logo
বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

  রফিক মজিদ, শেরপুর   ১৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

লটকন চাষ করে লাখপতি

লটকন চাষ করে লাখপতি
এক সময়ের অবহেলিত লটকন ফল (স্থানীয় নাম ভুবি) এখন চাহিদা সম্পন্ন ও অথর্করী ফল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষির ওপর নিভর্রশীল শেরপুর সদরসহ নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীর বিভিন্ন এলাকার শতাধিক কৃষক লটকন ফলের বাণিজ্যিকভাবে বাগান তৈরি করে লাখপতি হয়েছেন। বাগান মালিকরা কয়েক বছর ধরে প্রতি মৌসুমে শুধু লটকন বিক্রি করে ঘরে তুলেছেন লাখ লাখ টাকা। আর ওইসব বাগান থেকে লটকন কিনে নিয়ে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে পাইকারি এবং স্থানীয় বাজারে খুচরা বিক্রি করে অনেক মৌসুমি ফল বিক্রেতারা আথির্কভাবে স্বচ্ছল হয়েছেন। ভাগ্য খুলেছে জেলার লটকন বাগান মালিক ও শতাধিক মৌসুমি ফল বিক্রেতাদের।

শেরপুর জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, লটকন ফল চাষে শুরুতে গাছের চারা কেনা ও রোপণ খরচ ছাড়া আর কোনো খরচ নেই। নামমাত্র শ্রমে কোনো প্রকার পরিচযার্ ছাড়াই কম খরচে বেশি লাভ পাওয়ায় জেলার পাহাড়ি এলাকা ও মাঝারি উঁচু জমিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে এ ফলের চাষ। সাধারণত বেলে বা বেলে-দোঅঁাশ মাটিতে এর ফলন ভালো হয়। পরিত্যক্ত জমিতে লটকন বাগান করে কৃষক ও ফল বিক্রেতারা আথির্কভাবে অধিক লাভবান হচ্ছেন। অনেক চাষি তাদের বাড়ির আঙিনায় ও বিভিন্ন কাঠের বাগানে লটকন ফলের চাষ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

নকলার চন্দ্রকোণা ইউনিয়নের বন্দটেকী গ্রামের বাণিজ্যিকভাবে লটকন ফলচাষি মুনসেফ আলী ও খোকন মিয়া জানান, বীজের গাছে ফলন আসতে ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগে, কিন্তু কলম করা গাছে ফলন আসতে সময় লাগে মাত্র ২ থেকে ৩ বছর। প্রতি বছর মাঘ-ফাল্গুন মাসে লটকন গাছে ফুল আসা শুরু হয় এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিক থেকে ফল পাকা শুরু হয়।

চাষি শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পযর্ন্ত নাসাির্রর ব্যবসা করেছেন। ২০০৫ সালে ২০টি লটকন গাছ বাড়ির আঙ্গিনার পরিত্যক্ত জমিতে রোপণ করেন। পরের বছর ২৭ শতাংশ জমিতে ৭৫টি এবং ৩৫ শতাংশ জমিতে ৫৬টি লটকন গাছ রোপণ করেন। ২০১৫ সালে ওইসব গাছে ফল আসে, ওই বছর ৭ হাজার টাকার লটকন বিক্রি করেন তিনি। তারপর থেকে প্রতি বছর ফলন বাড়তে থাকে এবং টাকা আয়ের পরিমাণও বাড়ে। চলতি মৌসুমে তার ওই দুই বাগানের লটকন পাইকারদের কাছে অগ্রিম ৭৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, অগ্রিম বিক্রি না করলে লক্ষাধিক টাকায় ওই বাগানের লটকন বিক্রি করা যেত।

চাষি শরীফ হোসেন জানান, তার ১৪৫টি গাছের ফল অগ্রিম এক লাখ ৪৫ হাজার টাকায় এবং তার বন্ধু মনা মিয়া ৭৫টি গাছের ফল ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া চার বছর আগে কলমকাটা চারা রোপণ করে তার ছোট ভাই তারা মিয়ার ৬০টি গাছের ফল পাইকাররা অগ্রিম দাম করেছেন ৪৫ হাজার টাকা।

সদর উপজেলার মোছারচর এলাকার চাষি ছাইদুল ইসলাম, আক্কাস আলী, ইন্তাজ মিয়া ও আবদুল হাই জানান, বিনাশ্রমে ও বিনা ব্যয়ে লটকন চাষে যে লাভ পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো ফল-ফসল বা শাক-সবজি চাষে কল্পানাও করা যায় না। এ ফল চাষ করে জেলার সদরসহ নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীর বিভিন্ন এলাকার শতাধিক কৃষক লাখপতি হয়েছেন।

লটকন ফলের পাইকারি ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বলেন, বতর্মানে আগাম জাতের কিছু লটকন বাজারে উঠতে শুরু করেছে। যার খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পাইকারি মূল্য ৭৫ টাকা থেকে ৯০ টাকা। আর প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে।

কৃষি স¤প্রসারণ কমর্কতার্ কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ জানান, এক একর জমিতে লটকন ফল চাষ করার পরে ফলন আসলে প্রথম বছরেই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে শেরপুর জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আশরাফ উদ্দীন বলেন, বাড়ির আঙ্গিনায় এবং যে কোনো কাঠ বা ফলের বাগানেও লটকন চাষ কার সম্ভব। ছায়াযুক্ত স্থানের লটকন মিষ্টি বেশি হয়। তাই এটা চাষ করতে বাড়তি জমির দরকার হয় না। যে কোনো কাঠের বা ফলের বাগানেও চাষ করা যায়। তাছাড়া অন্যান্য ফল বা ফসলের চেয়ে লটকন ফলে রোগ বালাই ও পোকার আক্রমণ কম হয়। তাই ঝুঁকিমুক্ত এই ফলের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের পরামশর্ দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে