পূর্ববর্তী সংবাদ
জঙ্গিবাদ ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধকরণসত্য বটে, এই সরকারের আমলেই দেশ-বিদেশের প্রচ- বিরোধিতা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে, চালু করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা এবং এ কাজের প্রশংসা করি অকুণ্ঠভাবেই। কিন্তু তার সঙ্গে জামায়াত-শিবির, হেফাজতসহ তাবৎ ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে তাদের আয়ের সব উৎস দিব্যি বহাল রাখতে দেয়া এবং তার মাধ্যমে ওইসব জঙ্গি উৎপাদনকারী সংগঠনকে জঙ্গিপনা চালানোর বৈধ সুযোগ বজায় রাখা আদৌ কি সংগতিপূর্ণ?রণেশ মৈত্র বিশ্বাস করুন বর্তমান আইনমন্ত্রীর মুখে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত কোনো কথা শুনলে আমি সত্যি সত্যি অাঁতকে উঠে ভাবি, ওদের বৈধভাবে কাজ করার মেয়াদ কমপক্ষে আরও বছর দুয়েক বৃদ্ধি পেল সম্ভবত। এর কারণটা তিনি নিজেই। তার মুখে এর আগে শুনেছি বহুদিন ধরে যে 'জামায়াতকে শিগগিরই নিষিদ্ধ করা হবে এবং এ কারণে ওই দলের বিরুদ্ধে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। আইন প্রণীত হয়ে গেলেই আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। অতঃপর মাসের পর মাস চলে গেল। হঠাৎ একদিন তিনি জানালেন 'আইন প্রণয়ন প্রায় শেষের দিকে।' আরও মাস কয়েক পরে তিনি জানালেন, 'জামায়াত নিষিদ্ধকরণের জন্য প্রণীত আইন চূড়ান্ত হয়েছে। শিগগিরই তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেশ করা হবে। এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে তা পরবর্তী পার্লামেন্ট অধিবেশনে পেশ করা হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য।' এর পর কমপক্ষে আরও একটি বছর দিব্যি পার হয়ে গেল। কিন্তু জানাই যাচ্ছে না আইনটি কোথায়, কিভাবে আছে। অনুমান করি খসড়া ওই আইনটির অপমৃত্যু ঘটেছে এবং ফলে জামায়াত নতুন করে জীবনীশক্তি ফিরে পেয়েছে।
ইদানীং তিনি আরও বলছেন সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তার জন্য আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। সে আইন প্রণয়ন করতে কতকাল লাগবে এমন কোনো প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব তার বক্তব্যে পাওয়া যায় না। ওই আইন প্রণয়ন, মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে তার অনুমোদন গ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তার পেশ ও পাস করানোর বিলম্বের যুক্তি কী তা আমি জানি না। ততদিনে চতুর দেশদ্রোহী যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানেরা বা তাদের বংশধরেরা কি চুপচাপ বসে থেকে মজা দেখবে? নাকি সেগুলো হস্তান্তর করে প্রাপ্ত টাকাপয়সা বিদেশে পাচার করে দিয়ে সাধু সেজে বসে থাকবে?
বস্তুত, প্রচারমুখী নেতা আমাদের কর্তাব্যক্তিদের এক দল যারা নিজেদের কাজের চাইতে বেশি বেশি প্রচার- বেশি বেশি বক্তৃতা ভাষণ- এগুলোর প্রতিই তাদের অসাধারণ মোহ।
মাননীয় আইনমন্ত্রী দেশের একজন খ্যাতনামা আইনবিদ। তিনি তো ভালোমতোই জানেন জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মতো উপযুক্ত আইনের অভাব আমাদের দেশে নেই। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এ কথা বারবার বলেছেন। কিন্তু যেমন তিনিও মন্ত্রী থাকাকালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেননি- তেমনি ইনিও তা করছেন না। তবে বক্তৃতা দিয়ে গরম করে তুলছেন মাঝে মধ্যেই।
আমি একটি সহজ পন্থার সন্ধান দিতে পারি। মাননীয় আইনমন্ত্রী সেই পরামর্শ গ্রহণ করবেন কি? পরামর্শটা হলো- কোনো আইন প্রণয়ন বা কোনো মোকদ্দমা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে দায়ের করে অহেতুক সময়ক্ষেপণের আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। খোদ বঙ্গবন্ধু যে পথ অবলম্বন করে জামায়াতে ইসলামী ও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর অস্তিত্ব বিলোপ করেছিলেন সেই সহজ পথটি অবলম্বন করুন। সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী আনুন এবং সেই সংশোধনীতে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ছাত্র শিবির, আওয়ামী ওলামা লীগ এবং ধর্মাশ্রয়ী অপর সব দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করুন। একইভাবে ধর্মের নামে নতুন কোনো দল গঠনকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করুন। তাদের তাবৎ সম্পত্তি অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করে ওই সম্পত্তি দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করা হবে বলে স্পষ্টাক্ষরে সংবিধান সংশোধনীতে বিধান রাখুন। 'বিসমিল্লাহ্?'-'রাষ্ট্রধর্ম' প্রভৃতিও একই সংশোধনী মারফত প্রত্যাহার করুন। তবেই সংসদের এ অধিবেশনেই এই দীর্ঘদিনের জাতীয় দাবি পূরণ করা সম্ভব, অত্যন্ত কার্যকরভাবেই সম্ভব।
আজকের যে জঙ্গি উত্থান- তা নিয়ে সরকারি মহলে একটিমাত্র বিতর্ক হামেশাই শোনা যায়। তা হলো বাংলাদেশে আই.এস.-এর অস্তিত্ব আছে কি নেই। এই বিষয়ে সরকারের বক্তব্য হলো 'বাংলাদেশে আই.এস.-এর কোনো অস্তিত্ব নেই' এবং যা কিছু জঙ্গিরা বাংলাদেশে ঘটাচ্ছে তা ঘটাচ্ছে এ দেশের কিছু বিপথগামী যুবক।
কিন্তু বাংলাদেশের সরকার ব্যতীত পৃথিবীর বাদবাকি সব দেশই বলে আসছে বাংলাদেশেও আই.এস. ঘাঁটি গেড়েছে। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণরাই ঘটাচ্ছে- কিন্তু কোনো তরুণ বা তরুণী? সরকারি বা পুলিশি ভাষ্য অনুসারেই শত শত শিক্ষিত ও সচ্ছল ঘরের তরুণ-তরুণীরা নিখোঁজ। তারা অনেকেই ইরাক সিরিয়া গিয়ে আই.এস.-এ যোগ দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। গোয়েন্দা বাহিনীর তৎপরতা সত্ত্বেও তাদের বিদেশ যাত্রা ঠেকানো যাচ্ছে না। ওইসব দেশ থেকে আই.এস. বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদেরকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে-টাকাপয়সা, অস্ত্রপাতি এবং মানুষ খুন করলেই দ্রুত বেহেস্ত বা আল্লার সাক্ষাৎ লাভের অলীক মোহ সৃষ্টি করে খুনের তালিকাসহ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে এসবই তো সকলে জানা তথ্য। এরপর কি বাংলাদেশে আই.এস. নেই দাবি ধোপে টেকে? আই.এসও দাবি করে তারাই জঙ্গি আক্রমণগুলো ঘটাচ্ছে।
যা হোক, সরকার এটি স্বীকার করেছেন যে জঙ্গিপনায় লিপ্ত তরুণ-তরুণীদের বেশির ভাগই ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মী। অর্থাৎ তাদের রিক্রুট করছে জামায়াতে ইসলামী। এই জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী দিয়ে বা তাদের সঙ্গে নিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, আড়াই লাখ বাঙালি নারীর সম্ভ্রম লুটেছে, হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার চরমতম বিরোধিতা করেছে এবং এখনো তারা তরুণ-তরুণীদের দেশে বিদেশে পাঠিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ (এ কাজ দেশের আনাচে-কানাচেও করছে) দিয়ে এনে দেশের অভ্যন্তরে ধ্বংস এবং হত্যালীলা চালাচ্ছে। এরপরও দলটিকে বৈধভাবে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে তাদের অঢেল সম্পদ দিয়ে বহু ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য করে বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের উত্তর কোনো দিনেই মিলছে না। একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের হাজার হাজার নাম সংবলিত গেজেট বাতিল করতে, তাদের প্রাপ্য ভাতাদি থেকে তাদের বঞ্চিত করতে, বহু মুক্তিযোদ্ধাকে ভিক্ষা করে সংসার নির্বাহ করতে।
সত্য বটে, এই সরকারের আমলেই দেশ-বিদেশের প্রচ- বিরোধিতা সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে, চালু করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা এবং এ কাজের প্রশংসা করি অকুণ্ঠভাবেই। কিন্তু তার সঙ্গে জামায়াত-শিবির, হেফাজতসহ তাবৎ ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে তাদের আয়ের সব উৎস দিব্যি বহাল রাখতে দেয়া এবং তার মাধ্যমে ওইসব জঙ্গি উৎপাদনকারী সংগঠনকে জঙ্গিপনা চালানোর বৈধ সুযোগ বজায় রাখা আদৌ কি সংগতিপূর্ণ?
সুতরাং যেভাবে পূর্বে উল্লেখ করেছি- দ্রুত সেভাবে সংবিধান সংশোধন করে তাদের নিষিদ্ধ করা হোক- তাদের আয়ের সব উৎস বাজেয়াপ্ত করা হোক যুদ্ধাপরাধীদের তাবৎ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের পরিবার-পরিজনের কল্যাণে ব্যয়ের কার্যকর ব্যবস্থা করা হোক এবং ২০১৩ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংবলিত গেজেটে যাদের নাম লিপিবদ্ধ আছে অবিলম্বে তাদের ভাতাদি (খাস-বকেয়াসহ) এবং অপর সব প্রাপ্য সুবিধাদি প্রদানের ব্যবস্থা করা হোক।
এই কাজ করা হলে তার প্রত্যক্ষ পরিণতি হবে সংবিধানকে প্রকৃত অর্থে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সংবিধানে পরিণত করা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে একটা আস্থার ভার অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করা। তাতে দেশকে ফিরে আনবে পাকিস্তানমুখী থেকে ঘুরিয়ে বাংলাদেশমুখী পথে। সব সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষদাঁত ভেঙে দেয়া হবে এবং বঙ্গবন্ধু, শহীদ তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান, কমরেড মণি সিংহ. মোজাফফর আহম্মেদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, শহীদমাতা জাহানারা ইমামসহ লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার মনের গভীরে লালিত স্বপ্নও পূরণ হবে।
মাননীয় আইনমন্ত্রী হামেশাই দেশে আইনের শাসন প্রচলিত রয়েছে বলে মত প্রকাশ করে থাকেন, যার সঙ্গে মৌন দ্বিমত পোষণ করেন সমগ্র সংখ্যালঘু সমাজ এবং আরও অনেকে। ২০০১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যেসব সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে তার একটিরও বিচার না হওয়ার নাম কি আইনের শাসন? 'কেউ কোনো অপরাধ করলে আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না'_ এমন দাবি বস্তুত কি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? আমি মনে করি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো এবং যথার্থই আইনের শাসন প্রবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

রণেশ মৈত্র: সভাপতিম-লীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ
ৎধহবংযসধরঃৎধ@মসধরষ.পড়স
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin