logo
সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অজয় রায়   ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতি

সাধারণভাবে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী খুলনার মতো শহরগুলো এই সময়কালে যে মাত্রায় এবং যেভাবে স্ফীত হয়ে উঠেছে তার দিকে তাকালে আমরা হয়তো অবস্থা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আন্দাজ করতে পারব। শুধু জনগণের ব্যাপারটাই ধরা যাক না কেন- এই সময়কালে যে মাত্রায় নগরাঞ্চলে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছে তা ভাবতে গেলে অবাকই হতে হয়। মনে হয় এ দেশের ক্রমে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত যেন হঠাৎ করে কারও আলাদিনের প্রদীপের সন্ধান পেয়ে গেছে। প্রদীপ ঘষে যে দৈত্য তাদের সেবায় অবির্ভূত হয়েছে সে যেন ক্রমাগত একের পর এক নগরপত্তন করে চলেছে। তার আগ্রাসনের সামনে সবুজ শ্যামল গ্রাম-বাংলা প্রান্তে অপসৃত হয়ে কোনোক্রমে নিজেকে আড়াল করে আত্মরক্ষা করতে চাইছে আজকাল। শুধু এককালের মহকুমা শহর অর্থাৎ আজকের জিলা শহর নয়, এমনকি উপজেলা কেন্দ্র পর্যন্ত আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ঘষা দৈত্যের কার্যক্রমের সাক্ষ্য দেখতে পাই আমরা।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতি
স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ-১৯৭১ এর কালরাত্রির সূচনা থেকেই। সেদিন মুষ্টিমেয় বিশ্বাসঘাতক ছাড়া নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অর্জন করেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ব্যাপারটা অবশ্য সহজ হয়নি। সেদিনের সংগ্রাম যে বাংলাদেশের বাংলাভাষীসহ সব বাংলাদেশি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এই বিষয়টি বিশ্ববাসী তথা জাতিসংঘের কাছে গ্রাহ্য করে তোলার পথে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেয়া শাসনের ধরন যে ছিল ঔপনিবেশিক ধরনের এবং বাংলাদেশের বাঙালিদের সংগ্রাম যে বিশ্বব্যাপী চলমান জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অংশ, নাইজেরিয়ার অংশ বায়াফ্রার জনগোষ্ঠীর মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রাম নয় বিশ্ববাসীকে সেটা বোঝানো সহজ হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত ৩০ লাখ দেশবাসীর আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মদানের বিনিময়ে যে স্বদেশ সেদিন দেশবাসী অর্জন করেছে তা স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্ববাসীর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরও পাকিস্তানি শাসকবর্গের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ভূখন্ড পুনরুদ্ধারের জন্য অল্পসংখ্যক দেশদ্রোহীদের সামনে রেখে যে আন্দোলন চালানোর চেষ্টা হয়েছে তা ফলপ্রসূ হয়নি। তারপরও পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থেকেছে। হাস্যকর হলেও পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণকারীদের অন্যতম মাহমুদ আলীকে একের পর এক মন্ত্রিসভায় আগে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে স্থান দেয়া হয়েছে।

এটা সত্য কথা বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী নানা প্রক্রিয়ার মধ্যক্রমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের মধ্যদিয়ে নিজেদের জাতীয় সত্তার সন্ধান পেয়েছেন। বিষয়টি যে এই সময়কালের ইতিহাসে অন্যতম বিচিত্র ও কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা, তাতে সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও কোরিয়ান উপদ্বীপও বিভক্ত হয়েছে ঠিক, কিন্তু সে দেশের বিভক্তির প্রক্রিয়া ছিল ভিন্ন। সেখানে বিভক্তির ব্যাপারটি চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল সেসব দেশের জনসাধারণের ওপর। তারা কোনোদিনই মন থেকে তা মেনে নেয়নি। সে কারণেই বার্লিন দেয়াল ভেঙে ফেলে যখন দুই জার্মানির পুনরেকত্রীকরণের ঘটনাটি যখন সংঘটিত হলো তখন পূর্ব জার্মানির জনসাধারণের মনে ওই পুনরেকত্রীকরণের ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া যে সৃষ্টি হলো না তার কারণ যেমন পূর্ব জার্মানির তৎকালীন শাসক দলের নানা ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য নিহিত ছিল, তেমনি তার আরেকটি কারণ ছিল জার্মানির বিভক্তির বিষয়টি জনমনে কোনো সময়ই সমর্থন পায়নি।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক সে রকম ছিল না। নানা কারণের ফলে অন্ততঃপক্ষে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের, বিশেষত বাংলার মুসলমান জনসাধারণের সমর্থনের মধ্যদিয়েই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল সেদিন। অন্যদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার যখন নিশ্চিত হয়ে গেল তখন প্রধানত বাংলার অমুসলিম জনগণের দাবির ফলে সেদিন বাংলা ভাগ হয়ে জন্ম হয়েছিল পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের। বাংলার এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সীমানার মধ্যেই সেদিন বিভাগ-উত্তর বাংলার পটভূমিতে বাংলাদেশের বাঙালিদের বর্তমান জাতিগঠন প্রক্রিয়া যাত্রা শুরু করে।

বাংলাভাষী বাঙালির বিকাশ কালের সূচনা নিঃসন্দেহে কম করেও হাজার বছর আগে, কাল হিসেবে চর্যাপদের সূচনা কালে। বাংলাভাষী বাঙালি আমরাও অর্থাৎ বাংলাদেশের বাঙ্গালাভাষী বাঙালিরাও এই ঐতিহ্যের অধিকারী। আবার আরেক বিচারে আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশের বাঙ্গালাভাষীদের একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার সময়কাল থেকে।

কত বিচিত্র পথেই না পরিচালিত হয়েছে আমাদের জাতিগঠন প্রক্রিয়া। আমরা জানি নানা উপাদানের সংশ্লেষণের মধ্যদিয়ে সংহত হয় যে কোনো জনগোষ্ঠীর জাতীয় বৈশিষ্ট্যগুলো। এই সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কোনো একটি উপাদানকে নির্দিষ্ট করে মুখ্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। সেটা করতে যাওয়াও ঠিক নয়। তা যদি করতে যাওয়া হয় তাহলে আর যাই হোক সে প্রচেষ্টা ইতিহাসসম্মত হয় না। ইতিহাস কখনো সরলরেখায় অগ্রসর হয় না। তার গতি সব সময়ই বঙ্কিম। বস্তুত বিশ্বের কোনো কিছুর গতিপথই সরলরৈখিক নয়। সব বস্তুর গতিপথই বঙ্কিম, ঢেউয়ের মতো। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই তা এগিয়ে যায় সামনের দিকে।

আমাদের ইতিহাসের গতিধারা যেভাবে অগ্রসর হয়েছে অর্থাৎ একপর্যায়ে তা যেমন পাকিস্তান দাবির সমর্থনে প্রধানত উঠতি মধ্যবিত্ত বিপুলভাবে সমাবিষ্ট হয়ে যেমন ওই দাবিকে অনিবার্যতা দিয়েছে, তেমনি এই একই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নিজেদের বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য আবার অনিবার্য করে তুলেছে স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয়। তারপরও অবশ্য দেশের ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে এবং কোন ধারায় প্রবাহিত হবে তা বর্তমানে মূলত নির্ভর করেছে এই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ওপর।

বাংলাদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিকাশ

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের তুলনায় আজ অর্থাৎ চলিস্নশ বছর পর আমাদের দেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিকাশ কোন মাত্রায় এসে পৌঁছেছে সে সম্পর্কে সঠিক কোনো জরিপ চালানো হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এই বিষয়ে যদি কেউ আগ্রহী হয়ে কোনো জরিপ কাজ চালান তাহলে সামগ্রিক জাতীয় বিকাশ এই সময়কালে কোন ধারায় পরিচালিত হয়েছে তা বোঝার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন।

সাধারণভাবে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী খুলনার মতো শহরগুলো এই সময়কালে যে মাত্রায় এবং যেভাবে স্ফীত হয়ে উঠেছে তার দিকে তাকালে আমরা হয়তো অবস্থা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আন্দাজ করতে পারব। শুধু জনগণের ব্যাপারটাই ধরা যাক না কেন- এই সময়কালে যে মাত্রায় নগরাঞ্চলে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছে তা ভাবতে গেলে অবাকই হতে হয়। মনে হয় এ দেশের ক্রমে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত যেন হঠাৎ করে কারও আলাদিনের প্রদীপের সন্ধান পেয়ে গেছে। প্রদীপ ঘষে যে দৈত্য তাদের সেবায় অবির্ভূত হয়েছে সে যেন ক্রমাগত একের পর এক নগরপত্তন করে চলেছে। তার আগ্রাসনের সামনে সবুজ শ্যামল গ্রাম-বাংলা প্রান্তে অপসৃত হয়ে কোনোক্রমে নিজেকে আড়াল করে আত্মরক্ষা করতে চাইছে আজকাল। শুধু এককালের মহকুমা শহর অর্থাৎ আজকের জিলা শহর নয়, এমনকি উপজেলা কেন্দ্র পর্যন্ত আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ঘষা দৈত্যের কার্যক্রমের সাক্ষ্য দেখতে পাই আমরা।

নিঃসন্দেহে যারা আজ এভাবে এবং এত দ্রম্নতলয়ে স্ফীত হয়ে উঠল তাদের ধনাগমের উপায় কি সে বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকাটা বাংলাদেশের বর্তমান গতি-প্রকৃতি অনুধাবন অথবা ভবিষ্যতে তা কোন ধারায় প্রবাহিত তা অনুমান করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে অনুমাননির্ভর সাধারণ কিছু মন্তব্য করার আগে গত চলিস্নশ বছরে অর্থাৎ স্বাধীনতার পর সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের দৃশ্যত যে পরিবর্তনগুলো সাধিত হয়েছে সে বিষয়ে সাধারণ দু'একটি মন্তব্য করে নিতে চাই।

বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামে এই সময়কালে যদি যাওয়া যায় তাহলে চলিস্নশ বছর আগের চেয়ে আজকের যে পার্থক্য প্রথমেই চোখে পড়বে তা হলো, শিক্ষা। বিশেষত নারীশিক্ষার বিস্তারের বিষয়টি। আগের তুলনায় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্য শিক্ষার বিস্তার যেমন সাধিত হয়েছে, তেমনি মেয়েরা অনেক বেশি বিদ্যালয়মুখী হয়েছে আজকাল। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় অবস্থার উন্নতি হয়েছে। যার ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে আনুপাতিক হার বৃদ্ধি পেয়েছে তরুণের সংখ্যা। আগের তুলনায় স্বাস্থ্য সেবার অধিকতর বিস্তৃতি নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

এই সঙ্গে আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া দরকার। গত চলিস্নশ বছরে এ দেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসে কাজের জন্য গেছেন তাদের পাঠানো অর্থ গ্রামাঞ্চলে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি করেছে। তা ছাড়া এনজিওদের কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি গ্রামবাসীদের দারিদ্র্য বিমোচন না হোক, তাদের দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে।

আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলেও সচ্ছল মধ্যবিত্তের সংখ্যা আজ থেকে চলিস্নশ বছর আগে যা ছিল সেই তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে নিঃসন্দেহে।

আরও একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে বলা দরকার। তা হলো তৈরি পোশাকশিল্পে তরুণী মেয়েদের অধিক সংখ্যায় নিয়োগ নিঃসন্দেহে সামগ্রিকভাবে নারীসমাজের সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। মৌলবাদীদের পক্ষে দাপট দেখিয়ে পর্দার নামে আজ থেকে মেয়েদের পঞ্চাশ বছর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সহজ নয়। তা ছাড়া আজ মেয়েরা অনেক পরিবারেই রোজগেরে হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকেন।

গত চলিস্নশ বছরে পূর্বোক্ত যে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলো সাধিত হয়েছে তার কমবেশি প্রভাব রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে যে পড়বে তা স্বাভাবিক। এ বিষয় নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলার আগে আরও একটি বিষয় আলাপ করে নেয়া দরকার। সূচনায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিকাশের বিষয়টি উলেস্নখ করেছি। এটাও বলতে চেষ্টা করেছি গত চলিস্নশ বছরে সামাজিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য কোনো কিছুকে যদি উলেস্নখ করতে হয় তাহলে তা হলো উপরোক্ত ঘটনাটি। আর মধ্যবিত্তের এই বিকাশের অনুষঙ্গ হিসেবে আমাদের দেশের ধনিক শ্রেণি শুধু যে আগের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষণীয়ভাবে সামনে এসেছে তাই নয়, তাদের ভেতর থেকে কেউ কেউ উপরে উঠে শুধু ধনিক শ্রেণিতেই উন্নীত হননি, ধনিকদের মধ্যেও বড় ধনিকের কাতারে স্থান নির্দিষ্ট করতে পেরেছেন। শুধু তৈরি পোশাক নয়, ওষুধ, চামড়াজাত সামগ্রী প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ রপ্তানি করে এবং এসব ক্ষেত্রে উৎপাদক হিসেবে বড় ধনিক শ্রেণি আবির্ভূত হয়েছে।

এক কথায় স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর বাংলাদেশের পুঁজিবাদী ধারায় বিকাশের মাত্রা আগের তুলনায় যথেষ্ট দ্রম্নতগতিতে অগ্রসর হয়েছে, আরও সুস্পষ্টভাবে বললে বেশ দ্রম্নতগতিতে একদল লোক ধনাঢ্য হয়ে উঠে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য তথা কিছু পরিমাণ শিল্পে নিজেদের কর্মতৎপরতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করেছে।

তবে এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি উলেস্নখ করা দরকার তা হলো দেশের ধনিক ও মধ্যবিত্তদের বিকাশের ধরন প্রসঙ্গ।

মধ্যবিত্তের তথা ধনিক শ্রেণির দ্রম্নত বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যা কাজ করেছে তা হলো রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য। স্বাধীন বাংলাদেশের অভু্যদয়ের আগে ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলা ছিল কলকাতার এবং তৎসংলগ্ন শিল্প তথা ব্যবসার পশ্চাৎভূমি। প্রধানত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এ দেশ।

রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকাশের প্রশ্ন ধরলে বাংলার রাজনৈতিক সীমান্ত যখন আজকের বাংলাদেশের আকার পরিগ্রহ করেনি, যখন বর্তমান ভূখন্ড ব্রিটিশ ভারতীয় বাংলার অন্তর্গত ছিল এবং বাংলা তখন ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের একটি অংশ। তখন ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ক্রমে সমগ্র উপমহাদেশীয় ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনা ক্রমে বিকাশ লাভ করে। সেই ধারারই অন্যতম অংশ ছিল তৎকালীন বাংলার ও তার ভিতরে বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। সেদিন ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে বাংলা তথা বাঙালিরা সমগ্র ভারতে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী সংগ্রামে সংযোজন করেছিল এক গৌরবময় অধ্যায়। কিন্তু তারপরও এটা সভ্য যে সেদিনের সেই ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম তথা তৎকালীন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ বিশেষত বিকাশমান শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্তকে নিজেদের ধারায় অঙ্গীভূত করে নিতে পারেনি। তার ফল যা হওয়ার তা হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাংলার মুসলমান জনসাধারণ বিশেষত তাদের ছাত্র-যুবসমাজ পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে হলে এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

আবার এই মধ্যবিত্তের নেতৃত্বেই ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসাধারণকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়েছে বর্তমান বাঙালি জাতীয়তাবাদকে।

এখানে মনে রাখা দরকার, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর এ দেশের মানুষ জাতীয়তাবাদের যে ধারাকে সামনে নিয়ে অগ্রসর হয়েছে এর আগে ঐক্যবদ্ধ বাংলায় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারা প্রচলিত ছিল তার বৈশিষ্ট্য সবটা এক নয়। মাঝখানে ১৯৪৭ সালের উপমহাদেশ তথা বাংলার বিভক্তি একটি বড় চ্ছেদ ঘটিয়েছে উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়।

এরপর ২৬ পৃষ্ঠায়

এই প্রসঙ্গে শুধু এটুকুই বলা যায় অতীতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ব্রিটিশ শাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শামিল করার সম্ভাবনা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে। বিশেষত ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের পুরোধা সংগঠন জাতীয় কংগ্রেসের কতক সীমাবদ্ধতার জন্য ঐক্যের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে সর্বশেষ বড়মাপের চেষ্টা হয়েছিল দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জনের উদ্যোগে প্রবর্তিত বেঙ্গল প্যাক্টের সময়। তার অকালমৃতু্যর পর সেই ধারা আর এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের পটভূমিতে এ দেশের জনগোষ্ঠী যখন নতুন করে জাতীয়তাবাদের সন্ধান শুরু করল তখন তা যে আগের নিখিল ভারতের পটভূমিতে বিকাশমান ধারার চেয়ে পৃথক হবে তা বলা বাহুল্য।

এই কথাগুলো এত জোর দিয়ে বলছি কারণ আমরা যখন আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা খুঁজতে চাই তখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় চর্যাপদসহ হাজার বছর আগের বাংলা ও বাঙালির জীবনধারা, তাদের কৃতির দিকে। কিন্তু এই কৃতিত্বেরই অংশ অষ্টাদশ শতক ও তার পরবর্তী বাঙালির নবজাগরণ বা বাংলার রেনেসাঁ বলে যে অধ্যায়কে অভিহিত করা হয় সে পর্ব থেকে শুরু করে পরবর্তী পর্বের সব কিছুর সঙ্গে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত বাঙালি ইতোপূর্বেকার বাঙালি জাগরণের পুরোধাদের মতো ঠিক সমান আবেগ নিয়ে একাত্ম অনুভব করার ক্ষেত্রে ইতস্তততা এখনো অনুভব করে। আর এই ইতস্তততার সঙ্গত কারণ নেই তাও নয়। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। বাংলা ও বাঙালির এই দুই মহাপুরুষের হাত ধরে আমরা অবশ্য আবার বাঙালির ঐতিহাসিক সংশ্লেষণধর্মী ঐতিহ্যের স্রোত ধারায় রাষ্ট্রীয় সীমানার পার্থক্য অটুট রেখেই সমতালে অগ্রসর হওয়ার মধ্যদিয়ে সৃষ্টি করতে পারি সংশ্লেষণ ধর্র্মিতার নতুন অধ্যায়। নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে উভয় বাংলার বাংলাভাষীরা যে কালক্রমে এদিকেই এগোচ্ছে তাতে আস্থা পুনর্ব্যক্ত স্বাধীনতার চলিস্নশ বছর পরে পূর্বোক্ত লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে সে বিষয়ে নিজের কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই।

স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশ

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে স্বাভাবিকভাবে দেশবাসীর মনে সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা যার নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছে সেই নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং যে সংগঠনের নেতৃত্ব স্বাধীনতা সংগ্রাম এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে সেই আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ছিল বলতে গেলে সর্বব্যাপক। তার পাশাপাশি যুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল সেই ঐক্যও তখন পর্যন্ত অটুট ছিল। তবে তখনই প্রধানত তরুণসমাজের অনেকের মধ্যে দ্রম্নত এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নানা ঝোঁকের সৃষ্টিও যে হতে শুরু করেছিল তা বোঝা যাচ্ছিল।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ দেশবাসী তাকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা জানান। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে প্রবাসে কমিউনিস্ট পার্টি নিজ নামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজে কর্মে অংশ নেয়ার মধ্যদিয়ে আইনসঙ্গতভাবে কাজ করার অধিকার আদায় করে নিয়েছিল। দেশে ফিরে তারা আইনসঙ্গত হিসেবে কাজ গুছিয়ে নিতে শুরু করে। পাশাপাশি বাম ধারায় জাতীয়তাবাদী সংগঠন ন্যাপ (মুজাফফর) দেশে এসে নিজেদের সংগঠন গুছিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে। তাদের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু এলেন এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি আহ্বান জানালেন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসার। এই আহ্বান সত্ত্বেও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করে ন্যাপ নিজের ভূমিকা সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরোধী দলের যে অবস্থান সে রকম অবস্থান গ্রহণ করে নিজেদের কাজকর্ম পরিচালনের সিদ্ধান্ত নিল। তার আগে অবশ্য স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যেসব দল ও শক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে তাদের সবার সমবায়ে সূচনায় জাতীয় সরকারের আহ্বান জানানো হয়েছিল ন্যাপের পক্ষ থেকে। যুদ্ধবিপর্যস্ত দেশকে গুছিয়ে তুলে সংবিধান প্রণয়নের পর নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পুরোমাত্রায় প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছিল তখন। কিন্তু সেদিকে আওয়ামী লীগ বা কমিউনিস্ট পার্টি কেউই প্রয়োজনীয় দৃষ্টিপাত করেননি।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বঙ্গবন্ধু পদত্যাগ করার পরে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদে নির্বাচিত করা হয়। স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য উদ্যোগ গৃহীত হয় এবং দ্রম্নততম সময়ে প্রণীত হয় সংবিধান। নিঃসন্দেহে সে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধারণ করে। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি অর্থাৎ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এই চার তূলনীতির ভিত্তির ওপর প্রণীত সংবিধান সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে বিশিষ্টতার দাবি করতে পারে সব বিচারেই।

তবে আজ চলিস্নশ বছরের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে তাকালে প্রথমেই যে কথাটা বলতে ইচ্ছা করে তা হলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অর্থাৎ সংবিধানে যে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বিধৃত হয়েছিল তার সমর্থনে জনমতকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় প্রস্তুত না করে পূর্বোক্ত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বিশেষত সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করাটা ঠিক হয়েছিল কিনা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল ও শক্তি যদি একত্রে কিছু দিন সহমতের ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনার মাধ্যমে জনমতকে প্রযোজনীয় মাত্রায় নতুন দিনের নতুন কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারত তাহলে পরবর্তীতে যে জটিলতাগুলো দেখা দিয়েছে তা হয়তো এতটা না হলেও হতে পারত। এ সময় আরও একটি উলেস্নখযোগ্য ঘটনা ঘটে দেশে। তাহলে শিল্প ব্যবসাগুলো জাতীয়করণসংক্রান্ত সরকারের ঘোষণা। সেদিন কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপসহ মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী সব শক্তি দ্বারা এই ঘোষণা জোরেশোরে সমর্থিত হয়েছিল। কিন্তু আজ পিছনে ফিরে তাকালে এ ক্ষেত্রেও মনে হয় জাতীয়করণ কার্যকর করার জন্য যে দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ প্রশাসক ও কর্মীর প্রয়োজন পড়ে, তা গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দ্রম্নত প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল সর্বাগ্রে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা মারাত্মক ক্ষতিকারক হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়োজিত প্রশাসকরা দু'হাতে লুটপাট করেছেন এবং তার মধ্যদিয়ে নিন্দিত ও সমালোচিত হয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সে কয়টি বাঙালি পাট, বস্ত্রকল তৈরি হয়েছিল সেগুলো জাতীয়করণ করাও ঠিক হয়েছিল কিনা ভেবে দেখা দরকার। তা ছাড়া ব্যক্তিগত খাতে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্দিষ্ট করাটাও নিঃসন্দেহে সমীচীন হয়নি। বাঙালি পুঁজিপতিদের যুক্তিসঙ্গত বিকাশে সহায়তা প্রদান করে সদ্য স্বাধীন দেশের সরকার যে বাঙালি ধনিকদের বিকাশের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করবে এটাই ছিল উদীয়মান বাঙালি ধনিকদের কাছে অভিপ্রেত। বস্তুত এভাবে জাতীয় ধনিক শ্রেণির বিকাশে সাহায্য করা এবং তারা যাতে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ভূমিকা না নেয় সেজন্য তাদের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের এই ভূমিকাই ছিল কাম্য। এই অবস্থানের অনুপস্থিতিতে আর দেশীয় পুঁজির সামনে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যবহার করে পরজীবী ধাঁচের ব্যবসায়ী হিসেবে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নেয়া ছাড়া পথ খোলা থাকেনি তখন।

অবশ্যই তখন দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল এবং কমিউনিস্ট ও তাদের মিত্ররা যেভাবে অধনবাদী বিকাশের পথে পুঁজিবাদী বিকাশের যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় অতিক্রম করে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের রাষ্ট্রে ব্যবস্থায় পা রাখার স্বপ্নে বিভোর তখন তাদের পক্ষে অন্যভাবে চিন্তা করাটাও ছিল কঠিন। নবগঠিত সরকারও এই ধারণা দ্বারাই কমবেশি প্রভাবিত হয়েছিল।

তার ওপর স্বাধীনতা-উত্তর কালের সূচনাতেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তরুণ যুবক ছাত্রদের এক উলেস্নখযোগ্য অংশের মধ্যে দ্রম্নত অগ্রগতি সাধনের জন্য হটকারী পথ অগ্রসর হওয়ার আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য মাত্রায় দেখা দিল। এই ঝোঁকের প্রতিফলন আমরা দেখি জাসদ গঠনের মধ্য। অন্যদিকে নিজেদের চীনপন্থি বলে দাবি করেন এরূপ কিছু উগ্র গোষ্ঠীও সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ধারায় অগ্রসর হলো। আর তা করতে গিয়ে কেউ কেউ পাকিস্তানের সহায়তা চাইতেও ইতস্তত করেনি সেদিন। আর তার সঙ্গে ছিল ইসলামপন্থি দলগুলোর হটকারী কার্যক্রম। আর এ সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতিদের মধ্যপ্রাচ্য তথা পাশ্চাত্য দুনিয়াতে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার।

একদিকে এই সব শক্তি, অন্যদিকে দেশের মধ্যে জাসদের হটকারী কার্যক্রম আর তার সঙ্গে শাসক দল আওয়ামী লীগের মধ্যে নানা টানাপড়েন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছিল। তার ওপর দলের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে দুর্নীতির অভিযোগ (প্রচার ছিল বেশি) এবং সর্বোপরি খাদ্য সঙ্কট ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে দুর্ভিক্ষে যখন পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠল সেই অবস্থায় সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী, তাড়াহুড়া করে বাকশাল গঠনের একপর্যায়ে সপরিবারে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে এবং তার কিছুদিনের মধ্যে জেলের মধ্যে নিহত হলেন জাতীয় চার নেতা।

আর এভাবে বাংলাদেশে সাধিত হলো এক প্রতিবিপস্নবী অভু্যত্থান। বস্তুত এরকম একটি অভু্যত্থানের আশঙ্কা যে আড়াগোড়াই ছিল সে বিষয়ে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যত কথাই বলা হোক না কেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় পূর্ব সচেতনতা ও তা যাতে সাধিত না হতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অন্যদের কথা বলতে পারব না, তবে কমিউনিস্ট এবং ন্যাপের মধ্যে নেতৃত্বের পর্যায়ে পূর্বোক্ত প্রশ্নে সেরূপ সচেতনতা দেখিনি। অনুরূপ প্রশ্নের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও কোনো সচেতনতার লক্ষণ দেখতে পাইনি।

একদিকে পূর্বোক্ত প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মধ্য নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং কর্মী বা মধ্যস্তরের নেতাদের মধ্যে অসদুপায়ে অর্থ রোজগারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা ক্ষমতাসীন সংগঠনকে পরিণত করেছিল সঙ্কট মোকাবেলায় অপ্রস্তুত এক জনসমষ্টিতে। এই অবস্থায় বাকশাল ছিল কোনো উপায়ে শেষ রক্ষার চেষ্টা। এই পদক্ষেপ সম্পর্কে বস্তুত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মতৈক্য ছিল না। তার ওপর সংগঠনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা খোন্দকার মোশতাকের মতো চক্রান্তকারীরা তো ছিলই।

তার পরের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে পুনর্ব্যক্ত করে লাভ নেই। তা আমরা সবাই জানি। খন্দকার মোশতাকের স্বল্পকালীন শাসন, তারপর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভু্যত্থান এবং তার মধ্যদিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল, তারপর জাসদের উদ্যোগে সিপাহি জনতার অভু্যত্থানের নামে সেনাবাহিনীর অভু্যত্থান শেষপর্যন্ত জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যদিয়ে পুরোপুরি সেনাশাসন প্রতিষ্ঠা। তার পরে চক্রান্তের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের হত্যা ও এরশাদের ক্ষমতা দখল। সেই সেনাশাসনের অপসারণে অবশ্য গণআন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশ্য তার মধ্য অতিক্রান্ত হয়ে গেছে নয় বছর।

এই সময়কালে অবশ্য ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রথমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং এরশাদ সাহেবের আমলে তার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি গঠন করা হয়েছে। উভয় দলের উৎসই ছিল সেনা নেতৃত্বের একাংশ দ্বারা সমর্থিত।

এ সময়ই জিয়াউর রহমান সাহেবের আহ্বানে জাতীয়তার প্রশ্নে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন। বিষয়টি জিয়াউর রহমান সাহেবের আমলের। পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষী বাঙালিদের থেকে নিজেদের পার্থক্য টানার জন্যই বিষয়টি সামনে আনা হয়। স্বাভাবিকভাবে এখানে পার্থক্য সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে প্রাধান্য দেয়া হয় ধর্মীয় উপাদানকে। এভাবে নিজেদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যে মতবাদ চালু করা হয় তার মধ্যে প্রভাব থেকে যায় দ্বিজাতিতত্ত্বের। দুঃখজনক হলেও সত্য মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই ঘটনাটি ঘটে। খালেদা জিয়া সেই ট্র্যাডিশনই অগ্রসর করে নিয়ে চলেছেন আজ এবং তার সঙ্গে দেশে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিরতা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাজনীতিতে যেমন দক্ষিণপন্থী ধারায় বিএনপি তথা জাতীয় পার্টি গড়ে ওঠে, তেমনি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সমাজ গঠনের মধ্য যে পরিবর্তনগুলো সাধিত হয়েছিল পূর্বোক্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো ছিল তারই প্রতিফলন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও প্রকাশ্যে পার্টির নামে সংগঠন গড়ে তুলে রাজনীতির অঙ্গ সক্রিয় হতে চেষ্টা করে।

তা ছাড়া জামায়াতে ইসলামী ক্রমান্বয়ে নিজ নামে অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামীর নামে সংগঠন গড়ে তুলে রাজনীতিতে পদার্পণ করে। নিজ নামে রাজনীতিতে পদার্পণে প্রথমে ইতস্ততা ছিল তাদের। প্রথমে অন্য নাম এবং তারপর জামায়াতে ইসলামীর নামে তারা তাদের কাজকর্ম শুরু করে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে প্রথমে পাকিস্তান পরে অন্য দেশকে ভিত্তি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর একপর্যায়ে গোলাম আযম বাংলাদেশে আসেন। তার বিরুদ্ধে জাহানারা ইমামের গণআদালত অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি সামনে আসে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রধানত সামরিক শাসনের ছায়াতলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্স্নোগানের আড়ালে চরম দক্ষিণপন্থিসহ প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বলা বাহুল্য বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল মুসলিম লীগ আমলের দ্বিজাতিতত্ত্বেরই রকমফের। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর জোর দিয়ে, এমনকি একপর্যায়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে তারা যেমন নিজেদের প্রভাব দৃঢ়মূল করতে চেয়েছে তেমনি একই ধারায় অন্ধ ভারত বিরোধিতাকে পুঁজি করে নিজেদের রাজনীতি পরিচালনা করতে চেয়েছে সব সময়।

এরশাদের শাসনামলে তার নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে বিএনপির সহযোগিতা ছিল একই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অভিব্যক্তি। তা না হলে উভয়েই মূলত একই ধারার রাজনৈতিক দল। প্রসঙ্গত উলেস্নখ করা দরকার, বর্তমানে বিএনপি জামায়াতের ১৮ দলীয় জোটের বিরুদ্ধে এরশাদের সঙ্গে একযোগে কোনো পদক্ষেপ দেয়ার প্রশ্ন আসলে তা হবে সামরিক মৈত্রী 'তবে তাতে প্রাধান্য থাকতে হবে অন্যদের' জাতীয় পার্টির নয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং তার আগে সদ্য গঠিত জাসদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলনের অভিঘাত নিঃসন্দেহে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভূমিকাটি পালন করে। উগ্র বামপন্থী আন্দোলন যে বাস্তবে কীভাবে এবং হয়তো বা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে ১৯৭৫-এর পরবর্তী জাসদের ভূমিকা তার একটি দৃষ্টান্ত। পরে ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতার মধ্য তারা নিঃসন্দেহে আজকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

একই কথা খাটে আজকের ওয়ার্কার্স পার্টি সম্পর্কেও। তারা এক সময়কার হটকারী অবস্থান পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল ধারায় যেভাবে ফিরে এসেছেন তা ধন্যবাদযোগ্য।

কমিউনিস্ট পার্টিও যে ধারার কথা বলা হচ্ছে সেই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তবে এখনো তারা জাতীয় আন্দোলনে তাদের সঠিক অবস্থানটি কি হবে সে বিষয়ে দৃঢ়চিত্ত এবং নিজেদের অতীত অবস্থানের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থানে প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

তা ছাড়া বামপন্থি শিবিরে আরও কিছু ক্ষুদ্র শক্তি আছে। সামগ্রিকভাবে বললে বামপন্থিদের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা নিঃসন্দেহে জাতীয় রাজনীতিতে স্বতন্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মতো শক্তির অধিকারী নয়। তা ছাড়া গণতান্ত্রিক শক্তির অগ্রগতিই আজ সমাজ প্রগতির দাবি। তা ছাড়া জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি আজকের পর্যায়ে তাদের ভূমিকা কি হবে সে বিষয়েও তারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। এই প্রসঙ্গে মনে হয়, উপমহাদেশীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের এটি একটি বৈশিষ্ট্য, এখন পর্যন্ত তারা সে প্রভাব অতিক্রম করতে পারেনি।

পরিশেষে বলতে হয় আওয়ামী লীগ সম্পর্কে। নিঃসন্দেহে তা দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। তাদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। সাফল্যও অর্জিত হয়েছে এই আন্দোলনে।

তবে স্বাধীনতার পর দেশে শ্রেণি শিক্ষিত সচ্ছল মধ্যবিত্ত তথা বুর্জোয়াদের বিকাশ যে মাত্রায় হয়েছে তা বহুল পরিমাণে আওয়ামী লীগের প্রতিফলিত। বস্তুত এই দেশের সীমারেখার মধ্য উলেস্নখযোগ্য মাত্রায় সাধিত হয়েছে পূর্বোক্ত শ্রেণিসমূহের বিকাশ। সরকারি রাষ্ট্রযন্ত্রের আনুকূল্য তাদের বিকাশে সাহায্য করেছে বিশেষভাবে।

ফলে এসবের প্রভাব আওয়ামী লীগের ওপর যদি উলেস্নখযোগ্য মাত্রায় প্রতিফলিত হয় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই দলের বর্তমান সমস্যা হলো একদিকে সংগঠনের উপরে পূর্বোক্ত শ্রেণিসমূহের প্রভাবে অন্যদিকে এই সংগঠনের অতীত ঐতিহ্য যা দলের মধ্যে পূর্বোক্ত শ্রেণিসমূহের প্রভাবের সঙ্গে ঠিক সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ফলে তাদের বর্তমান ভূমিকায় প্রায় সব প্রশ্নে টানাপড়েন পরিলক্ষিত হয়। এখানে সমস্যা হলো গণতান্ত্রিক ধারায় অন্য জাতীয়তাবাদী শক্তির অভাবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি বহুল পরিমাণে উথাল-পাতাল অবস্থার মধ্যদিয়ে কালাতিপাত করেছে। ৭০ বছরে এসে গণতন্ত্র সুসংহত করা এবং নিজেদের ঘর সামলানোর জন্য ক্ষমতাসীনদের নজর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। তা না করে চোখ বন্ধ করে আত্মপ্রসাদে ভুগলে প্রলয় বন্ধ হবে না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে