logo
শুক্রবার ২৩ আগস্ট, ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

  মাহফুজুর রহমান   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি : বাংলাদেশের সফলতার গল্প

ব্যাংকিং সেবার জন্ম ও বিস্তার হয়েছিল সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে। যাদের অনেক সম্পদ আছে তাদের সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা এবং ধনবান মানুষকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের আরও ধনী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিই ছিল ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব। ব্যাংকের স্বভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, অ নধহশ রং ধ ঢ়ষধপব যিবৎব :যবু ষবহফ ুড়ঁ ধহ ঁসনৎবষষধ রহ ভধরৎ বিধঃযবৎ ধহফ ধংশ ভড়ৎ রঃ নধপশ যিবহ রঃ নবমরহং :ড় ৎধরহ. অর্থাৎ, ব্যাংক হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা রৌদ্র করোজ্জ্বল আবহাওয়ায় ছাতা ধার দেয়, কিন্তু বাদলা দিনে ছাতাটা ফেরত চেয়ে বসে।

বর্তমান বিশ্বে এ ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। সারা পৃথিবীতেই এখন ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। একটি দেশের যে সমস্ত মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছেন তাদের জন্য ব্যাংক সেবার ব্যবস্থা করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এই কর্মসূচিকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য নানারকম কাজ করে থাকে। অ্যালায়েন্স ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন (আফি) বিশ্বব্যাপী এ কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ আফির একটি সদস্য রাষ্ট্র। পৃথিবীর বহু দেশ বর্তমানে ক্লাস ব্যাংকিং-এর বদলে মাস-ব্যাংকিং বা গণমুখী ব্যাংকিং এর নীতিতে বিশ্বাসী। বাংলাদেশও এই কর্মকান্ডের বাইরে নয়।

২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক এদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকান্ড প্রবর্তন ও নেতৃত্ব প্রদান করে আসছে। এগুলোর মধ্যে আছে, ১০ টাকা, ৫০ টাকা ও ১০০ টাকায় খোলা ব্যাংক হিসাব, স্কুল ব্যাংকিং হিসাব, পথশিশু ও কর্মজীবী শিশু/কিশোরদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষকের হিসাব, সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণ, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ হিসাব, ক্ষুদ্র জীবন বিমা গ্রহীতাদের হিসাবসহ উপরে বর্ণিত অন্য হিসাবগুলো সহজে খোলার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ নির্দেশনা থেকে সুবিধা পাচ্ছেন সরকারি ভাতাভোগী, মুক্তিযোদ্ধা, অতি-দরিদ্র মহিলা উপকারভোগী, পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক, সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী, পাদুকা ও চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী ক্ষুদ্র কারখানার কারিগর, প্রতিবন্ধী, পূর্বতন ছিটমহলবাসী, আইলা দুর্গত ব্যক্তি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ সমাজের সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ও তত্ত্বাবধানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই কর্মসূচির সফলতা উলেস্নখ করার মতো। ২০১০ সাল বা তার পরবর্তী সময়ে শুরু হওয়া এসব কর্মসূচির আওতায় ৩১ মার্চ, ২০১৯ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকে বিভিন্ন খাতে মোট ১ কোটি ৯২ লাখ ১৭ হাজার ৪৭টি হিসাব খোলা হয়েছে। এসব হিসাবে পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ১ হাজার ৯০৮ কোটি ৮৪ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে কৃষকদের দ্বারা পরিচালিত হিসাবের পরিমাণ ৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ৯০৬টি। গ্রম্নপভিত্তিক বিভাজনে এটিই সবচেয়ে বেশি। আবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগীদের দ্বারা পরিচালিত ৫১ লাখ ২৫ হাজার ১৬৪টি হিসাবে পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ৫৪৯ কোটি ৭ লক্ষ টাকা। জমার পরিমাণের দিক বিবেচনায় এই গ্রম্নপই সবচেয়ে অধিক জমার অধিকারী।

১০ টাকা, ৫০ টাকা ও ১০০ টাকায় খোলা ব্যাংক হিসাব

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি। কৃষকসমাজ কোনোদিন ব্যাংকের ভেতরে যাবে এবং হিসাব খোলে টাকা লেনদেন করবে একথা তারা কখনও ভাবেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের স্বপ্নের ফসল হচ্ছে ব্যাংক-সেবায় কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি। ১০ টাকা দিয়ে নিখরচার হিসাব খোলার সুযোগ দিয়ে তিনি কৃষক এবং হতদরিদ্র মানুষদের ব্যাংকমুখী করে তুলেছিলেন। বিশেষ সুবিধাযুক্ত এই হিসাবগুলোর শতকরা ৫২ ভাগই এখন পরিচালনা করছেন কৃষকগণ। তাদের হিসাবে পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭৬ কোটি ১১ লক্ষ টাকা। কৃষি কর্মকান্ডে সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন ভর্তুকি বর্তমানে সরাসরি উপকারভোগীদের হিসাবে ক্রেডিট করে দেয়া হয়। এজন্য এই ভর্তুকি বা অনুদান সরাসরি উপকারভোগীর হিসাবে জমা হয়ে যায়, কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে বিতরণ করতে হয় না বলে অনিয়ম হয় না। সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত এমন হিসাব সংখ্যা ২১ লক্ষ ৩০ হাজার ৭৫৬টি। আর এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ৬২ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা।

কৃষক ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার পরেও ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক বহাল রাখা এবং লেনদেনে আগ্রহী করে তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বরাদ্দ করেছে। এই তহবিল হতে সহজ শর্তে ও কম সুদহারে ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ২৯০ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত এই কৃষকদের হিসাব ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। গত এক বছরে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ৭ লক্ষ ৬৭ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে শতকরা ৮.৩২ ভাগ।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির আওতায় কৃষক ছাড়াও অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার লোকেরা ১০ টাকা, ৫০ টাকা ও ১০০ টাকার হিসাব খুলতে পারেন। এ ধরনের মোট হিসাবের শতকরা ৪৮ ভাগ রয়েছে এই বিভাজনে। সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতা ও বেতন প্রদান ছাড়াও আর্থিক সেবা বৃদ্ধির জন্য এসব হিসাব খোলা হয়েছে। ৩১ মার্চ, ২০১৯ পর্যন্ত কৃষকদের হিসাব ছাড়া অন্যান্য খাতে খোলা সমধর্মী পুঞ্জীভূত হিসাব সংখ্যা ৯২ লক্ষ ২৭ হাজার ১৪১টি।

স্কুল ব্যাংকিং

শিশু-কিশোরদের ব্যাংকমুখী করে তোলার এবং তাদের সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১০ সালের নভেম্বর হতে দেশে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ১৮ বছরের কম বয়সী ছাত্রছাত্রীদের সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১০০ টাকা জমা দিয়ে যে কোনো তফসিলি ব্যাংকে হিসাব খোলার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এসব হিসাব পরিচালনার জন্য ব্যাংক কোনো ধরনের ফি আদায় করে না এবং এতে আকর্ষণীয় মুনাফা প্রদান করে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্সের আয়োজন করে থাকে।

৩১ মার্চ, ২০১৯ তারিখে বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত স্কুল ব্যাংকিং হিসাব সংখ্যা ১৯ লক্ষ ৫৪ হাজার ২৩১টি এবং এসব হিসাবে মোট স্থিতির পরিমাণ ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ১৪ লক্ষ টাকা। বিগত এক বছরে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ লক্ষ ৯২ হাজার ৩৭১টি এবং স্থিতির পরিমাণ বেড়েছে ১০৪ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা। এক বছরে হিসাব সংখ্যার প্রবৃদ্ধি শতকরা ৩৩.৬৮ ভাগ এবং স্থিতির প্রবৃদ্ধি শতকরা ৭.২৪ ভাগ। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর চেয়ে বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমে অনেকটা এগিয়ে আছে। বেসরকারি ব্যাংকসমূহ মোট ১৩ লক্ষ ৫৬ হাজার ১৯টি হিসাব খুলেছে; এটি মোট স্কুল ব্যাংকিং হিসাব সংখ্যার শতকরা ৬৯.৩৯ ভাগ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এসব হিসাবে স্থিতির পরিমাণ ১ হাজার ৩০৫ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা; এটি স্কুল ব্যাংকিং খাতে মোট জমার শতকরা ৮৪.৪২ ভাগ। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো স্কুল ব্যাংকিং খাতে আমানত সংগ্রহের কাজে অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এই খাতে তাদের দ্বারা পরিচালিত হিসাবের সংখ্যা শতকরা ২৩.৭২ ভাগ হলেও আমানতের পরিমাণ শতকরা মাত্র ১২.৫৩ ভাগ। আবার গ্রাম ও শহরের বিবেচনায় দেখা যায় যে, শহর এলাকার ছাত্রছাত্রীদের ভেতর ব্যাংকে হিসাব খোলার প্রবণতা বেশি। মোট হিসাবের শতকরা ৩৬.৬৮ ভাগ গ্রামাঞ্চলে এবং শতকরা ৬৩.৩২ ভাগ শহরাঞ্চলে খোলা হয়েছে। এসব হিসাবের স্থিতি বিবেচনা করলে শহরাঞ্চল এগিয়ে থাকার উদাহরণ চোখে পড়বে। স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের মোট স্থিতির শতকরা ২৫.৬৪ ভাগ গ্রামাঞ্চলের ব্যাংক-শাখাগুলোতে জমা হয়েছে। আবার মোট স্থিতির শতকরা ৭৪.৩৬ ভাগ জমা হয়েছে শহরাঞ্চলের শাখাসমূহে। হিসাবগুলোর তথ্য হতে আরও দেখা যায় যে, এখানে শতকরা ৫৯ ভাগ হিসাব রয়েছে ছাত্রদের নামে এবং শতকরা ৪১ ভাগ হিসাব ছাত্রীদের নামে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অনেকগুলো উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের বর্তমানে তেমন উৎসাহ দেখা না গেলেও স্কুল ব্যাংকিং-এর ক্ষেত্রে উৎসাহ বিদ্যমান আছে। তাই প্রতিবছর হিসাবসংখ্যা বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভেতর এভাবে ব্যাংক লেনদেনের অভিজ্ঞতা হলে এবং সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়লে এরা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানাভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয়।

পথশিশু ও কর্মজীবী শিশু/কিশোরদের ব্যাংকিং

ভাসমান, ঠিকানাবিহীন, পিতা-মাতা কর্তৃক পরিত্যক্ত বা পরিচয়সূত্রহীন পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই কর্মসূচির সঙ্গে দেশে কর্মরত বেশকিছু বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) জড়িত হয়েছে। এনজিও কর্মীরা পথশিশুদের ভেতর স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সুপথে আনার চেষ্টা করবে। এসব পথশিশুর অনেকেই সঙ্গদোষে বা অভিভাবকের অভাবে মাদকদ্রব্য সেবন করে বা সন্ত্রাসী ও অসামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পথশিশুদের মনে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন প্রোথিত করতে পারলে ওরা রোজগারের একটা বড় অংশ ব্যাংকে জমা রাখে। ফলে তাদের ভবিষ্যতের জন্য একটা মূলধন জমা হতে থাকে। পথশিশুদের হিসাবে উলেস্নখযোগ্য পরিমাণ টাকা জমা হওয়ার পর ব্যাংক এদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও প্রতিশ্রম্নতি রয়েছে এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টিতে সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপ করবে। বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক খোলা এসব হিসাবে কোন চার্জ আদায় করা হয় না এবং সর্বোচ্চ মুনাফা প্রদান করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে দেশের ১৯টি ব্যাংক পথশিশুদের হিসাব পরিচালনা করে থাকে। পথশিশুদের হিসাব পরিচালনা করার জন্য দেশের প্রচলিত আইনি কারণে এনজিও প্রতিনিধির সহায়তা প্রয়োজন হয়। কারণ কোন অভিভাবক ছাড়া নাবালকদের হিসাব খোলা যায় না। তাই পথশিশুদের অভিভাবকত্ব এনজিও কর্তৃক গ্রহণ করার পর তাদের প্রতিনিধির সঙ্গে যৌথ স্বাক্ষরে হিসাব পরিচালিত হয়। বর্তমানে দেশের ১৫টি এনজিও পথশিশুদের হিসাব পরিচালনার কাজে জড়িত আছে। এগুলো হচ্ছে মাসাস, সাফ, উদ্দীপন, অপরাজেয় বাংলাদেশ, ব্র্যাক, নারী মৈত্রী, সিপিডি, প্রদীপন, সাজিদা ফাউন্ডেশন, এএসডি, বাংলার পাঠশালা, ইবিসিআর প্রকল্প, ঘাসফুল, এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং পরিবর্তন।

৩১ মার্চ, ২০১৯ তারিখ পর্যন্ত পথশিশু ও কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের নামে পরিচালিত হিসাবের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৯৪টি। এসব হিসাবে মোট স্থিতির পরিমাণ প্রায় ৩৩ লক্ষ টাকা। বিগত তিন মাসে সবগুলো ব্যাংক মিলে মোট ৯টি নতুন হিসাব খুলেছে। ব্যাংকগুলোর ভেতর একমাত্র সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড পথশিশুদের হিসাব খুলেছে ১ হাজার ১৩৬টি। এই ব্যাংকের হিসাবগুলোতে স্থিতির পরিমাণ ৮ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা।

পথশিশুদের হিসাব পরিচালনায় বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া এনজিওগুলো পথশিশুদের হিসাব খোলা এবং পরিচালনার কাজটিকে মুনাফাহীন একটি বাড়তি দায়িত্ব বলে ধরে নিয়েছে। ফলে তাদের এক বা একাধিক কর্মীকে এই কাজে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে তারা উৎসাহ হারিয়েছে। ফলে দেশে যথেষ্ট সংখ্যক পথশিশু ও কর্মজীবী শিশু থাকা সত্ত্ব্বেও হিসাব সংখ্যা বাড়ছে না। কোনো কোনো ব্যাংকে হিসাব স্থবির হয়ে আছে বলেও জানা যায়।

পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের ব্যাংকিং সেবা প্রদানের এই উত্তম উদ্যোগটি বর্তমানে অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে পথশিশুরা উপকৃত হবে এবং দেশে মাদক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম কিছুটা হলেও কমে আসবে বলেই বিশ্বাস।

এজেন্ট ব্যাংকিং

বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সকল পর্যায়ে জনগণকে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সহযাত্রী হিসেবে পাওয়ার লক্ষ্যেই ব্যাংকসেবাকে গণমুখী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের নাম এজেন্ট ব্যাংকিং। সাশ্রয়ীভাবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দ্বারগোড়ায় ব্যাংকসেবা পৌঁছে দেবার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সাল থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে। অনুমোদিত ব্যাংকগুলো কর্তৃক এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর এই ব্যাংকসেবা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত মোট ২১টি ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদন প্রদান করা হলেও মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে ১৯টি ব্যাংক। বিগত ৩১ মার্চ, ২০১৯ সবগুলো অনুমোদিত ব্যাংক কর্তৃক স্থাপিত এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৬৬টি। এর মধ্যে গ্রামে রয়েছে ৪ হাজার ৩৬৫টি এবং শহরে আছে ৫০১টি। ব্যাংকগুলোর আওতায় আউটলেটের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৩৮টি। এর মধ্যে গ্রামে রয়েছে ৭ হাজার ৮৪টি আউটলেট এবং শহরে রয়েছে ৭৫৪টি আউটলেট। সংখ্যার বিবেচনায় ব্যাংক এশিয়া সবচেয়ে এগিয়ে আছে। এই ব্যাংকের এজেন্ট সংখ্যা ২ হাজার ৬৬৭টির মধ্যে গ্রামে ২ হাজার ৫৫৫টি এবং শহরে ১১২টি। আবার আউটলেটের দিক থেকেও ব্যাংক এশিয়ার সংখ্যাধিক্য দেখা যায়। এদের মোট আউটলেট সংখ্যা ২ হাজার ৭৪৮; এর মধ্যে গ্রামে রয়েছে ২ হাজার ৬২৩টি এবং শহরে আছে ১২৫টি। উভয় বিবেচনায়ই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড।

ব্যাংকের এজেন্টগুলোতে এ যাবতকালে মোট হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৫টি। হিসাবসংখ্যার বিবেচনায় এগিয়ে আছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক। এই ব্যাংকের এজেন্টগণ এ যাবতকালে মোট ১৩ লক্ষ ৬৩ হাজার ৭২১টি হিসাব খুলেছে। হিসাবসংখ্যার দৌড়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে ব্যাংক এশিয়া। তাদের এজেন্টসমূহ এখন পর্যন্ত ৮ লক্ষ ৭৫ হাজার ১৬৯টি হিসাব খুলেছে।

এজেন্টগুলোর হিসাবসংখ্যা থেকে জানা যায় যে, শহর এলাকার এজেন্টগণের কাছে ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ১৮৪ জন হিসাব খুললেও গ্রামে খুলেছেন ২৫ লক্ষ ২২ হাজার ৪৭১ জন। যারা হিসাব খুলেছেন তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১৮ লক্ষ ৬১ হাজার ৪৪৩ জন এবং নারীর সংখ্যা ১০ লক্ষ ২৪ হাজার ১১৪ জন। এসব হিসাবের মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাবের সংখ্যাই বেশী (২৫,০৮,০৩৬টি)। পূর্ববর্তী ত্রৈমাসিকের চেয়ে মার্চ, ২০১৯ তারিখে সমাপ্ত ত্রৈমাসিকে হিসাব সংখ্যা বেড়েছে শতকরা ১৮ ভাগ।

এজেন্ট ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত হিসাবগুলোতে জমা আছে ৩ হাজার ৭৩৪ কোটি ৫০ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে শহর এলাকার জমা হল ৮১৯ কোটি ৭০ লক্ষ ৯৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে পলস্নী এলাকার হিসাবধারীগণের হিসাবে জমা আছে ২ হাজার ৯১৪ কোটি ৭৯ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা। এজেন্টগুলোতে খোলা হিসাবগুলো গড় জমা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৪৮ টাকা। এসব হিসাবে পূর্ববর্তী ত্রৈমাসিকের চেয়ে আমানত বেড়েছে শতকরা ২০ ভাগ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কাজও শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় অদ্যাবধি বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ২১০ কোটি ৩৮ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা। এই ঋণ বিতরণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ব্যাংক এশিয়া। তাদের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১৯২ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা।

রেমিট্যান্স

ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে এর গ্রাহকগণকে খুব সহজেই রেমিট্যান্স সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের হিসাবেও মুহূর্তের ভেতর রেমিট্যান্স পৌঁছে যাচ্ছে। আর রেমিট্যান্স প্রাপ্তি এবং হিসাবে জমা হওয়ার তথ্যটিও মোবাইলের ম্যাসেজের মাধ্যমে গ্রাহক সঙ্গে সঙ্গে জেনে যাচ্ছেন। দেশব্যাপী রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটিকে যুগান্তকারী হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। মাত্র কয়েক বছর আগেও বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা গ্রামাঞ্চলের ব্যাংক শাখায় পৌঁছাতে মাসাধিককাল লেগে যেতো। কখনও কখনও বছরব্যাপীও অপেক্ষা করতে হয়েছে রেমিট্যান্স বাবদ আসা টাকা হাতে পাওয়ার জন্য।

মার্চ, ২০১৯ পর্যন্ত ১৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ৭ হাজার ১৮২ কোটি ৬৪ লক্ষ ৬২ হাজার টাকার রেমিট্যান্স বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে বিতরণকৃত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৬ হাজার ৪৫৭ কোটি ১৫ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে বিতরণকৃত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৭২৫ কোটি ৪৮ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা। রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই গ্রামকেন্দ্রিক। দেশের অধিকাংশ মানুষের বাস গ্রামে। এই গ্রামে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনে তাদেরকে দ্রম্নত উন্নতি লাভের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একাধারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপকৃত হয়েছেন, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে শ্রেণি বৈষম্য কমে আসার মাধ্যমে সকলেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারছেন। বর্তমানে দেশের সর্বত্র, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে, অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতির তৃণমূল পর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকিং দ্রম্নত বিকাশ লাভ করছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য হওয়ার ফলে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিকতায় অর্থবহ ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া দেশের সর্বত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং সেবা ক্রমান্বয়ে এজেন্ট ব্যাংক নির্ভর হয়ে উঠবে, এমনটি এখন সহজেই বিশ্বাস করা যায়।

মাহফুজুর রহমান

চেয়ারম্যান

এক্সপার্টস একাডেমি লিমিটেড এবং সাবেক নির্বাহী পরিচালক

বাংলাদেশ ব্যাংক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে