কম্পিউটারাইজেশনের মাধ্যমে চতুর্থ শিল্পবিপস্নব শুরম্ন২০১৭ সালে দেশে মোট ১০ লাখ ২৫ হাজার কম্পিউটার আমদানি হয়। এর মধ্যে ৫ লাখ ৪০ হাজার ল্যাপটপ, ২ লাখ ২৫ হাজার ব্র্যান্ড পিসি এবং ২ লাখ ৬০ হাজার ক্লোন পিসি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সরকার ক্রয় করে মাত্র প্রায় ১ লাখ ইউনিট। পুরাতন ব্যবহারকারীদের মধ্য থেকে নতুন ইউনিট ক্রয় করা হয় প্রায় ৩ লাখ। কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ফলে স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ইউনিট।মোহাম্মদ আব্দুল হক অনু মানবসভ্যতার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত্ম তিনটি শিল্পবিপস্নব পাল্টে দিয়েছে সারা বিশ্বের গতিপথ। প্রথম শিল্পবিপস্নবটি হয়েছিল ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদু্যৎ ও ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের আবিষ্কার শিল্পবিপস্নবের গতিকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। তবে আগের তিনটি বিপস্নবকে ছাড়িয়ে যেতে পারে ডিজিটাল বিপস্নব। এ নিয়েই এখন সারা দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে। এই তোলপাড়ের অন্যতম অনুষঙ্গ কম্পিউটার। কম্পিউটার প্রযুক্তিতে রূপান্ত্মরের মাধ্যমে শিল্প খাতে উৎপাদন যেমন বাড়ছে, তেমনি ঋদ্ধ হচ্ছে কর্মীর দক্ষতা ও নিপুণতাও। এই কম্পিউটারাইজেশনের মাধ্যমে অর্থনীতির বাঁক বদলকেই এখন বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপস্নব।
আশার কথা, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার সেই বিপস্নবকে ধারণ করেই এগিয়ে চলছে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্ত্মবায়নে। বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজড হচ্ছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যতটা শিল্প ও প্রযুক্তিতে উন্নয়ন ঘটেছে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ততটা উন্নত হয়ে ওঠেনি। এ ছাড়া প্রযুক্তির নানা উদ্ভাবনের ফলে শিল্প ক্ষেত্র খুব দ্রম্নত অটোমেশন ঘটছে। তবে এই অটোমেশনের কারণে আমাদের বাংলাদেশে অনেক বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই আশঙ্কার মূল কারণ আমরা অনেক ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে কেবল প্রশিক্ষণ দেয়ার আবর্তেই ঘুরছি। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেয়ার পর তা কাজে লাগানো এবং পেশাদারিত্বের মানোন্নয়নে ততটা মনোযোগী হতে পারিনি। পাঠ্যক্রমে কম্পিউটার বিষয় অন্ত্মর্ভুক্ত করা হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব ও ইন্টারনেট যেমন সহজলভ্য নয়, তেমনি দেশে ব্যক্তিগতভাবে পিসি ব্যবহারকারীর সংখ্যাও আশানুরূপ নয়। স্মার্টফোন ব্যবহারের হার সন্ত্মোষজনক হলেও উৎপাদন বা শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে নতুন করে।
কেননা কম্পিউটার জগৎ গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬% শতাংশ পিসি ব্যবহার করছেন। ২০১৭ সালে দেশে মোট কম্পিউটার ব্যবহারকারী ছিল ৯৪ লাখ ২ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে ল্যাপটপ ব্যবহারকারী ৪৯ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫২ জন, ব্র্যান্ড পিসি ব্যবহারকারী ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮০ জন এবং ক্লোন পিসি ব্যবহারকারী ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ০৪৪ জন।
২০১৭ সালে দেশে মোট ১০ লাখ ২৫ হাজার কম্পিউটার আমদানি হয়। এর মধ্যে ৫ লাখ ৪০ হাজার ল্যাপটপ, ২ লাখ ২৫ হাজার ব্র্যান্ড পিসি এবং ২ লাখ ৬০ হাজার ক্লোন পিসি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সরকার ক্রয় করে মাত্র প্রায় ১ লাখ ইউনিট। পুরাতন ব্যবহারকারীদের মধ্য থেকে নতুন ইউনিট ক্রয় করা হয় প্রায় ৩ লাখ। কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ফলে স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ইউনিট। আর অফিস এবং সাধারণ নতুন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার ইউনিট।
এদিকে দেশে ২০১৭ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৩ জন। এই সংখ্যাটা ২০১৬ সালের চেয়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৯০ জন বেশি। আবার ২০১৭ সালে সব শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসিতে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮৬ জন। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৮ হাজার ৬২৮। অর্থাৎ শুধু এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মোট ২৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৯৯ জন। কিন্তু একই সময়ে দেশে আমদানিকৃত পিসির সংখ্যা থেকে দেখা যায় বাজারে বিক্রি হওয়া মোট পিসির সংখ্যা এসএসসি ও এইচএসসি শিক্ষার্থী সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ।
পক্ষান্ত্মরে ২০১৭ সাল শেষে দেশে কম্পিউটার ব্যবহারকারী ছিল ৯৪ লাখ ২ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে ল্যাপটপ ব্যবহারকারী ৪৯ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫২ জন, ব্র্যান্ড পিসি ব্যবহারকারী ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮০ জন এবং ক্লোন পিসি ব্যবহারকারী ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪ জন।
দেশে মোট জনসংখ্যার সাথে আনুপাতিক হারে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর এই সংখ্যা কিন্তু বড়ই বেমানান। অথচ এই শিক্ষার্থীদের এক-চতুর্থাংশের হাতেও যদি কম্পিউটার পৌঁছে দেয়া যেত তাহলে এই বাজার প্রবৃদ্ধি সহজেই ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত। দেশে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ডাবল ডিজিট ছুঁতে পারত। এরাই কম্পিউটার ব্যবহার করে ব্যবসায়, উদ্ভাবনায় মনোনিবেশ করে অর্থনীতি ও জীবন মানে উন্নয়ন ঘটাতে পারত।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, চতুর্থ শিল্পবিপস্নবের ফলে পৃথিবীব্যাপী শিল্প ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকবে। শিল্প-কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তি ও যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়বে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত্ম হবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ। কারণ আমাদের জনসংখ্যা অত্যাধিক। কিন্তু মেশিন ও রোবটের আধিক্য বাড়লে অনেক লোক বেকার হবে। আর এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে দক্ষ মানব শক্তি গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল উন্নয়নে ক্ষেত্রে নতুন নতুন ট্রেডে মনোনিবেশন করতে হবে। সর্বোপরি ইন্ডাস্ট্রিয়ালের চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাস তৈরি করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করাতে হবে। তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেয়ার চেয়ে কম্পিউটার পিসি/ল্যাপটপ তুলে দেয়া হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
এ ক্ষেত্রে আমরা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডবিস্নউইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব চতুর্থ শিল্পবিপস্নব নিয়ে লেখা প্রবন্ধের দিকে নজর দিতে পারি। তিনি বলেছেন, 'আমরা চাই বা না চাই, এত দিন পর্যন্ত্ম আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম, চিন্ত্মাচেতনা যেভাবে চলেছে সেটা বদলে যেতে শুরম্ন করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপস্নবের ভিত্তির ওপর শুরম্ন হওয়া ডিজিটাল এ বিপস্নবের ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে গাণিতিক হারে, যা আগে কখনো হয়নি। সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে, যার ফলে পাল্টে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা, এমনকি রাষ্ট্র চালানোর প্রক্রিয়া। তাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমরা যতটা যুতসইভাবে নিজেদের সংশেস্নষিত করতে পারব ততই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তা না হলে ডিজিটাল বৈষম্যে নিপতিত হতে হবে। সবার জন্য ইন্টারনেট বিপস্নব সফল করতে হলে সবার জন্য কম্পিউটার প্রত্যয়কে ধারণ করতে হবে মর্মে মর্মে; প্রতিটি কর্মে।
মোহাম্মদ আব্দুল হক অনু
নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক কম্পিউটার জগৎ
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
-এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close