logo
রোববার ২৬ মে, ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  মুশফিক চৌধুরী   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

দেশের আথির্ক খাতে অব্যবস্থাপনা ও অস্থিরতা

দেশের আথির্ক খাতে অব্যবস্থাপনা ও অস্থিরতা
বাংলাদেশে আথির্ক খাতে সংঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারি অনিয়ম, অথর্ লোপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো সবাইকে হতবাক করেছে। এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আথির্ক প্রতিষ্ঠানে চুরি ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুবর্লতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক লুট করেছে দুবৃর্ত্তরা। কখনো ছাদ কেটে ভেতরে ঢুকে, কখনো সুরঙ্গ পথ তৈরি করে, কখনো বা অস্ত্র দেখিয়ে, নিরাপত্তাকমীের্ক হত্যা করে ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে লুটপাট চালানো হচ্ছে। বেশিরভাগ ঘটনায় ব্যাংকের কমর্কতার্-কমর্চারীদের সংষ্টিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যাংক ও সোনার দোকানে লুট বা ডাকাতি করে একই সিন্ডিকেট। দেশের এ ধরনের সিন্ডিকেট হাতে গোনা চার পঁাচটি। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে এই অপরাধীচক্রকে গ্রেফতার বা এদের বিরুদ্ধে কাযর্কর ব্যবস্থা এ পযর্ন্ত গৃহীত হয়নি। অনেক সময় এসব ঘটনার তদন্তের অগ্রগতিই হয় না, অপরাধীর বিচার হবে কীভাবে। এ ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষ যদি উদাসীন থাকে তবে এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আথির্ক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষের যেমন ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে একইভাবে দায়িত্ব রয়েছে সরকারেরও। কারণ পুঁজি হারিয়ে গ্রাহকরা পথে বসুক অথবা রাজভান্ডার শূন্য হোক, এটিএম কাডর্ জালিয়াতির ঘটনা ঘটুক এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এই ঘটনা দেশের আথির্ক খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত । জাতীয় আন্তজাির্তকভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সবাই আমাদের প্রশংসা করতে শুরু করেছে। আর এরই মধ্যে ঘটলো এই ধরনের কেলেঙ্কারির ঘটনা। যা দেশের ভাবমূতিের্ক প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের সবেচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণের প্রবল উপস্থিতি এবং ব্যাংকগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের প্রচÐ অভাব। ব্যাংকিং সেক্টর বতর্মানে ‘দুষ্টের পালন এবং সৎ মানুষের দমন’ নীতিমালা অনুসরণ করে চলেছে। ঋণদানকালে একজন কমর্কতার্ যদি ব্যাংকের স্বাথর্ সংরক্ষণে নিবেদিত হতেন, তাহলে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যেত। একশ্রেণির ব্যাংক কমর্কতার্ তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা লুফে নিচ্ছে। আর এই সুযোগে অসৎ ঋণগ্রহীতারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করছে বা অন্য খাতে প্রবাহিত করছে। যারা ব্যাংকের ভেতরে বসে নানা ধরনের দুনীির্ত আর অপকমর্ করছে, তাদের বিচার করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। যারা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ সব বিজ্ঞজনই স্বীকার করবেন যে ব্যাংক এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার আসল ভিত হচ্ছে তার বিশ্বস্ততা। ১১৫৭ সালে ‘ব্যাংক অব ভেনিস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। তখনও বিশ্বাসের ওপর ভর করেই মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখত। এখনো সেই বিশ্বাসকে সম্বল করেই কারও হাজার টাকা, কারও লাখ টাকা বা কোটি টাকা ব্যাংকে জমা রাখছেন। মানুষের বিশ্বাস ব্যাংকে জমাকৃত সব টাকা, অন্যান্য মূল্যবান জিনিস সুরক্ষিত থাকবে। মানুষের এই আস্থা যাতে অটুট থাকে সেটা এ দেশসহ সব দেশেই নিশ্চিত করে থাকে সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের মূল কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের আমানত হিসাব সৃষ্টি করে জনগণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি সংস্থা হতে আমানত সংগ্রহ করা। ব্যাংক এ জন্য চলতি আমানত হিসাব ছাড়া অন্যান্য আমানত হিসাবের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন হারে সুদ বা মুনাফা প্রদান করে থাকে। আর আমানতকারীদের তাদের আমানতের ওপর সুদ বা মুনাফা প্রদান করার জন্য ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিদের্শনা অনুযায়ী শতকরা ১৩ শতাংশ হারে ‘এসএলআর’ এবং শতকরা ছয় দশমিক পঁাচ শতাংশ হারে ‘সিআরআর’ সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট আমানতের অথর্ বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রপ্তানিকারক এবং ঋণ নীতিমালা মোতাবেক সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের ঋণ ও অগ্রিম হিসেবে প্রদান করে সুদ/মুনাফা অজর্ন করে। আদিকাল থেকে, ব্যাংকিং প্রথা অনুযায়ী সব বাণিজ্যিক ব্যাংকই আমানতকারীদের প্রাত্যাহিক চাহিদা মিটানোর জন্য তার মোট আমানতের শতকরা দুই/তিন ভাগের বেশি নগদ (ক্যাশ) অথর্ ব্যাংকে জাম রাখে না। চাহিদার বেশি নগদ অথর্ রাখলে ব্যাংকের ক্ষতি বিবেচনায় এই প্রথা সব দেশেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এই অবস্থায়, কখনো যদি কোনো নিদির্ষ্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে, ‘ব্যাংকটি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে অক্ষম, ব্যাংকটি, তার কমর্চারীদের বেতন দেয়ার সামথর্্যও হারিয়ে ফেলেছে’Ñ এ ধরনের নেতিবাচক খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে আমানতকারীরা আতঙ্কিত হবে। পরের দিন সেই ব্যাংকের অসংখ্য আমানতকারী আতঙ্কিত হয়ে ব্যাংকে জমাকৃত টাকা উঠানোর জন্য সেই ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় হাজির হবে। এই অস্বাভাবিক অবস্থায় ব্যাংক কী সব আমানতকারীর চেক অনার করতে পারবে? কখনই সম্ভব নয়। এটা শুধু সংকটে পড়া ফারমাসর্ ব্যাংক নয়, ‘এ ক্যাটাগরির ক্যামেলস রেটিং’ পাওয়া খুব ভালো ব্যাংকের পক্ষেও কোনো এক নিদির্ষ্ট দিনে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দশগুণ বেশি টাকা উত্তোলনের চাহিদা মিটানো সম্ভব হয় না, এ কারণে সব ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেনের জন্য ব্যাংকের ভল্টে ‘টিল মানি’ হিসাবে মোট আমানতের শতকরা দুই/তিন ভাগের বেশি টাকা ব্যাংকের লাভ লোকসান বিবেচনায় সংরক্ষণ করা হয় না। আর কোনো এক সময়ে ব্যাংকের ইমেজ সংকট হলে, সেই ব্যাংকে আমানতকারীরা টাকা জমা রাখতে সাহস পান না। এই অবস্থায়, অতি দ্রæততার সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে সংকটে পড়া সেই ব্যাংককে সব ধরনের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। লেখকের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত তথা অথর্নীতির স্বাথের্ সংবাদ মাধ্যম, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী সবাইকেই এগিয়ে আসা উচিত খেলাপি গ্রাহকদের খেলাপি ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন পন্থায় বাধ্য করার জন্য। সংকটে পড়ে ফামার্স ব্যাংক বা সংকটে পড়া অন্য কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় হয়ে গেলে, ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণের পরিমাণ দ্রæত কমে যাবে। সে কারণে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়ে যাবে। ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ শতকরা পঁাচ ভাগের নিচে নেমে এলে এবং ব্যাংকটি নন-ফান্ডেড ব্যবসা সবার্ত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বৃদ্ধি করে সন্তোষজনক পরিচালন মুনাফা অজর্ন করতে পারলে, ফারমাসর্ ব্যাংক বা এ ধরনের সংকটে পড়া যে কোনো ব্যাংকের ইমেজ সংকট আস্তে আস্তে দূরীভ‚ত হবে। জনগণের আস্থা ফিরে এলে, ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি পাবে, তারল্য সংকট কেটে যাবে। জীবন ফিরে পাবে সংকটে পড়া ব্যাংক বা ব্যাংকগুলো। স্বস্তি আসবে এ দেশের ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশের অথৈর্নতিক প্রবৃদ্ধির উচ্চ ধারা আরও বেগবান হবে আগামী দিনগুলোতে, বাড়বে বাংলাদেশের মান মযার্দা।

গত এক দশকে বাংলাদেশে আথির্ক খাতে সংঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারি অনিয়ম, অথর্ লোপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো সবাইকে হতবাক করেছে যুবক, ডেসটিনি, হলমাকর্, কিংবা বিসমিল্লাহ গ্রæপ প্রভৃতি নাম উচ্চারিত হতেই জনমনে এক ধরনের ঘৃণা অস্বস্তি, অবিভক্তভাব জেগে উঠতে দেখা যায়। ব্যাংক খাতে সংঘটিত এসব অনিয়ম, দুনীির্ত, অথর্ লোপাটের ঘটনাগুলো এক ধরনের ভীতির সঞ্চার করেছে কমর্কতাের্দর মধ্যে। সবাই আজকাল নিজের গা বঁাচাতেই যেন বেশি ব্যস্ত। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বড় বড় ঋণগ্রহীতারা তা ফেরত দিতে চায় না, ব্যাংক কমর্কতার্রা প্রায় ক্ষেত্রে বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গিয়ে পদে পদে হেঁাচট খান, বঁাধার সম্মুখীন হন। এসব কারণে এখন ব্যাংক খাতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিরাজ করছে স্থবিরতা, অনাগ্রহ।

আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভর করে যে ব্যাংকিং ব্যবসার বিস্তৃত ঘটেছে পৃথিবীব্যাপী তা শুদ্ধাচার এবং নৈতিকতার অভাবে অনেকটাই হুমকির মধ্যে পড়ে গেছে। ব্যাংকে প্রতারণা, ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম, দুনীির্ত বাড়ছে। ব্যাংকিংও যে এক ধরনের ব্যবসা, এটা যেমন সত্যি, তেমনি ব্যাংক যে অন্যের আমানত নিয়ে ব্যবসা করে সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক এ কারণে অন্যান্য ব্যবসা-প্রয়াসের চেয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে মানুষ অধিকতর নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করে। ব্যাংকিং কমর্কাÐে তথা ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধতা থাকবে, স্বচ্ছতা থাকবে এটা যে কোনো গ্রাহক মনে মনে প্রত্যাশা করেন। ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে নৈতিকতার কোনো বিরোধ নেই। বরং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধাচার আবশ্যিক ব্যাপার হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যদি ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা অনিয়ম গ্রাস করে তাহলে সেখানে শুদ্ধতা আশা করা যায় না। মূলত নৈতিকতা বিবজির্ত কাজের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকারদের ব্যক্তিগত কমর্কাÐের মধ্যে সীমারেখা নিধার্রণ করা উচিত। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে কেবল উচ্চবিত্ত মুষ্টিমেয় কিছু গ্রাহকের মধ্যে ঋণসুবিধা সীমিত রাখা, সহায়ক জামানতবিহীন সাধারণ মানুষ এবং দরিদ্রদের জন্য ঋণ গ্রহণের সুযোগ না রাখা, মুনাফা অজের্নর লক্ষ্যে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করে ব্যাংককে বিপদগ্রস্ত করা কিংবা দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো উদ্যোগে ঋণসুবিধা দেয়াÑ এসবকেই ব্যাংকিং খাতের অনৈতিক কমর্কাÐ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আবার ব্যাংক কমর্কতাের্দর ব্যক্তিগত অনৈতিক কমর্ এবং ঊধ্বর্তন কতৃর্পক্ষের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে নিজেরাই অনৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়াÑ এসবের মধ্যে পাথর্ক্য নিণর্য় করা উচিত। ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা নিশ্চিত করার বিষয়টির সুরাহা করা দুঃসাধ্য বলেই হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভনর্র ড. আতিউর রহমান ‘মানবিক ব্যাংকিং’ বলে একটি ধারণা চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। মানবিক ব্যাংকিং বলতে যে কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার অধীনে দান-খয়রাত কিংবা রাজনৈতিক নিদেের্শ আদায় অযোগ্য কৃষিঋণ বিতরণ বোঝায় তা কিন্তু নয়, তার চেয়ে বরং স্বল্প খরচে সাধারণ বঞ্চিত অবহেলিত মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পেঁৗছে দেয়াই যে মানবিক ব্যাংকিং, সেটিই নিশ্চিত করার প্রয়াস এই উদ্যোগ। ব্যাংকিং খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা অনৈতিকতাকে ডেকে আনে। এমনিতে আথির্ক খাতে নিয়োজিত লোকজন সহজাতভাবে অন্যদের চেয়ে কম বা বেশি নীতিপরায়ণ নন। কিন্তু এই খাতের প্রণোদনা কাঠামোটি এমনই যে এটি অনৈতিক আচরণকে কেবল অনুমোদনই করে না, এমনকি মাঝেমধ্যে উৎসাহিতও করে। তবে এটাই স্বতঃসিদ্ধ বা অনিবাযর্ ব্যাপার নয়, চাইলে এটিকে শুদ্ধ করা যায়। নৈতিক আচরণের প্রতি আথির্ক খাতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবতর্ন আনা সম্ভব। তবে এ জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আথির্ক খাত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাÑ এই তিন পক্ষকে স্থির সংকল্পবদ্ধ হয় যে যেকোনো অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অস্বচ্ছতাকে কোনোভাবে প্রশ্রয় দেবে না কেউই।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুণীির্ত, নৈতিকতাহীনতা খুব স্বাভাবিকভাবে চলে আসেÑ এরকম কথা বলতে চান অনেকই। ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার বিষয়টিকে পরস্পর বিরোধী বলে যে ধারণা প্রচারিত হচ্ছে, তা দূর করার জন্য ব্যাংকগুলোকে আইনের শাসন বাড়ানোর লক্ষ্যে যে কোনো ধরনের নেতিবাচক কমর্কাÐ পরিচালনার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। কাযর্ক্রমের সব পযাের্য়র স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। স্বল্প মেয়াদে মুনফার লক্ষ্য অজের্নর জন্য যেকোনো ধরনের ঝঁুকি গ্রহণের চেষ্টা পরিহার করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে, ব্যাংক যেমন কোনো খয়রাতি বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়, তেমনি জনগণ তথা সাধারণ আমানতকারীদের আস্থাও বিশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে দেশ, সমাজ ও অথর্নীতিতে অবদান রাখার জন্য নৈতিক ব্যবসা পরিচালনা করাই ব্যাংকের দায়িত্ব। যেখানে শুদ্ধাচারই হবে সব কমর্কাÐের ভিত্তি, যেখানে স্বচ্ছতা থাকবে প্রতিটি স্তরেই। এসব কারণেই অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাংকের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট কঠোর ও নিবিড় হওয়া উচিত।

রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ও দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, সমতা, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক, অথৈর্নতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে কৌশল হলো সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুনীির্তমুক্ত রাখা এবং দেশের সবর্স্তরে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা। শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকষর্ বোঝায়। এর দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীণর্ মানদÐ, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্যও বোঝানো হয়। ব্যক্তি পযাের্য় এর অথর্ হলো, কতর্ব্যনিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা। ব্যক্তির সমষ্টিতেই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয় এবং তাদের সম্মিলিত লক্ষ্যই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রতিফলিত হয়। একজন মানুষের নৈতিকতা শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবারে এবং শুদ্ধাচার অনুসরণের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূণর্ প্রতিষ্ঠান। তার পরের ধাপে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নৈতিক জীবন গড়ার ক্ষেত্রে এর ভ‚মিকা অপরিসীম। তৃতীয় ধাপে আছে তার কমর্স্থল। শুদ্ধাচার নিভর্র করে প্রতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতার ওপর। ব্যাংক জনগণ, জনগণের অথর্ বা অথের্র সমমূল্য পণ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কমর্কাÐ চালায়, ব্যবসা করে। মানুষ সবসময়েই উচ্চাকাক্সক্ষী এবং অথর্ হলো, একটি স্পশর্কাতর সম্পদ। কাজেই মানসম্মত গ্রাহক সেবা ও বিশ্বাসযোগ্যতা, দুটোই ব্যাংকের জন্য অতীব গুরুত্বপূণর্ বিষয়। এ দুটি বিষয় প্রধানত নিভর্র করে প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিও নৈতিকতার চচার্র ওপর। গ্রাহক সেবার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায় পরায়ণতা, পরিপালন, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা প্রভৃতি মৌলিক আদশর্ ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা বা চচার্ নিশ্চিত করা হলে ব্যাংক তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পেঁৗছতে তেমন কোনো প্রতিক‚লতার মুখোমুখি হবে না। অতএব, ব্যাংকব্যবস্থাপনার শুদ্ধাচার চচার্ ও প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে আন্তরিক এবং নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সহ দেশের আথির্ক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা যদি নড়বড়ে থাকে এবং রিজাভের্র টাকা, গ্রাহকের টাকা চুরি বা লুট করা হয়, গায়েব হয়ে যায় চেক, ডিডি, এফডিআর ডকুমেন্ট, এসডিআর, এমটিডিআর, পে-অডার্র, আমদানি-রপ্তানির এলসি ডকুমেন্টের মতো গুরুত্বপূণর্ নথি গায়েব হয়ে যায় তা হলে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে এ আর বিচিত্র কী।

লেখক : কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে