আ'লীগ এবার নির্ভারহেফাজতমুক্ত সিটি নির্বাচন!২০১৩ সালে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিপুল ভোটে পরাজিত হলেও এবার রংপুরসহ ছয়টি সিটির নির্বাচনে হেফাজত নিয়ে চিন্ত্মিত নয় ক্ষমতাসীনরাইয়াছিন রানা হেফাজতে ইসলামের অপপ্রচারের কারণে ২০১৩ সালে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিপুল ভোটে পরাজিত হলেও এবার রংপুরসহ ছয়টি সিটির নির্বাচনে হেফাজত নিয়ে চিন্ত্মিত নয় ক্ষমতাসীনরা।
আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের মতে, ২০১৩ সালের পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। সে সময় বিএনপি-হেফাজত ৫ মে রাতের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু সেটা যে অপপ্রচার ছিল, সেটা জনগণ বুঝতে পেরেছে। তাই এবার নির্বাচনে হেফাজতের কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব থাকবে না এবং বিএনপি যেন তাদের কাজে লাগিয়ে গতবারের মতো সুবিধা নিতে না পারে, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকবেন তারা।
গত সিটি নির্বাচনে হেফাজতে ইসলাম সরাসরি আওয়ামী লীগের বিপক্ষে থাকলেও দলটির নেতাদের দাবি, এবার সংগঠনটি তাদের পক্ষে রয়েছে। নেতারা বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার স্বীকৃতি, হাইকোর্টের সামনে থেকে গ্রিক মূর্তি অপসারণসহ হেফাজতের কয়েকটি দাবি সরকার মেনে নেয়ায় হেফাজতে ইসলাম এবার আওয়ামী লীগের বিরম্নদ্ধে যাবে না।
এ ছাড়া তাদের সেই আগের অবস্থানও নেই; নিজেরাই এখন নানাভাবে বিভক্ত; নেতাদের নামে দায়েরকৃত মামলাগুলো নিয়ে তারা চিন্ত্মিত এবং বিএনপির দ্বারা আশাহত।
তবে বিএনপি চাচ্ছে আবারও হেফাজতকে মাঠে নামিয়ে সুবিধা নিতে; যেটা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে আওয়ামী লীগে। কারণ, এক হেফাজতের ট্রামকার্ডে গতবার ফলাফল উল্টে তাদের মেয়র প্রার্থীদের নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে পরিণত হয়েছিল বলে মনে করেন সে সময়ের মেয়র প্রার্থী এবং দলীয় নেতারা।
সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বরিশাল বাদে অন্যান্য সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থীদের সঙ্গে হেফাজতের স্থানীয় নেতারা যোগাযোগ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনগুলোতে হেফাজতে ইসলাম কোনো আলোচনায় নেই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, উপরোক্ত পাঁচ সিটির নির্বাচন ৫ মে'র সামান্য আগে অথবা পরে অর্থাৎ আগামী বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে বিধায় সংগঠনটি নিয়ে ভোটের রাজনীতিতে চলছে মেরম্নকরণ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা চাচ্ছেন সংগঠনটির সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিতে।
উলেস্নখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ ও তাদের সরিয়ে দিতে পুলিশ,র্ যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানের পর ১৫ জুন একযোগে অনুষ্ঠিত হওয়া খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। এরপর ৬ জুলাই গাজীপুর সিটির নির্বাচনেও পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এর আগে ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর রংপুর সিটির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্মর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়। সে সময় আওয়ামী লীগের বিরম্নদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি-হেফাজতকে বলা হয়, ৫ মে'র ঘটনার রাতে যৌথ অভিযানে হাজার হাজার হেফাজতকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় ৫ এবং ৬ মে দুদিন সারাদেশে ২৮ জন নিহত হয়েছিল। আর রাতে পুলিশ,র্ যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানের পর পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ নিহতের সংখ্যা ৩৯ জন বলে জানানো হয়েছিল।
গত সিটি নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বলেন, নির্বাচনগুলোতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পেছনে হেফাজতে ইসলামই ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করেছিল। বিএনপির প্রার্থীদের তুলনায় জনপ্রিয়তায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু হেফাজতের অপপ্রচারে সবাই হেরে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা যায়যায়দিনকে বলেন, 'গতবার আসলে কপাল খারাপ ছিল। জয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু ৫ মে'র ঘটনার পর সবকিছুই যেন আশ্চর্যজনকভাবে উল্টে যায়। পরিস্থিতি দেখেই বুঝে ছিলাম, এবার সময় ভালো না, সব শেষ। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না। তবে এবার হেফাজত আমাদের পক্ষে।'
আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের মতে, হেফাজতের ভোট সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু জনসাধারণ মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের সম্মান করে বিধায় তাদের অপপ্রচারে গতবার জনমনে প্রভাব ফেলেছিল। নির্বাচনে ধর্মীয়ভাবে যখন কারও বিরম্নদ্ধে কথা বলা হয়, কাউকে কোণঠাসা করা হয়, তখন এর বিপক্ষে কোনো যুক্তিই কাজ করে না। তাই এবার ধর্মীয় বিতর্কের দিকে যেতে চায় আওয়ামী লীগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সম্পাদকম-লীর সদস্য যায়যায়দিনকে বলেন, 'হেফাজত ভোট না দিক, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বিপক্ষে যেন তারা প্রচারণা না চালায় সে ব্যবস্থা করাটাই হবে মূল কাজ।' তিনি আরও বলেন, 'হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা আওয়ামীবিরোধী হলেও স্থানীয় নেতারা আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং সবাই দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছেন। তাই কেন্দ্রীয় নেতারা যেন স্থানীয় নেতাদের প্রভাবিত করতে না পারে অথবা কোনো ফতোয়া দিয়ে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের আওয়ামী লীগের বিরম্নদ্ধে না নামাতে পারে, সে জন্য সচেষ্ট থাকবে দল।'
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ যায়যায়দিনকে বলেন, গতবারের পরিস্থিতি আর বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। ২০১৩ সালে হেফাজত যে অপপ্রচার চালিয়েছিল, সেটা জনগণের কাছে পরিষ্কার। তাদের দ্বারা এবার জনগণ বিভ্রান্ত্ম হবে না।
সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম যায়যায়দিনকে বলেন, জামায়াত ও হেফাজত একই সূত্রে গাঁথা। মিডিয়াতে অনেক প্রচারণা হলেও তাদের প্রকৃত ভোট সংখ্যা খুবই কম। ভোট সংখ্যা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
সভাপতিম-লীর সদস্য কর্নেল (অব.) ফারম্নক খান যায়যায়দিনকে বলেন, দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার কারা স্বাধীনতার পক্ষে আর কারা বিপক্ষে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ হেফাজতের ভোটের আশা করে না।
নির্বাচনের বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনায়েদ আহমেদ বাবুনগরী বলেন, 'হেফাজত কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কাউকে কোনো নির্বাচনে মনোনয়ন দিবে না। রাজনৈতিক কোনো মোর্চার সঙ্গে হেফাজতের কোনো সম্পর্ক নেই। হেফাজত মুসলমানদের ইমান-আক্বিদা রক্ষার সংগ্রামের একটি অরাজনৈতিক বৃহত্তম সংগঠন। আমরা আমাদের এই ইমানি আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে সদা প্রস্তুত রয়েছি।'
মামলা নিয়ে দুশ্চিন্ত্মায় হেফাজত
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের সমাবেশকে ঘিরে সংঘটিত তা-ব-পরবর্তী মামলার আসামি হেফাজত নেতারা। এসব মামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কিছুটা কৌঁসুলি ভূমিকা নিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
১১ এপ্রিল রাতে গণভবনে কওমি সনদের স্বীকৃতি ছাড়াও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে নেতাদের বক্তব্যে। জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর হেফাজতের আহ্বায়ক নূর হোসাইন কাসেমীসহ নেতারা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সে সময় হেফাজতে ইসলামের আমির ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সভাপতি আলস্নামা শাহ আহমদ শফীসহ ৩০০ জন আলেম গণভবনে উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রে জানা যায়, ৫ মে'র ঘটনায় ঢাকাসহ পাঁচ জেলায় মোট ৮৩টি মামলা হয়, যাতে আসামি করা হয় ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে। আসামির তালিকায় তিন হাজার ৪১৬ জনের নাম উলেস্নখ করা হয়। আসামিদের মধ্যে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সঙ্গে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের নামও রয়েছে।
এসব মামলার মধ্যে পুলিশ ১৫টিতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। এর মধ্যে কেবল বাগেরহাটে একটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে, এতে সব আসামি খালাস পেয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর রমনা, মতিঝিল, ওয়ারী ও তেজগাঁও এলাকায় মোট ৫৩টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে চারটির অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে, বাকি ৪৯টি মামলা তদন্ত্মাধীন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এবার সিটি নির্বাচনকে অগ্নি-পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন তারা। ইতোমধ্যে ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের বিধান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৮ মার্চ থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে গাজীপুর, ১৩ মার্চ থেকে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সিলেট, ৩০ মার্চ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে খুলনা, ৯ এপ্রিল থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে রাজশাহী এবং ২৭ এপ্রিল থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা। আগামী বছরের মার্চ কিংবা এপ্রিল থেকে দুই দফায় এই পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চিন্ত্মাভাবনা হচ্ছে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin