রড সিমেন্টের মূল্য বৃদ্ধিঅর্ধেক প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ বাকিরাও ধীরে চলো নীতিতেসিন্ডিকেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের নতুন ফ্ল্যাটের মূল্য আরও বৃদ্ধির শঙ্কা নির্মাণ খাতে এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি আন্ত্মর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাস, দেশে বৃদ্ধিএস এম মামুন হোসেন প্রধান নির্মাণ উপকরণের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির ধকল কুলাতে না পেরে দেশের অর্ধেক রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানই তাদের কাজ বন্ধ রেখেছে। বাকিরাও ধীরে চলো নীতিতে অগ্রসর হচ্ছে। আন্ত্মর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাসের পরও দেশের বাজারে হঠাৎ করেই এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে যথাসময়ে ফ্ল্যাট বুঝে দেয়া যেমন সম্ভব হবে না তেমনই নতুন ফ্ল্যাটের দামও ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত্ম বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। আবার দাম না কমায় ১৫ এপ্রিল থেকে বড় অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণায় নির্মাণ খাতের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেরও আশঙ্কা তাদের।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছু বলা হচ্ছে না। বরং সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা থেকে নিজেদের ব্যবসা করা উচিত বলেই মনে করেন সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুন্সী সফিউল হক। সিন্ডিকেট করে রড, সিমেন্ট, পাথরসহ অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, 'সরকার জোর করে কারো ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে চায় না। বরং বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা থেকে ব্যবসা করবে এমনটাই প্রত্যাশা।'
তবে আন্ত্মর্জাতিক বাজারে এসব নির্মাণ সামগ্রীর দাম যখন কমছে তখন দেশীয় বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে মূল্য বৃদ্ধিকে স্বাভাবিকভাবে মানতে পারছেন না রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। আর এ কারণে তারা এখানে সরকারের হস্ত্মক্ষেপ কামনা করছেন বলে জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়িক নেতারা।
নির্মাণ খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভাইচ প্রেসিডেন্ট ও সংসদ সদস্য নুরম্নন নবী চৌধুরী শাওন এ বিষয়ে যায়যায়দিনকে বলেন, 'দাম বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসেছে যে কাজ চালিয়ে যাওয়াই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। রডের দাম বেড়েছে টনপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে রড-সিমেন্টের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের কথা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু আন্ত্মর্জাতিক বাজারে দাম যখন কমছে তখন দেশের বাজারে এমন দাম বৃদ্ধির অন্য কোনো কারণ আমরাতো দেখছি না। এ অবস্থা চললে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব খুব নেতিবাচক হবে। ফলে সরকার বিষয়টিতে আরও বেশি যত্নবান হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।'
এদিকে ক্লায়েন্টদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে কাজ বন্ধ রাখার বিষয়টি চেপে যেতে চাইছেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যবসায়ী। তবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় একাধিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি কিছু কাজ ক্লায়েন্টদের মন রক্ষর্থে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তবে দাম না কমলে তাও খুব শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।
অপরদিকে দাম না কমলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি আগামী ১৫ তারিখ থেকে তাদের সব কাজ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। আর এটি কার্যকর হলে নির্মাণ খাতের ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মুনির উদ্দিন আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, 'পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে আমাদের কিছু করার নেই। অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর হয়ে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত্ম।'
এদিকে দাম বৃদ্ধির ফলে রড-সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর খুচরা বিক্রেতাও জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই মাসে তাদের বিক্রিবাট্টা এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গেছে। খুলনার একজন রড-সিমেন্ট বিক্রেতা এস এম শামীম হোসেন এ বিষয়ে যায়যায়দিনকে বলেন, 'দাম এতই বেড়েছে যে বিক্রিবাট্টা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া হঠাৎ করে যদি দাম পড়ে যায় এই ভয়ে বেশি মালও জমা করতে পারছি না। অল্প মাল আনা-নেয়াতে খরচও বেশি পড়ছে। কিন্তু টালমাটাল এ অবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন থাকলে ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাবে।'
এ বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব মুন্সী সফিউল হক বলেন, 'আশা করি যৌক্তিক সময়ে দাম কমে আসবে। কিন্তু তা যদি না আসে তবে তা নির্মাণ খাতের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে আমরা আশাবাদী এ সময়ের মধ্যে দাম কমে আসবে।'
কিন্তু রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) আরেক ভাইচ প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভুঁইয়া মিলন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, 'মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর দুই সপ্তাহের বেশি পার হয়ে গেছে। কিন্তু বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। আর এ কারণে আমরা সরকারের আরও ত্বরিত ব্যবস্থা দাবি করছি।'
সংসদ সদস্য শাওনও অতিরিক্ত সচিবের বক্তব্যে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'মন্ত্রীও আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। দীর্ঘদিন পর নির্মাণ খাতে একটি গতি এসেছিল। কিন্তু এ দাম বৃদ্ধির কারণে তা ধ্বংসের মুখে। একদিকে ব্যাংকের দুই অংকের সুদ প্রতিদিনই বাড়ছে। অন্যদিকে বাড়তি দামের জন্য আমাদের কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শুধু বেসরকারি নয় সরকারেরও পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদু্যৎকেন্দ্রসহ সারাদেশে বিপুল উন্নয়ন কাজ চলছে। ফলে সরকারের কাজেও সমস্যা হচ্ছে। দেশে উন্নয়নে গতি আসায় নির্মাণ উপকরণের চাহিদা বেড়েছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি মহল এই সিন্ডিকেট করছে। সরকার কঠোর না হলে এ সিন্ডিকেট ভাঙা সহজ হবে না এবং দামও কমবে না।'
গত ১ তারিখে অবকাঠামো নির্মাণ খাত সংশিস্নষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক করেন মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। ওই বৈঠকে রড-সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর বিরম্নদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠলে তারা তা নাকচ করে দেশের ভেতরের বিভিন্ন কারণের কথা জানান। কিন্তু নির্মাণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ এসব সমস্যা আগেও কমবেশি ছিল। এমন নয় যে হঠাৎ করে একদিনেই এগুলো হয়েছে। ফলে তাদের এসব অভিযোগকে সঠিক নয় বলেই দাবি করছেন সংশিস্নষ্ট ব্যবসায়ীরা।
এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর সাথে এক বৈঠকের সময় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) রড-সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর কাছে জানতে চান, 'আপনাদের কত টাকা উৎপাদন খরচ বেড়েছে? আর বাজারে দাম বাড়িয়েছেন কত? বিষয়টির সাথে ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি জড়িয়ে রয়েছে।' তবে রড-সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে এর কোনো উত্তর দেয়া হয়নি।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close