পূর্ববর্তী সংবাদ
আরও বড় বন্যার আশঙ্কাবাড়ছে পানি, ভাসছে মানুষআগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের বৈশ্বিক বন্যা সতর্কতা পদ্ধতির বিশ্লেষণ করে এই সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছেযাযাদি ডেস্ক টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে দিনাজপুরের অর্ধশতাধিক গ্রাম। তাই বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা তাদের গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন। ছবিটি রোববার তোলা _ফোকাস বাংলাঅব্যাহত বর্ষণ আর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে বেড়েই চলেছে নদীর পানি। বিপদসীমার উপরে উঠে ভাসাতে শুরু করেছে তীরবর্তী এলাকার লাখ লাখ মানুষকে। মাত্র একমাসের ব্যবধানে ফের বন্যাকবলিত হওয়ায় কষ্টের যেন শেষ নেই উত্তরাঞ্চলের বানভাসি মানুষের। ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তা কিংবা বাঁধে অবস্থান করছে অসংখ্য পরিবার। আঞ্চলিক পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে আগামী কয়েকদিনে পানি আরও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, সিংঙ্গীমারী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রেললাইনের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ঢাকা-লালমনিরহাট রুটে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট।
রোববার সকালে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারেজের সব (৪৪টি) গেট খুলে দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তিস্তা ব্যারেজ রক্ষার বাইপাস সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
কুড়িগ্রাম : একইভাবে ধলাই ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ায় ঢাকার সঙ্গে কুড়িগ্রামের সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রোববার সকালে ধলাই নদীর পানি বিপদসীমার ১১২ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বেড়ে কুড়িগ্রামের ৫০টি ইউনিয়নের ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ৪১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের চরাঞ্চলের বেশ কিছু ঘরবাড়িতে দ্বিতীয় দফা পানি ঢুকেছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদরের যাত্রাপুর, আঠারঘড়িয়া, বারোঘড়িয়া, হেমেরকুঠি, জগমোহনের চর, চর জয়কুমারসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ধরলার ভাঙনে বাংটুর ঘাট, হেমেরকুঠি, সারোডোব এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে।
গাইবান্ধা : ব্রহ্মপুত্র নদের পানি রোববার সকাল ৬টায় গাইবান্ধার ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর
পানি শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে নদ-নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলের কারণে কয়েকদিন থেকে গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। আগামী কয়েকদিনেও নদ-নদীগুলোতে ব্যাপক পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
রোববার সকাল ৬টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার উপরে, ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার উপরে, করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্টে ৫০ সেন্টিমিটার নিচে ও তিস্তা নদীর পানি সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের ফুলছড়ি পয়েন্টের রেকর্ড কিপার (পানি পরিমাপক) মো. আজিজার রহমান বলেন, সকাল ছয়টায় ফুলছড়ি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়।
সিরাজগঞ্জ : অপরদিকে যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা নদীতে পানি বেড়েই চলেছে। এতে জেলার অভ্যন্তরীণ করতোয়া, গুমানী, হুরাসাগর, ফুলজোড় নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন করে আবারও বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ের ডাটা অ্যান্ট্রি অপারেটর আবুল কালাম আজাদ জানান, শনিবার সকাল থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় (সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা হার্ড পয়েন্ট এলাকায়) যমুনা নদীর পানি ৩৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, ভারতের আসামে বন্যা হওয়ার কারণে যমুনার পানি আরও ৪/৫ দিন বাড়বে। এতে দ্বিতীয় দফায় সিরাজগঞ্জে আবারও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে এবং যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁওয়ের টঙ্গন, সেনুয়া ও শুক নদীসহ আঞ্চলিক নদীগুলোতে রোববার সকাল থেকে পানি বিপদসীমার ৪০ মিলিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির এ অব্যাহত বৃদ্ধিতে জেলার প্রায় ১ হাজার গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
জামালপুর : জামালপুরে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বেড়ে আজ রোববার সকাল থেকে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলামপুর উপজেলার উলিয়া, পার্থশী, চিনাডুলী, কুলকান্দি, সাপধরী, চুকাইবাড়ি, নোয়ারপাড়া, দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ, চিকাজানী এবং মেলান্দহের মাহমুদপুর ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ১১টি বিদ্যালয়।
সুনামগঞ্জ : প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জে বন্যাপরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নদ-নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। নতুন করে জেলার দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ সদর, দিরাই, ধর্মপাশা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় বন্যাপরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন গ্রামের মানুষজন।
সড়ক প্লাবিত হওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়াও সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের সাথে নয় ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে আক্রান্ত উপজেলাগুলোতে তিন মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১০ হাজার টাকা জরুরি সহায়তা দেয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি আরও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বর্ষণ অব্যাহত আছে।
পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যার আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
নীলফামারী : ভারী বর্ষণে উজানের ঢলে তিস্তা নদী ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। রোববার সকাল ৯টায় নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ পূর্বাভাস কেন্দ্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিস্তায় ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
পানি বৃদ্ধির কারণে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের নির্দেশে ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার তিস্তা অববাহিকার গ্রাম ও চর এলাকায় মাইকিং ও ঢোল সহরত করে মানুজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহিম জানান, প্রশাসনের সবস্তরের সরকারি কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বন্যারদুর্গত মানুষের জন্য ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ১০টি মেডিকেল টিম ও একটি অতিরিক্ত হাসপাতালের মেডিকেল টিম কাজ করছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ডিমলা খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের ছোটখাতা ও বানপাড়া গ্রামের ঘর-বাড়ির টিনের চালের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে।
নেত্রকোণা : হাওর ও পাহাড় অধ্যুষিত নেত্রকোণায় তিন নদীর পানি আরও বেড়েছে। এতে চার নদীর পানিই বিপদসীমা ছাড়ানোয় জেলার বন্যাপরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রোববার সকাল নয়টায় পানি পরিমাপ করে দেখেছে পাহাড়ি এলাকায় সোমেশ্বরীর পানি কিছুটা কমলেও বেড়েছে কংস, উব্দাখালী ও ধনু নদীর পানি। তবে সোমেশ্বরী এখনও বিপদসীমার ওপরে বইছে।
বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তাহের জানান, জেলার হাওরাঞ্চলের নদী ধনুর পানি নতুন করে বেড়ে বিপদসীমা পেরিয়েছে।
দুর্গাপুর পয়েন্টে পাহাড়ি সোমেশ্বরী আজ সকালেও বিপদসীমার সাত সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। তবে আগের চেয়ে পানি কিছুটা কমায় নদীর আশপাশ প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নেমেছে।
দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ জানান, রোববার সকাল থেকে প্লাবিত ৭০ গ্রাম থেকে পানি নেমে যাচ্ছে। তিনি জানান, শনিবার দুপুর থেকে মধ্যরাত নাগাদ নেতাই নদীর বাঁধ ভেঙে ও সোমেশ্বরীর পানি উপচে নিম্নাঞ্চল এলাকার গ্রামগুলো প্লাবিত হয়। পানি নামতে থাকায় গ্রামগুলোর পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ কমে আসছে। তার পরও স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানান ইউএনও।
ময়মনসিংহ : ভারতীয় সীমান্তবর্তী ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় নিতাই নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার রাতে প্রবল পাহাড়ি স্রোতে দুটি বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামের ভেতর পানি ঢুকছে।
রোববার বিকাল পর্যন্ত চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। উপজেলার কালিকাবাড়ী গোদারাঘাট সংলগ্ন নিতাই নদীর উত্তরপাড় ভেঙে প্রবল স্রোতে দোকানপাট ও বাড়িঘর ভাঙনের মুখে পড়েছে।
দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক জানান, দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালিকাবাড়ী এজাহারের বাড়ির কাছে প্রায় ১০০ ফুট নদীর পাড় ভেঙে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করে কালিকাবাড়ী, নয়াপাড়া, জাঙ্গালিয়াপাড়া, দুধকুড়া, ভলল্বপুর, খাগগড়া ও সোহাগীপাড়া গ্রামসহ ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বহু মানুষ উঁচু রাস্তায় মালামাল, গবাদি পশুসহ আশ্রয় নিলেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে উঁচু রাস্তাগুলো। পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।
যশোর : টানা বৃষ্টিতে যশোরের তিন উপজেলায় বন্যাপরবর্তী জলাবদ্ধতার আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুরের দেড় লক্ষাধিক মানুষ।
বিশেষ করে হালসা, শ্যামকুড়, মশ্মিমনগর, নেহালপুর, ভোজগাতীসহ অন্তত ৯০টি গ্রাম বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
এদিকে জলাবদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শংকায় পানিবন্দি মানুষ বাড়িঘর ছাড়তে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে প্রায় সাত হাজার মানুষ সড়কের দুই ধারে ও স্কুল-কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে তিন উপজেলার প্রায় ৩০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কেশবপুরে ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়ায় ফসল ও মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। প্রাথমিকভাবে নিরূপণ করা এ ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৬০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
রাঙামাটি : ভারী বৃষ্টির কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসার কারণে হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে গত শনিবার ডুবে যায় রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু।
ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার বাঘাইছড়ি লংগদু উপজেলায় বন্যাকবলিত নিম্ন এলাকা এখনো পানির নিচে আছে। বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে বন্যাদুর্গতরা।
গত শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় রাঙামাটির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নিচু এলাকায় বন্যার সৃষ্টির হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে নষ্ট হয়ে গেছে আউশ ও আমন ফসল।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক শফি উদ্দিন আহমেদ জানান, হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধের ১৬ দরজায় পানি ছাড়া হচ্ছে।
শেরপুর : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি নদী ভোগাইয়ের অন্তত ১৩টি স্থানে ভাঙনের ফলে উপজেলার ৮ ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত গ্রামের ৩ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে আছে শত শত মানুষ। ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ।
শনিবার ভোরে উপজেলার ভোগাই নদীর ১৩টি স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে এবং চেল্লাখালীর তীর উপচে বিপদ সীমার উপর দিয়ে ঢলের পানি আশপাশের গ্রামে প্রবেশ করে। তবে রোববার পানি না বাড়লেও নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানায়।
পাহাড়ি নদী ভোগাইয়ের নয়াবিল ইউনিয়নের হাতিপাগারে একটি, রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের ম-লিয়াপাড়া ও ভজপাড়ায় ২টি, নালিতাবাড়ী ইউনিয়নের নিচপাড়া ও খালভাঙ্গায় ৩টি, বাঘবেড় ইউনিয়নের শিমুলতলা এলাকায় ৩টি এবং পৌরসভার নিচপাড়ায় একটি, খালভাঙ্গায় একটি ও উত্তর গড়কান্দা এলাকার ২টি মিলে মোট ১৩টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গনের আশংকা রয়েছে আরও বেশকিছু এলাকায়।
বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় বেশকিছু বিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বেশকিছু এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ।
বন্যাকবলিতরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বিগত কয়েক বছর যাবত ভোগাই নদীর বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ ভাঙ্গা অব্যাহত ছিল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর পরও এসব বাঁধ রক্ষায় সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসেনি।
জেলা প্রশাসক ড. মলি্লক আনোয়ার হোসেনসহ উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পাহাড়ি ঢলে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাহায্য প্রদান ও ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
দিনাজপুর : দিনাজপুরে বন্যাপরিস্থিতির অবনতির মধ্যে দুর্গত মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছে জেলা প্রশাসন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রোববার পুর্নভবা নদীর পানি বিপদসীমার কয়েক মিলিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহর রক্ষাকারী বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিজিবি শহর রক্ষা বাঁধ মেরামতে কাজ করছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়।
জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানান, সদর, বিরল, বোচাগঞ্জ, কাহারোল, বীরগঞ্জ ও খানসামা উপজেলায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানভাসি মানুষের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
খায়রুল আলম বলেন, পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে জরুরি হয়ে পড়েছে বন্যার্ত মানুষকে উদ্ধার কাজ। সে কারণে উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর সাহায্য চাওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার ৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহর রক্ষাবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শহরের বিভিন্ন অংশে পানি ঢুকে পড়ছে। তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধ মেরামতে বিজিবি কাজ শুরু করেছে।
দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ তোফাজ্জুর রহমান জানান, শনিবার সকাল ৯টা থেকে রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত দিনাজপুরে ২৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

বন্যার দুর্যোগে
সবার ছুটি বাতিল
এদিকে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে সরকার।
পাহাড়ি ঢল এবং অতি বৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় মানুষের দুর্ভোগের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় রোববার এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করেছে।
এতে বলা হয়েছে, পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান বন্যাপরিস্থিতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের আওতাধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকা জরুরি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) এবং মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরকারি ছুটিসহ সকল প্রকার ছুটি বাতিল করা হলো।
'দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত অফিস ত্যাগ না করার জন্য অনুরোধ করা হলো।'
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
monobhubon
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin