চাল আমদানিতে ভুল সিদ্ধান্ত, না কারসাজিসিদ্ধ চালের ভোক্তা ৯০ শতাংশ হলেও মোট আমদানির ৮০ শতাংশ আতপ চাল নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, আরও বাড়বে নভেম্বরের আগে দাম কমার সম্ভাবনা নেই শুধু আমদানি করে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা যাবে না, এটা এখন স্পষ্ট এই মুহূর্তে সরকারের গুদামে চালের মজুদ মাত্র তিন লাখ টনের মতোসাখাওয়াত হোসেন চালের দরের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে আমদানি শুল্ক সর্বনিম্নপর্যায়ে নামিয়ে আনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। মাঠপর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তা, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, নভেম্বরে বাজারে নতুন ধান আসার আগে চালের দাম স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ দু'মাস চালের দাম অল্প অল্প করে আরো কিছুটা বাড়বে। এ ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু আমদানি করে যে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা যাবে না, এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিবর্ষণ ও আগাম বন্যায় হাওরসহ উত্তরাঞ্চলের ২১ জেলায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির পর এমন সময় চালের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে, যখন ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া চালের রপ্তানি মূল্য বেশখানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে হ্রাসকৃত শুল্কে চাল আমদানি করতে আগের চেয়েও কিছুটা বেশি খরচ পড়ছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমদানিকারকরা আশানুরূপ কম দামে চাল বিক্রি করতে পারছে না।
অন্যদিকে সরকারি উদ্যোগে আমদানিকৃত চালের ৮০ শতাংশের বেশি আতপ। অথচ দেশের অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ সিদ্ধ চালের ভোক্তা। চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলের মানুষ আতপ চাল খেলেও তাদের মধ্যেও দেশীয় চালে চাহিদা বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিদেশ থেকে আমদানিকৃত আতপ চাল অস্থির বাজারে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে চাল আমদানির ক্ষেত্রে আতপের প্রাধান্য দেয়া কোনোভাবেই সঠিক হয়নি। তবে এটি সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত, নাকি বিশেষ কোনো মহলের কারসাজি তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।
বাজার পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, কোনো সিন্ডিকেটকে বিশেষ সুবিধা দিতে মোট আমদানির ৮০ শতাংশের বেশি আতপ চাল আমদানি করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তা না হলে আগামীতে চালের বাজার আরো অস্থির হয়ে উঠবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
চাল ব্যবসায়ীরা জানান, কোনো মানুষই সহজে খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে না। তাই সিদ্ধ চালের দাম না কমে শুধুমাত্র আতপ চালের দাম কমলে সবাই সেদিকে ঝুঁকবে এমনটা আশা করার সুযোগ নেই। বরং এতে ভিন্ন প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন চাল ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ।
বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান যায়যায়দিনকে বলেন, 'চলতি অর্থবছরে মোট ১৫ লাখ মেট্রিক টন চাল আনা হবে। এরমধ্যে ভিয়েতনাম থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। এর দুই লাখ টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ আতপ চাল পছন্দ করে না।'
তিনি আরো বলেন, সারা বিশ্বে চালের বাজার খুবই ছোট। শুধু দক্ষিণ-এশিয়ার কয়েকটি দেশে চাল উৎপাদন হয়। তাই কোনো দেশে সমস্যা দেখা দিলে অন্য দেশগুলো দাম বাড়িয়ে দেয়। চালের সংকট দূর করতে এ পর্যন্ত ৩৩ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির জন্য ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের সঙ্গে জিটুজি চুক্তি হয়েছে। যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ সিদ্ধ চাল রয়েছে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে চার দফায় যে এক লাখ ৭ হাজার টন চাল ভিয়েতনাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পেঁৗছেছে তা সবই আতপ। এখন পর্যন্ত জিটুজি পদ্ধতির এ ক্রয়ে এক ছটাকও সিদ্ধ চাল আসেনি। তাই স্বাভাবিকভাবে সিদ্ধ চালের বৃহৎ বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
যদিও এ নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনদের অনেকেই। তারা এ জন্য ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা অর্জনের প্রবণতাকে দায়ী করেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারিপর্যায়ে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৩৪-৩৬ টাকা। সেই চাল খুব বেশি হলে ৩৮-৪০ টাকায় বিক্রি হতে পারে। অথচ ক্রেতাদের তা কিনতে হচ্ছে ৪৩-৪৭ টাকায়।
তবে ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের মতে, ধানের মৌসুম শেষ। এখন বাজারে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী নভেম্বরের আগে নতুন ধান আসবে না। এ জন্য ধানের দাম বেড়েছে। তাছাড়া ঈদের আগে-পরে ছুটির কারণে ধান ও চাল আনা-নেয়ায় বেশি ভাড়া দিয়েও ঠিকমতো ট্রাক পাওয়া যায়নি। এতে পরিবহন ব্যয় বেশি হচ্ছে। তাছাড়া বন্যায় উত্তরাঞ্চলে চালকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এসব কারণে চালের দাম বেড়েছে।
এ ছাড়া কৃষকের ঘরে চাল না থাকাকে তারা বড় সমস্যা বলে দাবি করেছেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এই সময় কৃষকের ঘরে সাধারণত সরকারি মজুদের চেয়েও অনেক বেশি গুণ চাল মজুদ থাকে। কিন্তু এবার ফলন মার খাওয়ায় কৃষকের গোলা খালি পড়ে রয়েছে। যে কৃষক খাদ্যের যোগান দেয়ার কথা, তাদেরই এখন বাজার থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। আর এ কারণেই চালের বাজারে চাপ বেশি।
এদিকে আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনা, বাকিতে ঋণপত্র খোলার সুযোগ এবং সরকারিভাবে আমদানির পরও বাজারে চালের দামে প্রভাব না পড়ার কারণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বাবুবাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন সরকার। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, যেসব দেশ থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে- বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশে চালের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে আমদানিতে শুল্ক কমানোর কোনো সুযোগ আমদানিকারক বা ব্যবসায়ীরা নিতে পারেননি এবং এমনকি ভোক্তারাও। তিনি জানান, দেশটি ঈদের পরে চালের দাম বাড়িয়েছে। দেশেও সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি ধানের দাম দেড়শ টাকা বেড়েছে যার নেতিবাচক প্রভাব চালের বাজারে পড়েছে।
বাবুবাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি কাউসার আলম যায়যায়দিনকে বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে ধানের উৎপাদন কমেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যার কারণে শুল্ক কমিয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে চাল আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে যখন টনপ্রতি চালের দাম ভারতে ৪২০ ডলার ছিল, তখন তারা এলসি খুলতে বুকিং রেট ছিল ৩৫ থেকে ৩৬ ডলার। যখন শুল্ক কমিয়ে আনা হলো তখন থেকে বুকিং রেট বেড়ে টনপ্রতি ৬২ ডলার হয়েছে। এখন ভারতে চালের দাম টনপ্রতি ৫২০ ডলার বিক্রি হচ্ছে। তার মানে এক সপ্তাহের মধ্যে চালের দাম ভারতে টনপ্রতি ১২০ ডলার বেড়েছে। তিনি বলেন, শোনা যাচ্ছে- ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। তা যদি হয় তবে চালের বাজার আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, সরকারিভাবে যেসব চাল আনা হচ্ছে তা সবধরনের মানুষের জন্য নয়। সরকারের নিজস্ব কিছু প্রকল্প আছে যেমন ওএমএস ও টিআর কাবিখা। যদিও এখন ওএমএসও বন্ধ রয়েছে। যার কারণে সরকারের চাল আমদানিতে বাজারের কিছু আসে যায় না বা প্রভাবও পড়ে না- যোগ করেন কাউসার আলম।
তবে সরকারি-বেসরকারি আমদানি বাড়লেও চালের অস্থির বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসার জন্য সরকারের ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন আমদানিকারকরা। তাদের ভাষ্য, সরকার অনেক বেশি দামে চাল ক্রয় করার কারণে বেসরকারি পর্যায়ের আমদানিকারকদের বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। তাদেরকেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তা ছাড়া সরকার চালের ওপর শুল্ক কমানোর সংবাদে সাপ্লাইয়াররা বুকিং রেট বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে করে আমদানিকারকরা শুল্ক কমানোর সুবিধা থেকে প্রকান্তরে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে বেসরকারিপর্যায়ে বড় বড় আমদানিকারকদের কাছে অপেক্ষাকৃত ছোট আমদানিকারকরা অসহায়। চট্টগ্রামের আমদানিকারকরা মিয়ানমার থেকে চাল আমদানি করেন। সেখান থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আতপ চাল আমদানি হয়ে থাকে। যা চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকজন খেয়ে থাকেন। দেশের সাধারণ মানুষ এসব চালের ভাত খেতে অভ্যস্ত না। বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে আতপ চাল দেয়া হলে অনেকেই তা দোকানিদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বলেন, এখনো সরকারি চালের মজুদ আশানুরূপ নয়। ফলে সরকার চাইলেই প্রয়োজনীয় চাল সরবরাহ করতে পারবে না। এর সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে চালের সংকট দেখিয়ে দাম বাড়াচ্ছে। আবার বাজার তদারকিতেও সরকারের গাফিলতি রয়েছে। এসবের কারণে চালের দাম কমছে না। যে দেশে ৯০ শতাংশ মানুষ সিদ্ধ চাল খায়, সেখানে আতপ চাল কী পরিমাণ আমদানি করা উচিত সে হিসেব আগেই পর্যালোচনা করা জরুরি ছিল বলে মনে করেন তারা।
ক্যাব সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমানের ভাষ্য, এই মুহূর্তে সরকারের গুদামে চালের মজুদ রয়েছে মাত্র তিন লাখ টনের মতো। আবার বিদেশ থেকে সরকারিপর্যায়ে আমদানিও সন্তোষজনক নয়। ফলে বেসরকারিপর্যায়ে আমদানিকৃত চালের ওপর সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আর চাল আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা সে সুযোগটাই নিচ্ছে। তাদের অতি মুনাফার কারণে চালের দাম বাড়ছে।
সমাধানের পথ হিসেবে এই বিশ্লেষক বলেন, সরকারকে খুব শিগগির কমপক্ষে ৮-১০ লাখ টনের মতো চালের মজুদ বাড়াতে হবে। আর সরকারিভাবে চালের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সরকারকে ভালোভাবে বাজার মনিটরিং করতে হবে। তাহলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close