু) গঠনের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্ত্মানের বিদু্যৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসা হয়। ব্রিটিশ আমলে ব্যক্তিখাতে বিভিন্ন শহর/নগরভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা চালু ছিল। তখন বিদু্যৎ ব্যবহার মূলত সীমাবদ্ধ ছিল আবাসিক ও কিছু বাণিজ্যিক ব্যবহারের মধ্যে। শিল্প উৎপাদনে তৎকালীন পূর্ববাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশে বিদু্যতের ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশের কবল থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্ত্মান সৃষ্টির পর এতদাঞ্চলে শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এবং বিদু্যতের চাহিদাও দ্রম্নত বৃদ্ধি পেতে থাকে। শহর বা নগরভিত্তিক ছোট ছোট বিদু্যৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষে বিদু্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সম্ভব ছিল না বলে তৎকালীন সরকার বিদু্যৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে প্রথম পানি ও বিদু্যৎ উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা ওঊঈঙ গধংঃবৎ চষধহ, ১৯৬৪ নামে সমধিক পরিচিতি। পাকিস্ত্মান আমলে তৎকালীন ইপিওয়াপদা-এর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের বিষয়ে হাভার্ড ইকোনমিস্ট গ্রম্নপ (ঐধৎাধৎফ ঊপড়হড়সরংঃ এৎড়ঁঢ়)-কে উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। তাদের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন ইপিওয়াপদার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা ও জনবলকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেশনের আদলে ইপিওয়াপদাকে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। ষাটের দশকে ইপিওয়াপদা ছাড়াও বেশ কিছু সরকারি, আধাসরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মার্কিন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বিভিন্ন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।
২. বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর পরই ১৯৭২ সালে ইপিওয়াপদাকে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ ৫৯ (চঙ.৫৯) বলে দু'ভাগে বিভক্ত করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ড নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্ত্মান আমলে গৃহীত প্রকল্পসমূহ ধারাবাহিকতায় চলতে থাকে। ব্রিটিশ আমল থেকে ইপিওয়াপদা গঠনের আগে ঢাকা শহরের বিদু্যৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা পরিচালনা করত তৎকালীন ডেভকো (উঊঠঈঙ) নামে একটি ব্রিটিশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তখন ঢাকা শহরের বিদু্যৎ উৎপাদন হতো হাতিরপুলে/পরিবাগে স্থাপিত ৮ মে. ও. একটি কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র থেকে। ঢাকা শহরে বিদু্যৎ সরবরাহ করার জন্য ১৯৬০ সালে ইপিওয়াপদা সিদ্ধিরগঞ্জে একটি ৩০ (৩১০) মে. ও. ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেল চালিত বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করে। সিদ্ধিরগঞ্জ হতে হাতিরপুল পর্যন্ত্ম একটি ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনও একই সাথে স্থাপন করা হয়। ঐ একই সময়ে কাপ্তাই পানি বিদু্যৎকেন্দ্র হতে বিদু্যৎ সরবরাহের জন্য কাপ্তাই হতে চট্টগ্রাম হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পর্যন্ত্ম একটি ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান বিদু্যৎ চাহিদা মেটানোর জন্য ঘোড়াশাল ও আশুগঞ্জে গ্যাসভিত্তিক বৃহদাকারের বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং সাব-স্টেশনেরও বিস্ত্মার ঘটানো হয়। এ ছাড়াও খুলনা, ভেড়ামারা, ঠাকুরগাঁও ও চট্টগ্রামে ছোট ছোট বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। আশুগঞ্জে প্রথমে ব্রিটিশ সহায়তায় পরে জার্মান, ঘোড়াশালে রাশিয়ান, চট্টগ্রামে চেকোশস্নাভিয়ার সহায়তায় বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। রাশিয়া এবং চেকোশস্নাভিয়ার সাথে সাপস্নাইয়ার্স ক্রেডিট/বার্টার ট্রেড-এর আওতায় এসব বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি চীনের সাপস্নাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায় রাউজানে ২২১০ মে. ও. তাপ বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বলতে গেলে ২০০৩ সাল পর্যন্ত্ম বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদু্যৎকেন্দ্রই রাশিয়া, চীন, জার্মান, চেকোশস্নাভিয়ার সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হয়েছিল। ১৯৯৭-৯৮ সাল হতে আইপিপি বা ওহফবঢ়বহফবহঃ চড়বিৎ চৎড়ফঁপবৎ-এর আওতায় মেঘনাঘাট ও খুলনায় ব্যক্তিখাতে বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরম্ন হয়। অবিশ্যি এ সময়ে ১০ মে. ও. ক্ষমতাসম্পন্ন কিছু ছোট ছোট বিদু্যৎকেন্দ্র ব্যক্তিখাতে নির্মিত হয়, যারা পলস্নী বিদু্যতায়ন বোর্ডকে বিদু্যৎ সরবরাহ করতো।
৩। ১৯৬৪ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে পুনরায় একটি পাওয়ার সেক্টর মাস্টার পস্ন্যান প্রস্তুত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে পাওয়ার সেক্টর মাস্টার পস্ন্যান হালনাগাদীকরণ করা হয়। এ সকল পরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদু্যৎকেন্দ্রসমূহ পরিচালিত হতো ব্যয়বহুল জ্বালানি ফারনেস ওয়েল, ডিজেল এবং হাইস্পিড ডিজেল দ্বারা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭৮ সালে দেশের পূর্বাঞ্চল হতে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদু্যৎ স্থানান্ত্মরের জন্য ২৩২ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টার কানেক্টর সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজে হাত দেয়া হয়। এতে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদু্যৎ সরবরাহের উন্নতি ঘটে। ঐ একই সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গ্রামাঞ্চলে দ্রম্নত বিদু্যতায়ন করার লক্ষ্যে পলস্নী বিদু্যতায়ন বোর্ড (আরইবি) প্রতিষ্ঠা করেন। আরইবি গঠিত হওয়ার পূর্বে পিডিবি এককভাবে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিদু্যৎ সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। আরইবি'র বিদু্যৎ বিতরণ ব্যবস্থা পিডিবি হতে সম্পূর্ণ পৃথক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরইবির আওতায় পলস্নী বিদু্যৎ সমিতি গঠন করা হয়। পলস্নী বিদু্যতের সকল গ্রাহকই তার নিজস্ব এলাকায় সমিতির সদস্য হিসেবে পরিগণিত হবেন। এতে বিদু্যতের সিস্টেম লস ব্যাপকহারে হ্রাস করা সম্ভব হয়।
৪। দেশের ক্রমবর্ধমান জাতীয় প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলাতে হলে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন বিদু্যৎ অবকাঠামো নির্মাণ অত্যাবশ্যক। এ বিষয়টি উপলব্ধি করে ২০০৩ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মার্কিন কারিগরি উপদেষ্টা কোম্পানি নেক্সান্টকে (ঘবীধহঃ) নতুন করে চড়বিৎ ঝবপঃড়ৎ গধংঃবৎ চষধহ (চঝগচ) প্রণয়নের কাজ দেয়া হয়। এ কাজটি ২০০৫ সালের জুনের মধ্যে সমাপ্ত করার কথা থাকলেও চঝগচ-২০০৫ সত্যিকারভাবে সরকারের নিকট পেশ করে সেপ্টেম্বর ২০০৬-এ, তখন চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা ছাড়ার পালা এসে যায়। চঝগচ-২০০৫-এ ২০২৫ সাল পর্যন্ত্ম বিদু্যৎ চাহিদা বিশেস্নষণ করে দেখানো হয় যে, স্বাভাবিক ভাবে ২০১০-২০১৫, ২০২০, ২০২৫ সালে বিদু্যতের চাহিদা যথাক্রমে ১০,০০০, ১২,০০০, ১৮,০০০ ও ২০,০০০ মে. ও. হবে। ২০১০ এবং ২০১৬-এ প্রণীত চঝগচ-তে ২০২১, ২০৩০ এবং ২০৪১-এ বিদু্যৎ চাহিদা যথাক্রমে ২৪,০০০, ৪০,০০০ এবং ৬০,০০০ মে. ও. দেখানো হয়েছে। সে অনুযায়ী বিদু্যৎ] উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে সরকার। চঝগচ-২০০৫ শুধু দেশের ক্রমবর্ধমান বিদু্যৎ চাহিদার প্রতিই দৃষ্টি দেয়া হয়নি। এ চঝগচ-২০০৫-এ সাশ্রয়ী মূল্যে গ্রাহকের কাছে গুণগত মানসম্পন্ন বিদু্যৎ পৌঁছে দেয়া যায়, সে জন্য খবধংঃ ঈড়ংঃ এবহবৎধঃরড়হ চষধহ (খঈএচ) প্রস্তুত করা হয়। খঈএচ-তে বিদু্যৎ উৎপাদনে জ্বালানি মিশ্রণের প্রতি গুরম্নত্ব দেয়া হয়। এ ছাড়াও দিনের বিভিন্ন সময়ের বিদু্যৎ চাহিদা পূরণে প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন পরিকল্পনার প্রতিও গুরম্নত্বারোপ করা হয়। আমাদের দেশে সারাদিনে বিদু্যৎ ব্যবহারের চিত্র বিদু্যৎ ব্যবস্থা পরিকল্পনাকারীদের নিকট অত্যন্ত্ম সমস্যা বহুল। আমাদের দেশে দিনব্যাপী বিদু্যৎ ব্যবহার ও চাহিদার চিত্র হতে লক্ষণীয় যে, ভোরের দিকে বিদু্যৎ ব্যবহার সর্বনিম্ন, দিনের মধ্যভাগে চাহিদা মোটামুটি কিন্তু সান্ধ্যকালীন সময়ে বিদু্যতের চাহিদা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ যা দিবাভাগের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। চাহিদার এ ধরনের চিত্রের মূল কারণ হলো, আমাদের দেশে বিদু্যৎ চাহিদার শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ গৃহস্থালি, শতকরা ৩২ ভাগ শিল্প-কারখানা এবং প্রায় শতকরা ১০ ভাগ বাণিজ্যিক শতকরা ৮ ভাগ অন্যান্য ব্যবহারের থেকে উৎসারিত। শিল্প-কলকারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার শতকরা ৭০ ভাগ না হলে একটি ভারসাম্যমূলক বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
৫। যে কোনো বিদু্যৎ ব্যবস্থা পরিকল্পনাকারীদের প্রথমে নির্ধারণ করতে ভিত্তি চাহিদা (ইধংব খড়ধফ), মধ্যম চাহিদা (ওহঃবৎসবফরধঃব খড়ধফ) এবং সর্বোচ্চ চাহিদা (চবধশ খড়ধফ)। সাধারণত যে কোনো বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বৃহৎ বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহ নির্মাণ করা হয় ভিত্তি চাহিদা বা ইধংব খড়ধফ-এর ওপর ভিত্তি করে। ভিত্তি চাহিদা পূরণের নিমিত্তে নির্মিত বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহ সাধারণত দিনের অধিকাংশ সময়জুড়ে বিদু্যৎ উৎপাদন করে থাকে। এসব বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্বাচনের সময় জোর দেয়া সাশ্রয়ী জ্বালানি, জ্বালানি মূল্য ও জ্বালানি দক্ষতার ওপর। মধ্যম চাহিদা পূরণের জন্য নির্মাণ করা হয় মাঝারি আকারের দক্ষ ও সাশ্রয়ী বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র। ভিত্তি চাহিদা বা ইধংব খড়ধফ-এর জন্য ৫০০ মে. ও. অধিক জ্বালানি দক্ষতা ও ক্ষমতাসম্পন্ন ও কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস পাওয়ার পস্ন্যান্ট অথবা সুপার ক্রিটিক্যাল/আলট্রা সুপারসিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। মধ্যম চাহিদা মিটানোর জন্যও ৩০০-৫০০ মে. ও. মধ্য দক্ষতা ও ক্ষমতাসম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস পাওয়ার পস্ন্যান্ট অথবা কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। স্বল্প সময়ের উচ্চ বিদু্যৎ চাহিদা মিটানোর জন্য ১০০-১৫০ মে. ও.-এর সিম্পল সাইকেল গ্যাসভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র অথবা তরল জ্বালানিভিত্তিক অপেক্ষাকৃত ছোট বা মাঝারি ক্ষমতায় বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
৬। ২০০৮-০৯ সাল পর্যন্ত্ম দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশেই বিদু্যতের মূল্য ছিল সবচে কম। তখন শতকরা প্রায় নব্বই ভাগ বিদু্যৎ উৎপাদন দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল যদিও জ্বালানি দক্ষতা ছিল অপেক্ষাকৃতভাবে কম, গড়ে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। শতকরা ৫-৬ ভাগ বিদু্যৎ উৎপাদন হতো তরল জ্বালানি অর্থাৎ ফারনেস ওয়েল, ডিজেল ও হাইস্পিড ডিজেল ভিত্তিক। অবশিষ্ট শতকরা ২-৩ ভাগ ছিল পানি-বিদু্যৎ এবং কয়লাভিত্তিক। বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০১৬-১৭ সালের বার্ষিক রিপোর্ট হতে লক্ষ্য করা যায় যে, জ্বালানি দক্ষতা অর্জনে আমরা তেমন কোনো সফলতা দেখাতে পারিনি। ওই বছরে বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহের বারিত গড় দক্ষতা ছিল শতকরা ৩৩ ভাগ। এ সময়ে বিদু্যতের বারিত উৎপাদন ব্যয় ছিল ৩.০৮। এ সময়ে বিদু্যতের পাইকারী সরবরাহ মূল্য ছিল .৪২ অর্থাৎ প্রতি কি.ও. ঘণ্টা বিদু্যৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য ছিল .৫৬ (ছাপ্পান্ন পয়সা)। বর্তমান সরকার যখন তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন এবং রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদু্যৎ ক্রয় শুরম্ন করে তখন বিদু্যতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় তিন থেকে চারগুণ বেড়ে যায়। বিদু্যতের উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহের মধ্যে বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি হয়, যা বার বার বিদু্যতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য বৃদ্ধি করেও কমানো যায়নি। ২০১৬-১৭ সালের বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ডের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী বিদু্যতের বারিত গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে .৪৪১৭ এবং বর্তমান পাইকারী সরবরাহ ব্যয় .৭০ অর্থাৎ দু'য়ের মধ্যে ফারাক হ'ল .৭৭১৭। ২০০৮-০৯ হতে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত্ম প্রতি কি. ও. ঘ. বিদু্যতের উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যয় এবং লোকসানের চিত্র সারণি ৫.১-এ দেখানো হলো।

সারণি ৫.১ থেকে লক্ষণীয় যে, ২০০৯-১০ সাল পর্যন্ত্ম প্রতি ইউনিট বিদু্যৎ সরবরাহে যে লোকসান হতো তা অতি সামান্য। কিন্তু ২০১০-১১ সাল হতে লোকসানের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এ লোকসানের পরিমাণ প্রতি বছর অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে। বিগত কয়েক বছর যাবত বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম থাকায় তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন বাড়া সত্ত্বেও লোকসানের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম ছিল। অতি সাম্প্রতিককালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদনে খরচ অবিসম্ভাবীভাবে বেড়ে যাবে। দেশীয় গ্যাসভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয় কম থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি করে তা সরবরাহ করার ফলে গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। এলএনজি-এর মূল্য দেশীয় গ্যাসের প্রায় চারগুণ। একইসাথে এলএনজি ক্রয়মূল্য যেহেতু, জ্বালানি তেলের মূল্যের সাথে সম্পর্কিত, তাই জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়লে এলএনজি-এর দামও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে।
২০০৮-০৯ হতে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত্ম মোট বিদু্যৎ উৎপাদন, বিভিন্ন জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদন ও আমদানির চিত্র সারণি ৫.২-এ দেয়া হলো।

বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন হতে লক্ষ্য করা যায় যে, ২০০৮-০৯ অর্থ বছর হতে ১০১৬-১৭ বছর পর্যন্ত্ম সর্বমোট বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ডের সর্বমোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় চলিস্নশ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়াও বিদু্যৎ উন্নয়ন বোর্ডকে আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দরে তেল সরবরাহের জন্য আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে বিপিসিকে। সরকার ভর্তুকী প্রদানের মাধ্যমে এ সকল ব্যয় নির্বাহ করছে। নিম্নে সারণি ৫.৩-এ বছর ওয়ারী লোকসানের চিত্রটি দেয়া হলোঃ
প্রসঙ্গত: উলেস্নখ্য যে, আইপিপি, রেন্টাল ও সরকারি খাতের বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র হতে প্রতি কি. ও. ঘণ্টা বিদু্যৎ যথাক্রমে .৩৬, ৭.৩৬ এবং .৯৬ ক্রয় করা হয়েছে। ভারত হতে আমদানিকৃত প্রতি ইউনিট বিদু্যৎ ক্রয়ের জন্য .৫২ পরিশোধ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় সরকারি মালিকানাধীন বিদু্যৎকেন্দ্র হতে বিদু্যতের ক্রয়মূল্য সবচে কম।
৭। বিদু্যৎ খাতে অব্যাহতভাবে লোকসানের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতকে টেকসই করা দুরূহ। এ ছাড়াও এখাতে বিদেশি বিনিয়োগ প্রকৃত অর্থে আকৃষ্ট করা অত্যন্ত্ম কঠিন হবে। এখানে উলেস্নখযোগ্য যে, সরকার ভবিষ্যৎ বিদু্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরম্নত্ব দিয়েছে আমদানিকৃত কয়লা এবং এলএনজিভিত্তিক বৃহদাকারের বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের প্রতি। এতে বিদু্যতের উৎপাদন ব্যয় যে আরও বাড়বে, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনিতেই ২০০৮-০৯ হতে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত্ম বিদু্যতের পাইকারি সরবরাহ ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা কি. ও. ঘ. প্রতি বিদু্যতের মূল্য বেড়েছে প্রায় চার গুণের বেশি। সে সাথে পালস্না দিয়ে লোকসানের পরিমাণও বেড়েছে। আমদানিকৃত কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন শুরম্ন হলে বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সম্ভবত. বিদু্যৎ উৎপাদনের ব্যয় দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশেই হবে সবচে বেশি। বিদু্যৎ খাতে যে সকল উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, তা সবই অত্যন্ত্ম ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে যাবার সম্ভাবনার পথ তৈরি করবে।
হ৮। দেশীয় কয়লা ভা-ার অব্যবহৃত রেখে সরকারি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী, পায়রাসহ কয়েকটি স্থানে আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক ২০ হাজার মে. ও. বিদু্যৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। ইতিমধ্যে ব্যক্তিখাত এবং সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি কোম্পানিকে আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। সরকার এ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে পাওয়ার সেক্টর মাস্টার পস্ন্যান চঝগচ ২০১০ এবং ২০১৬-এর ভিত্তিতে। চঝগচ ২০১০ এবং ২০১৬-তে বিদু্যৎ উৎপাদনে বিভিন্ন জ্বালানি সংমিশ্রণে স্বল্প ব্যয়ে বিদু্যৎ উৎপাদনের (খবধংঃ ঈড়ংঃ এবহবৎধঃরড়হ চষধহ) কোনো বিশেস্নষণ আদৌ করা হয়েছে কিনা, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক বিপুল পরিমাণ বিদু্যৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি, খালাস ও পরিবহনের কোন ব্যবস্থাই এখনো গড়ে ওঠেনি।
৯। আমরা যদি বিগত কয়েক বছরে বিদু্যৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্ত্মবায়ন অগ্রগতি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো যে, ২০০৯ থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত্ম ১৮,১৫১ মে. ও. ক্ষমতায় ৯৫টি নতুন বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্ত্মবত এ সময়ে ৮৩৭৮ মে. ও. উৎপাদন ক্ষমতার ৮৪টি বিদু্যৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে শতকরা ৪৬ ভাগ। যে পরিমাণ বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা স্থাপিত হয়েছে, সেখানে ফারনেস ওয়েল ও ডিজেলভিত্তিক উৎপাদন ক্ষমতার পরিমাণই বেশি। আরও একটি বিষয়ে এ ব্যাপারে লক্ষ্যণীয় যে, স্থাপিত বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৪৩৪০ মে. ও. বেসরকারি খাতে এবং ২,০৭৩ মে. ও. সরকারি খাতে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা লক্ষণীয়। একইভাবে ২০১৬-১৭ সালে মোট উৎপাদিত বিদু্যতের ৫২.৬২০ গিগাওয়াট এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে যথাক্রমে ২৬,৫৯৭ এবং ২৬,০২৩ গিগাওয়াট উৎপাদিত হয়েছে অর্থাৎ উভয় খাতের হিস্যা প্রায় সমান সমান। এ ছাড়াও ৪৬৫৬ গিগাওয়াট বিদু্যৎ ভারত হতে আমদানি করা হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ সৌর ও বায়ু বিদু্যৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে, তা কার্যকর হয়নি। সম্ভবত. লোক দেখানোর জন্য বেশ কয়েকটি সৌরবিদু্যৎ প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে, বাস্ত্মবে সে লক্ষ্য কতদূর অর্জিত হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ওউঈঙখ-এর আর্থিক সহায়তায় সারাদেশে গ্রিডবিহীন এলাকায় প্রায় ২০০ মে. ও. সৌরবিদু্যৎ প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে আরইবি সারাদেশে বিদু্যতের লাইন সম্প্রসারণের নামে ওউঈঙখ-এর সৌর প্যানেল স্থাপিত এলাকায়ও প্রবেশ করছে। এতে ওউঈঙখ-এর সৌরবিদু্যৎ সম্প্রসারণের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত্ম হবে।
১০। বর্তমান সরকার নয় বছরের অধিককাল ক্ষমতাসীন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পরই তারা বিদু্যৎ খাতের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হয়। প্রাথমিকভাবে বিদু্যৎ চাহিদা মিটানোর জন্য উচ্চমূল্যে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদু্যৎ ক্রয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিনা টেন্ডারে বিদু্যৎ ক্রয়ের বিষয়টিকে আইনগতভাবে সুরক্ষা দেয়ার জন্য ুঊসবৎমবহপু ঊহবৎমু ঝঁঢ়ঢ়ষু অপঃ ২০১০চ্- আইনটি পাস করে। প্রথমে এটি ৩ বছর মেয়াদের জন্য করা হয়। এই আইনের মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত্ম বাড়ানো হয়। এখন শোনা যাচ্ছে যে, আইনটি ২০২১ সাল পর্যন্ত্ম বলবৎ থাকবে। বিদু্যৎ খাতে সংগঠিত সকল অনিয়ম ও বেআইনি কাজকে বৈধতা দেয়ার জন্য এ আইনটি যে করা হয়েছে তা সকলের বোধগম্য। সরকার আভ্যন্ত্মরীণ জ্বালানি সম্পদ বিশেষ করে ভূমি এলাকা ও সমুদ্রবক্ষে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কিংবা আভ্যন্ত্মরীণভাবে মজুদ দেশীয় কয়লা আহরণের কোন জরম্নরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আমদানিকৃত কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে যেভাবে সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে দেশীয় গ্যাস ও কয়লা ব্যবহারের সুযোগ দারম্নণভাবে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতা কম ব্যবহার করে ব্যক্তিখাতের বিদু্যৎ উৎপাদন ক্ষমতার বেশি ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষণীয়। যখন আমদানিকৃত কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন চালু হবে, তখনও একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, যা দেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে।
১১। মাতারবাড়ী ও তার পার্শ্ববর্তী অধিকাংশ এলাকা পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত্ম সংবেদনশীল। মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব শুধু মহেশখালী দ্বীপ ও তার চারপাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটা চকোরিয়া সুন্দরবন, চকোরিয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলেও বিস্ত্মৃত হবে। সমুদ্রের পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষেত্রেও তা মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। একইভাবে পায়রা ও তৎসংলগ্ন এলাকাও পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত্ম ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফসিল ফুয়েল বা খনিজ জ্বালানি বিশেষ করে তেল ও কয়লাকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী কয়লা ও তেলভিত্তিক নতুন বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে পুরনো কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। সেখানে কোন বিবেচনায় আমরা আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণের বৃহদাকারের পরিকল্পনা করছি? একই সাথে আমরা কোন বিবেচনায় ডিজেল ও ফারনেস ওয়েলভিত্তিক বিদু্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে উৎসাহী হয়েছি? বিদু্যৎ খাতের উন্নয়নে যা করা হচ্ছে তা অপরিণামদর্শী।
১২। বিদু্যৎ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কযেকটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। প্রথমত বিদু্যৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত বিদু্যৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উৎস ও প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ বিষয়ে উলেস্নখ্য যে, সৌর বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যয় বর্তমানে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সৌর বিদু্যৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত সোলার সেলের দক্ষতা যদি শতকরা ৩০ ভাগের ওপর বৃদ্ধি পায়, তাহলে গৃহস্থালির ব্যবহারের জন্য গ্রিডভিত্তিক বিদু্যৎ ব্যবহার ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। এক সময় মানুষ টেলিযোগাযোগের জন্য ভূমিভিত্তিক টেলিফোনের ওপর নির্ভরশীল ছিল, মোবাইল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের ফলে এখন মোবাইল ফোনই টেলিযোগাযোগের অন্যতম প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে। বিদু্যৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সোলার এবং ফুয়েল সেল প্রযুক্তি নব-বিকাশ ও উদ্ভাবন সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত্মের উন্মোচন করবে। চতুর্থত বিদু্যৎ উৎপাদনে জ্বালানি উৎস বিবেচনায় পরিবেশগত বিষয়সমূহও বিবেচনায় নিতে হবে। পঞ্চমত দক্ষ বৈদু্যতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে বিদু্যতের উৎপাদন চাহিদাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেমন এক সময়ে ফিলামেন্ট বাল্ব ব্যবহার হতো- তার স্থান দখল করে নেয় প্রথমে বিদু্যৎ সাশ্রয়ী ফ্লোরেসেন্ট বাল্ব। এরপরে আসে আরও বিদু্যৎ সাশ্রয়ী সিএফএল বাল্ব। সর্বশেষে এসেছে এলইডি লাইট, যা ফিলামেন্ট বাল্ব হতে চারগুণ বিদু্যৎ সাশ্রয়ী ও দক্ষ। একইভাবে কলকারখানায় দক্ষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার ব্যাপকভাবে বিদু্যতের সাশ্রয় করবে। বিদু্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া গুরম্নত্বপূর্ণ। আমাদের ভবিষ্যৎ বিদু্যৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ প্রকল্প পরিকল্পনায় আদৌ এ সকল বিষয় বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। ভবিষ্যতের বিদু্যৎ উৎপাদন হতে হবে পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও দক্ষ। একই সঙ্গে গৃহস্থালি, কল-কারখানা, বাণিজ্যিক বিদু্যৎ ব্যবহারও হতে হবে দক্ষ ও সাশ্রয়ী। সে অবস্থায় আমরা ভবিষ্যৎ যে বিদু্যৎ চাহিদা নিরম্নপণ করছি, তা কতটা বাস্ত্মবসম্মত, তা ভেবে দেখা দরকার।

প্রকৌ. আ ন হ আখতার হোসেন পিইঞ্জ
সাবেক প্রেসিডেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ সাবেক সচিব, বিদু্যৎ বিভাগ, বিদু্যৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close