logo
সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

  ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটানো আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিবাচক নয়

উন্নয়নের জন্য সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হলো ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থা। এটি মূলত মধ্যস্থতার কাজ করে। অর্থ জমা নেয়া, নগদ কিংবা ঋণ প্রদান ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যাংক মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে। এ মধ্যস্থতার ভূমিকা যদি ঠিক না হয়, তাহলে অন্য সবকিছু থমকে যাবে। এটি হলো আমাদের সবচেয়ে ভয়ের বিষয়। আশঙ্কাজনকভাবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ক্রমেই আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এ খাতের আজকের দুর্বলতা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি কয়েক বছর ধরে হয়ে আসছে। বলতে গেলে এটি ২০১০ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ওই বছর ধস নামে পুঁজিবাজারে। তার পর থেকে ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয় নেমে আসে। এর কিছু কারণ রয়েছে। একটি হলো দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা। ধীরে ধীরে এর মাত্রা বেড়েছে। এখন এটি অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। এর কারণ সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়া। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে। সংস্থাটি সময়মতো শক্ত অবস্থান নেয়নি।

আমাদের অর্থনৈতিক অর্জন মোটামুটি ভালো। এই অর্থে যে আমরা দুটি মাইলস্টোন অর্জন করেছি। এক. আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছেছি। দুই. উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছি। আগে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় ছিলাম। এখন আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছি। এ জায়গায় উন্নীত হতে ৪৭ বছর সময় লেগেছে। সময়টা কিন্তু কম নয়। এ সময়ে আশপাশের কিছু দেশ, যারা আমাদের সমপর্যায়ে বা আরো নিম্নপর্যায়ে ছিল, তাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস প্রভৃতি দেশ আমাদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। তবে আমাদের জন্য এ অর্জনও কম নয়। এমন এক বাস্তবতায় নতুন অর্থমন্ত্রী অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, আরো জোরালোভাবে উন্নয়নের পথে দেশকে নিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, বিদ্যমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বেড়ে চলা অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবেলা। এখানে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। আয়বৈষম্যের চেয়ে সম্পদের বৈষম্য আরো বেশি। এটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কাজেই আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমানোর উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমাদের এগোতে হবে। তার মানে আমাদের শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখলে চলবে না, সামাজিক উন্নয়নটা দেখতে হবে। মানুষের জীবনের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। জন্মলগ্নে সমাজতন্ত্র আমাদের অন্যতম মূলনীতি হলেও দেশে বর্তমানে প্রচলিত পুঁজিবাদ বা বাজার অর্থনীতি। এখানে ব্যক্তি খাতেরই প্রাধান্য। এখানে পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা না গেলেও সমতাভিত্তিক সমাজ বা কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ আছে। সবাই একেবারে সমানভাবে সুযোগ-সুবিধা পাবে না, কিন্তু পর্যাপ্তভাবে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের জীবনমান বাড়াতে হবে। এসব হলো মূলত চ্যালেঞ্জ।

লক্ষণীয়, আমাদের যে উন্নয়ন হচ্ছে, সেটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিখাতের ওপর নির্ভরশীল। এখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ও অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান আছে (ব্যাংক, বীমা, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিটিআরসি, বিইআরসি), সেগুলোর দক্ষতা ও উদ্যোগ অনেক সীমিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলো অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত করতে হবে। ব্যক্তি নিজ নিজ উদ্যোগে কাজ করবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি নিয়মনীতিগুলো বাস্তবায়ন হয়। কাজেই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর না হলে উন্নয়ন দ্রম্নত হবে না।

উন্নয়নের জন্য সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হলো ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থা। এটি মূলত মধ্যস্থতার কাজ করে। অর্থ জমা নেয়া, নগদ কিংবা ঋণ প্রদান ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যাংক মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে। এ মধ্যস্থতার ভূমিকা যদি ঠিক না হয়, তাহলে অন্য সবকিছু থমকে যাবে। এটি হলো আমাদের সবচেয়ে ভয়ের বিষয়। আশঙ্কাজনকভাবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ক্রমেই আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এ খাতের আজকের দুর্বলতা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি কয়েক বছর ধরে হয়ে আসছে। বলতে গেলে এটি ২০১০ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ওই বছর ধস নামে পুঁজিবাজারে। তার পর থেকে ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয় নেমে আসে। এর কিছু কারণ রয়েছে। একটি হলো দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা। ধীরে ধীরে এর মাত্রা বেড়েছে। এখন এটি অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। এর কারণ সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়া। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে। সংস্থাটি সময়মতো শক্ত অবস্থান নেয়নি। বিসমিলস্নাহ কেলেঙ্কারি হলো, হলমার্ক কেলেঙ্কারি হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, 'আমরা জানি। এ সম্পর্কে আমরা বলেছি।' কিন্তু সেটিও বলেছে অনেক দেরিতে। ব্যবস্থা গ্রহণে যে শিথিলতা বা দীর্ঘসূত্রতা, তা সমাধানের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সদিচ্ছাও আছে বলে মনে হয় না। কারণ সমস্যাগুলো জানা, সমাধানগুলো কঠিন নয়। কিন্তু এ ধরনের কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি।

ইদানীং দেখছি কতগুলো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। প্রথমত. খেলাপি ঋণ বিপুল এবং খেলাপি ঋণ আদায় করার কথা বলা হচ্ছে। কয়েক বছর আগে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকা ঋণগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আর্থিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী যে সুদ দেয়া হবে, সেটিও দেয়া হচ্ছে না। এসব উদ্যোগ ভেবেচিন্তে নেয়া উচিত ছিল। যখন নিয়েছে তখন সেগুলো পরিপালন ও যথাযথ বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। বরং এটা একটি খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ হলেই খেলাপিরা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বড় ছাড় পাবেন। যারা ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে তো নিশ্চয়ই ভালো লোক আছে। প্রকৃত কারণেই হয়তো তারা খেলাপি হয়েছে। কিন্তু এখানে উদ্যোক্তাদের মধ্যেই একটি বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি মোটেই ঠিক নয়। সম্প্রতি বলা হচ্ছে, সুদের হার কমিয়ে দেয়া হবে। ৯ শতাংশ হারে নেয়া হবে এবং চক্রবৃদ্ধি হারে আর নেয়া হবে না। আবার বলা হচ্ছে, শুধু আসল দিলেই হবে। কোনো সুদ দিতে হবে না। কিন্তু এগুলো অস্থায়ী (অ্যাডহক) সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এসব পদক্ষেপ খুব ভেবেচিন্তে নেয়া হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় বিষয়, এসব পদক্ষেপ আসছে সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এটা আসা উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে। সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে জেনেছি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে। এটি হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের চেয়ারম্যানশিপে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে ক্রমাগত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়। আগেই বলেছি, এসব সিদ্ধান্ত অ্যাডহক। ধরা যাক সুদের হারের বিষয়টি। বড় খেলাপিদের জন্য সুদহার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, মাঝে মাঝে হয়তো পরিশোধ করতে পারেন না, তাদের রিশিডিউলিংয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ব্যাংকাররা তাদের চলতি মূলধন দিচ্ছেন না। ওভারড্রাফট একটু বাড়াতে বললেও সেই সুযোগ দিচ্ছেন না ব্যাংকাররা। এদিকে কোনো সক্রিয় ভূমিকা, সহানুভূতিশীল অ্যাপ্রোচ নেই। ফলে যারা ঋণ নিয়েছেন এবং যারা ভালো গ্রাহক, তারা সরল সুদে সুদ দেয়ার সুযোগ পাবেন না। শিথিল হওয়া নিয়মের মাধ্যমে তাদের কোনো উপকার হবে না। এতে তারা হতোদ্যম হবেন। তাদের ব্যবসায়ও প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হবে। কারণ সবার জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, এর প্রভাব ব্যাংকের ওপর পড়বে। চক্রবৃদ্ধি হার অন্যভাবে যৌক্তিক করা যেত। যেভাবে ব্যাংকগুলো সাধারণত করে থাকে কিছুদিন রেয়াত দিয়ে, কিছুদিন ব্লক রেখে কিংবা কিছুদিন সময় দিয়ে। বিদ্যমান হারের পরিবর্তে হয়তো বলা হবে এখন থেকে অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ সুদ দিতে হবে। কিন্তু সেটি তো করা হচ্ছে না। এ ধরনের বিভিন্ন পদ্ধতি সবারই জানা আছে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে ব্যাংকের আয় কমে যাবে।

এমনিতেই ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। আমানত কীভাবে আহরণ করবে, সেটি নিয়ে তারা চিন্তিত। এমনটি হলে তারা পরিচালন ব্যয় পোষাতে পারবে না। তহবিল ব্যয়, খেলাপি ঋণের জন্য প্রভিশনিং, মুনাফা এগুলো বজায় রাখতে পারবে না। এগুলোর সংস্থান করা না গেলে ব্যাংক চালানো যাবে না। কাজেই ব্যাংকিং অপারেশনের ওপর বিরাট একটি আঘাত আসবে। আমানতকারীরাও তখন হতোদ্যম হবেন।

সম্প্রতি ঋণ হিসাবের সময়সীমায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঁচ বছরের স্থলে তিন বছরের মাথায় ব্যালান্স শিট থেকে ঋণ অবলোপন করা যাবে। এটি অদ্ভুত একটা ব্যাপার। এর মানে হলো, অ্যাকাউন্টিং ট্রিটমেন্ট দিয়ে দ্রম্নত ঋণ সাফ করে দেয়া, যাতে ব্যালান্স শিট আরো আকর্ষণীয় হয়। এটি তো গোঁজামিল দেয়া, জনগণকে ফাঁকি দেয়া। এটি মোটেই কাম্য নয়। এটিও একটি খারাপ নজির সৃষ্টি হলো।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব নিয়মকানুন বারবার সার্কুলার দিয়ে পরিবর্তন করা আন্তর্জাতিক আর্থিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ভেবেচিন্তে প্রভিশনিং, রিশিডিউলিংয়ের নিয়মকানুন সংশোধন করা হয়েছিল। এগুলোয় হাত দেয়া উচিত হয়নি। আগেরবার ব্যাংক কোম্পানি আইনও সংশোধন করা হলো। আমার মনে হয়, এগুলো করা হচ্ছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব না দেখে এবং আন্তর্জাতিক নীতি ও মান অনুসরণ না করে। পরে কিন্তু এসব ব্যাংকিং খাতকে আরো বিপদে ফেলবে। আমরা ব্যাসেল ৩-এর দিকে যাচ্ছি। এতে অনেক পরিপালনের ব্যাপার আছে। ইকুইটি ক্যাপিটাল বাড়াতে হবে। লিকুইডিটি বজায় রাখতে হবে। এর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। মিটিগেশন মেজারস নিতে হবে। গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে যথাসম্ভব দ্রম্নত পদ্ধতিগত ঝুঁকি কমাতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নীতিগুলো আরো কঠোর করা দরকার। সংশোধন করতে পারে খুব বিশেষ ক্ষেত্রে।

দুঃখের বিষয়, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সক্রিয়তা দৃশ্যমান নয়। সংস্থাটির কোনো বক্তব্যও খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। এর মানে কি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন (অটোনমি) আছে। আইনে সংস্থাটিকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক চর্চাগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মকানুনে আছে। আশ্চর্য হয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো উচ্চবাচ্য করছে না! তাদের কথা শুনুক বা না শুনুক তারা প্রকাশ্যে এগুলো বলতে পারে। সরকারকে বিপক্ষ মনে না করে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রো-অ্যাক্টিভভাবে বলতে পারে যে আমরা এভাবে সমাধান করতে পারি। আমার পরামর্শ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগে ঋণখেলাপি কমানো, উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে বিশেষ সুবিধা দেয়া, নারীদের ঋণ দেয়ার বিষয়গুলো দেখতে পারে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে পারে। এগুলো সবার পরামর্শক্রমে ভেবেচিন্তে ছোট ছোট সার্কুলার দিয়ে করতে হবে। এজন্য বড় থিসিস পেপার লেখার দরকার নেই।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক চ্যালেঞ্জের মুখে। এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজ করছে। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদরা যে একেবারে অবিবেচক হবেন, তা আমার মনে হয় না। তাদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেখিয়ে দিতে হবে যে সমস্যা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে যথেষ্ট দক্ষ কর্মকর্তা আছেন। এখানে সমস্যা হলো, উচ্চপর্যায়ে যারা রয়েছেন, তারা খুব চাপে আছেন। এটি ক্রমাগত বাড়ছে। এ চাপটি হয়তো শুধু সরকারের কাছ থেকে আসছে তা নয়, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের মালিকদের দিক থেকেও আসছে। বহিঃস্থ চাপ আছে। এই বহুমুখী চাপ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট প্রস্তুতি নিচ্ছে না। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডের একটি শক্ত ভূমিকা রয়েছে। কথা শুনুক আর না শুনুক বোর্ড মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো মিডিয়াকে জানাতে পারে। এটি না হলে পরে নিজের ঘাড়ে দায় পড়ে। এতে মধ্যম সারির কর্মকর্তারা হতোদ্যম হন। ভালো কর্মকর্তারা সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে পারেন এবং সমাধান দিতে পারেন। কিন্তু দেখা গেল, সমস্যা চিহ্নিত করার পরে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে তারা হতোদ্যম হয়ে পড়েন। বাংলাদেশে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন হচ্ছে না। প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেমন নেয়া হচ্ছে না, তেমনি আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। ফলে দোষীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। কাজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মোটিভেশন ও ইচ্ছা কমে গেছে। তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কারণ চাকরির ভয় আছে। এটিই প্রধান সমস্যা।

এদিকে ব্যাংকিং খাতে কিন্তু দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। ৫৭টি ব্যাংকের জন্য যে সংখ্যক দক্ষ জনবল দরকার, তা নেই। এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন, তাদের অনেকেরই ব্যাকগ্রাউন্ড, যোগ্যতা ব্যাংকিং পেশার জন্য যথোপযুক্ত নয়। বলা যায়, আমাদের মানবসম্পদে ঘাটতির সমস্যা আছে। যারা ব্যবসায়ী, খেলাপি, তাদের মধ্যে অনেক স্মার্ট লোকজন আছেন। তারা নানা রকম ফাঁকি দিতে পারেন। ব্যাংকিংয়ে দক্ষ জনশক্তি থাকলে সেটি অনেক কমে আসবে। কাজেই প্রথমে দক্ষতা লাগবে। তারপর উদ্যোগ, মোটিভেশন এসবের বিষয় আসে। ব্যাংকিং খাতে উদ্যোগ, মোটিভেশন দরকার আছে। এসবের অভাব আছে।

দেশে ব্যাংকের বাইরে একটি সমান্তরাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখনো ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিংয়ের বাইরে। তার কারণ হলো, ব্যাংকে তারা সাশ্রয়ী, উদ্ভাবনীমূলক ও যুগোপযোগী সেবা পায় না। দেশে যতগুলো ব্যাংক আছে, সবই একই ধরনের সেবা দেয়। সেবা ও প্রডাক্টে কোনো বৈচিত্র্য নেই। এটা ভালো হতো, যদি সেখানে প্রতিযোগিতা হতো। সেটাও হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো সেগমেন্টেড। কোনো প্রতিযোগিতা নেই। এটি সবচেয়ে খারাপ। ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ব্যাংকে গেলে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন রকমের হয়রানির শিকার হয়। মনে রাখতে হবে সেবার মান ভালো হলে মানুষ ব্যাংক ছেড়ে অন্যদিকে যাবে না। তারা সমবায় সমিতিতে যাবে না, মহাজনের কাছে যাবে না। তাদের কাছে যাচ্ছে কেন? তারা দ্রম্নত সেবা দিচ্ছে। সময়-অসময়ে সেবা দিচ্ছে। সেখানে সার্ভিস চার্জ বা সুদ বেশি কি কম, সেটি দেখছে না। সেবার সময় (টাইমিং), পরিমাণ ও সাশ্রয় মূল্য এগুলো তো ব্যাংকাররা নিশ্চিত করছেন না। ব্যাংকাররা এখনো গতানুগতিক ধারায় আছেন। তারা নিজেদের মনোভাব, ধ্যান-ধারণা, নীতি ও কৌশল পরিবর্তন করেননি। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি হয়নি।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ। ব্যাংকের কাজ হলো সেভার্স ও ইনভেস্টরের মধ্যে মধ্যস্থতা করা। আমানতকারী অর্থ বাড়িতে না রেখে ব্যাংকে রাখবেন। তার বিনিময়ে ব্যাংক অর্থের নিরাপত্তা ও যথাযথ রিটার্ন দেবে। আর ব্যাংক অর্থ বিনিয়োগকারীদের দেবে, এটিই রীতি। এখানে ব্যাংক আসল কাজটি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এমন এক বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতকে সর্বাংশে যদি ঠিক করতে হয়, তাহলে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর দায় চাপালে হবে না। সরকারি নীতিগুলো দেখতে হবে। প্রতি বছরই বাজেটে কিছু নীতি বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হয়, যা ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ধরনের অস্থায়ী বা হঠকারী নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে 'দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনের' পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দায়মুক্তি সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। একটি অস্থায়ী কমিশন করতে হবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে; যাদের অর্থনীতি, উন্নয়ন, রাজনীতি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্যক ধারণা আছে। তারা রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, আমলা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করে প্রভিশনিং পলিসি, সিঙ্গেল এক্সপোজার লিমিট, রিশিডিউলিং নীতি প্রণয়ন করবেন। এখন সময় এসেছে এগুলো ঠিক করার। তারপর রয়েছে লিকুইডিটি। বাংলাদেশে লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট নামে কোনো সেগমেন্টই নেই। ব্যাসেল ৩-এ এগুলো বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব নিয়ে সার্কুলার দিয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এখন এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে