মুসলি্লরা আসছেন: কাল শুরু বিশ্ব ইজতেমারেজাউল কবির রাজিব টঙ্গী থেকে আম বয়ানের মধ্যদিয়ে ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার ৫২তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপ শুরু হচ্ছে। দুই ধাপের এ ইজতেমার প্রথম ধাপে ১৭ জেলার মুসলি্লরা অংশ নিচ্ছেন। এরই মধ্যে নির্ধারিত এলাকা থেকে দলে দলে মুসলি্লরা টঙ্গীর তুরাগ তীরে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে প্রথম পর্বের শেষ হবে। এরপর চার দিন বিরতি দিয়ে ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। ২২ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তির মাধ্যমে ২০১৭ সালের বিশ্ব ইজতেমা শেষ হবে।
বিশ্ব ইজতেমার মুরবি্ব গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রথম ধাপে দেশের ১৭টি জেলার মুসলি্লরা ইজতেমায় অংশ নেবেন। ২৭টি খিত্তায় তাদের ভাগ করে দেয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে অংশ নেয়া জেলা ও খিত্তাগুলো হলো- ঢাকা (১-৫ নং খিত্তা), টাঙ্গাইল (৬-৮ নং খিত্তা), ময়মনসিংহ (৯-১১ নং খিত্তা), মৌলভীবাজার (১২ নং খিত্তা), ব্রাহ্মণবাড়িয়া (১৩ নং খিত্তা), মানিকগঞ্জ (১৪ নং খিত্তা), জয়পুরহাট (১৫ নং খিত্তা), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (১৬ নং খিত্তা), রংপুর (১৭ নং খিত্তা), গাজীপুর (১৮-১৯ নং খিত্তা), রাঙামাটি (২০ নং খিত্তা), খাগড়াছড়ি (২১ নং খিত্তা), বান্দরবান (২২ নং খিত্তা), গোপালগঞ্জ (২৩ নং খিত্তা), শরীয়তপুর (২৪ নং খিত্তা), সাতক্ষীরা (২৫ নং খিত্তা) ও যশোর (২৬-২৭ নং খিত্তা)। দেশের বাকি জেলার মুসলি্লরা দ্বিতীয় পর্বে অংশগ্রহণ করবেন।
এদিকে ইজতেমার নিরাপত্তায় র‌্যাব, পুলিশ ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইজতেমা চলাকালে গোটা এলাকা পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলবৎ থাকবে। বেশ ক'দিন আগে থেকেই গোয়েন্দারা গোটা এলাকায় সতর্ক নজর রাখছে।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল টহল, নৌ টহল ও হেলিকপ্টারে টহলে থাকবে র‌্যাব সদস্যরা। বিপুলসংখ্যক র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সাদা পোশাকে পুরো ইজতেমা ময়দানে অবস্থান করবেন। র‌্যাবের নয়টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে ইজতেমা ময়দানকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আলহাজ অ্যাড. আ ক ম মোজাম্মেল হক, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মো. জাহিদ আহসান রাসেল ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ বিশ্ব ইজতেমার দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন। তারা জানান, বিশ্ব ইজতেমায় আসা মুসলি্লদের সেবায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইজতেমায় যাতায়াতের সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিআরটিসি স্পেশাল বাস সার্ভিস চালু করেছে। দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমার শেষদিন পর্যন্ত টঙ্গী রেলস্টেশনে প্রতিটি ট্রেন দুই মিনিট করে যাত্রা বিরতি করবে। ইজতেমার মোনাজাতের দিন ১১৫টি ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। মুসলি্লর জন্য ওজু, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, অতিরিক্ত টিকিট কাউন্টার ও ভ্রাম্যমাণ টিকিট বিক্রি করা হবে। বিআরটিসির ৩৫০টি বাস মুসলি্লদের যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত থাকবে। এ ছাড়া বিদেশি মেহমানদের কাকরাইল মসজিদ এবং বিমানবন্দর থেকে ইজতেমা ময়দানে আনার জন্য পর্যাপ্ত এসি বাস বরাদ্দ থাকবে। ইজতেমা ময়দানের বিদেশি নিবাসে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবার নতুন একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ইজতেমায় আগত মুসলি্লদের চিকিৎসা সেবায় ১৪টি অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। অসুস্থদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক ও ওষুধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের সদস্যরা তুরাগ নদীর ওপর সাতটি স্থানে ভাসমান সেতু নির্মাণের কাজ শেষ করেছে।
এদিকে ২০টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আশপাশে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ, বিলবোর্ড ও ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হচ্ছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশ সার্বক্ষণিক কাজ করবে। এ ছাড়াও বিশুদ্ধ খাবার নিশ্চিত, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, গ্যাস, চিকিৎসাসেবা বাস্তবায়ন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ইজতেমা মাঠে স্থাপিত ১২টি উৎপাদন নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি লিটারেরও বেশি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওযু-গোসলের হাউজ ও টয়লেটসহ প্রয়োজনীয় স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পাকা দালানে প্রায় ছয় হাজারের মতো টয়লেট ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত ওযু গোসলখানা এবং টয়লেটগুলো ইতোমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষে ২০টি ফগার মেশিন দিয়ে ইজতেমা ময়দানে মশক নিধন, ইজতেমা চলাকালীন ২০টি ট্রাকের মাধ্যমে রাতদিন বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা, ইজতেমা চলাকালীন রাতদিন ২৪ ঘণ্টা সেবা কার্যক্রম, ইজতেমা ময়দানে বিনামূল্যে ৫৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মুসলি্লদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
ডেসকো' কর্তৃপক্ষ জানায়, ইজতেমা এলাকায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। উত্তরা, টঙ্গী সুপার গ্রিড ও টঙ্গী নিউ গ্রিডকে মূল ১৩২ কেভি সোর্স হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। যে কোনো একটি গ্রিড নষ্ট হলেও সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘি্নত হবে না। ইজতেমা এলাকায় ৪টি স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর এবং পাঁচটি ট্রলি-মাউন্টেড ট্রান্সফরমারও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানান, ইজতেমাস্থলে তারা একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে। যেখানে সার্বক্ষণিক কর্মকর্তাসহ ফায়ারম্যানরা অবস্থান করবেন। ময়দানের প্রতি খিত্তায় ফায়ার ইস্টিংগুইসারসহ ফায়ারম্যান, গুদামঘর ও বিদেশি মেহমানখানা এলাকায় তিনটি পানিবাহী গাড়ি, তিন সদস্যের ডুবুরি ইউনিট, একটি স্ট্যান্ডবাই লাইটিং ইউনিট এবং পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। সূত্র আরও জানায়, ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের রাস্তাঘাট ধূলামুক্ত করতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন সার্বক্ষণিক পানি ছিটানোর ব্যবস্থা হাতে নিয়েছে।
টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার জানান, টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত শয্যা ছাড়াও অতিরিক্ত শয্যা বাড়িয়ে মুসলি্লদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ মেডিকেল অফিসারদের তালিকা ও ডিউটি রোস্টার করে চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মুসলি্লদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে মুন্নু গেট, এটলাস গেট, বাটা কারখানার গেট ও টঙ্গী হাসপাতালমাঠসহ ছয়টি অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে হৃদরোগ, অ্যাজমা, ট্রমা, বার্ন, চক্ষু এবং ওআরটি কর্নারসহ বিভিন্ন ইউনিটে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ চিকিৎসা দেবেন। রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য সার্বক্ষণিক ১৪টি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ইজতেমা মাঠের দায়িত্বে নিয়োজিত মুরবি্ব গিয়াসউদ্দিন জানান, তাবলীগ জামাতের উদ্যোগে প্রতিবছর এ ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ইজতেমায় দেশি মুসলি্ল ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ থেকেই তাবলীগ জামাতের মুসলি্লরা অংশ নেন। প্রতিবারের মতো ইজতেমা মাঠের উত্তর-পশ্চিমাংশে বিদেশি মেহমানদের জন্য বিশেষভাবে টিনের ছাউনির মাধ্যমে পৃথক কামরা তৈরি করা হয়েছে।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, মুসলি্লদের নিরাপত্তায় বুধবার থেকে সাত হাজার সাতশ' পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়াও সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যাপ্ত সদস্য নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
গাজীপুর জেলা তথ্য কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার ১৫ জানুয়ারি গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বৃহত্তর জেলাগুলোর ঢাকাগামী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া দুই পর্বের আখেরি মোনাজাতের দিন গাজীপুরে বিভিন্ন সড়কেও যান চলাচল বন্ধ থাকবে।
ইজতেমায় দুই ধাপের আখেরি মোনাজাতের ১৫ জানুয়ারি ও ২২ জানুয়ারি দিন সকাল ৬টা থেকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ-টঙ্গী মহাসড়কের মাঝখান ব্রিজ থেকে স্টেশন রোড ওভারব্রিজ পর্যন্ত সড়কপথে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। টঙ্গীর কামারপাড়া ব্রিজ থেকে মুন্নু টেক্সটাইল মিল গেট পর্যন্ত সড়ক পথেও থাকবে একই নির্দেশনা।
এদিকে পন্টুন ব্রিজ নির্মাণ ও মুসলি্লদের চলাচলের সুবিধার্থে কামারপাড়া ব্রিজ থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত তুরাগ নদীর সব ধরনের নৌ-যান চলাচল নোঙর করা ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে ২২ জানুয়ারি বন্ধ থাকবে। প্রয়োজনে নৌ-যানগুলো টঙ্গী ব্রিজের পূর্ব পাশে এবং কামারপাড়া সেতুর উত্তর পাশে নোঙর করতে পারবে। ইজতেমা চলাকালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন বিভিন্ন স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে আগত মুসলি্লদের বহনকারী যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য মহাসড়ক পরিহার করে টঙ্গীর কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিল কম্পাউন্ড, মেঘনা টেক্সটাইল মিলের পাশে রাস্তার উভয় পাশে শফিউদ্দিন সরকার একাডেমি মাঠ প্রাঙ্গণ, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ, চান্দনা চৌরাস্তা হাইস্কুল মাঠ, তেলিপাড়া ট্রাকস্ট্যান্ড এবং নরসিংদী-কালীগঞ্জ হয়ে আগত মুসলি্লদের বহনকারী যানবাহন টঙ্গীর কে-টু ও নেভী সিগারেট ফ্যাক্টরিসংলগ্ন খোলা স্থান ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। উলি্লখিত সড়ক পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin