logo
শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  রফিক মজিদ, শেরপুর   ০৪ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

কৃষি পযর্টনে সম্ভাবনাময় শেরপুর

কৃষি পযর্টনে সম্ভাবনাময় শেরপুর
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর মনকাড়া চিত্র-বৈচিত্র্যে ভরা। যে মৌসুমই আসুক না কেন সবুজ আর সজীবতার যেন শেষ নেই। আর এর মধ্যেও আছে নানা বৈচিত্র্যের সমাহার। কবির ভাষায় চোখ মেলে দেখেছি ‘ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে, কোথায় এমন হরিৎ ক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে’। কিংবা সকালের দিকে ধানের ফুল ফোটার শব্দ কেউ কি কান পেতে শুনেছি? কেউ কি দেখেছি সকালের সূযোর্দয়ের সময় ধানক্ষেতের পশ্চিমে দঁাড়িয়ে পুবের দিকে মাকড়শার জালের অপূবর্ কারুকাযর্! কিংবা শীতকালীন সবজি ক্ষেতে সকালের শিশির বিন্দু। হয়তো দেখেছি আসা-যাওয়ার পথে। কিন্তু দেখিনি দেখার মতো করে। মনের মাধুরী মিশিয়ে কল্পনা করিনি কোনো কিছুর সঙ্গে। দিনাজপুরের লিচু ভালো, রাজশাহীর আম, সিলেটের চা ভালো, পাবর্ত্য চট্টগ্রামের জাম। নরসিংদীর কলা ভালো, বগুড়ার দই। আর শেরপুরের ব্র্যান্ডিং হয়েছে ‘তুলসী মালার সুগন্ধে, পযর্টনের আনন্দে’। একেক অঞ্চল একেকটি ঐতিহ্যবাহী ফসল নিয়ে কৃষি পযর্টন হতে পারে। শহরের তরুণরাও এসব স্পটে দল বেঁধে ভ্রমণ করতে পারে। এতে তারা কৃষির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে পাশাপাশি, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে নিমর্ল আনন্দ পাবে।

শেরপুরের সম্ভাবনাময় কৃষি পযর্টন স্পট

শেরপুর জেলায় একসময় প্রায় ৭টি নদী, ২০টি খাল ও অধর্শত বিল ছিল, বতর্মানে সেসব বিলের খুব একটা অস্তিত্ব না থাকলেও যে টুকু আছে বষার্য় কিছুটা চোখে পড়ে। এসব জলাশয়ে নৌকা করে ঘুরে বেড়ানো, পাখি দেখা, মাছ ধরার, জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরার সুযোগ, নৌকাবাইচ দেখা এবং নৌকা চালানো বেশ আকষর্ণীয়। ধানের জেলা হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম জেলা হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠেছে শেরপুর জেলা। বছরে তিনটি ধানের আবাদের মৌসুমে দুগন্তজুড়ে সোনালি ফসলের সমারোহে যে কোনো মানুষের মনে দোলা দিয়ে যায়। ধান যখন পেকে সোনালি বণর্ ধারণ করে তখন জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশ দিয়ে চালাচলরত যে কোনো পেশার পথিকের মন ছুঁয়ে যায় পাকা ধানের মম গন্ধে। জেলার চরাঞ্চলের পাশাপাশি গারো পাহাড় এলাকায় পাহাড়ঘেঁষা ধান ক্ষেতে বাতাসের দোলা দেখলে ক্ষণিকের জন্য হলেও যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ থমকে দঁাড়াবে।

শীত মৌসুমে জেলার সদর উপজেলার চরাঞ্চলের কিছু এলাকা এবং নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা এবং উরফা ইউনিয়নে সরিষার ব্যাপক ফলন হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সরিষার ফুল এলে দিগন্তজুড়ে মম গন্ধ ছড়িয়ে যায়। এ সময় দু’চোখ যে দিকে যায় শুধু হলুদ আর হলুদের সমারোহ। এ যেন হলুদ গালিচায় প্রকৃতি সাজে নতুন সাজে। সরিষা মৌসুমে সরিষা ক্ষেতের পাশেই মৌমাছি পালনকারীদের মধু সংগ্রহ দেখা ও টাটকা মধু খাওয়া, স্বল্পমূল্যে পযর্টকদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করা পযর্টকদের আকৃষ্ট করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। শীতের সবজিতে শেরপুর জেলার জুড়ি নেই। বিশেষ করে শীতের সবজি চাষাবাদের সময় জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে শত শত একর জমিতে টমোটো, ফুলকপি, বঁাধাকপি, সিম, বেগুন, মটরশুঁটি, মাশকালাইসহ নানা শীতকালীন সবজির আবাদ হয়। এসব সবজি ক্ষেতের থোকা থোকা বিভিন্ন টাটকা সবজি দেখে মন জুড়িয়ে যায়।

শীতকালীন সবজি ছাড়াও গ্রীষ্মকালীন সবজির পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে এগ্রো-ফিশারিজ ফামর্, মালটা, কমলা, বিভিন্ন প্রজাতির লেবু বাগান, নকলা উপজেলার টালকি ইউনিয়নের রামেরকান্দি গ্রামে সমতলের চা বাগান, সীমান্তবতীর্ গারো পাহাড় এলাকায় বষার্কালীন সবজি চাষের পাশাপাশি সম্প্রতি শুরু হয়েছে চা চাষ। এ ছাড়া জেলার বিভিন্নস্থানে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে রয়েছে আম, জাম, লিচু, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন মিশ্র ফল বাগান, ফলজ, ঔষুধি, বনজ গাছের মনোরম নাসাির্র, বিভিন্ন গাছ-গাছালির অকির্ড বাগান উল্লেখযোগ্য। শহরের প্রাণকেন্দ্রের নয়আনী বাজার ডিসি অফিসের চারপাশে লেকবেষ্টিত ছায়াসুনিবিড় পরিবেশে ডিসি চত্বর। কৃষি পযর্টন এলাকায় রকমারি সুন্দর সুন্দর ফুল ফোটা সবজি ক্ষেত পরিদশর্ন করা, আন্তঃপরিচযার্, সংগ্রহ ও সবজির চাষ কৌশল দেখা, থোকা থোকা বিভিন্ন ফলের ঝুলে থাকা দৃশ্য কার না ভালো লাগবে।

সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়াতে জেলার নালিতাবাড়িতে দুইটি, নকলায় একটি এবং ঝিনাইগাতীতে একটিসহ মোট ৪টি বিভিন্ন নদীর ওপর রাবার ড্যাম বা বঁাধ তৈরি করা হয়েছে। এ রাবার ড্যামের পাশে বসে ঝরনার জলের মতো ড্যামের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি দেখে অনেকেই নেমে পড়ে সে পানিতে। ড্যামের পাশেই বিভিন্ন গাছের ছায়াতলে কোথায় কোথাও স্থাপন করা হয়েছে বেঞ্চ। এসব বেঞ্চে বসে বিকালের সোনালি রোদ্দুরের সঙ্গে ড্যামের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানির কলতান শুনলে ক্ষণিকের জন্য হলেও জীবনের অনেক কষ্ট ভুলে থাকা যাবে। এসব স্থানে ইতোমধ্যে স্থানীয় এবং জেলার বাইরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভ্রমণে আসছে। দল বেঁধে বেড়াতে যাচ্ছে বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।

কৃত্রিমভাবে তৈরি পাহাড়ের এবং সমতলে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন পিকনিক বা পযর্টন স্পট দেখতে দেখতে মানুষ অনেকটা হাফিয়ে উঠছে। প্রকৃতির নিমর্ল বাতাস আর মৌসুমভিত্তিক জেলার বিভিন্ন কৃষি পযর্টন এলাকায় বিভিন্ন ফসলের মম গন্ধ যেন জীবনকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলে। তাই আগামী প্রজন্মের কাছে কৃষি পযর্টনের প্রতি দিন দিন আকষর্ণ বাড়ছে।

জেলায় রয়েছে কৃষিনিভর্র ও কৃষিভিত্তিক অটোমেটিক রাইস মিল, হিমাগার, মুড়ি ও চিড়া তৈরি কারখানাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরি ফ্যাক্টরি ও ইন্ডাস্ট্রি। এসব ফ্যাক্টরিতে চলমান কাযর্ক্রম পরিদশর্ন করা, চরাঞ্চলের কৃষি ও চরের সংগ্রামী মানুষের কৃষি কমর্কাÐ পরিদশর্ন করা এবং তাদের সঙ্গে কাজে অংশগ্রহণ করা আনন্দের নতুন মাত্রা যোগ করবে। এগ্রো-ফিশারিজে কৃষি খামার পরিদশর্ন, পাহাড়িদের কৃষির সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও তাদের কাজের সঙ্গে অংশগ্রহণ করা, কোনো সফল কৃষকের কমর্কাÐ পরিদশর্ন, তার সফলতার কাহিনীর বণর্না শোনা ইত্যাদি কৃষি পযর্টনের আকষণ হতে পারে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে