logo
বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  এস এম মুকুল   ১৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

হালদায় হরেক সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অসংখ্য নদী থেকে হালদা নদীর বিশেষ পাথর্ক্য মূলত পরিবেশগত। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম ছাড়ার উপযোগী প্রতিটি মাছের ওজন সবির্নম্ন পঁাচ কেজি থেকে সবোর্চ্চ এক মণ পযর্ন্ত হয়। এসব মাছ ডিম দেয় একসঙ্গে ৫ থেকে ৪০ লাখ পযর্ন্ত।

হালদাকে অঁাকড়ে থাকা প্রায় তিন হাজার জেলে পরিবারসহ জড়িয়ে আছে ২০ হাজার মানুষের জীবিকায়ন। নদী গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের অসংখ্য নদী থেকে হালদা নদীর বিশেষ পাথর্ক্য মূলত পরিবেশগত। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিম ছাড়ার উপযোগী প্রতিটি মাছের ওজন সবির্নম্ন পঁাচ কেজি থেকে সবোর্চ্চ এক মণ পযর্ন্ত হয়। এসব মাছ ডিম দেয় একসঙ্গে ৫ থেকে ৪০ লাখ পযর্ন্ত। বতর্মানে হালদা নদীতে মিঠা পানির ডলফিনসহ ৬০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। জানা গেছে, পঞ্চাশের দশকে দেশের মোট চাহিদার ৭০ ভাগেরও বেশি পোনার চাহিদা পূরণ করত এই হালদা। আগে হালদার যে পরিমাণ মাছ ও ডিম পাওয়া যেত এখন তার এক-চতুথাংশও মেলে না।

হালদা সম্পকের্

হালদা খালের উৎপত্তিস্থল মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ি গ্রাম সালদা। সালদার পাহাড়ি ঝণার্ থেকে নেমে আসা ছড়া সালদা থেকে নামকরণ হয় হালদা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূবার্ঞ্চলে খাগড়াছড়ি পাবর্ত্য জেলার রামগড় পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে মানিকছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বুড়িশ্চরের নিকট কণর্ফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। হালদার দৈঘর্্য প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। পানির উৎস মানিকছড়ি, ধুরং, বারমাসিয়া, মন্দাকিনী, লেলাং, বোয়ালিয়া, চানখালী, সত্তার্, কাগতিয়া, সোনাইখাল, পারাখালী, খাটাখালীসহ বেশকিছু ছোট ছোট ছড়া। নদীটির গভীরতা স্থান বিশেষ ২৫ থেকে ৫০ ফুট। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছেÑ হালদায় এক সময় ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কালপরিক্রমায় পাঙ্গাশ, ঘনি চাপিলা, কৈপুঁটি, বাণী কোকসা, ঘর পুঁইয়া, গুইজ্জা আইড়, বুদ বাইলাসহ অন্তত ১৫টি প্রজাতির মৎস্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জানা গেছে, ১৯৪৫ সালে শুধু হালদা থেকেই ৫০০০ কেজি রেণু সংগ্রহ করা হতো। এক সময় হালদায় ২০-২৫ কেজি ওজনের কাতলা, ১২-১৫ কেজি ওজনের রুই এবং ৮-১০ কেজি ওজনের মৃগেল পাওয়া যেত যা এখন কালেভদ্রে চোখে পড়ে। মৎস্য অধিদপ্তরের সংকলন-২০১৩ থেকে জানা যায়Ñ হালদা থেকে ১৯৪৫ সালে সংগৃহীত ডিম ১,৩৬,৫০০ কেজি এবং ৬৫ বছর পর ২০১১ সালে সংগৃহীত ডিম ১৩০৪০ কেজি।

প্রাকৃতিক এগ্রো মেগা ইন্ডাস্ট্রি

হালদা নদী বাংলাদেশের সাদা সোনার খনি হিসেবেও পরিচিত। জনশ্রæতি আছেÑ হালদা নদী থেকে প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা জাতীয় অথর্নীতিতে যোগ হতো। এ নদী শুধু মৎস্য সম্পদের জন্য নয়, যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উৎস। হালদা বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, হালদার ৫ কেজি ওজনের ডিমওয়ালা একটি মাছ থেকে বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। তাই অপার সম্ভাবনাময় এ নদীকে ঘিরে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে জাতীয় অথর্নীতিতে শত কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনাকে অবহেলা করা ঠিক নয়। জেনে রাখার মতো বিষয় হলোÑ ডিম থেকে উৎপাদিত রেণুু পোনা থেকে মাছ হিসেবে খাবার টেবিলে আসা পযর্ন্ত দেশের মৎস্য খাতে হালদা নদী চার ধাপে আমাদের জাতীয় অথর্নীতিতে অবদান রাখে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হালদায় বতর্মানে মাছ যে পরিমাণে ডিম ছাড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ে কাতলা মাছ। ১৮ থেকে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ ডিম দেয় প্রায় ৪০ লাখ। একটি মা মাছ থেকে এক বছরে চার ধাপে আয় করা যায়। প্রথম ধাপে ডিম থেকে রেণু বিক্রি করে, দ্বিতীয় ধাপে ধানী পোনা বিক্রি করে, তৃতীয় ধাপে আঙ্গুলি পোনা বিক্রি করে, চতুথর্ ধাপে এক বছর বয়সে মাছ হিসেবে বাজারজাত করে। বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি ধাপে ৪০ শতাংশ মৃত্যু হার বাদ দিয়ে হিসাব করলে একটি মা কাতলা মাছ প্রতিবছর হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে ১৯ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার। এই হিসেবে হালদার প্রতিটি মা মাছকে একেকটি প্রাকৃতিক এগ্রো মেগা ইন্ডাস্ট্রি বলেও অভিহিত করছেন হালদা গবেষকরা।

অথর্নীতিতে অবদান

একক নদী হিসেবে আমাদের জাতীয় অথর্নীতিতে হালদা নদীর অবদান সবচেয়ে বেশি। এ নদীকে যদি সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে অবদানের পরিমাণ অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। হালদা নদী ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু থেকে মাছ হিসেবে খাওয়ার টেবিলে আসা পযর্ন্ত দেশের মৎস্য খাতে চার ধাপে আমাদের জাতীয় অথর্নীতিতে অবদান রাখে। হালদার একটি মা-মাছ কাতলা মা-মাছ তৃতীয় বছর বয়স থেকে পরিপক্বতা লাভ করে ডিম দেয়া শুরু করে। একটি মা-মাছ থেকে এক বছরে চার ধাপে (স্তরে) আয় করা যায়। একই পদ্ধতিতে এক বছরের চার ধাপে জাতীয় অথর্নীতিতে হালদার অবদান প্রায় ৮২১ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ৬ শতাংশ।

নানা সঙ্কটে হালদা

হালদাকে বলা হয় পৃথিবীর একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী। প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হিসেবেও হালদা বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও দখল, দূষণ, লবণাক্ততা, রাবার ড্যাম নিমার্ণসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদী এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, শিল্প-কারখানার বজর্্য থেকে সৃষ্ট দূষণের কারণে সেখানে কাপর্জাতীয় মাছ রুই, কাতল, মৃগেল ও কালবাউশ ডিম ছাড়ার হার কমে গেছে। নদীতে লবণাক্ততাও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে, সুপেয় পানি সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। হালদা নদীর উজান এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে দুটি রাবার ড্যাম নিমাের্ণর কারণে পানির প্রবাহ অনেক কমে গেছে। যদিও এবছর মা মাছ ডিম ছাড়ার প্রথম দিনেই প্রায় ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ করেছেন হালদার জেলেরা যা গত এক দশকের ইতিহাসের সবোর্চ্চ বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।

হালদা সংরক্ষণে করণীয়

হালদাকে তুলনা করা যেতে পারে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নদী মেকংয়ের সঙ্গে। মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড যৌথভাবে একটি সমন্বিত নদী কমিশন গঠন করে মেকং নদীতে মৎস্য চাষের মাধ্যমে তাদের সারাবছরের মাছের চাহিদা পূরণ করছে। জানা গেছে, মেকং নদীর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত সমন্বিত নদী কমিশনের যৌথভাবে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বছরের জুন থেকে অক্টোবর পযর্ন্ত নদী থেকে মাছ শিকার বন্ধ থাকে। এর ফলে নভেম্বর থেকে মে পযর্ন্ত মাছ ধরার জন্য মেকং নদী উন্মুক্ত করে দিলে জেলেরা নদী থেকে প্রচুর মাছ আহরণ করে। হালদা নদীকে নিয়েও মেকং নদীর মতো একটি পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ নিতে পারলে জাতীয় মৎস্য অথর্নীতিতে একক নদী হালদার অবদান আরও গুরুত্বপূণর্ পযাের্য় পৌঁছবে।

লেখক

কৃষি ও অথর্নীতি বিশ্লেষক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে