সাম্প্রতিক স্বস্তিদায়ক সফল অভিযানএখন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, সেজন্য জঙ্গিরা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না বলেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশাবাদ রয়েছে। তবে এখন থেকে বসে না থেকে এসব সচেতনতা ধরে রাখতে হবে। তাহলেই সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে।ড. মো. হুমায়ুন কবীর এই তো ৮ অক্টোবর দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শারদীয় দুর্গাপূজা চলাকালে ঢাকার আশুলিয়া, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরে তিন-চারটি স্থানে একই সঙ্গে পরিচালিত পরপর যৌথবাহিনীর কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অংশ হিসেবে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করার সময় 'অপারেশন শরতের তুফান' নামের যৌথবাহিনীর এক সফল অভিযানে তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১২ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে ১৩ সেপ্টেম্বর কাশ্মিরে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। ঈদের ঠিক তিনদিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে পাকিস্তানের একটি মসজিদে আবারও আত্মঘাতী এক সন্ত্রাসী বোমা হামলায় সেখানেও প্রায় ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ, উন্নত ও শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স এমনকি ইসলাম ধর্মের পবিত্র পুণ্য ও তীর্থভূমিখ্যাত সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের স্থানেও বিভিন্ন সময়ে বোমা, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলার কথা আমরা সবাই জানি। আর পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, তুরস্ক, ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইত্যাদি দেশে তো জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলা নিত্যদিনের নৈমিত্তিক ঘটনা। সেখানে আজ আইএস তো কাল আল-কায়েদা ইত্যাদি নামে-বেনামে ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী শান্তির দেশে দেশে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে সারাক্ষণ। ঈদের কয়েকদিন আগে-পরেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা ও খুনের ঘটনায় কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশিও খুন হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু ওপরে উলি্লখিত কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা-েরই তড়িৎ কিংবা তৎক্ষণাৎ বিচার করে ফেলতে পেরেছে এমনটি শোনা যায়নি। সেজন্য আজকে এসে নিশ্চিতভাবেই এটা বলা যায়, আমাদের বাংলাদেশে এসব ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচারে যে অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বাংলাদেশে বিগত কিছুদিন ধরে দেশজুড়ে নিরাপত্তার বিষয়টি যেভাবে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের অস্বস্তিত্মতে রেখে একপ্রকার শঙ্কিত করে তুলেছিল। এবারের (২০১৬) কোরবানি ঈদে তা অনেকখানি কেটে গেছে বলে মনে করছেন নাগরিকরা। কারণ ধারাবাহিক ও ক্রমাগতভাবে দেশে যেভাবে জঙ্গি পরিচয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ঘৃণ্য প্রয়াস চালিয়েছিল, তা এখন অনেকাংশেই বিফলতার দিকে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। শুরুটা বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই এবং শায়খ আব্দুর রহমানদের দিয়ে। এভাবে মুফতি হান্নান কিংবা অপরাপর জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের পরিচয় নিয়ে আগে গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টা করা হলেও এখন সরকারের আন্তরিকতায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতায় তা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গছে। এখন চলছে এর মূলোৎপাটনের প্রক্রিয়া। যাহোক, এবছরের রমজানের ঈদের আগে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি ২০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা এবং রমজানের ঈদের দিনে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ঈদ জামাত শোলাকিয়ায় কথিত জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে যে বার্তা দিতে চেয়েছিল তা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। দেখা গেছে, প্রতিবারই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে অভিনব কায়দায় সন্ত্রাসী হামলাগুলো চালানো হয়েছে। কারণ হলি আর্টিজানের মতো ভিআইপি নিরাপত্তার ভিতরেও কূটনৈতিক এলাকায় কিংবা শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের মতো পবিত্র স্থানে ইসলাম ধর্মের নামে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে তা কোনোদিন কারো কল্পনাতেই ছিল না। সেজন্য এসব স্থানে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবসময় স্বাভাবিক নিরাপত্তাব্যবস্থাই নেয়া হতো। কিন্তু সেসময়কার এ দুটি হামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আবার নতুন করে ভেবে পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেটারই বাস্তবায়ন দেখা গেল এবারের কোরবানি ঈদের নিরাপত্তাবেষ্টনি সৃষ্টিতে। আর তাই এবার কোরবানি ঈদে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, যার সুফল দেশবাসি পেয়েছেও। রাজধানী ঢাকা শহরের প্রধান ঈদ জামাতের জন্য জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররামসহ প্রত্যেকটি ঈদগাহ মাঠে এবং মসজিদে বিশেষ এবং চারস্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। আর ঈদের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই এসব নামাজের স্থানে গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। এসব ক্ষেত্রে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন, সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যেকে একেকটি টিমে কাজ করেছে। ঈদে বিশেষ নিরাপত্তা দেয়ার জন্য তাদের কারো কারো ঈদের ছুটি পর্যন্ত বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ। ঠিক রাজধানী ঢাকার মতোই বৃহত্তম ঈদ জামাত শোলাকিয়াসহ সারাদেশের ঈদগাহ মাঠ ও মসজিদে চারস্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্যদিকে গুলশান এবং শোলাকিয়ার দুর্ঘটনার পর আরো বেশ কয়েকটি হামলার পরিকল্পনার কথা টের পেয়ে বিশেষ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের অনেকটা দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়েছে। আগের কয়েকটি সফল অভিযান এবং ঈদের দিনে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা_ এ সবকিছু মিলেই এবারের কোরবানির ঈদে কোনো ধরনের জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলা হতে পারেনি। আর এটি শুধু ঈদের নামাজের ক্ষেত্রেই যে প্রযোজ্য হয়েছে তাই নয়। বরং ঈদের আগে কেনা-কাটার সময় বিভিন্ন শপিংমলে, কোরবানির পশুর হাটে, পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি ঠেকাতে, অজ্ঞান ও মলম পার্টির দৌরাত্ম্য ঠেকাতে, জালটাকা ছড়ানোর হাত থেকে পশু কারবারিদের রক্ষা করতে, ঈদে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়া নাগরিকদের ঢাকায় রেখে যাওয়া বাসা-বাড়ির নিরাপত্তা বিধান করা, অন্যায় ও অন্যায্যভাবে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, সঠিক সময়ে ও যৌক্তিক ভাড়ায় টিকেট প্রাপ্তি, যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা ইত্যাদির মাধ্যমেও নাগরিকদের যথাসাধ্য সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা করেছে নিরাপত্তা বাহিনীর তরফ থেকে। তবে ঈদের আগে কিছু নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, রাস্তায় রাস্তায় যানজট, জাল টাকার বিস্তার, অজ্ঞান ও মলমপার্টির দৌরাত্ম্য, টিকেটের কালোবাজারি, ট্র্যাপে ফেলে যানবাহনের বেশি ভাড়া আদায় ইত্যাদি ঈদ আনন্দের সঙ্গে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় রূপ নিয়েছে। কাজেই এগুলো একেবারে কেউ চাইলেই পুরোপুরি নির্মূল করা সহজ কাজ নয়। তারপরেও নিরাপত্তা বাহিনীর গর্বিত সদস্যরা মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদাালত কিংবা বিশেষ বিশেষ অভিযানে অংশ নিয়ে সেগুলো থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা করেছেন। তবে এবারের ঈদে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেকটাই নিয়মতান্তিক হয়েছে তা সবাই স্বীকার করবেন। সেজন্য এসময়ে গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে অনেক নাগরিকই সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার প্রশংসা করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছেন। সেজন্য ঈদ পরবর্তী অফিস খোলার দিনে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবারের ঈদ উৎসবে নাগরিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে তার সন্তুষ্টির কথা ব্যক্ত করেছেন এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে। এতদুপলক্ষে তিনি এও বলেছেন, দেশে জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি এখন আতঙ্কের ঊধর্ে্ব। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময়োপযোগী সহযোগিতামূলক তৎপরতায় তা এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আর জঙ্গি-সন্ত্রাস বিষয়ে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে অতি অল্প সময়ে ও সহজেই একটি সফল পরিণতির দিকে যাচ্ছে। কারণ আগে কখনো যেসব বিষয় আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর নজরে কিংবা কল্পনাতেই আনেনি, সেসব ঘটনা ঘটার পর সেগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা নতুন নতুন কৌশল ও সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে তা সফল করার চেষ্টা করছে। আর সেগুলো কাজের অংশ হিসেবেই গুলশানে জিম্মি ঘটনায় যৌথ বাহিনীর গৃহীত 'অপারেশন থান্ডার বোল্ট', তারপর কল্যাণপুরে নয় জঙ্গির ঘটনার অভিযানের নাম 'অপারেশন থান্ডার স্টর্ম-২৬', গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে 'অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭' এবং সর্বশেষ রাজধানীর রূপনগর ও আজিমপুরের সফল অভিযানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারাত্মক আহত হলেও অভিযান সফল হয়েছে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহসী সদস্যরা তাদের জীবনের ওপর এসব ঝুঁকি নিয়ে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছেন। এর আগে শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর মনে করা হয়েছিল যে, আপাতত হয়তো জেএমবির জঙ্গি নেটওয়ার্কের মধ্যে একটি চির ধরাতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু এবারও আগের জেএমবি কিছুটা নিষ্ক্রিয় হলেও তারা আবার নব্য জেএমবিসহ আরো নানা নামে একত্রিত হয়ে সংগঠিত করে সাম্প্রতিক হামলাগুলো চালিয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে এবং গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গিদের জেরার মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে। এখন বস্নগার রাজীব হত্যা থেকে শুরু করে জাগৃতি প্রকাশনীর দীপন ও টুটুলের হত্যাকারী, সর্বশেষ গুলশানের হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ায় হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং মূল পরিকল্পনাকারীদের অনেককেই পুলিশ ধরতে সমর্থ হয়েছে। তারমধ্যে কেউ 'মাস্টারমাইন্ড' ও কেউ প্রশিক্ষণ দাতা। সম্প্রতি এরকম কয়েকজনের নাম 'হিটলিস্টে' নিতে পেরেছেন তারা। এরা হলো_ মূল পরিকল্পনাকারী সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, কানাডা প্রবাসী তামিম আহমেদ চৌধুরী, সেনাবাহিনীর মেজরের চাকরি থেকে অবসর নেয়া জাহিদুল ইসলাম এবং তাদের সঙ্গে রয়েছে নুরুল ইসলাম মারজান, মামুনুর রশীদ রিপন ও মানিক। শেওড়াপাড়ার বাসায় বসে হলি আর্টিজানের হামলা মনিটর করেন মেজর জাহিদ ও তামিম, বিভিন্ন স্থানের হামলার জন্য গাইবান্ধায় সাতজনকে প্রশিক্ষণ দেন মেজর জাহিদ এবং উত্তরবঙ্গে হামলা বন্ধ করে রাজধানী ঢাকায় হামলার সিদ্ধান্ত হয় নাটোরে বসে। এগুলো বিভিন্ন অভিযানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রেস ব্রিফিং থেকে সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে জানা গেছে। তবে এর বাইরেও হয়তো আরো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির তথ্য তাদের কাছে রয়েছে যা স্বভাবতই তদন্ত ও নিরাপত্তার খাতিরে প্রকাশ করছেন না তারা। এখন এসব জঙ্গি দূরীকরণ করতে গিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন পুলিশ। একসময় ধারণা করা হতো যে, এসব ধর্মীয় জঙ্গিবাদে শুধু মাদ্রসায় পড়ুয়া দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা জড়িত থাকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এ ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং দেশ-বিদেশ থেকে একটি বিশেষ বয়সের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেশের অভ্যন্তরে নামি-দামি বেসরকারি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ধনীর দুলালরাও এতে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে এরকম ধারণাও একসময় বদ্ধমূল ছিল যে, এসব জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদে শুধু পুরুষ কিংবা ছেলেরাই জড়িত হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ছেলে জঙ্গিদের উচ্চশিক্ষিত স্ত্রীরাও তাদের সহযোগী হিসেবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। সর্বশেষ কয়েকটি পুলিশি অভিযানে বেশ কয়েকজন নারী সদস্য ধরা পড়েছে। সেখানে পুলিশের জেরায় বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর অনেক কাহিনী। আর এসব জঙ্গি নেটওয়ার্কের নাড়ি-নক্ষত্রের মূলে কুঠরাঘাত করতে পারার কারণে ঈদুল ফিতরের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পর দীর্ঘ প্রায় আড়াই-তিন মাসের মধ্যে আর কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। তবে বেশ কয়েকটি হামলার প্রস্তুতির কথা আগে থেকেই টের পেয়ে সেগুলো ধূলিস্যাৎ করে দিতে পেরেছে এবং তাদের পাকড়াও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সফল অভিযানের কারণে জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকা- অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আসায় দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আবারও উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় বিদেশি নাগরিকদের টার্গেট করার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে যে একটি স্থবিরতা ও মন্দা কাজ করছিল যা কাটতে শুরু করেছে। সেজন্য বাংলাদেশের জঙ্গি-সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে দেশি-বিদেশি সব মহলেই আপাতত সন্তুষ্ট হয়েছেন। কারণ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিসেস মার্শা বস্নুম বার্নিকাট নারায়ণগঞ্জের অভিযানের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য গিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তাছাড়া সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঝটিকা ঢাকা সফরে এবং এ বিষয়ে তার দেয়া মন্তব্যগুলো আশার সঞ্চার করেছে, যাতে সহজেই কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যেতে পারে। কাজেই জঙ্গি নির্মূলে শেষ কথা বলতে কিছু নেই কিংবা শেষ কথা বলার সময় এখনো আসে নাই। তারপরও একটি সমাধান সূত্র যে আবিষ্কার করা গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সেজন্য এসব সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে সরকারি নীতির সুফল, তেমনি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিকতাপূর্ণ অভিযানের সফলতা। সেই সঙ্গে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা তো রয়েছেই। কারণ এসব ঘটনার পর সারাদেশে এ নিয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। আর তরুণ প্রজন্মের ভিতরে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সারাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গি-সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এতে অনেক সুফল পাওয়া যাচ্ছে। কারণ সবাই জানেন এসব ঘটনা একক কোনো দেশের একার কোনো সমস্যাও নয় আর কোনো দেশের একার পক্ষে সমাধানও সম্ভব নয়। বর্তমানে এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আর বাংলাদেশের জঙ্গিরা যদিও বা আইএসের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগযোগ নেই, তারপরও তাদের বিদেশি নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের অর্থ, অস্ত্র, সাহস, বুদ্ধি, পরামর্শ ইত্যাদি দিয়ে কেউ না কেউ সহযোগিতা করছে। তাদের মধ্যে সর্বশেষ অভিযানে নিহত জঙ্গি তানভীরসহ একাধিক জঙ্গি সদস্যের আইএসের সঙ্গে কানেকশন তৈরি করার চেষ্টার আলামত পাওয়া গেছে।
এখন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, সেজন্য জঙ্গিরা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না বলেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশাবাদ রয়েছে। তবে এখন থেকে বসে না থেকে এসব সচেতনতা ধরে রাখতে হবে। তাহলেই সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

ড. মো. হুমায়ুন কবীর: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
যশধনরৎভসড়@ুধযড়ড়.পড়স
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin