logo
  • Sat, 17 Nov, 2018

  মো. মইনুল ইসলাম   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

নিবার্চনই গণতন্ত্রের মহৌষধ নয়

গণতন্ত্রের জন্য নিবার্চন দরকার। তবে নিবাির্চত সরকারকে ঘুষ-দুনীির্তর অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো সংরক্ষণের দিকেও নজর দিতে হবে। অথৈর্নতিক উন্নয়নকে উত্তরোত্তর গতিশীল ও শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে শুধু সুষ্ঠু নিবার্চনেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে না। ওপরে আলোচিত সাফল্য এবং ব্যথর্তার আলোকে নিবার্চনের কাযর্কারিতা বিচার করতে হবে।

নিবার্চনই গণতন্ত্রের মহৌষধ নয়
দেশে নিবার্চন ঘনিয়ে আসছে। গণতন্ত্রের জন্য নিবার্চন দরকার। নিবার্চনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি নিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় একটি দল রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনার অধিকার লাভ করে।

অথার্ৎ দেশ শাসনের অধিকার পায়। আমরা যেহেতু সাংবিধানিকভাবে একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাই পঁাচ বছর পরপর দেশে নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়।

সামরিক শাসক জিয়া এবং এরশাদের শাসনের অবসানের পর দেশে নিয়মিত নিবার্চন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত নিবার্চনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ব্যাপক কারচুপি এবং কারসাজির আশ্রয় নেয়ায় ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে একটি অনিবাির্চত তত্ত¡াবধায়ক সরকার দেশ শাসন করে।

২০০৯ সালে অবশ্য তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তথা সত্যিকার নিবার্চন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। এ নিবার্চনে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।

দেশ-বিদেশে এ নিবার্চন ব্যাপক প্রশংসিত হলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তা মেনে নেয়নি, যদিও তারা সে নিবার্চনে অংশগ্রহণ করেছিল।

তবে নিবার্চনই গণতন্ত্র নয়। নিবার্চন গণতন্ত্রের একটি অংশ মাত্র। এর আরও দুটি উপদান হচ্ছেÑ আইনের শাসন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন।

যুগ যুগ ধরে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জজির্রত আমাদের মতো দেশে অথৈর্নতিক উন্নয়ন গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান কতর্ব্য। উন্নয়নের মাধ্যমে দেশবাসীর দারিদ্র্য বিমোচনও তাই আমাদের মতো দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্যের একটি বড় সূচক। বহু বছর আগে কবি নজরুল বলে গেছেন, ‘ক্ষুধাতুর মানুষ চায় না স্বরাজ, চায় দুমুঠো ভাত।’

এটা গরিব দরদি কবির ভাবাবেগের বহিঃপ্রকাশ বটে। তবে দরিদ্র মানুষ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসার মতো জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোর অভাবের কারণে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোর ব্যাপারে ততটা সচেতন থাকে না।

আবার এ ব্যাপারে একেবারে উদাসীন থাকে, তাও বলা যাবে না। তাই অথৈর্নতিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতি- দুটোই মানুষ চায়। আর আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক অনন্য ঘটনা।

মুক্তিযুদ্ধের পেছনে যে চেতনা কাজ করেছিল, তা ছিল বৈরী পাকিস্তানি শাসনের অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ এবং নিযার্তনের হাত থেকে মুক্ত এক স্বদেশ। যার প্রকৃত রূপায়ন ঘটবে একটি অসা¤প্রদায়িক গণতান্ত্রিক এবং উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর আলোকেই নিবার্চনের যথাথর্তা এবং দেশের অথৈর্নতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নকে বিচার করতে হবে।

আগেই বলা হয়েছে, আমাদের মতো দেশে উন্নয়ন বলতে বোঝায় দারিদ্র্য বিমোচন। এ ব্যাপারে আমাদের সাফল্য উল্লেখজনক, যা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। দেশে দারিদ্র্যের হার ক্রমাগত কমছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার হার ২০১৭ সালে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ২০০৫ সালে ছিল ৪০ শতাংশ।

আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৬-১৭ অথর্বছরে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর চলতি অথর্বছরে (২০১৭-১৮) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে দঁাড়াবে বলে অনুমান করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

অন্যদিকে এ বছর মাথাপিছু আয় দঁাড়াবে ১ হাজার ৭৫২ ডলারে, গত বছর (২০১৬-১৭) যা ছিল ১ হাজার ৬১০ ডলার। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর আমাদের নিভর্রতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।

১৯৮১-৮২ সালে যা ছিল জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৬-১৭ সালে তা মাত্র ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

মোট কথা, আমরা মোটামুটি একটি স্বনিভর্র অথর্নীতির পথে এগিয়ে চলেছি। ফলে বিশ্বব্যাংক আমাদের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল (ডেভেলপিং) দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে।

সুতরাং উন্নয়ন তথা অথৈর্নতিক অগ্রগতিতে আমাদের সাফল্য দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর এসবই ঘটেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের গত ৯-১০ বছরের শাসনকালে।

কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক উন্নয়ন তথা গণতন্ত্রের অগ্রগতির রেকডর্ অথর্নীতির তুলনায় ততটা উল্লেখযোগ্য নয়। নিবার্চনী ব্যবস্থাটি এখনও দুবর্ল এবং একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা হিসেবে দেশ-বিদেশে এখনও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

এর জন্য বড় দুটি দলই দায়ী। তাছাড়া আরও একটি প্রধান কারণ হলো, আমাদের সাংঘষির্ক রাজনীতি। ভিন্ন দল ও মতের প্রতি সহনশীলতা এবং সম্মান প্রদশর্ন, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যÑ তা আমাদের রাজনীতিতে এখনও প্রতিষ্ঠা পায়নি।

আর আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিবার্চনে পরাজিত হওয়া মেনে নিতে পারে না এবং বিরোধী দলে যেতে চায় না। অথচ নিবার্চনে হারজিত আছে এবং বিরোধী দল গণতন্ত্রের অপরিহাযর্ অংশ।

আগেই বলা হয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য নিবার্চন ছাড়াও আইনের শাসন তথা সুশাসন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন হলো অন্যতম প্রধান দুটি শতর্। নিবার্চন এক-দু’দিনের অনুষ্ঠান।

কিন্তু সুশাসন মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন। আর এর নিদারুণ অভাব দেশে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার ফলে মানুষ প্রতিদিন সরকারি অফিসে প্রাপ্য সেবা পেতে নানা ভোগান্তি এবং হয়রানির শিকার হচ্ছে।

শেষ পযর্ন্ত অনেককে অবৈধ অথর্ তথা ঘুষ প্রদান করে কাজ উদ্ধার করতে হয়। প্রায় দুই দশক আগে বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবমতে, ঘুষ-দুনীির্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশ হ্রাস করে। অতি স¤প্রতি জেনেভায় জাতিসংঘের সামাজিক, অথৈর্নতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক কমিটি বাংলাদেশে দুনীির্তর ব্যাপক বিস্তারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তারা দাবি করেছে, সরকার যেন দুনীির্ত দমন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে এবং এ ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা ও রাজনীতিকদের ছাড় দেয়া না হয়। সরকারি তহবিল ও সেবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়া, জমি বন্দোবস্ত এবং মৌলিক সেবাগুলো পেতে ঘুষ দেয়ার মতো খবরে কমিটি বিশেষ উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে।

তারা মনে করে, দুনীির্ত সাধারণ মানুষের অথৈর্নতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার মারাত্মকভাবে বিঘিœত করছে। এর শিকার হচ্ছে মূলত পশ্চাৎপদ তথা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

দেশের দুনীির্তর এ খবর জাতিসংঘেও পেঁৗছেছে। এতে যে কোনো সভ্য দেশ ও সরকারের লজ্জাবোধ হওয়া উচিত। এসব খবর আমাদের গণতন্ত্রের দাবিকেও ¤øান করে দেয়। ইতিপূবের্ পরপর ৪ বার বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা দুনীির্তবাজ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা দুনীির্তবাজ দেশের তালিকা থেকে রেহাই পেয়েছে। তবে দুনীির্তর ব্যাপারে আমাদের উন্নতি খুব একটা সন্তোষজনক নয়।

বিশ্বব্যাপী দুনীির্তর ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহকারী বালির্নভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইয়ের জরিপমতে, গেল বছর (২০১৭) দুনীির্ততে বিশ্বের ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩ নম্বর।

আগের বছরে (২০১৬) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৫ নম্বরে। তবে আমাদের প্রাপ্ত নম্বর একশর মধ্যে মাত্র ২৮। আর বিশ্বের গড় হচ্ছে ৪৩। দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে আমরা ২ নম্বর দুনীির্তবাজ দেশ এবং মাত্র আফগানিস্তানের উপরে আমাদের অবস্থান।

আমাদের অথৈর্নতিক উন্নয়ন প্রশংসনীয়। তবে গণতন্ত্রের উন্নয়ন তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। বরং হতাশাজনক। দুনীির্তর ফলে সুশাসন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কারণে গণতন্ত্রের অগ্রগতি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিলাতের ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ঊওট) মতে, ২০১৬ সালে বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে গণতন্ত্রের সূচকে আমাদের অবস্থান ছিল ৮৪তম। ২০১৭ সালে আমাদের অবস্থান দঁাড়িয়েছে ৯২তম স্থানে।

অথার্ৎ এ ব্যাপারে আমাদের ৮ ধাপ অবনতি ঘটেছে। এতে অবশ্য বিএনপির উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের ২০০১-০৫ শাসনামলে অবস্থা আরও খারাপ ছিল। উপরোক্ত ব্রিটিশ সাময়িকীটির মতে, বিএনপির শাসনামল ছিল কষবঢ়ঃড়পৎধপু; চৌযর্তন্ত্র বা চোরের রাজত্ব।

পরিশেষে বলব, গণতন্ত্রের জন্য নিবার্চন দরকার। তবে নিবাির্চত সরকারকে ঘুষ-দুনীির্তর অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো সংরক্ষণের দিকেও নজর দিতে হবে।

অথৈর্নতিক উন্নয়নকে উত্তরোত্তর গতিশীল ও শক্তিশালী করতে হবে। তা না হলে শুধু সুষ্ঠু নিবার্চনেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে না। উপরে আলোচিত সাফল্য এবং ব্যথর্তার আলোকে নিবার্চনের কাযর্কারিতা বিচার করতে হবে।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে