logo
সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

  ড. মইনুল ইসলাম   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

পুঁজি পাচার মোটেও শ্লথ হবে না

বিশ্বের অনেক দেশের সাম্প্রতিক নজির থেকে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার অবস্থানে অতীতে যেসব দেশ ছিল, সেগুলো বিপস্নব, গণ-অভু্যত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনী পালাবদলের মাধ্যমে তুলনামূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাওয়ার পর উন্নয়নের মহাসড়কে শামিল হতে পেরেছে। হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইরান, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি বিবেচনা করলে এর সত্যতা মিলবে। সত্তরের দশক পর্যন্ত হংকং কালো টাকা সাদা করার নীতিতে বিশ্বাসী ছিল, কিন্তু আশির দশকে তারা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউকে অনুসরণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করার পর হংকংয়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চমকপ্রদ গতিসঞ্চার হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তোর ১৯৬৫-৯৮ সালের ৩৩ বছরের শাসনকে উন্নয়ন তত্ত্বে 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' আখ্যায়িত করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমি অভিনন্দন জানিয়ে অনুরোধ করেছিলাম এবার সত্যি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তাহলে ইতিহাসে তিনি চিরস্থায়ী আসন করে নিতে সমর্থ হবেন। কিন্তু সরকারের মেয়াদের ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার কাছাকাছি সময়ে এসে আমার এ প্রত্যাশা ফিকে হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক ঘোষিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে যখন দেখলাম প্রতি বছরের মতো ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এবার কালো টাকার মালিকদের জন্য অভূতপূর্ব আরও কয়েকটি নতুন সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, তখন বুঝতে পারলাম বর্তমান অর্থমন্ত্রী শুধু ঋণখেলাপিদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়েই ক্ষান্ত হবেন না, তিনি দুর্নীতিবাজ কালো টাকার মালিকদের সক্রিয় মদদ প্রদানেও কোনো রাখঢাক করবেন না। বাজেট-উত্তর প্রেস কনফারেন্সে যখন প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলো, তখন তিনি এরই মধ্যে সৃষ্ট কালো টাকাকে 'মেইনস্ট্রিমে' নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন। নইলে নাকি এ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। দুঃখের সঙ্গে তাকে জানাতে হচ্ছে, তার সরকারের এমন উদ্যোগগুলো পুঁজি পাচার মোটেও শ্লথ করতে পারবে না। তিনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কালো টাকাকে সাদা করার ব্যবস্থা প্রতিটি সরকারের বাজেটে ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত মাত্র ১৩ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে এবং সেখান থেকে সরকার যে রাজস্ব পেয়েছে তা-ও অকিঞ্চিতকর। অথচ গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা (৭৫ বিলিয়ন ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে বলে মার্কিন গবেষণা সংস্থা 'গেস্নাবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির গবেষণায় উদ্ঘাটিত হয়েছে।

সুবিধা দিলেই যে কালো টাকার মালিকরা ছুটে এসে তাদের টাকা সাদা করে নেবেন, এমন প্রত্যাশা অবশ্য সরকারও করে না। কিন্তু এ সুবিধা সত্ত্বেও প্রতি বাজেটে ঘোষণার আসল মরতবা হলো, প্রধানত দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের একটি পথ খুলে দেয়া। এ ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে কি কালো টাকার মালিকদের সিগনাল দেয়া হচ্ছে যে, এ সুবিধা নিলে তাদের দুর্নীতিকে কঠোরভাবে দমন করা হবে না? তাহলে দুর্নীতির ব্যাপারে 'জিরো টলারেন্স' নীতি তো নেহাতই 'রাজনৈতিক স্টান্ট' হয়ে গেল! আমাদের নীতি প্রণেতারা কি জানেন না, সামান্য কিছু অর্থ এসব দুর্নীতিবাজ ১০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করে নিলে ওই বৈধকরণের নথিপত্রগুলো তাদেরকে হাজার হাজার কোটি কালো টাকা নিরাপদে রেখে দেয়ার ভালো দালিলিক সুরক্ষা প্রদান করে। কারণ টাকার গায়ে তো কালো-সাদা লেখা থাকে না? আর ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকা আড়াল করার ভালো ব্যবস্থা তো এ দেশে গেড়ে বসে রয়েছে যুগ যুগ ধরে! দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের মানেই হলো, একটা সুনির্দিষ্ট সমঝোতা-নেটওয়ার্কের সহায়তায় দুর্নীতিবাজরা নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমর্থ হচ্ছে।

কালো টাকাকে 'কর প্রদানের সময় অপ্রদর্শিত অর্থ' সংজ্ঞা দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ গুরুতর অপরাধটিকে হালকা করার যে অবস্থান নিয়েছে তা সংবিধানসম্মত কিনা, সে প্রশ্ন অবশ্যই তোলা যায়। কারণ দেশের সংবিধানের ২০(২) ধারা বলছে, 'রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।' সংবিধানের এ বিধানমতে 'অনুপার্জিত আয়' যদি কালো টাকা হয়, তাহলে এনবিআর কালো টাকার সংজ্ঞা 'অপ্রদর্শিত অর্থ' আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দিতে পারে কিনা, সেটা আইনবেত্তাদের ভেবে দেখতে বলি। উপরন্তু এনবিআরের এ সংজ্ঞা দুর্নীতির সঙ্গে কালো টাকার যে ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে, সেটাকে অনেকটাই গৌণ বা লঘু করে দিচ্ছে কিনা, তা-ও ভেবে দেখা প্রয়োজন। এটা অনস্বীকার্য যে অনেক সময় বৈধভাবে অর্জিত অর্থের ওপর ধার্য কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা সমাজে গেড়ে বসে থাকে। যেমন জমিজমা, অ্যাপার্টমেন্ট, পস্নট, দোকান ইত্যাদি রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়ে প্রকৃত দাম না দেখিয়ে কম দাম দেখালে রেজিস্ট্রেশন খরচ, স্টাম্প খরচ, সম্পদ কর ও ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া যায়। অতএব, প্রায় সব ক্ষেত্রে এগুলোর মাধ্যমে কালো টাকার জন্ম হওয়াই স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে কালো টাকাকে 'অপ্রদর্শিত অর্থ' বলাই সংগত। কিন্তু দুর্নীতি প্রতিরোধকে প্রধান অগ্রাধিকার ঘোষণাকারী সরকারের প্রধান টার্গেট তো হওয়া উচিত 'দুর্নীতিজাত অনুপার্জিত আয়'। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবৈধভাবে অর্জিত বা আয়ের জ্ঞাত সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন যেকোনো অর্থবিত্তকে 'কালো টাকা' অভিহিত করার যে আইনি অবস্থানে রয়েছে, সেটাকেই সাংবিধানিকভাবে আমার কাছে বেশি যৌক্তিক মনে হয়। অতএব, এ সংজ্ঞা মোতাবেক মার্জিনখোর রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর আমলা এবং মুনাফাবাজ/কালোবাজারি/ চোরাকারবারি/

ব্যাংকঋণ লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের অপরাধী সাব্যস্ত করা গেলে তাদের আইনের আওতায় এনে অপরাধের শাস্তি বিধান না করা হলে সেটা গুরুতর অনৈতিক ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ হবে। অর্থনীতিতে 'নৈতিক বিপদ' বলে একটা সাড়া জাগানো কনসেপ্টের প্রচলন করেছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্‌জ। সৃষ্টিকর্তার কাছে কবিগুরুর প্রার্থনা ছিল, 'অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।' দুর্নীতির মতো অনৈতিকতা লালনকারী কোনো সরকার নাগরিকদের কাছে কি ঘৃণার পাত্র হবে না?

বিশ্বের অনেক দেশের সাম্প্রতিক নজির থেকে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার অবস্থানে অতীতে যেসব দেশ ছিল, সেগুলো বিপস্নব, গণ-অভু্যত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন কিংবা নির্বাচনী পালাবদলের মাধ্যমে তুলনামূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাওয়ার পর উন্নয়নের মহাসড়কে শামিল হতে পেরেছে। হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইরান, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি বিবেচনা করলে এর সত্যতা মিলবে। সত্তরের দশক পর্যন্ত হংকং কালো টাকা সাদা করার নীতিতে বিশ্বাসী ছিল, কিন্তু আশির দশকে তারা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউকে অনুসরণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করার পর হংকংয়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চমকপ্রদ গতিসঞ্চার হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তোর ১৯৬৫-৯৮ সালের ৩৩ বছরের শাসনকে উন্নয়ন তত্ত্বে 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' আখ্যায়িত করা হয়েছে। গত দুই দশকে তারা এই সর্বোগ্রাসী দুর্নীতিকে অনেকখানি কমিয়ে আনতে সমর্থ হওয়ায় এখন ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নের পালেও প্রবল হাওয়া লেগেছে। স্বৈরাচারী এরশাদ আশির দশকে সুহার্তোর ওই মডেলটি অনুসরণ করে এ দেশে দুর্নীতিকে সর্বনাশা স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর গত ২৮ বছরে সরকারগুলো এ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জটাজালকে আরও সর্বব্যাপী করে তুলেছে। ফলে এখন কিছু মানুষকে এমনও বলতে শোনা যায় যে, এরশাদের শাসনকালের চেয়ে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। এরশাদ আমলের তুলনায় ক্রমেই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে বাড়তে তখনকার সাড়ে ৪-৫ শতাংশ থেকে এখন ৮ শতাংশে পৌঁছলেও এ প্রবৃদ্ধির সুফল প্রধানত কয়েক হাজার ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে পুঞ্জীভূত হয়ে চলেছে। সেজন্যই মার্কিন গবেষণা সংস্থা 'ওয়েলথ এক্স'-এর গবেষণা প্রতিবেদনে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল এ পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলার বা ২৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার নির্ণীত হয়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ন্যক্কারজনক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনের পরও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শীর্ষ নেতৃত্বের টনক নড়ছে না। বেশ কয়েকজন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে তাদের অতীতের কর্মকান্ডের মূল্যায়ন না করে বরং এখন দেশের অর্থনীতি পরিচালনার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে। গত ২৩ জুন এক সেমিনারে মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রীকে আয় ও সম্পদ বণ্টনের এ ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে অপরিহার্য দেখানোর জন্য এরই মধ্যে ভুল প্রমাণিত 'কুজনেৎস কার্ভ তত্ত্ব' আউড়াতে শুনলাম। উন্নয়ন অর্জনে সফল হওয়ার পরও আয় ও সম্পদ বৈষম্য কমে পিকেটির সাড়া জাগানো সাম্প্রতিক গবেষণা গ্রন্থ 'ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েনটি ফার্স্ট সেঞ্চুরি'র এ তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি কি জ্ঞাত নন? দুর্নীতিজাত কালো টাকা লালন থেকে সরে না এলে আয় ও সম্পদ বণ্টনের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য থেকে বাংলাদেশের মুক্তি মিলবে না। কালো টাকা সৃষ্টির বাস্তবতাকে প্রতিরোধে শামিল হওয়াই সময়ের দাবি। অনৈতিক কর্মকান্ডের যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা না করাই সমীচীন।

ড. মইনুল ইসলাম

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে