আ'লীগের ঘাঁটিতে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপজহিরম্নল হক টিটু পিরোজপুর থেকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে পরিচিত পিরোজপুর-১ আসন। জেলা সদরকেন্দ্রিক এই আসনে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তৎপরতা শুরম্ন করেছেন। চায়ের টেবিল থেকে শুরম্ন করে বিভিন্ন হোটেল, রেস্ত্মরাঁ, সভা-সমিতিতে চলছে ভোটের আলোচনা-সমালোচনা।
পিরোজপুর-১ আসনের নির্বাচনী এলাকা বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই আসনের নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাস করা হয়। সে সময় পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর এবং নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলা নিয়ে এই আসন গঠন করা হয়। এর আগে এই আসনটি ছিল জিয়ানগর উপজেলা (বর্তমান ইন্দুরকানী উপজেলা), পিরোজপুর সদর ও নাজিরপুর উপজেলা নিয়ে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এই (পিরোজপুর সদর-নাজিরপুর-নেছারাবাদ) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা যার সবচেয়ে ভালো হবে, তিনিই পাবেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন- এটা এই নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের ধারণা। এ ক্ষেত্রে সংসদীয় আসনে পুরনো অনেক প্রার্থী নানা ইমেজ সংকটে পড়েছেন। ফলে এবার নতুন অনেক প্রার্থী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলীয় মনোয়ন পেতে কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ শুরম্ন করেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং এর আগের বার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।
এবার অনেক নতুন প্রার্থী এই আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে ব্যানার, ফেস্টুন এবং বিভিন্ন শুভেচ্ছা পোস্টার দিয়ে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের যে যার অবস্থান সাধারণ ভোটাদের কাছে তুলে ধরতে বছরের বিশেষ দিনগুলোতে, আবার দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে যারা নৌকার সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারেন, তারা হলেন- পিরোজপুর পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ মো. হাবিবুর রহমান মালেক, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ শাহ আলম, বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এ.কে.এম.এ আউয়াল, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন-বিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ. ম রেজাউল করিম, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক এমপি এবং বিশিষ্ট আইনজীবী প্রয়াত এনায়েত হোসেন খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ এ্যানি রহমান, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ সাকিব বাদশা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ আহ্বায়ক, পিরোজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং '৯০ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পিরোজপুর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক শফিউল হক মিঠু।
অপরদিকে বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটও বসে নেই। তারাও যে যার মতো প্রচারণা চালাচ্ছেন। দলীয় সূত্র বলছে, আগামী নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে জেলা বিএনপি থেকে অন্ত্মত অর্ধ ডজন নেতা মনোনয়ন চাইতে পারেন। এরা হলেন- জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নুরম্নজ্জামান বাবুল, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি নাজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নজরম্নল ইসলাম খান, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ফকরম্নল আলম ও জেলা বিএনপির সদস্য ব্যারিস্টার মেজর (অব.) এম. সরোয়ার হোসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মী জানান, বর্তমানে পিরোজপুর জেলা বিএনপিতে শক্তিশালী কোনো প্রার্থী নেই। সে ক্ষেত্রে ২০-দলীয় জোটের শরিক দলের প্রার্থী হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃতু্য দ-িত এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী বা তার মেজ ভাই শামীম সাঈদী কিংবা জাতীয় পার্টির একটি অংশের মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মোস্ত্মফা জামাল হায়দার মনোনয়ন পেতে পারেন বলে মাঠে গুঞ্জন চলছে।
এ ছাড়া আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপির প্রার্থী হিসেবে নজরম্নল ইসলামের নাম শোনা গেলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি কাকে প্রার্থী করবে, তা এখনো নিশ্চিত নন। এ ছাড়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এম.এ জব্বারের মৃতু্যতে কে প্রার্থী হবেন, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সিপিবির জেলা শাখার সভাপতি ডা. তপন বসু রয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায়।
এদিকে কয়েক ভাগে বিভক্ত জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রম্নয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী জয়লাভ করেনি। ১৫ ফেব্রম্নয়ারির নির্বাচনে এমপি হন জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি গাজী নুরম্নজ্জামান বাবুল। তবে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম এবং ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের অষ্টম জাতীয় সংসদ- এই দুটি নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী দাঁড়িপালস্না প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন।
পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জেলা আওয়ামী লীগকে তিনিই সংগঠিত করেছিলেন। দীর্ঘ বছর জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদ দখল না করে দলীয় সব কর্মসূচিতে অকুণ্ঠ সহযোগিতা দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদ-আপদ বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। আজ যখন স্থানীয় এমপি দলের নেতাকর্মী ও জনগণের আস্থা হারিয়েছেন তখন আবার আওয়ামী লীগের হাল ধরেছেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন। নেত্রী যদি মনোনয়ন দেন, তাহলে ইনশাআলস্নাহ দলকে বিজয় উপহার দেবেন।
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক, পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সদস্য শ. ম রেজাউল করিম বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছেন। ১৯৮০ সালে খুলনা-দৌলতপুর সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি, ১৯৮১ সালে খুলনা কৃষি কলেজের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে অদ্যাবধি জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন-বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম এ আউয়াল বলেন, এই আসনকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাত থেকে ফিরিয়ে এনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিয়েছেন। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বাড়ির এলাকা হলেও জামায়াতকে এই এলাকা থেকে উৎখাত করে আওয়ামী লীগের একটি নগরে তৈরি করেছেন। আগামীতে প্রধানমন্ত্রী ও সভানেত্রী শেখ হাসিনা যদি আবার মনোনয়ন দেন, তাহলে পুনরায় এই আসনটি আওয়ামী লীগের হয়ে তাকে উপহার দিতে পারবেন।
পিরোপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক, প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিউল হক মিঠু বলেন, আগামী নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি যাকে নমিনেশন দেবেন তারা তার পক্ষে কাজ করবেন এবং এই আসন থেকে দলীয় প্রার্থীর জয়লাভের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন ইনশালস্নাহ।
পিরোজপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও নাজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নজরম্নল ইসলাম খান বলেন, পিরোজপুরে বর্তমানে সাংগঠনিক অবস্থা ভালো না, তবে বিচ্ছিন্নভাবে জেলা সদরে ও বিভিন্ন উপজেলায় আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীরা যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে জেলা বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ও বিভিন্ন উপজেলার অনেক নেতাকর্মীর নামে এই সরকারের আমলে মামলা হয়েছে। এর ফলশ্রম্নতিতে আন্দোলন-সংগ্রাম আশানুরূপভাবে বাস্ত্মবায়িত হয়নি। এরপরও দেশের জাতীয় রাজনীতির কারণে জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষের ব্যাপক জনসমর্থন আছে বলে আশা করেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং জনগণের কাছে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মনোনয়ন দিলে তারা এই আসনে জয়লাভ করতে পারবেন বলে আশা করেন।
জেলা বিএনপির সদস্য মেজর (অব.) ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেন বলেন, বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে তিনিসহ তাদের অনেক নেতাকর্মীর নামে অসংখ্য মিথ্যা মামলা হয়েছে। মাসের পর মাস তাদের জেল খাটতে হয়েছে। কিন্তু জেলা বিএনপির সভাপতি গাজী নুরম্নজ্জামান বাবুল, সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন কোনো মামলার আসামি হননি। তারা আওয়ামী লীগের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, জেলা বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নেই। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্র সঠিক সিদ্ধান্ত্ম না নিলে অবস্থার উত্তরণ ঘটবে বলে মনে হয় না।
পিরোজপুর জেলা বিএনপি সহ-সভাপতি মো. ফকরম্নল আলম জানান, পিরোজপুরে বিএনপিকে শক্তিশালী করতে হলে নতুন নেতৃত্ব আনতে হবে।
প্রসঙ্গত, জেলার ৭টি উপজেলা ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ৩টি আসন। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় ব্যাপক পরিবর্তন হয় জেলার ৩টি নির্বাচনী এলাকার সীমানা। সীমানা পুনর্বিন্যাস হওয়ায় পাল্টে গেছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পূর্বের হিসাব-নিকাশ।
 
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
শেষের পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin
close