সিরিয়ায় পশ্চিমা হামলা: ভয়ঙ্কর হতে পারে পরের পরিস্থিতিএখন নিঃসন্দেহেই এটা বলা চলে, নতুন করে এক শীতল যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বিশ্বেযাযাদি ডেস্ক রাজধানী দামেস্কে তিন দেশের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাএক বছর আগে সিরিয়ায় যে হামলা চালানো হয়েছিল, গত শনিবারের হামলা ছিল তার চেয়েও বড় ধরনের। সেবার হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র একা। এবার তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। গতবার সিরিয়ার বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ করে যত হামলা চালানো হয়েছিল, এবার তার চেয়েও বেশি অস্ত্র ব্যবহার করা হযেছে। বলা হচ্ছে, দ্বিগুণেরও বেশি।
কিন্তু মূল যে প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে- এর মাধ্যমে কি যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব? যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের লক্ষ্য সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ যাতে আবারও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার না করেন। সেজন্য এই হামলার মাধ্যমে তাকে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে।
গত বছরের এপ্রিল মাসের হামলার পর সিরিয়ায় যুদ্ধের অবসান ঘটেনি। কিন্তু দুটো বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমত, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত্ম প্রেসিডেন্ট আসাদ সরকারের জয় হচ্ছে এবং তার কৌশলের একটি গুরম্নত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত্ম করে রাখা। প্রেসিডেন্ট আসাদ এখনো হয়তো পুরো সিরিয়ায় তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি কিন্তু রাশিয়া ও ইরানের সমর্থন পাওয়ার পর তার বিরম্নদ্ধে দাঁড়ানোর মতো সিরিয়ায় এখন আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত, ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্ক- সাধারণভাবে বলতে গেলে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের উলেস্নখযোগ্য রকমের অবনতি ঘটেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, অনেকেই বর্তমান অবস্থানকে তুলনা করছেন শীতল যুদ্ধের সঙ্গে।
এ রকম পরিস্থিতিতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে শাস্ত্মিমূলক বার্তা দিতে চেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বার্তায় কতটা কাজ হবে? প্রেসিডেন্ট আসাদ কি কিছুটা হলেও ভীত হবেন? নাকি আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন? এর ফলে রাশিয়ার অবস্থানের কি কোনো পরিবর্তন ঘটবে?
বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস বলছেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান খুব একটা পরিষ্কার নয়। ট্রাম্প নিজেও তার দেশের ভেতরে নানা ধরনের সমালোচনার মুখে জর্জরিত। এ রকম একটা পরিস্থিতির মধ্যেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসাদ সরকারের বিরম্নদ্ধে যেসব হুমকি দিচ্ছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল বড় ধরনের সামরিক অভিযানই পরিচালিত হবে। কিন্তু কার্যত সে রকম কিছু হয়নি। সুতরাং এখান থেকে মস্কো কিংবা প্রেসিডেন্ট আসাদ কী ধরনের উপসংহার টানতে পারেন?
পেন্টাগন এমনভাবে এই অভিযান চালিয়েছে যাতে 'বিদেশিরা'- বিশেষ করে 'রাশিয়া' যাতে হামলার শিকার না হয়, সে বিষয়ে তারা সচেষ্ট ছিল। যে তিনটি জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে, বলা হচ্ছে সেগুলো প্রেসিডেন্ট আসাদ সরকারের রাসায়নিক অস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু একই সঙ্গে এসব জায়গায় বেসামরিক লোকজনের হতাহত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল খুব কম।
পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলেছেন, সিরিয়ার আরও কিছু জায়গা যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় ছিল, সেগুলোতে হামলা করা হয়নি। তাদের স্পষ্ট বার্তা ছিল, প্রেসিডেন্ট আসাদের সরকার যদি আবারও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে তাহলে তাদের ওপর আরও হামলা চালানো হবে।
কিন্তু গত বছরের এপ্রিলের অভিযানের পরও কিন্তু রাসায়নিক অস্ত্র বিশেষ করে ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে আসাদ সরকারের বিরম্নদ্ধে। তখন কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলায় যায়নি।
এখন পশ্চিমারা আশা করছে, এর ফলে আসাদের আচরণের পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু সিরিয়ায় যে গৃহযুদ্ধ চলছে, তার কী হবে? এই বর্বর যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই তো চোখে পড়ছে না। অনেকেই বলছেন, সিরিয়ায় যেসব মৃতু্যর ঘটনা ঘটছে, সেগুলো হচ্ছে ব্যারেল বোমা, বুলেট এবং গোলা-হামলার কারণে। রাসায়নিক হামলার কারণে নয়। কিন্তু এটাই কি শুধু পশ্চিমা বিশ্বকে সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে আগ্রহী করে তুলল?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের কারণে পশ্চিমা বিশ্বে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণে এই অস্ত্রের ব্যাপারে একটা ভীতি আছে। এই অস্ত্রের ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করে গৃহীত আন্ত্মর্জাতিক চুক্তিও নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে একটি গুরম্নত্বপূর্ণ সমঝোতা। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্বের সবশেষ এই হামলা সিরিয়ার পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন ঘটাবে? এর ফলে কি গৃহযুদ্ধ অবসানের জন্য কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে? দুঃখজনকভাবে এর উত্তর হচ্ছে- 'না'। এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পরিষ্কার কোনো কৌশলও নেই।
আসাদ সরকারের প্রতি সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রদর্শনের মাধ্যমে রাশিয়া ওই অঞ্চলে তার অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে। মস্কো ওয়াশিংটনকে হুশিয়ারও করে দিয়েছে, তারা যাতে সিরিয়ায় হামলা না চালায়। কিন্তু এই শনিবারের হামলার পর রাশিয়া এখন কী করতে পারে?
বিশেস্নষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়াবে না রাশিয়া। তবে তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিরম্নদ্ধে তাদের প্রচারণাকে আরও তীব্র করতে পারে। এ রকম প্রচারণা এরই মধ্যে শুরম্ন হয়েছে। তারা বলছে, সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। শুধু তাই নয়, তারা এটাও বলছে, আসাদ ও মস্কোকে বিপদে ফেলার জন্য 'বিদেশি এজেন্টদের দিয়ে এ রকম একটি ঘটনা সাজানো' হয়েছে।
এরপর নিঃসন্দেহেই এটা বলা চলে, নতুন করে এক শীতল যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বিশ্বে। এর ফলে পরমাণু যুদ্ধের হয়তো কোনো আশঙ্কা নেই কিন্তু এটাও ঠিক যে, এই পরিস্থিতিতে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে সেটাও হয়তো আঁচ করা সম্ভব নয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সুপারপাওয়ার নয় রাশিয়া। এই দেশটির এখন আর তেমন কোনো আদর্শ নেই, যার ফলে সারা বিশ্বের স্বাধীনতাকামীরা তাদের সমর্থন দিতে পারে। রাশিয়া এখন মাঝারি ধরনের আঞ্চলিক শক্তি যার উলেস্নখযোগ্য রকমের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। একই সঙ্গে আছে দুর্বল অর্থনীতিও। কিন্তু এই দেশটি এখন জানে কীভাবে তথ্য দিয়ে যুদ্ধ চালাতে হয় এবং প্রেসিডেন্ট পুতিন তো রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
আবার সিরিয়ায় রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি ইসরাইল সিরিয়ার একটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে উত্তেজনা বাড়ছে। এই উত্তেজনার শেষ কোথায়, কীভাবে এবং কখন- সেটা কেউ বলতে পারে না। আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সবশেষ এই সামরিক হামলা হয়তো এই উত্তেজনাতেই আরও একটা মাত্রা যোগ করল। সংবাদসূত্র : বিবিসি নিউজ
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close