ভবিষ্যতের গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশমুহাম্মদ ওয়াশিকুর রহমান ইন্টারনেটের শুরম্নর ইতিহাসটা ষাটের দশকের। তবে প্রকৃত ইন্টারনেট প্রযুক্তির উৎসকর্ষ হয়েছে আশির দশকে। বতমানে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, অনেকের কাছেই ইন্টারনেট ছাড়া জীবন যেন অর্থহীন। তাই তো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো ইন্টারনেটও এখন মানুষের মৌলিক চাহিদা হয়ে উঠেছে বলে মন্ত্মব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দুনিয়াজুড়ে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগসহ ব্যবসায়িক ও বাজার অর্থনীতির বিচিত্র কার্যক্রম অনলাইন বা ইন্টারনেট মাধ্যমে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিকভাবে সবার কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার কারণে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন নিউজপোর্টাল বা অনলাইন গণমাধ্যমগুলো। ছাপামাধ্যম থেকে সরে না এলেও অন্য সব ধরনের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকাগুলোও পালস্না দিয়ে নিজস্ব ওয়েবসাইট খুলে অনলাইন সংস্করণে যুক্ত হয়েছে বা হচ্ছে।
কেননা একটা সময় ছিল, যখন আগের দিনের ঘটনার বিস্ত্মারিত বিবরণ পাওয়া যেত পর দিনের সংবাদপত্রে। এখন তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে দেশ-বিদেশের সংবাদ ঘটনা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে যাচ্ছে মানুষ। আগের মতো অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না। এই যে তাৎক্ষণিক ও টাটকা সংবাদ সরবরাহ- এতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে দেশের অনলাইন সংবাদ পোর্টালগুলো। শব্দের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভিডিও ফুটেজ থাকার কারণে অনলাইন সংবাদপত্রগুলো একইসঙ্গে সম্প্রচার ও প্রিন্টমাধ্যমের কাজ করতে পারে। তাই এ সংবাদমাধ্যমটিকে মাল্টিমিডিয়া বলা হচ্ছে। শুধু ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই মোবাইল বা কম্পিউটারে ঘরে-বাইরে যে কোনো জায়গায় বসে জানা যায় দেশ-বিদেশের সার্বিক পরিস্থিতি।
অনলাইন গণমাধ্যমের আরও একটি বড় বৈশিষ্ট্য- এটি রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের পরিবেশিত সংবাদের চরিত্র একসঙ্গেই প্রস্ফূটিত করতে পারে। এখানে শ্রবণ, দর্শন ও মুদ্রণ একসঙ্গে বাঙ্মময় হয়ে উঠতে পারে। রেডিও বা টেলিভিশনে একবার শোনার পর দ্বিতীয়বার শোনার সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে বারবার শোনা যায়, দেখা যায়, পড়া যায়। ছোট লেখা বড় করা যায়, বড় লেখা ছোট করা যায়। ইতোমধ্যেই এই শক্তিশালী মাধ্যমটিকে সঙ্গী করে নিয়েছে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন। সব মাধ্যমের এখন 'অনলাইন ভার্সন' আছে। তবে অনলাইনের আলাদা রেডিও, টেলিভিশন বা সংবাদপত্র নেই। সম্ভবত প্রয়োজন নেই। অনলাইন নিজেই তিনটির বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হতে পারে।
আর তাই অনলাইন সংবাদ সুবিধার কারণে ভবিষ্যতে বিশ্বে ছাপা সংবাদপত্রের অস্ত্মিত্ব থাকবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আসলে সংবাদপত্রের অস্ত্মিত্বের সঙ্গে সঙ্গে রেডিও-টেলিভিশনের অবস্থাও সংকটাপন্ন করে তুলছে। জরিপে দেখা গেছে, অনলাইনের কারণে টেলিভিশনের দশকও কমেছে। বিশেষ করে ভিডিও শেয়ারিং সাইট (ইউটিউব, ফেসবুক ভিডিও, ডেইলিমোশণ) আর মাল্টিমিডিয়া গণমাধ্যমের কারণে তরম্নণপ্রজন্ম টেলিভিশনের বদলে এসব সাইটেই ভিজিট করে প্রয়োজন শেষ করছে। ফলে টেলিভিশনগুলোর দর্শক ধরতে এসব মাধ্যমে সংযুক্ত করছে নিজেদের। যদিও সংবাদপত্রের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ পশ্চিমা দুনিয়ার বেশ কয়েকটি দৈনিক তাদের কাগজে ছাপা মাধ্যম থেকে সরে পুরাপুরি যুক্ত হয়েছে অনলাইন মাধ্যমে। তবে পত্রিকা দুটির সরে আসার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক ব্যয়ের বিষয়টি বড় কারণ ছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে টেলিভিশনের এই অবস্থা দেখতে ঢের সময় বাকি আছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রেডিও, টেলিভিশন সংবাদপত্রকে বিদায় দিতে পারেনি। অনলাইনের হুমকি মোকাবিলা করে সংবাদপত্র কি তার রাজত্ব রক্ষা করতে পারবে? এ নিয়ে দুনিয়া জোড়া বিতর্ক। আমাদের দেশেও এ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। প্রবীণরা বলছেন, সংবাদপত্রের মৃতু্য নেই। নতুনরা বলছে, সংবাদপত্রের পত্রচু্যত হলে ক্ষতি কী? অনলাইনে সংবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে তো কোনো বাধা নেই। কণ্ঠ মিলিয়েছে পরিবেশবাদীরা। সংবাদপত্রের জন্য বৃক্ষ নিধনে তারা ঘোর বিরোধী। এ ক্ষেত্রে প্রবীণ ও নতুনের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য আছে। প্রবীণদের ডিজিটাল দেয়ালে সংবাদ পড়ায় অনীহা। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিবান্ধব। তারা এ যন্ত্র দিয়ে পুস্ত্মক থেকে সংবাদপত্রের সবই পড়ছে, বড় বড় লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ছে, পছন্দমতো বই খুঁজে নিচ্ছে। বই খরিদও করছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংবাদপত্র হাতে নেওয়ার কোনো গরজ নেই। কোনো পরিবারের মা-বাবা যখন তাদের সন্ত্মানকে খবরের কাগজের টাটকা কাহিনী শোনাতে যান, তখন সন্ত্মান বলে, ওটি সে রাতে অনলাইনে পড়েছে। প্রযুক্তিবান্ধব নতুন প্রজন্ম লাইব্রেরির চেয়ে ডিজিটাল লাইব্রেরিতে বই পাঠ, সংবাদপত্রের চেয়ে অনলাইনে সংবাদ পাঠেই আগ্রহী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদীয়মান নতুন প্রজন্ম যেহেতু অনলাইনের প্রধান পাঠক, সে কারণে তাদের পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে ধারা গড়ে উঠবে তা খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
০০ পৃষ্ঠার পর

এতে করে দৈনিক পত্রিকার জন্য অনলাইন সংবাদ যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
অনলাইনের প্রবল আধিপত্যের মুখে পশ্চিমা দুনিয়ায় সংবাদপত্র সংকটের মুখে পড়েছে। একদা মার্কিন পত্রিকা নিউজ উইক ৮০ বছর দাপটের সঙ্গে চলেছে, এখন তার মুদ্রণমাধ্যম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। নিউজ উইক বলতে এখন কেবল অনলাইন ভার্সনই বোঝাবে। পশ্চিমা দুনিয়ায় সংবাদপত্র সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে দিন দিন। এখন সেখানে নতুন প্রজন্ম অনলাইনে সংবাদ পড়ে। সেটিই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাংলাদেশের তরম্নণ প্রজন্মও অনলাইনেই এখন সংবাদ দেখছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদপত্র ঝুঁকিতে পড়েনি, তার কারণ সুস্পষ্ট। এখানে কম্পিউটার এখনো সাধারণের কাছে পৌঁছায়নি। যাদের ঘরে কম্পিউটার আছে তারাও কম্পিউটারবান্ধব হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে গ্রামবাংলায় যোগাযোগ কাঠামোর প্রসার ঘটায় সেখানে সংবাদপত্র প্রবেশ করছে। যে কারণে সংবাদপত্রের বাজার অক্ষুণ্ন আছে। কিন্তু মোবাইল ফোন ও এর উন্নত নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্ত্মারের ফলে ইন্টারনেটের ব্যবহারকে আরও বেশি গতিশীল ও সম্প্রসারিত করেছে। এতে করে অনলাইনে গড়ে উঠেছে মানুষের কাছে দ্রম্নত ও তাৎক্ষণিক সংবাদ পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম। ফলে পশ্চিমা বিশ্বে সংবাদপত্র গুটিয়ে গেলে এখানে ব্যতিক্রম হবে। বড়জোর আয়ু দীর্ঘ হতে পারে। তাই খুব ভালোভাবেই বলা যায় ভবিষ্যতের গণমাধ্যম হবে মাল্টিমিডিয়ানির্ভর অনলাইন পোর্টাল বা অনলাইন গণমাধ্যম। এই মাধ্যমকে অনেকে নিউ মিডিয়া হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
২০০৪ সালে বিডিনিউজ ২৪.কম-এর মাধ্যমে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের যাত্রা শুরম্ন হলেও বর্তমানে এর সংখ্যা ঠিক কত, তার সঠিক সংখ্যা বোধহয় সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষেরও জানা নেই। কারণ প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অনলাইন পোর্টাল তালিকায় যোগ হচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর বেশিরভাগেরই এখন অনলাইন ভার্সন রয়েছে।

প্রথম দিকে অনলাইন জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও এমন একটি সংবাদমাধ্যম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ একটি দুরূহ কাজ। তখন দেশের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো অন লাইনে বিজ্ঞাপন দিতে নারাজ ছিল। কিন্তু এখন সেদিন পাল্টেছে। বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন বা ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ব্যয় বাড়াচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইন ছাড়া বিজ্ঞাপনই দিচ্ছে না। নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অনলাইন সংবাদপত্রই হবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে পঠিত।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) তথ্য অনুসারে দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট গ্রাহক আট কোটি ৩১ লাখ ৪১ হাজারে দাঁড়িয়েছে। জিএসএমএর হিসাবে বাংলাদেশে প্রকৃত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন সাড়ে ৩ কোটি। এ হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি ৫ জনে একজন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এদিকে বর্তমান সরকার দেশের ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো ইন্টারনেটও এখন মানুষের মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করতে চায়। সম্প্রতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্ত্মাফা জব্বার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, দেশের সব ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে দ্রম্নত গতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে না পারলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে এই সীমাবদ্ধতা দূর করা যাবে। তাহলে বিষয়টি আরও তরান্বিত হবে বলেই আশা করছি।
তবে অনলাইন পত্রিকা প্রতি মুহূর্তে দেশ-বিদেশের খবর দিচ্ছে ঠিকই; কিন্তু এর ভূমিকা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন ও বিতর্ক। কারণ কিছু কিছু নিউজ পোর্টালের প্রকাশিত সংবাদ ভুল তথ্য বা চটকদার তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে বিভ্রান্ত্মি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। সেদিকে নজর দিতে হবে আমাদের। সংবাদ পরিবেশনে বস্ত্মুনিষ্ঠতা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরম্নত্ব দিতে হবে।


মুহাম্মদ ওয়াশিকুর রহমান
সংবাদকর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close