logo
রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

ুকোনপথে গণতন্ত্র?

এখানে আগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাস বলতে ভুলে গেছি, তা হলো ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের অকল্পনীয় বিজয়- অভু্যত্থান। যাতে প্রতাপশালী ধর্মের অজুহাতে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জনগণের কাছে নির্মমভাবে পরাজিত হয়েছিল বললেই শেষ হবে না, বলব মুসলিম লীগের কবর রচিত হয়েছিল। 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান' স্স্নোগানে যে দলটি ক্ষমতার অধিকারী হয়েও টিকতে পারল না নবশক্তির উদ্বোধনে, নিশ্চিহ্নই হয়ে গেল। মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশ্রয়ে রাজনীতি করার কপট-কৌশলেও টিকতে পারল না। সামরিক শাসনকর্তার মোহাব্বতের প্রয়োজন হলো। অবশ্য মুসলিম লীগ এ বঙ্গে পাত্তা না পেলেও পাকিস্তানে 'কাউন্সিল' ও 'কনভেনশন' দুটি দলে বিভক্ত হয়ে টিকে থাকতে চাইল। শেষ পর্যন্ত পারল না জেনারেল আইয়ুব খানের সহযোগিতা ও সরাসরি স্বত্বাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যুক্তফ্রন্ট যখন বিজয়ী হলো ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে, তখন পূর্ববঙ্গে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গঠিত হয়েছিল। কিন্তু মার্চে নির্বাচন হলেও মন্ত্রিসভা গঠন প্রক্রিয়ায় অকারণ বিলম্ব মতলবি পরিকল্পনারই আভাস দিয়েছিল সেদিন। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের ভূস্বামী অধু্যষিত পাঞ্জাব গোষ্ঠীর অনুসারী পূর্ববঙ্গে ক্ষমতাহীনতাকে সহ্য করতে চায়নি বলে কেন্দ্রীয় সরকার ৯২ক ধারা জারি করে '৫৪ সালের ২৯ মে গভর্নর শাসক প্রবর্তন করে এবং মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে সামরিক গভর্নর করে পাঠায়। মির্জা শেরেবাংলা মন্ত্রিসভার সদস্য ও রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক নেতাকর্মী সবাইকে গ্রেপ্তার করে জেলখানা ভর্তি করে ফেলে। তখনকার সময় 'রাষ্ট্রদ্রোহী' বলে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে আটকে রাখা হতো। আজকালের মতো কথায় কথায় মামলা দেয়া হতো না। পাকিস্তান আমলেও কিন্তু রাট বা হেবিয়াস কর্পাস করে রাজবন্দিরাও মুক্তি পেতেন। আজকাল জামিনে আনতে হয়। মামলা ঝুলে থাকে। আগেরকালে মামলার আসামি করা সে হতো না, তা নয়। তবে তারও বিধিবিধান ছিল। আজকের মতো নয়। শেরেবাংলা গৃহবন্দি ছিলেন, পরে তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেই সময়কার সার্থক নিয়ন্ত্রক হিসেবে গভর্নর মির্জাকে প্রমোশন দিয়ে পরে গভর্নর জেনারেল করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের সামরিক অভু্যত্থানের জান্তাপ্রধান ছিলেন কদিন, তারপর অপসারিত হয়ে জেনারেল আইয়ুব সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।

এই যে কালের যাত্রাপথ ক্রমে পূর্ববঙ্গবাসীর সংগ্রামী জীবনকে শোষণ-বঞ্চনার নির্মূল ইতিহাসে পরিণত করেছে আর অন্যদিকে মানুষ জেগে উঠেছে এই নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। মুসলিম লীগের নির্লজ্জ পতনের পর সামরিক শাসনকর্তার রাজনৈতিক সাধ-আহ্লাদ পূরণে যে মুসলিম লীগ পুনর্গঠিত হয়েছিল, সে কেবল ওই সামরিক একনায়কের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য। তাই সেখানে দল বা রাজনীতি বড় ছিল না, প্রবল হয়ে উঠেছিল তিনি কতটা পরাক্রমশালী এবং দেশ ও দশের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মহৎ ব্যক্তি সেটা প্রমাণের প্রচারাভিযান, তাই সেনাশাসকের মাহাত্ম্যের শিঙা ফোঁকার জন্য কেবল পদলেহনকারী রাজনৈতিক কর্মী-নেতাদেরই লাইন লেগে গিয়েছিল, তা বলি কী করে? এ লাইনে লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, তথকাথিত বুদ্ধিজীবী নামের পালিত ও বিক্রীত ব্যক্তিরাও শামিল হয়েছিলেন। বু্যরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন (বিএনআর)-এর খাতায় নাম লিখিয়ে কতনা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ওই সৈনিক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কী যে ন্যক্কারজনক পরিবেশ-পরিস্থিতি, তা আজ বলে বোঝানো যাবে না। কারণ আজ যে কোনো ক্ষমতাসীনের পকেটস্থ হতে পারাটাকেই যেন জীবনের সব সাধ পূরণের উপায় বলে মনে করেন। এরা বিকৃত মানসিকতা নিয়ে সম্পূর্ণ বিক্রীত হয়ে গেছেন এক এক ক্ষমতাপ্রত্যাশী সংসদীয় রাজনীতি ও ক্ষমতার কাছে। এই আত্মাহুতিতে প্রসাদ লাভ করেছেন যেমন মানসিক ও অর্থকরী দিক থেকে এবং এর মাধ্যমে সমাজের প্রতাপশালী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া। ক্রমে সম্পদশালী হওয়ার প্রশস্ত ময়দানে নির্বিঘ্নে বিচরণ করছেন। তাতে এদের কারো মনে অনুতাপ আছে বলে মনে হয় না। থাকলে অন্যায়, অবিচার, হিংসা, সহিংসতা, অর্থলোলুপ চরিত্র ধারণ করতে পারত না অনেকেই। কারণ অনেকেই তো জীবন শুরু করেছিল সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার অঙ্গীকারে শ্রেণিবৈষম্য দুষ্ট সমাজকে পাল্টানোর শপথ নিয়ে। সেই তারা আজ গণবিরোধী রাজনীতির বিকট চিৎকারের অংশে পরিণত হয়েছে। কাকে ছেড়ে কার কথা বলব, সবাই তো একপথের পথিক। দিশারি তাদের ক্ষমতায়ন। এদের মধ্যে দু-চারজন আছেন, যাদের পরিযায়ী পাখির সঙ্গে তুলনা করা যায়। কেউ কেউ আবার এদের মধ্যে দু-একজনকে 'গিরগিটি' বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন।

ওই পাকিস্তানি হিংসাত্মক রাজনীতির পৈশাচিক শিকার ও নিপীড়নে পরিণত হয়েই তো মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এই পূর্ববঙ্গীয় ভূখন্ডে নির্যাতিত, উপেক্ষিত জনগণের পক্ষে সরকারবিরোধী রাজনীতির পত্তন করে ১৯৪৮ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন। প্রতিষ্ঠালগ্নের এ কমিটিতে টাঙ্গাইলের এম শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমদ যুগ্ম সম্পাদক হয়েছিলেন। এখানে একটা কথা বলে রাখি, মুসলিম লীগবিরোধী সংগঠন হলো বটে; কিন্তু লীগের জনপ্রিয়তার কথা ভেবে সংগঠনের নামে মুসলিম লীগ শব্দটি রাখতে হয়েছিল তবে সঙ্গে 'আওয়ামী' শব্দ সংযোজন করা হয়েছিল। অর্থাৎ মানুষকে বোঝাতে চাইছিল বোধহয় এটা হলো 'জনগণের মুসলিম লীগ'। আওয়ামী অর্থ হলো জনগণ তেমনি আবার মওলানা ভাসানী যখন সিয়াটো, সেন্টো এবং পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনি শোষণ-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হলেন গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে; শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী মুসলিম লীগ নাখোশ হলো মওলানার ওপর। তা ছাড়া মওলানা ভাসানী ভাবলেন এখন আর ধর্মকে নির্ভর করেও রাজনীতি করার সময় নেই, এবার জনগণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। সুতরাং আওয়ামী মুসলিম লীগকে 'মুসলিম' শব্দটিকে পরিত্যাগ করতে হবে। তখন মওলানা ভাসানী দলকে অসাম্প্রদায়িক করার উদ্যোগ নিলেন। বাধল লড়াই। কারণ সোহরাওয়ার্দী যেমন ওই সামরিক চুক্তির সমর্থক ছিলেন এবং মার্কিনিদের বিরুদ্ধে যেতেও চাননি। ফলে সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর মধ্যে আদর্শিক এবং নীতিগত দ্বন্দ্ব দেখা দিলে সোহরাওয়ার্দী অনুসারীদের কট্টর অবস্থানের কারণে মওলানা ভাসানীকে নিজের হাতে গড়েপিটে তোলা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করতে হলো। '৫৭ সালের শেষ দিকে ঢাকায় 'গণতান্ত্রিক কনভেনশন' আয়োজন করে নতুন প্রগতিশীল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠন করলেন। নাম দিলেন 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি'। খেয়াল করবেন পাঠক, এখানেও 'আওয়ামী' শব্দটাকে বাদ দিলেন না মওলানা সাহেব। এই কনভেনশনে সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান, তার সহযাত্রী আবদুস সামাদ আচকজাই, 'জিয়ে সিন্ধ' আন্দোলনের নেতা আবদুল মজিদ সিন্ধি, জি এম সৈয়দ, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী, লাহোরের প্রগতিশীল আইনজীবী মাহমুদ আলী কাসুরিসহ অগণিত সরকারবিরোধী অসাম্প্রদায়িক, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রগতিশীল মানসিকতার শ্রমিক, কৃষক ও রাজনৈতিক নেতা-সংগঠকরাও নতুন সংগঠনে যোগ দিলেন এবং নতুন চিন্তার এই প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলটি তড়িতগতিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু বছরখানেক পরেই দেশে মার্শাল ল' জারি হতে কার্যক্রম বন্ধ করে দিল সরকার। কিন্তু সামরিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্ধ হলে ষাটের প্রথমার্ধেই সচল হয়ে আবারও গণতান্ত্রিক পথে সক্রিয় হয়ে ওঠে সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু সামরিক জান্তার নানা কৌশল পরিকল্পিত হতে থাকল জনগণের সচেতন হয়ে আন্দোলনমুখী হওয়ার বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের লড়াই আরও প্রকট হয়ে উঠল। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সংক্ষেপে ন্যাপ সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত করতে ১৪ দফা দাবি প্রণয়ন করল বটে, কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা অথবা প্রচারণার অভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারল না। অথচ ষাট দশকের আন্দোলনমুখী রাজনৈতিক পরিবেশের সুযোগে আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবি খুব সহজেই জনগণের কাছে পৌঁছে গেল এবং মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করল। এর পেছনে কারণ হলো- আওয়ামী লীগের ব্যাপক সংগঠন ও জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা। আর এ দাবির উপস্থাপক শেখ মুজিবুর রহমানও ক্রমেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হলেন সরকারের নিরন্তর নিপীড়ন ও জেল-জুলুমের কারণে।

এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত বাংলা সামরিক শাসকচক্রের অবহেলা-উপেক্ষা, নিপীড়ন-নির্যাতন মানুষকে আরও প্রবল বিরোধী মানসিকতায় জাগিয়ে তুলল। ষাটের প্রথমার্ধেই ছাত্রদের সর্বদলীয় ঐক্য ও ১১ দফার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল প্রবল প্রতাপে। আর আন্দোলনের দৃপ্ত উত্থান মানুষকে আরও সচেতন করে তুলেছিল দেশের গোটা জাতিসত্তার মানুষকে। সংগ্রামের চেতনা ও পরাক্রম ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। জেগে উঠল মুসলিম লীগ ও সামরিক জান্তাবিরোধী জাতীয়তাবাদী শক্তি, সচেতন হয়ে উঠল এই অপশাসনে কেবল বঞ্চনাই সইতে হবে। সুতরাং বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত হয়ে দাঁড়াল। ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ ১১ দফা আন্দোলন দেশবাসী ধর্ম-বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সংঘবদ্ধ করেছিল। তাতে ৬ দফার উত্তাপ সঞ্চারিত হলে- দুয়ের প্রবল মনোবলে জনতার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল দেশময়। এরই পরিণতিতে ঊনসত্তরের ছাত্র-জনতার মিলিত সংগ্রাম গণঅভু্যত্থানে রূপ নিলে ভড়কে গেল সামরিক জান্তা। ফলে ক্ষমতালিপ্সু সেনাবাহিনী প্রধান তার সাবেক প্রধান এবং দেশের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে অপসারণ করে জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাজসিংহাসন দখল করে সদর্পে আবির্ভূত হলেন। জনপ্রিয়তার লোভে দেশে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা আইনি বিধান প্রণয়ন করে। মওলানা ভাসানী এতে অংশগ্রহণ করলেন না; কিন্তু শেখ মুজিব তার দলের জনপ্রিয়তা নির্ভর করে নির্বাচনে গেলেন। গেলেন না শুধু, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জাতীয় সংসদেও বিজয় লাভ করলেন। পূর্ববঙ্গে তো কথাই নেই। কিন্তু তার পরও তাকে ক্ষমতায় যেতে দেয়া হলো না ভুট্টো-ইয়াহিয়ার চক্রান্তে। অগ্নিগর্ভ পূর্ববাংলা গণজাগরণের উত্তাল ঢেউ পৌঁছে গেল গ্রাম-গ্রামান্তরে। বিক্ষুব্ধ মানুষের সম্মিলিত গণশক্তি তুলল আওয়াজ মুক্তির, সংগ্রামের। কিন্তু সামরিক একনায়ক ইয়াহিয়া নানা কৌশলে আন্দোলন বন্ধ করার চেষ্টা করার ফাঁকে ফাঁকে আলোচনার সুযোগে সৈন্যসামন্ত ও অস্ত্রসম্ভার বৃদ্ধির মতলব করলেন। সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাজনৈতিক সংলাপকে ব্যর্থ করে দিয়ে গণহত্যার পথ বেছে নিলেন। কিন্তু অধিকার হরণ করে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা না দেয়ায় সংক্ষুব্ধ পূর্ববাংলা গর্জে উঠল জনতার প্রতিরোধে। পথে পথে মিছিলের প্রতিরোধ গড়ে উঠল। কারণ তখন বাংলায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী জননায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন : 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। এরপর জাতি দিকনির্দেশনা পেয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল মুক্তিসংগ্রাম। দমন করতে চালাল পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা। নির্বিচার ধ্বংসলীলা, মাতৃসম্ভ্রম লুণ্ঠিত হলো। তবু বাংলা লড়াইয়ের যে অগ্নিমশাল হাতে রাজপথ উত্তপ্ত করে অবশেষে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দৃপ্ত শপথে বলীয়ান বাংলার মানুষ শত্রম্নহত্যার হাতিয়ারে শান দিল। অকুতোভয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল শত্রম্নর মোকাবেলায়। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক সহচর তাজউদ্দীন আহমদ প্রতিবেশী ভারতে ইন্দিরা সরকারের সঙ্গে কথা বলে সহযোগিতা চাইলেন। মিললও। ৯ মাস আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত হলাম। জীবন দিলাম অকাতরে। শত্রম্ন নিধনের পেছনে পড়ে রইলাম না। নিরস্ত্র বাংলার অমিততেজ মানুষ বুকের পাঁজর থেকে লাঠিতে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ক্রমে ক্রমে শত্রম্ন নিধনের মাধ্যমে এবং পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত-পর্যুদস্ত করে হাজারে হাজারে অস্ত্রের দখল নিয়েছিলাম, যা ছিল আমাদের সম্বল। বন্ধু ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন হাত বাড়িয়ে দিল বন্ধুত্বের। শক্তি আমাদের বৃদ্ধি হলো।

রক্তিম বাংলার অকুতোভয় লড়াকু মানুষের বন্ধুত্বের সহায়তায় পাকিস্তানের মতো 'দুর্ধর্ষ' বলে পরিচিত একটি সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনল সবুজ শ্যামল জমিনে। লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা বিজয় অর্জন করলাম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সলজ্জ আত্মসমর্পণে।

আমরা স্বাধীন হয়েছি ৪২ বছর আগে কিন্তু কেন আজ আবার নির্মম পরিণতির মোকাবেলা করছি। আমার তো মনে হয়, এ জন্য আমরাই দায়ী। প্রতিপক্ষকে অভিযুক্ত করে লাভ নেই, কারণ ওরা তো বাংলাদেশ চায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক বিরোধিতা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরাসরি মদদে। প্রবল পরাক্রমশালী মার্কিন সপ্তম নৌবহর হুমকি দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রচন্ড গর্জনকে স্তব্ধ করে দিতে, তাজউদ্দীন আহমদের দৃঢ়চেতা মানসিকতা ও অবিচল সিদ্ধান্ত এবং মুক্তিসেনা দলের দৃপ্ত শপথে বলীয়ান মুক্তিযোদ্ধারা মার্কিনি হামলার ভয়কে জয় করে নিঃশঙ্কচিত্তে সংগ্রামের পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন বলে সেদিন মার্কিনি চক্রান্ত বিফল হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। এ চক্রান্তের দোসর খন্দকার মোশতাক মন্ত্রিসভায় থেকেও মার্কিন যোগসূত্র বজায় রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ফেডারেশন করার কপটতায়ও জড়িত হয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের পরও তিনি মন্ত্রিসভায় থেকে গেলেন, অপসারিত হলেন তাজউদ্দীন, যিনি ৯ মাস সরেজমিনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন এবং বিজয় অভিযানের মহানায়ক। ওই মার্কিনি চক্রান্তের দোসর মোশতাক ও বিচু্যত সেনা কর্মকর্তাদের চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে নানা উত্থান-পতনের পর আবার সেই সেনাশাসনে ফিরে গেলাম জেনারেল জিয়ার মাধ্যমে। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতকে পুনর্বাসন করলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া গোলাম আযমকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়ে আর জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া হত্যার পর তাকে নাগরিকত্বই দিয়ে দিয়েছিলেন। এর বিরোধিতা করেছিলেন শহীদজননী জাহানারা ইমাম ও দেশের বরেণ্য লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক-সাহিত্যিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বহু ব্যক্তিত্ব। সেই যুদ্ধাপরাধীদের সেদিন বিচার শুরু হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সব হত্যাকারী-অপরাধীকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছিল। ওরা মিশে গেছে এ দেশের মানুষের মধ্যে। কিন্তু পৈশাচিক আচরণের যে ভয়ঙ্কর রূপ ছিল একাত্তরে বিচার তাৎক্ষণিক না হওয়ায় আজ আবার কেউটের ফণা তুলে হিংস্রতার ছোবলে জর্জরিত করেছে গোটা দেশকে। জনগণকে ধর্মের দোহাই দিয়ে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করেছে। সন্ত্রাসের সহিংসতায় দেশের মানুষকে হত্যা, খুন, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগে বিপন্ন করে তুলেছে। আজ যখন বর্তমান মহাজোট সরকার তাদের মেয়াদকালের তিন সাড়ে তিন বছর কাটিয়ে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেপ্তার, বিচার ও শাস্তি দিতে শুরু করেছে, তখন জামায়াত-বিএনপি কেবল নয়, নতুন নতুন দল, সংগঠন তৈরি করে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি নানা সময়ে নানা ধরনের জোট পাকাতে শুরু করেছে। উদ্দেশ্য একটাই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা।

এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধী বা মানববতাবিরোধী একাত্তরের বিশ্বাসঘাতক স্থানীয় দোসর যারা পাকিস্তানিদের কসাই-জলস্নাদ হিসেবে কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে রায় দেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু কসাই নামে পরিচিত ধিকৃত ও ঘৃণিত কাদের মোলস্না শত শত মানুষ হত্যাকারী হয়েও যখন যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হলেন, তখন অনলাইন যোদ্ধাদের দেশপ্রেম এবং রাজপথের সংস্কৃতিযোদ্ধারা একত্রিত হয়ে শাহবাগ চত্বরে 'গণজাগরণ মঞ্চ' জন্ম দিলেন স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার সাহসী ও আন্তরিক অংশগ্রহণে। নানা অজুহাতে জামায়াত-বিএনপি মৌলবাদীদের নিয়ে বিচার বন্ধ করতে না পেরে, দেশের সর্বত্র 'গণজাগরণ মঞ্চ' সৃষ্টি হওয়ায় মানুষের মধ্যে নবচৈতন্যোদয় ঘটেছে, তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওই গণবিরোধী চক্রের মোক্ষম অস্ত্র 'ধর্ম'-কে প্রয়োগ করে, মিথ্যা প্রচার চালিয়ে, ভিত্তিহীন অভিযোগ মনগড়া কাহিনী বানিয়ে অনলাইন যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে হেনস্তা করার কৌশল নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে শুধু যাচ্ছে না, তরুণ প্রজন্মের মেধাবী নব্য মুক্তিসেনাদের দেশপ্রেম, মাতৃভক্তিকেও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারের দোটানা নীতির পরিণতিতে হেফাজতে ইসলাম নামের উদ্ভট একটি ধর্মান্ধ শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলায় তারা ঢাকা প্রবেশের অনুমতি নিয়ে খালেদা জিয়ার উস্কানিমূলক বক্তৃতা এবং তাদের মুখপত্রে মিথ্যা ও কল্পকাহিনী ও বানানো ছবি ছাপিয়ে টকশোতে চিৎকার করে সবার উপরে গলা চড়িয়ে কথা বলেও জিততে চাইছে। কী হিংস্র আচরণ করেছে হেফাজত তা তো আমরা টেলিভিশনেই দেখেছি। মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি, এই কি মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ।

যে দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও সদস্যরা সংসদে যান না, ভোটারদের অপমান করেন, সে দেশে কোনো গণতন্ত্র আদৌ আছে বলে তো আমার মনে হয় না। বড় দুই দল গোঁ ধরে বসে আছে বলেই মনে হচ্ছিল এতদিন। এখন দেখছি ক্ষমতাসীনরা অনেকটা ছাড় দিয়েছে, তারা বিরোধী দলকে সংলাপে ডাকছে। তবে প্রধানমন্ত্রী এক কথা বলছেন, অন্যরা একেকজন একেক ধরনের মন্তব্য করে জনমনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলছেন। সংসদে অথবা বাইরে যে কোনো জায়গায় বসা যেতে পারে। কিন্তু এত ডাকাডাকি করেও বিরোধী দলের মান ভাঙানো যাচ্ছে না। তারা তো গোঁ ধরে বসে আছেন। উল্টো চায়ের দাওয়াত দিয়েছেন খালেদা তার বাসায়।... এ কেমন 'ভদ্রতা'। প্রধানমন্ত্রী তো সরকারপ্রধান, তিনি বারবার ডাকছেন, সংসদে যেতে বলছেন কিংবা যে কোনো জায়গায় বসে আলাপ করে সমস্যা-সংকট নিরসনের কথা বলছেন। কোনো সদুত্তর মিলছে না। মিলছে আলটিমেটাম কিংবা চক্রান্ত আর উসকানি। ফলে এগোচ্ছে না আলোচনার সুযোগ। জাতিসংঘ বলছে। মার্কিনিরা চাপ দিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত সম্মত করাতে চেষ্টা করছেন, তার পরও আজ পর্যন্ত কোনো সদিচ্ছার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে না বিরোধী দলের।

এ দেশে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রেখে মুক্তির পথে চলাই হলো জাতির অঙ্গীকার। আমরা আজও তার ধারেকাছে পৌঁছাতে পারিনি। যে সমাজ-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-ইতিহাস আমাদের পূর্বপুরুষ রেখে গেছেন গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, আমরা তাকেই রক্ষা করতে পারছি না, তো নতুন কী করব? অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পশ্চিমা বেলেলস্নাপনা আমাদের গ্রাস করতে উদ্যত। তার কাছেই আমরা সমর্পিত হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কেন? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আমরা রক্তাক্ত প্রান্তরের সাহসী যোদ্ধা। আমাদের দেশ অগ্নিগর্ভ। সম্ভাবনায় উজ্জ্বল নিজস্ব সম্পদে। তবু বাইরের যে কোনো ভালোকে গ্রহণ আমাদের চরিত্রের অংশ। কিন্তু কোনো অন্যায়, অশুভকে আমরা গ্রহণ করতে অতীতেও পারিনি, এখনো পারছি না। আগামী পৃথিবী সাক্ষ্য দেবে, আমরা পেরেছি কিনা? কিন্তু জীবনসংগ্রামে ঋদ্ধ আমরা আমাদের বাংলাকে গর্বে-ঐতিহ্যে সোনার বাংলায় পরিণত করতে চাই। যে বাংলা হবে অসাম্প্রদায়িক। মানুষের অধিকার যেখানে প্রবল বিশ্বাসে স্থায়িত্ব পাবেই। জয় আমাদের নিশ্চিত।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে