বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চার জেলায় বন্যাযাযাদি ডেস্ক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় প্রবল বর্ষণের পাশাপাশি উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে অধিকাংশ এলাকা। ছবিটি শনিবার ঢাকা-আগরতলা সড়ক থেকে তোলা _ফোকাস বাংলাটানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে চর, দ্বীপচর ও নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার সাতটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার ঘরবাড়িসহ অনেক ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম: শনিবার কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি বিপদসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে। ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের পানিও বিপদসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কুড়িগ্রাম
কার্যালয় থেকে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীতে ব্রিজ পয়েন্টে ৭২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদে চিলমারী পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৬৬ সেন্টিমিটার ও তিস্তায় পানি ২৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে।
কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের চরাঞ্চলের বেশ কিছু ঘরবাড়িতে দ্বিতীয় দফা পানি ঢুকতে শুরু করেছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদরের যাত্রাপুর, আঠারঘড়িয়া, বারোঘড়িয়া, হেমেরকুঠি, জগমোহনের চর, চর জয়কুমরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ধরলার ভাঙনে বাংটুর ঘাট, হেমেরকুঠি, সারোডোব এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ: বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা বিবেচনা করে জেলার সাতটি উপজেলার ৮৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ খান জানান, জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছে। কিন্তু উজান থেকে নেমে আস ঢল ও প্রবল বর্ষণের কারণে অনেক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। আবার কোনো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পানি উঠে গেছে। এ ছাড়া হাওর এলাকার শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে আসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, ধরমপাশা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ এবং দিরাই উপজেলার ৮৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শনিবার ও রোববারের পরীক্ষা শুরু হয়। তবে স্কুল খোলা হয়েছে।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নদনদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। নতুন করে জেলার দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ সদর, দিরাই, ধরমপাশা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। সড়ক প্লাবিত হওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার রাত থেকে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর, নবীনগর, ধারারগাঁও, পশ্চিমবাজার, মধ্যবাজার, উত্তর আরপিনগর এলাকায় সুরমা নদীর তীর উপচে ঢলের পানি ঢুকছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ জানান, তার উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। তাই পাঠদান বন্ধ আছে। সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া সুলতানাসহ তারা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। জেলা প্রশাসন থেকে এই উপজেলার জন্য তিন টন চাল ও নগদ ১০ হাজার টাকা জরুরি সহায়তা দেয়া হয়েছে। সেগুলোও বিতরণ করা হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. বোরহান উদ্দিন জানান, ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকছে। লোকজন দুর্ভোগে আছে।
তাহিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার বলেন, এই উপজেলার ১৩৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই হাওর এলাকায়। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পরীক্ষা নেননি। তবে স্কুল খোলা আছে।
পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয় থেকে জানা গেছে, শনিবার সকাল নয়টায় সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি আরও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বর্ষণ অব্যাহত আছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামরুজ্জামান বলেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। জেলার সাতটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব উপজেলায় প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম সকালে কয়েকটি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারাও মাঠে আছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: আখাউড়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তিন দিন ধরে প্রবল বর্ষণের পাশাপাশি উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল নেমে আসছে। শুক্রবার বিকালে উপজেলা সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের হাওরা নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। এতে আখাউড়া ইউনিয়নের মনিয়ন্দ, মোগড়া ও আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের কমপক্ষে ৩০ গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পানি ঢুকে পড়ায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
কসবার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের জয়নগর-ধজনগর সড়কের গোয়ালবাড়ী সেতু এলাকায় সড়ক ভেঙে গেছে। এ কারণে বেশ কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়।
গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এস এম মান্নান জাহাঙ্গীর মো. মিজান মিয়া বলেন, তার ইউনিয়নে পানিতে ডুবে একজন মারা গেছে এবং দুজন আহত হয়েছে। রাস্তা ভেঙে কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।
আখাউড়া সদর ইউপির চেয়ারম্যান মো. কামাল ভূঁইয়া বলেন, শুক্রবার ইটনা এলাকায় হাওরা নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ইটনা, আইরল, তুলাশিমুল, শৌনলোহঘর, টনকিসহ আরও কয়েকটি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।
আখাউড়ার মোগড়া ইউপির চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, তার ইউনিয়নের বাচিয়া, শান্তিপুর, নিলাখাদ, কানুয়াপাড়া, কুসুমবাগ, আদমপুর ও গোয়ালবাড়ি এলাকার বাড়িঘর ডুবে গেছে। খোলা হয়েছে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র।
আখাউড়া স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, স্থলবন্দর সড়কে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। ফলে বন্দরের কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না।
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসিনা ইসলাম বলেন, গোপীনাথপুর ও বায়েক ইউনিয়নের রাস্তা ভেঙে ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। আখাউড়ার ইউএনও মোহাম্মদ সামছুজ্জামান বলেন, দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ছয় টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দুপুরে এগুলো বিতরণ করা হবে।
লালমনিরহাট: টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার পাঁচটি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিস্তা, ধরলা, রতনাই, শনিয়াজানসহ প্রায় সব নদ-নদীর পানি বেড়ে বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা গ্রামের বুমকা এলাকায় গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ধরলা নদীর ওয়াপদা প্রতিরক্ষা বাঁধের ২০ ফুট এলাকা ভেঙে গেছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
পাউবোর লালমনিরহাট কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী রতন কুমার সরকার জানান, দুপুরে তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং কুড়িগ্রামের ধরলা পয়েন্টে একই সময় ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুপুর ১২টার দিকে ধরলা নদীর ওয়াপদা প্রতিরক্ষা বাঁধের ২০ ফুট এলাকা ভেঙে যায়।
জেলা প্রশাসক সফিউল আরিফ বলেন, সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনও এবং ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের বন্যাকবলিত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি চলছে। তবে তিস্তাবিধৌত এলাকার বন্যাকবলিত লোকজনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, জেলার পাঁচটি উপজেলার ৪৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং পাউবোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তৎপর রয়েছেন বলে তিনি জানান।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
monobhubon
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin