জলাবদ্ধতা-যানজটে স্থবির রাজধানীযাযাদি রিপোর্ট রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের সমস্যা যানজট। এর সঙ্গে যোগ হওয়া জলজট বাড়িয়েছে ভোগান্তি। ছবিটি বুধবার কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ থেকে তোলা _যাযাদিদুপুরে মাত্র দু'ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে বুধবার নগরীর আবাসিক এলাকা ও রাস্তাঘাটে কোথাও জমেছে হাঁটু পানি; কোথাও বা তা কোমর ছাড়িয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে বরাবরের মতো নগরজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দেয়। এর উপর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নানামুখী বিশৃঙ্খলায় গোটা ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। যার দুর্বিষহ দুর্ভোগ মধ্যরাত পর্যন্ত নগরবাসীকে পোহাতে হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে ঢাকার অধিকাংশ শ্রেণি-পেশার মানুষের দৈনন্দিন কর্মসূচি এলোমেলো হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। দুর্বিষহ এ পরিস্থিতিতে যানবাহন, অফিস-আদালত ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে নানা পেশার মানুষকে চাপা ক্ষোভে ফুঁসতে দেখা গেছে। জলাবদ্ধতা-যানজট নিরসন এবং ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্লজ্জ নীরবতায় অনেকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করে মনের ঝাল ঝেরেছেন।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রধান সড়ক ও অলিগলির পথ জলমগ্ন। জলাবদ্ধ রাস্তায় কিছুদূর পর পর বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা, লেগুনা ও প্রাইভেট কার বিকল হয়ে পড়ে আছে। অফিসপাড়া এবং বাণিজ্যিক এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহনের সারি দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে গুলিস্তান, মতিঝিল, দিলকুশা, পল্টন, বায়তুল মোকাররম, সচিবালয় ও প্রেসক্লাব কেন্দ্রিক সড়কগুলোতে দুপুর থেকে তীব্র যানজট লেগেই ছিল।
এসব রুটের বাসযাত্রীরা জানান, আধাঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিতে তাদের তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে। জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে কোথাও কোথাও বিভিন্ন গণপরিবহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকায় অনেকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
দুপুরের পর রাজধানীর রাজারবাগ, কমলাপুর, আরামবাগ, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, তেজগাঁও সাতরাস্তা, খিলগাঁও, চৌধুরীপাড়া, কারওয়ানবাজার, মগবাজার, আজিমপুর, নিউমার্কেট থেকে ধানম-ি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা ও ধনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে এসব সড়কে যানজটের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি চালকরাও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা-যানজট, এই পরিস্থিতিতে ঢাকাকে বাঁচাবে কে- এ প্রশ্নও উঠেছে ঘুরে ফিরে।
সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও মন্ত্রণালয় দীর্ঘ দিনে কোনো স্বস্তির কথা জানাতে পারেনি। তাই সহসাই এ সমস্যার সমাধান হবে এমনটা আশা করাও বোকামি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্য, ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। গত আট বছরে ঢাকার পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর কিছু করেনি। সরকারও এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কর্মসূচি নেয়নি। এখন পরিস্থিতি যখন সঙিন হয়ে উঠেছে, তখন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এক বছরের মধ্যে সমস্যার সমাধান করার কথা বলছেন। যা পুরোপুরিই 'রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি' বলে মনে করেন অনেকেই।
সরকারের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের কার্যত কোনো কর্মসূচি নেই। সরকার জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঝে মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। তারও সব বাস্তবায়িত হয় না। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে পানি নিষ্কাশনের যে দীর্ঘমেয়াদি নিবিড় কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি, সে উদ্যোগ সরকারের নেই।
নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্য, কর্মসূচি আর সিদ্ধান্ত এক নয়। পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা ওয়াসা নগরীর হারিয়ে যাওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ। কিন্তু খালগুলো কীভাবে উদ্ধার করবে, কত দিনের মধ্যে করবে, সরকারের কোন কোন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা করে কার্যক্রম চালানো অনেকটাই কঠিন। তাই হয়তো এ রকম কোনো কর্মসূচি সরকারের নেই।
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, কাজের কাজ না করে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারে যে কোনো ফল হয় না, তার প্রমাণ তো হাতেনাতেই পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম না চালানোয় নগরীর সমস্যা অনেক বেড়েছে। আগে ভারী বৃষ্টি না হলে তেমন জলাবদ্ধতা হতো না। এখন গত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিতেও নগরজুড়ে মারাত্মক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
রাজধানীর একটি খ্যাতনামা কলেজের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে বলেন, একটা সময় ছিল কমিউনিকেশন গ্যাপের, তখন কোথায় কী হচ্ছে তা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকত, রাজা-বাদশারা তো অনেক দূরেই থাকত। কিন্তু এখন তো দেশের নীতি-নির্ধারকরা ইচ্ছা করলেই হাতের তালুতে গোটা দেশকে দেখতে পান। অথচ এরপরও তারা নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। নিঃসন্দেহে এ পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে। যা এখন খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করেন এ প্রবীণ শিক্ষক।
একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করে একজন শিল্পপতি বলেন, ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই আধা ঢাকা পানিতে ডুবে যাচ্ছে। জলাবদ্ধতা-যানজটে দিনভর গোটা নগরী অচল হয়ে থাকছে। মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি থমকে যাচ্ছে। অথচ এরপরও সরকারের মন্ত্রী-সাংসদরা কথায় কথায় উন্নয়নের জোয়ারের কথা বলছেন। যা ঢাকাবাসীকে সরকারের প্রতি আস্থাহীন করে তুলেছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান, দুপুরে বৃষ্টি শুরুর পর তিনি গুলিস্তান থেকে বাসে করে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে তাকে বহনকারী বাসটি পৌনে ৪টার সময় তেজগাঁও নাবিস্কো মোড়ে পেঁৗছেছে। জাহিদুল জানান, অন্যান্য সময় গুলিস্তান থেকে তার কর্মস্থলে পেঁৗছতে আধাঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট সময় লাগলেও বুধবার তার সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে।
উত্তরা রাজউক মডেল কলেজের শিক্ষার্থী জোবায়ের হোসেন জানান, কলেজ থেকে তার পুরনো ঢাকার ওয়ারির বাসায় পেঁৗছতে পাকা চার ঘণ্টা সময় লেগেছে। এরমধ্যে মহাখালী থেকে বাকি রাস্তা পার হতে বেশি সময় ব্যয় হয়েছে। জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে বেশ কয়েকটি জায়গায় অধিকাংশ যানবাহন ২৫-৩০ মিনিট একই স্থানে দাঁড়িয়ে থেকেছে বলে জানায় জোবায়ের।
এদিকে নগরীতে ভয়াবহ যানজটের জন্য ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জলাবদ্ধতা ও ভাঙাচোরা সড়কের পাশাপাশি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিকে দায়ী করেন।
তাদের ভাষ্য, সকাল থেকে তারা দলে দলে বায়তুল মোকাররম মসজিদের আশপাশের এলাকায় জড়ো হতে শুরু করলে ওইসব সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব ধীরে ধীরে গোটা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। যা তারা প্রাণন্তকর চেষ্টা করে কিছুটা গুছিয়ে আনলেও এরপর ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিকের এডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা যায়যায়দিনকে বলেন, 'আজকের (বুধবার) যানজটের কারণ কিছুটা ভিন্ন। তবে রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি না থাকলেও সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা দূরহ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার রাস্তাঘাট যেভাবে ভাঙাচোরা এবং বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় তাতে যে কারও পক্ষেই যানজট সামাল দেয়া অসম্ভব।'
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin