logo
শনিবার ২৪ আগস্ট, ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬

  ড. শাহজাহান কবির   ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

পাকিস্তানের জন্মের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে বশীভূত করা হয়। যদিও পূর্ব পাকিস্তান পাট রপ্তানির মাধ্যমে সমগ্র পাকিস্তানের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত, পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে তার অধিকাংশই বিনিয়োগ করা হতো। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৫০-১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সামগ্রিক বাজেটের শতকরা ২৮.৭ ভাগ ব্যয় করা হয় (১)। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ অনুভব করেছিল যে, তাদের পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র
বৈদেশিক শক্তির কবল থেকে বাংলাদেশিরা দুই ধাপে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয় ১৯৪৭-এ যখন ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষকে দুই রাষ্ট্রে (ভারত ও পাকিস্তান) বিভক্ত করা হয়েছিল। পাকিস্তান ছিল দুই শাখাতে বিভক্ত-পূর্ব ও পশ্চিম। এই দুই শাখার মধ্যবর্তী ১৫০০ কিলোমিটার দূরত্বের কিছু বেশি জুড়ে বিস্তারিত ছিল ভারত। প্রাথমিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে বলা হতো পূর্ব বাংলা, যেটি ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করে সৃষ্টি করা হয়েছিল। পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ ছিল ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। ধর্মের এই বন্ধন ব্যতিরেকে দুই শাখার মধ্যে মিল ছিল খুবই কম। পাকিস্তানের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগের বসবাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানে, যাদের সাংস্কৃতিক পটভূমিকা ছিল ভিন্ন। তারা ছিল মূলত বাংলাভাষী। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের চারটি পৃথক ভাষা ব্যবহার করত। ভৌগোলিক দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসাধারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের নিকটবর্তী। পাকিস্তানের শাসন শক্তির ভিত্তি ছিল পশ্চিম ভারতের মুসলিম অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে যারা ১৯৪৭-এ ভারত থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে এসেছিল। এই অভিজাত শ্রেণি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণির সঙ্গে সহযোগিতায় সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। যদিও পাকিস্তান প্রথমদিকে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম লীগ দলের সদস্য। নীতিগতভাবে তারা ছিল অতি দুর্বল এবং সহজেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা নিপুণভাবে পরিচালিত হয়ে যেত। ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এরপর থেকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রপতির হাতে চলে আসে এবং পরে সামরিক বাহিনীর হাতে। ১৯৫০ দশকে এটা লক্ষ্য করা হয়েছিল যে, যখন প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো পূর্ব পাকিস্তানিকে মনোনীত করা হতো, তখন তাকে অতি দ্রম্নত পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সরিয়ে দিত। ১৯৫৮-১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তান সামরিক শাসক দ্বারা পরিচালিত ছিল।

পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের ওপরে প্রথম আঘাত হানা হয় ১৯৪৮-এ যখন পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ হলো। এর ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয় যার পরিণতিতে ভাষা শহীদদের জীবন দিতে হলো। ১৯৫৬ সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলো। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল নামেমাত্র স্বীকার। বাংলাভাষাকে পাকিস্তানি আমলে কখনই পূর্ণ মর্যাদা দেয়া হয়নি।

পাকিস্তানের জন্মের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে বশীভূত করা হয়। যদিও পূর্ব পাকিস্তান পাট রপ্তানির মাধ্যমে সমগ্র পাকিস্তানের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত, পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে তার অধিকাংশই বিনিয়োগ করা হতো। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৫০-১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সামগ্রিক বাজেটের শতকরা ২৮.৭ ভাগ ব্যয় করা হয় (১)। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ অনুভব করেছিল যে, তাদের পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এই বৈষম্য দূর করার জন্য আওয়ামী লীগ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের জন্য ছয় দফার একটি পরিকল্পনা রচনা করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাকিস্তানের গঠন হবে 'ফেডারেল' বা 'যুক্তরাষ্ট্রীয়', যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রথা চালু থাকবে। ফেডারেল সরকার দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় পরিচালনা করবে। অন্যান্য সব বিষয় প্রদেশগুলোর আওতায় থাকবে। ১৯৬৬-এর ৮ মে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা হয়। ১৯৬৯-এর ৫ জানুয়ারি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনরা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য অনুরূপ ও পরিপূরক ১১ দফার একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করে। ১৯৬৮ সালের শুরুতে শেখ মুজিবসহ ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে মিলিত হয়ে চক্রান্ত করার অভিযোগে সামরিক আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার এক মামলা দাখিল করা হয়। এই মামলা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এই মামলার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ দেখা দেয় এবং আন্দোলন চলাকালে অনেক ব্যক্তি নিহত হয়, যাদের মধ্যে আসাদের নাম বিশেষ উলেস্নখযোগ্য। বিচারের তারিখ হিসাবে ১৯৬৯-এর ৬ মার্চ ধার্য করা হলেও তা রাজনৈকি অস্থিরতার জন্য স্থগিত করা হয়। অতি নির্মমভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহিরুল হককে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয়। তার মৃতু্যর সংবাদ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে বিশাল গণবিক্ষোভের সৃষ্টি করে। মাত্র তিনদিন পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উচ্চপদস্থ শিক্ষক ডক্টর সামসুজ্জোহাকে কর্মে নিয়োজিত অবস্থায় পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে। গণবিক্ষোভের চাপে সরকার কয়েকদিন পর (২২ ফেব্রম্নয়ারি ১৯৬৯) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এই গণবিক্ষোভ পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের একনায়কত্ব সামরিক সরকারের পতনকে দ্রম্নত করিয়ে দেয়। মাত্র এক মাস পর আয়ুব খান রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া তখন সারাদেশে সামরিক আইন জারি করেন।

২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ জেনারেল ইয়াহিয়া নিয়মতান্ত্রিক সরকারের জন্য গণপরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণ করেন (৫ অক্টোবর ১৯৭০)। এই তারিখ পরে পিছিয়ে ৮ ডিসেম্বর ১৯৭০ করা হয়। ১২ নভেম্বর ১৯৭০ এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় পূর্ব পাকিস্তানের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানে। যার ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ জীবন হারায়। পাকিস্তান সরকার এই দুর্দশাকে গুরুত্ব দেয়নি। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই মন্থর। ঘূর্ণিঝড়ের পর দুর্গত মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদরা সরকারকে অমানবিক উপেক্ষা ও নির্মম অবহেলার জন্য দোষী করে (২)। ২৩ নবেম্বর ১৯৭০ পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট গণনেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অদক্ষতার দরুন জেনারেল ইয়াহিয়ার পদত্যাগ দাবি করেন। তার মতে, 'হাজার হাজার ভাইবোনদের মৃতু্য সংবাদ পাকিস্তান সরকার বা জাতীয় বেতার আমাদের জানায়নি। আমরা জেনেছিলাম, আট হাজার মাইল দূরের বিবিসির মাধ্যমে।' শেখ মুজিব বলেন, 'ঘূর্ণিঝড়ের ১০ দিন পরও কোনো সাহায্য দুর্গতদের কাছে পৌঁছায়নি। ঘূর্ণিঝড়ের দুইদিন আগে সতর্ক করে দিলেও কর্তৃপক্ষ মানুষদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি জনসাধারণকে যথোপযুক্তভাবে সতর্ক করে দেয়া হয়নি। আমাদের বড় সামরিক বাহিনী আছে। কিন্তু মৃতদের কবর দেয় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সৈন্যরা।' ঘূর্ণিঝড়ের এই দুঃখদায়ক কাহিনী ছিল আর একটি বিষয়, যা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে বুঝতে সাহায্য করল যে, তারা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কিছু আশা করতে পারে না। এই তিক্ততার প্রতিফলন ঘটেছিল ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে বিপুল জনসমর্থনে জয়ী হয়। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন দখল করে সমগ্র পাকিস্তানির সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়ে গেল। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩১৩টি। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক 'পাকিস্তান পিপলস পার্টি' ৮৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় দল হয়। নির্বাচনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তাকে 'পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী' বলে সম্বোধন করেন। ১৩ ফেব্রম্নয়ারি ১৯৭১ তারিখে জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনের দিন হিসেবে ৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখকে স্থির করেন। নির্বাচনের ফলাফল জুলফিকার আলী ভুট্টোকে খুবই হতাশ করে।

এরপর ২৯ পৃষ্ঠায়

তিনি শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে নানা প্রকার বাধা সৃষ্টি করতে লাগলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কর্তৃক নির্বাচনে সমর্থিত শেখ মুজিবের স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবিকে মানতে নারাজ হলেন। ফেব্রম্নয়ারি ১৯৭১-এর শেষের দিকে জেনারেল ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলী ভুট্টো অতি গভীর আলোচনায় নিমগ্ন হলেন। ১ মার্চ ১৯৭১ তারিখে জেনারেল ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি রাখার ঘোষণা দিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দেয়ালের ওপর লেখাকে ঠিক দেখতে পেল। জেনারেল ইয়াহিয়া নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রায়কে মানবে না এবং গণভোটের মাধ্যমে যে শক্তি তাদের প্রাপ্য, সেই অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করতে চায়। সারা পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল বের হয়ে গেল। অনেক লোক সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত হলো। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গণসমাবেশে বাংলাদেশের নতুন জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দেয়া হলো। সেই পতাকায় সবুজ পটভূমির মধ্যখানে ছিল গোল সূর্যের লাল আভা এবং সেই লাল গোলের ওপর হলুদ রঙে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র। ৩ মার্চ শেখ মুজিব, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও জেনারেল ইয়াহিয়ার মধ্যে এক বৈঠক হয়। সেই আলোচনা ব্যর্থ হলো। ৩ মার্চ ঢাকায় এক জনসমাবেশে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে 'স্বাধীন বাংলার ইশতেহার' পাঠ করা হয়। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার অসহযোগিতা শুরু হলো।

২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস চালনার জন্য দৈনিক নির্দেশ দিতে লাগলেন। পাকিস্তান সরকারের জারিকৃত নির্দেশাবলীকে অগ্রাহ্য করা হলো। যার ফলে সেই সরকারের কর্মশক্তির বিলুপ্তি হলো। ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া ২৩ মার্চ জাতীয় সংসদ উদ্বোধন করার বিষয় ঘোষণা করেন। ৭ মার্চ শেখ মুজিব ঢাকার বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসমাবেশে জাতীয় সংসদের অধিবেশন সম্পর্কে আলোচনার প্রশ্নে ভাষণ দেন। সেই সভায় তিনি কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন : অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সামরিক বাহিনীর সব লোককে তাদের সেনানিবাসে ফিরিয়ে নেয়া, বাঙালিদের হত্যার পেছনে দন্ত এবং ২৩ মার্চের অধিবেশনের পূর্বে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। জনসাধারণের ওপর পাকিস্তানি হামলার কথা চিন্তা করে শেখ মুজিব সভায় সমবেত জনতাকে 'প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে' ও 'স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম' করতে বলেন। ভাষণ সমাপ্তির প্রাক্কালে তার আহ্বান 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' পূর্ব বাংলার জনসাধারণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করল।

১৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় আসে। শেখ মুজিবের সঙ্গে তার অনেকগুলো বৈঠক হয়। বিরামহীন ও গভীর আলোচনার শেষে দুই পক্ষ ২০ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে একমত হয়। ২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় শেখ মুজিবের সঙ্গে 'আলোচনার' জন্য আসে। এই পর্যায়ে ভুট্টো ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তি মানতে রাজি না হয়ে সমগ্র প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করে। সে জাতীয় সংসদের অধিবেশনকে প্রথম ডাকার কথা বলে। অন্যথায় সে শেখ মুজিবের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য অধিক সময় চাইল। ২৩ মার্চ আয়োজিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকে মুলতবি ঘোষণা করা হলো। ২৫ মার্চ শেখ মুজিব ও তার দলের প্রধান সদস্যরা জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিশদে আলোচনার উদ্দেশ্যে একটি টেলিফোন বার্তার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। তারা বৃথায় অপেক্ষা করেছিলেন। সেই টেলিফোন বার্তা কখনো আসেনি।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর সন্ধ্যা বেলায় পাকিস্তান উত্তর ভারতের কয়েকটি বিমানবন্দরে অগ্রিম আক্রমণ চালায়। ভারতের দুই পাশে, পশ্চিম ও পূর্বে, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। পূর্বদিকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে একজোট হয়ে ভারত অধিকৃত বাংলাদেশ মুক্ত করার কাজে নেমে গেল। সম্মিলিত ভারত (৩ কর্পস) ও মুক্তিবাহিনীর (৩ ব্রিগেড) সৈন্য সংখ্যা পাকিস্তানের মাত্র ৩ ডিভিশনকে ছাড়িয়ে গেল। ভারতীয় সমর বাহিনী সহজেই সমগ্র বাংলাদেশ দখলে আনল। ভারতীয় বিমান বাহিনী পাকিস্তানের ক্ষুদ্র বিমানবহরকে অতি সহজেই বিচূর্ণ করে দিল। ঢাকা বিমানবন্দর অকেজো হয়ে গেল। ভারতীয় নৌবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে সমুদ্রপথে অবরোধ করে দিল। দ্রম্নত যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে সম্মিলিত ভারতীয় ও মুক্তি বাহিনীর কাছে ঢাকার পতন ঘটল। যে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল, তাদের খুবই দ্রম্নত ও লজ্জাকর পরাজয় ঘটল। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করল এবং ৯০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্যকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে নেয়া হলো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এটাই হলো সবচেয়ে বড় ধরনের আত্মসমর্পণ।

১৯৭১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে জেনারেল ইয়াহিয়া যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দৈনিক দেখা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কখনো ইয়াহিয়াকে বাংলাদেশ স্বীকার এবং অথবা শেখ মুজিবের মুক্তির বিষয়ে চাপ দেয়নি। যখন যুদ্ধ পুরোপুরিভাবে শুরু হলো, তখন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের অধিবেশনে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির জন্য এক প্রস্তাব উত্থাপন করল। কিন্তু সেই প্রস্তাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতি বা শেখ মুজিবের মুক্তির বিষয়ে কোনো কিছুই উলেস্নখ করা হলো না। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রস্তাবে ভেটো বা অসম্মতি জ্ঞাপন করায় এটাকে গ্রহণ করা হয়নি। এখানে উলেস্নখ করা যেতে পারে যে, এর আগে জুলাই মাসের প্রথমে জাতিসংঘের মহাসচিব উঁ থান্ট এই সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি (৩৫)।

১৯৭১-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার এক বিরাট সম্ভাবনা ছিল। যখন পাকিস্তানের পরাজয় আসন্ন, তখন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে ঐক্য দেখানোর জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করল পারমাণবিক যুদ্ধের গোপন হুমকি দিয়ে। ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের তাঁবেদার মনে করত। নিক্সন ও হেনরী কিসিঞ্জারের ৮ ডিসেম্বরের টেলিফোন আলাপ আলোচনা বর্তমানে প্রকাশ করা হয়েছে। সেই আলোচনা মতে হেনরী কিসিঞ্জার বলেছিলেন, 'আমরা সেই অবস্থানে আছি, যেখানে সোভিয়েতের অস্ত্র সাহায্যে একটা দেশকে দখল করা হচ্ছে যেটি যুক্তরাষ্ট্রের এক মিত্র (৩৬)।' নিক্সন বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তি পরিচালিত বিমানবহনকারী জাহাজ 'ঞযব টঝঝ ঊহঃবৎঢ়ৎরংব' কে পাঠিয়ে দিল বঙ্গোপসাগরে। এর জবাবে সোভিয়েত সরকার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র-সংবলিত দুই দল জাহাজ সামুদ্রিক বন্দর ভস্নাডিভস্টক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োজিত নৌবাহিনীকে অনুসরণ করতে পাঠাল। নিক্সন ও হেনরী কিসিঞ্জার চীনকে ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করার কথা ভাবছিল। এটা তাদের ৮ ডিসেম্বরের টেলিফোনের আলোচনার মধ্য থেকে পাওয়া যায় (৩৬)।

'নিক্সন : আমি আপনাকে বলছি, কিছু চীনাদের ভারত সীমান্তের দিকে চলাফেরা 'গড ড্যাম' ভারতীয়দের মৃতু্যর ভয়ে কাঁপিয়ে তুলবে।

কিসিঞ্জার : এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যত তাড়াতাড়ি আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব, আমি তাহলে চীনাদের সঙ্গে বলব। আমি বরং এই শুক্রবারেই তা করব।

নিক্সন : হঁ্যা। আচ্ছা, যদি কোনো উপায়ে তাদের এতে আনা যায়, তা হবে সত্যিই কিছু ব্যাপার!

ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন 'শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার' চুক্তিতে আবদ্ধ। যদি চীন ভারত আক্রমণ করত, তা হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সামগ্রিক চিত্রে চলে আসত।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাত বেঁধে দিয়েছিল নভেম্বর ১৯৭১-র সেই আইন যা পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু নিক্সন এতে নিরুৎসাহ হননি। তিনি খুঁজেছিলেন বিকল্প পথ যথা-জর্ডান, সৌদি আরব, ইরান ও তুরস্কের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে অস্ত্র, গোলাগুলি এবং বিমানবহর সরবরাহ করার জন্য। প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তরের উপ-সহকারী আলেকজান্ডার হেগের ভাষায়, 'এই প্রক্রিয়াকে সহজ করার জন্য আমরা সব কিছুই করছি।' তিনি জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের দূতের কাছে আরও বলেন '... এটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত যে আপনার সরকার স্বীকার করুক যে, আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ আপনাদের সঙ্গে সমতাল বজায় রেখে করেছি। আমরা আপনাদের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বলেছি (৩৭)।' তাই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে রুখতে একজোটে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকেছিল।

সুপরিকল্পিতভাবে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা কার্য ছিল ১৯৭১'র গণহত্যার এক বিশেষ দিক (৩৮)। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষাবিদদের মার্চ ও এপ্রিলের 'ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঝবধৎপযষরমযঃ (সন্ধানী বাতির কার্য প্রক্রিয়া)' এর সময় হত্যা করা হয়েছিল, চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের হত্যার চরম ঘটনাগুলো ঘটেছিল যুদ্ধ শেষের কিছু দিন আগে। ১২-১৪ ডিসেম্বর মধ্যে নানান পেশার বুদ্ধিজীবী যেমন প্রফেসর, সাংবাদিক, ডাক্তার, শিল্পী, প্রকৌশলী ও লেখকদের পাকিস্তানি সমর বাহিনী ও সহযোগী আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর লোকেরা তুলে নিয়ে যায়। তাদের অধিকাংশেরই চোখ বাঁধা অবস্থায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন উপকণ্ঠের (মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া এবং রাজারবাগে) নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একযোগে হত্যা করা হয়, বিশেষ করে রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমি বলে পরিচিত স্থানে। এমনকি সরকারিভাবে ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরও পাকিস্তানি সমর বাহিনীর সহযোগীরা সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে যায়। বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ও লেখক জহির রায়হান ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭১'র পরে নিখোঁজ হয়ে যান এবং তাকে বিহারিরা হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হয়।

পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজয়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গণহত্যা চালিয়ে যায়। গণহত্যা বন্ধ করা তাদের তালিকাতে ছিল না। একমাত্র শক্তি এই কার্যকে প্রতিহত করতে পারত, সে ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। কারণ, এই সরকারই ছিল পাকিস্তানের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যদানকারী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ধরে রেখেছিল যে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেই মোতাবেক যথারীতি কার্যক্রম চালিয়ে গেল। যখন ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার বস্নাড ও তার সহকর্মীরা গণহত্যাজনিত তারবার্তা পাঠালেন, নিক্সন ও কিসিঞ্জার সে বিষয়ে কোনো কর্ণপাত করেননি। সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার বদলে তারা আর্চার বস্নাডকে ঢাকা থেকে সরিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক পশ্চাদভূমিতে নিক্ষেপ করলেন।

নিক্সনের ব্যক্তিগত প্রতিকূল ধারণা দক্ষিণ এশিয়ার সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণ করেছিল। তিনি ছিলেন শীতল যুদ্ধের ফসল। পঞ্চাশ দশকে দুই দফা তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যে সময় পাকিস্তান কমিউনিস্টবিরোধী জোটগুলোতে (সিয়াটো ও ছেন্টো) যোগ দেয়। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে তিনি পাকিস্তানকে বেশি পছন্দ করতেন। ভারত যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত জোটগুলোতে অংশ নেয়নি। বরং জোট নিরপেক্ষ 'ন্যামে' (ঘঅগ- ঘড়হ অষরমহবফ গড়াবসবহঃ) নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সফরকালে জেনারেল ইয়াহিয়া তাকে বিশেষ সংবর্ধনা জানায়। ১৯৭১'র সংকটকালে তাদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ ছিল অটুট। ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিংর কাছে কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে, 'সত্যি কথা বলতে কি; প্রেসিডেন্টের (নিক্সনের) ইয়াহিয়ার প্রতি ব্যক্তিগত অনুরাগ আছে। এর ভিত্তিতে কেউ কোনো নীতি তৈরি করতে পারে না। কিন্তু এটাই বাস্তব সত্য (৩৯)' অপরপক্ষে নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে খুবই অপছন্দ করতেন এবং তার সম্পর্কে কটূক্তি (যা লেখা সম্ভব নয়) করতে দ্বিধা করতেন না। এসব কিসিঞ্জারের সঙ্গে নিক্সনের ব্যক্তিগত আলোচনাতে পাওয়া যায়, যেগুলো বর্তমানে প্রকাশ করা হয়েছে (৪০)। তাই নিক্সনের 'প্রচন্ড নিষ্ক্রিয়তার' ফলে শুরু থেকেই ভারত চিত্রে চলে এলো। কিসিঞ্জারের সঙ্গে নিক্সনের ছিল এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক। তারা দুইজনে এত ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন, যার দৃষ্টান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে বিরল (৪১)। বিগত ষাট দশকের শেষে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্কের যখন চরম অবনতি ঘটল, কিসিঞ্জার তখন সোভিয়েতের বিরুদ্ধে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক জোট স্থাপনের প্রচেষ্টা করল। জেনারেল ইয়াহিয়া ছিল নিক্সন-কিসিঞ্জার ও চীনের মধ্যকার যোগসূত্র। জেনারেল ইয়াহিয়ার ভাষায় 'দু'বছর ধরে আমার অনেক পরিশ্রমের ফলে এই দুই বিশাল শক্তিকে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। এই দুই দেশ আমার কাছে এমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, যা আমি প্রকৃতপক্ষে বর্ণনা করতে পারব না। (৪২)' নিক্সন ও কিসিঞ্জার এমন বিশ্বস্ত মিত্রকে ছেড়ে দেয়নি এবং তাদের নির্ভরযোগ্য সহযোগী যে গণহত্যা করে যাচ্ছিল, এর দিকে কোনো দৃষ্টিপাতও করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এই সংকটকালে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন থাকায় আইন প্রবর্তন করল। কিন্তু নিক্সন ও কিসিঞ্জার কিভাবে আইনকে এড়িয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পাকিস্তানকে অস্ত্রাদি সরবরাহ করতে হয় তা জানতেন। ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে আর্চার বস্নাডের পুত্র পিটার বস্নাড বলেন, 'নিক্সন প্রশাসন আমেরিকার জনসাধারণের অভিমতকে প্রতিনিধিত্ব করেনি ... আমেরিকার সমগ্র জনসাধারণ ধীরে ধীরে বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নীতিবহির্গত কার্যের তথ্যাবলী সম্পর্কে জানতে পারল (৪৩)।' এটা সত্য। আমি (বর্তমান প্রবন্ধের লেখক) আমেরিকাতে ১৯৭১'র দক্ষিণ এশিয়ার সংকটের সময় জনসমাবেশে ভাষণ দিয়েছি। আমি দেখেছিলাম, আমেরিকার জনসাধারণ বাংলাদেশিদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সংবাদপত্র পাকিস্তানের আচরণের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তার বিপরীত। পাকিস্তানকে লাগাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার ছিল। কিন্তু তিনি তা প্রয়োগ করেননি এবং লাখ লাখ মানুষকে কষ্ট পেতে ও মৃতু্যবরণ করতে দিয়েছিলেন। নিক্সন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ রোধ করেছিলেন। তিন বছর পর ন্যায়ের পথ রোধ করার দরুন তাকে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে হলো। তিনিই হলেন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ভ্রমণকালে পিটার বস্নাডকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামকালে পররাষ্ট্রনীতির জন্য দুঃখ জানিয়ে অপরাধ স্বীকার করবে কিনা। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি যে, নিক্সন প্রশাসন যুদ্ধকে বিচার করতে এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করার নিন্দা না জানিয়ে ভুল করেছিল। কিন্তু এখন দুঃখ জানিয়ে অপরাধ স্বীকার করবে কিনা, সেটি (যুক্তরাষ্ট্র) সরকারের ওপর নির্ভর করছে (৪৪)।'

বাংলাদেশের জন্মের পর ৪৭ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সেই জন্ম ছিল অতীব যন্ত্রণাদায়ক। বাংলাদেশের মানুষরা অধুনাকালের অন্যতম প্রধান বর্বরজনক গণহত্যার শিকার হয়েছিল। আমি সেই সময় কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করছিলাম। আমি কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের বাংলাদেশ সমিতির সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণের ও নীতি-নির্ধারণকারী নেতাদের কাছে তুলে ধরার জন্য কাজ করে যাই। এই প্রক্রিয়ায় আমি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনেক নেতৃস্থানীয় সদস্য যেমন- সিনেটর উইলিয়াম ফুলব্রাইট ও সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি তারা ছিলেন অতীব সহানুভূতিশীল। আমি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গণসমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য বক্তৃতা দিই। সেখানকার জনসাধারণের বাংলাদেশের প্রতি ছিল গভীর সহানুভূতি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকার যে নীতি পোষণ করেছিল, তা ছিল পাকিস্তান ঘেঁষা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিপন্থি। যে গণহত্যা অগণিত নিরীহ মানুষের জীবন নিয়েছিল, তাকে কি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল? এসব প্রশ্নের পরও বলা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন এবং দেশে গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে। যদিও গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেকে অনেক প্রশ্ন করেছেন। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, এগিয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের পূর্ণতার পথে। আমরা আশাবাদী।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে