পূর্ববর্তী সংবাদ
পরিবহন খাত ৩ দলের ২৫ নেতার দখলেযাযাদি রিপোর্ট রাজধানীতে পরিবহন সঙ্কটের কারণে ঘরমুখো মানুষকে এভাবে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয় -যাযাদিদেশের পরিবহন ব্যবসা ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ২৫ নেতার দখলে। যে দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন সে দলের নেতারাই এ খাত নিয়ন্ত্রণ করেন। পরিবহন ব্যবসার পাশাপাশি শ্রমিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও চলে যায় ক্ষমতাসীন দলের হাতে। আবার কখনো কখনো নিজেদের স্বার্থে মিলেমিশে নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে নেন তারা। ফলে সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীরা তাদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকেন।
এ অবস্থায় প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অনেকেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। চাপে পড়ে কেউ কেউ গোটা ব্যবসা ক্ষমতাসীন নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। পরিবহন ব্যবসার লাভ-ক্ষতি পুরোপুরি রাজনৈতিক নেতাদের মর্জির ওপর নির্ভর করায় তারা নতুন করে এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই এ খাতে উন্নয়নের পরিবর্তে দিন দিন ধ্বংসের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে।
সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন সেক্টরের দখলদার রাজনৈতিক নেতাদের চাপ খোদ সরকারই সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের আবদারের (!) মুখে কোনো কোনো রুট থেকে বিআরটিসির বাসও তুলে নিতে হচ্ছে। সরকারি কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত হলেই তারা জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, এমনকি পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিচ্ছে। এ অবস্থায় পরিবহন খাতে নেয়া সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে গণপরিবহনে যাত্রীসেবা শূন্যের কোটায় এসে পেঁৗছেছে। রাজধানীসহ সারাদেশে অনেক জায়গায় বিআরটিসির বাস বন্ধ হয়ে গেছে।
সাধারণ পরিবহন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলের নেতারা এক-দুইটি বাস কিনে মালিক সমিতির নেতা বনে যান। আবার কখনো কখনো শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হয়ে পরিবহন সেক্টরে আধিপত্য বিস্তার করেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ার সুবাদে প্রকৃত পরিবহন ব্যবসায়ীদের পেছনে ফেলে নেতৃত্বের হাল ধরেন। এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি তুললেই দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা সহজেই তাদের কাছে নতিস্বীকার করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ভাই আলী কবির চাঁন 'দ্রুতি' পরিবহনের মালিক। তিনিই আবার বর্তমানে বাংলাদেশ বাস, ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি নিজে শ্রমিক ইউনিয়ন করলেও তার ভাই বাচ্চু খান 'সার্বিক' পরিবহনের মালিক। মন্ত্রীরও ওই পরিবহন ব্যবসায় অংশিদারিত্ব রয়েছে। শাজাহান খানের শ্যালক একটি বাসের সামান্য অংশিদারিত্ব নিয়ে যাত্রাবাড়ী-মিরপুর রুটের 'শিখর পরিবহনের' এমডি সেজে বসে আছেন। বর্তমান সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় চালু হয় শাজাহান খানের ভাইয়ের মালিকানাধীন 'কনক' পরিবহন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক এমপি মির্জা আব্বাস ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম 'ঢাকা পরিবহনের' মালিক। বিএনপির অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি জিএম সিরাজ 'এসআর পরিবহনের' মালিক। 'হানিফ পরিবহনের' মালিক সাভারের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন ও তার ভাই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি হানিফ। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এসএ খালেকের পরিবহনের নাম খালেক এন্টারপ্রাইজ।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা জানান, বিএনপি আমলে মূলত মির্জা আব্বাস, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, এসএ খালেক, জিএম সিরাজ ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খানের বাবা হবিবুর রহমান খানকে পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে।
আর এখন আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। শ্রমিকনেতা হলেও তার পরিবারের পরিবহন ব্যবসা আছে। বাসভাড়া নির্ধারণের বৈঠকে যোগাযোগমন্ত্রীর চেয়ে তার কথাই বেশি গুরুত্ব পায়। সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভূমিকা কী হবে, সেটাও অনেকটা নির্ধারণ করে দেন তিনি।
এদিকে মহাজোটের শরিক দল হিসেবে পরিবহন ব্যবসা থেকে পিছিয়ে নেই জাতীয় পার্টিও। জাতীয় পার্টির রংপুরের নেতা এমপি মসিউর রহমান রাঙ্গা সঞ্চিতা পরিবহনের মালিক। রংপুরের বাস মালিক সমিতির সভাপতিও তিনি। জাতীয় পার্টির অপর নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ এসএ পরিবহনের মালিক। ঢাকা-ফেনী পথে চলাচলকারী স্টারলাইন পরিবহনের স্বত্বাধিকারী আলাউদ্দিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
বাস মালিক হলেও বিএনপি নেতা সাদেকুর রহমান হিরু এবং শ্রমিক লীগ নেতা শহীদুল্লাহ সদু মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়ে বসে আছেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মহাখালী বাস টার্মিনালে পরিবহন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন বিএনপি নেতা হিরু। বর্তমানে তিনি শহীদুল্লাহ সদুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পরিবহন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন বাস মালিক সমিতির সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুল আলম মোল্লা। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার ভাতিজা হওয়ার সুবাদেই তিনি এই সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে পটপরিবর্তনের প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও গাবতলী টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ এখনো নিতে পারেনি ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। বিএনপি দলীয় সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর আস্থাভাজন নেতা, শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি আব্বাস উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান সেখানকার পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এছাড়া প্রতিটি জেলা উপজেলা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যন্ত মালিক-শ্রমিক সমিতির অধিকাংশ নেতা আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক দলের নেতারাই পরিবহন সেক্টরে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের আমলে শাজাহান খানের ডান হাত হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ। পরিবহন খাতের ভাড়া নির্ধারণ থেকে শুরু করে এই খাতের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও সংশোধনসহ সব বৈঠকে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়।
মিরপুর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত চলাচলকারী 'বিহঙ্গ' পরিবহনের চেয়ারম্যান স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ। বর্তমান সরকারের আমলে এই কোম্পানির বাস নামানোর অনুমতি দেয়া হয়। অভিযোগ আছে, ওই পথে আগে থেকেই ইউনাইটেড কোম্পানির বাস চলাচল করত। রীতি অনুযায়ী একই যাত্রা ও গন্তব্যে একাধিক কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়া হয় না। বিহঙ্গের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয়নি।
আজিমপুর-টঙ্গী পথে চলাচলকারী 'দুলদুল' পরিবহনে একজন মন্ত্রীর বাস আছে বলে জানা গেছে। হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর চাচাত ভাই মনির চৌধুরীর বাস আছে আজিমপুর থেকে আবদুল্লাহপুর পথে চলাচলকারী 'সূচনা বিআরএফ' পরিবহন। সূচনা বিআরএফ একটি কোম্পানি এবং এতে অন্য আরো অনেক মালিকের বাস আছে।
এদিকে পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের চাপে সরকার পরিচালিত বিপুলসংখ্যক বিআরটিসির বাস বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্টরা তা অস্বীকার করেছেন। অতিরিক্ত লোকসান হওয়ায় এসব বাস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআরটিসির বাস বন্ধ হওয়ার পর ওইসব রুটে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বাস চলাচল করছে এবং তারা যথেষ্ট মুনাফা অর্জন করছেন।
পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা জানান, মিরপুর-১১ নাম্বার থেকে আবদুল্লাহপুর পথে বিআরটিসির প্রায় ২৫টি বাস চলত। কিন্তু হঠাৎ করেই তা বন্ধ হয়ে যায়। বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, একই পথে নৌমন্ত্রীর ভাই আজিজুর রহমান খানের কোম্পানি 'কনক পরিবহনের' বাস চলাচল করে। আজিজুর রহমান খান এই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। শাজাহান খান মন্ত্রী হওয়ার পর এই পরিবহন কোম্পানিটি চালু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, শাজাহান খানের চাপেই বিআরটিসি এই পথে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ বিআরটিসির বাস চালু হওয়ার পর এই কনক পরিবহনে যাত্রী কমে যায়। চালুর পর থেকেই তাই কনক পরিবহনের পক্ষ থেকে পথটি বন্ধ করার চাপ ছিল।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, 'আমি এই রুটটি সম্পর্কে কিছুই জানি না। সুতরাং এ ব্যাপারে চাপ দেয়ার প্রশ্নই আসে না।'
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
monobhubon
প্রথম পাতা -এর আরো সংবাদ
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নজঙ্গিবাদ নিয়ে মন্ত্রীদের প্রচারে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে_ বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনের এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2015 The Jaijaidin