logo
বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  ড. আতিউর রহমান   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

টেকসই উন্নয়ন এবং অতি দারিদ্র্য নিরসনের চ্যালেঞ্জ

এমন পরিস্থিতি একদিনেই সৃষ্টি হয়নি। বাঙালি সমাজের অন্তর্নিহিত স্বাদেশিক অনুভূতি, একে অপরের দুঃখে সামিল হওয়া, একাত্তরের মতো অতি-সাধারণের মাঝে থেকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক হবার ঐতিহ্য আমাদের দীর্ঘ দিনের। সেই ১৯০৭ সালের ১৮ জুন চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাকে দেয়া সংবর্ধনার জবাবে সেদিন তিনি বলেছিলেন, 'প্রাচীন বা মধ্যপন্থি এবং নবীন বা উপগ্রপন্থি কোন দলই দেশের প্রকৃত কাজ করছেন না, কেননা দেশের অতি সাধারণ মানুষদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে এসে তাদের নিয়ে কাজ কোনো পক্ষই করছেন না, অথচ এটাই এখন সবচেয়ে জরুরী কাজ।' (বি. দ্র. : শিমুল বড়ুয়া, রবীন্দ্র জীবনে ও সাহিত্যে চট্টগ্রাম, অমিতাভ প্রকাশন, ২০১৬, পৃ. ২৫)। রবীন্দ্রনাথ নিজে শিলাইদাহ, পতিসর, শান্তিনিকেতনে এই অতি-সাধারণের মাঝে কাজ করেছেন বলেই এই উপলব্ধি তার হয়েছিল। আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই অতি-সাধারণ ঘেষা এক দূরদর্শী নেতা। চুয়ান্নর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি এক গরিব বৃদ্ধার ঘরে গিয়েছিলেন।

এমডিজি পূরণে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা সর্বজনবিদিত। এর উত্তরসূরি এমডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। এসডিজি এখন বিশ্ব এজেন্ডা। সতেরোটি লক্ষ্য পূরণে জাতিসংঘের নেতৃত্বে পুরো বিশ্ব আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সকলেই বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। দেশটি এমডিজির মতো এসডিজি পূরণেও কি একই ধরনের সাফল্য দেখাতে পারবে।?

এ কথা ঠিক এসডিজি পূরণে চ্যালেঞ্জটা অনেক কঠিন। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিবারণ, সকলের জন্যে সুশিক্ষা, নারী-পুরুষের সুযোগের সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা, সবার জন্য টেকসই জ্বালানি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি, সবার জন্যে উৎপাদনশীল ও গ্রহণযোগ্য কর্মসংস্থান, টেকসই অবকাঠামো ও শিল্পায়ন, বৈষম্য দূরিকরণ, বাসযোগ্য টেকসই নগরায়ন, টেকসই উৎপাদন ও ভোগ ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও টেসকই উন্নয়ন, বনভূমি সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন, শান্তিপূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্যে বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্বের আবহ জোরদার করার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জসমূহ ২০৩০ সাল নাগাদ মোকাবেলার অঙ্গীকার পত্রে স্বাক্ষর করেছেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। এসডিজি চুক্তির পর পরই প্যারিসে জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তারা। এসডিজির প্রাণ ভ্রমরা এই প্যারিস চুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেন দরবার শেষে এই চুক্তিতে সই করেছিল। নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিশ্ব চুক্তি থেকে সরে আসার কথা বললেও মনে হয় তার দেশের এবং বিশ্বের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের চাপে তিনি শেষ পর্যন্ত প্যারিস চুক্তি নিয়ে আর বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবেন না। অবশ্যি অস্থিরমতি এই প্রেসিডেন্ট আখেরে কি করবেন তা বলা মুশকিল।

তিনি যাই করুন, সারা বিশ্বের নেতৃবৃন্দ এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এক অভাগা দেশ। আমাদের তাই এই চুক্তি বাস্তবায়নে সদাই তৎপর থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববাসীকেও আমাদের দুঃখ দুর্দশার কথা বলে যেতে হবে। তাদের প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে নৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো পূরণে আমাদের তাই সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সমন্বয় করার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। সুখের কথা বাংলাদেশ সরকার এসডিজি বাস্তবায়নের জন্যে খুবই আন্তরিক। আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রাসমূহ এসডিজির আলোকেই নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অর্থই হবে এসডিজি বাস্তবায়নের ভিত্তিভূমিকে মজবুত করা। তাছাড়া এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে একটি এসডিজি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল স্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়কে এসডিজির লক্ষ্য অনুযায়ী অনুরূপ বাস্তবায়ন সেল গঠন করতে বলা হয়েছে। ফলাফল নির্ভর এসব উদ্যোগের সাথে ব্যক্তিখাত, এনজিও ও সামাজিক সংগঠনকেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসডিজি বাস্তাবায়নে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিখাতকে অর্থায়নে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যক্তিখাত ও সরকারি খাত মিলে পিপিপি নির্ভর অর্থায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ থেকেও এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সহযোগিতা পাওয়ার কথা রয়েছে। এতসব উদ্যোগের সমন্বয় নিশ্চিত করে লক্ষ্য ধরে ধরে বাস্তবায়ন কর্মকান্ডের নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বেকেই দিতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসডিজি এজেন্ডাকে খুবই আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেছেন। বিশ্ব মঞ্চে তার সরব উপস্থিতি আমরা সকলেই দেখতে পাচ্ছি। তাই এমডিজির মতো এসডিজি অর্জনেও তার নেতৃত্বে প্রশাসন, সমাজ ও ব্যক্তিখাত মিলে মিশে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের সমন্বয় সাধন করতে যে পারবেন সে বিশ্বাস আমাদের রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের জন্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যটি হচ্ছে প্রথমটি। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে অতি-দারিদ্র্য পুরোপুরি নিরসন এবং সার্বিক দারিদ্র্য অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যটি পূরণ করা খুবই চ্যালেঞ্জিং হতে বাধ্য। বর্তমানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশের মতো। এই হারকে ২০৩০ সাল নাগাদ ১১ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে অতি-দারিদ্র্যের হার ১২ শতাংশের মতো। তাকে পুরোপুরি নিরসন করতে হবে। প্রায় দু'কোটির মতো অতি দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা চাট্টিখানি কথা নয়। এমন কি উন্নত দেশেও বিরাট সংখ্যক মানুষ অতি দারিদ্র্য রেখার নিচে বাস করেন। তাদের সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে এই বিপুল সংখ্যক অতি দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত রাখা খুব একটা সহজ হবে না।

তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য একমাত্র বাংলাদেশেরই রয়েছে। দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের ব্যাপক সাফল্যের কথা সকলেরই জানা। বিশেষ করে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার গরিব-হিতৈষী নীতি কৌশলের ফলে এ দেশের গরিব-দুঃখী মানুষ তাদের বঞ্চনা ও দুরবস্থা থেকে কীভাবে উঠে এসেছে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ছিয়ানব্বইয়ে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই তিনি বয়স্কভাতা ও বিধবা ভাতা প্রদানের সামাজিক সুরক্ষা নীতি চালু করেন। এর পরের বার ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি এর ভিত্তি ও ব্যাপ্তি দুই-ই বাড়িয়েছেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে যেদিন আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে প্রথম বাংলাদেশ ব্যাংকে পা রেখেছিলাম সেদিন সকালেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি এসএমএস পেয়েছিলাম। তিনি কয়েকটি কথায় লিখেছিলেন, 'গরিবের জন্য কাজ করবেন।' এই নির্দেশনা আমাকে নিরন্তর উৎসাহ ও উদ্দীপনা যুগিয়েছে অবহেলিত বঞ্চিতজনদের জন্য আর্থিক সেবা পৌঁছে দেবার পক্ষে। এমন কি এদেশের পথশিশু, পরিচ্ছন্ন কর্মী, স্কুল শিশু, কৃষক, গার্মেন্টস কর্মী - সকলের জন্যে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেবার নানা উদ্যোগ নিতে আমাকে সাহস যুগিয়েছে ঐ ছোট্ট বার্তাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই আমি বলতে পারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই এসডিজি'র এই প্রধান লক্ষ্য পূরণ খুবই সম্ভব। দীর্ঘদিন এ দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার কারণে যে অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা তিনি অর্জন করেছেন সেসবের আলোকেই তিনি অতি দারিদ্র্য নিরসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখেন।

তাছাড়া বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোতেও গরিব-সহায়ক বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক আধুনিকায়ন ও যন্ত্রায়নের কারণে ভূমির ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। বর্গাচাষের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন বেশিরভাগ জমিই 'ফিক্সড রেন্ট' বা চুক্তিতে ভাগ চাষ হয়। ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীরা এতে উপকৃত হচ্ছেন। ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুবিধেও পাচ্ছেন। শ্রম বাজারেও এসেছে পরিবর্তন। দৈনিক মজুরির বদলে চুক্তিভিত্তিক শ্রম বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে। এ সবই হচ্ছে কৃষি খাতের ব্যাপক আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগের কারণে। বর্তমান সরকারের কৃষি-বান্ধব নীতির কারণেই যে গ্রামীণ অতি দারিদ্র্যের হার ব্যাপক হারে কমেছে সে কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তার পাশাপাশি গ্রাম থেকে প্রায় অর্ধ-কোটি নারী শ্রমিক রপ্তানিমুখী শিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন। এরাও নিয়মিত গ্রামে টাকা পাঠাচ্ছেন। সে টাকায় আত্মীয়স্বজন জমি ইজারা নিচ্ছেন। তার মানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোরও পরিবর্তন এনে তাকে অনেকটাই অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পেরেছে। এর ফলে অতি-দরিদ্র মানুষের আয় রোজগারের সুযোগ বেড়েছে। তাছাড়া এই সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও অর্থায়ন কৌশলের কারণে বৈষম্য সেভাবে বাড়েনি। গ্রাম পর্যায়ে বরং তা কমেছে। আর সে কারণে অতি-দারিদ্র্যের হার দ্রম্নততার সাথে কমেছে। আর প্রবৃদ্ধির হার ভালো থাকার কারণে সকলেরই আয় রোজগার বেড়েছে। তারও সুবিধে গরিব মানুষের ভাগ্যে বেশ খানিকটা জুটেছে। যদি ৭% শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা যায় তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ বড়জোর ৩ শতাংশ মানুষ অতি দরিদ্র থাকবে। এরা আবার প্রতিবন্ধী, স্বামী-পরিত্যক্ত ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কাঠামোগত সমস্যার শিকার হবার কারণে অতি-দারিদ্র্যর ঐ ফাঁদ থেকে বের হতে কষ্টকর হবে। এই পরিমাণ অতি দরিদ্র মানুষকে উন্নত দেশেও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে প্রতিপালন করতে হয়। আমাদেরও হয়তো তাই করতে হবে। সেজন্যে সামাজিক সুরক্ষা নীতির ব্যাপক আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এরই মধ্যে এদিকে নজর দিয়েছেন। টার্গেটিং বিতরণ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে নতুন সামাজিক সুরক্ষা কৌশল হাতে নিয়েছে সরকার। এর সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন ব্যবস্থা (যেমন মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং) সংযুক্ত করা হলে কাঠামোগত অতি-দরিদ্র মানুষদের ভাগ্যোন্নয়নে বড় ধরনের সাফল্য দেখা দেবে।

এছাড়া শুধু অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কৌশলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে যে সব গরিব-হিতৈষী প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপমূলক (যেমন চর উন্নয়ন প্রকল্প, অসহায় নারীর সুনির্দিষ্ট কর্ম সংস্থান প্রকল্প, এনজিওদের 'সৌহার্দ্য', 'টাপ (ঞটচ)' প্রকল্প এবং 'নদী ও জীবন' প্রকল্প, নগরের অংশীদারমূলক দারিদ্র্য নিরসন প্রকল্প, 'সিঁড়ি' প্রকল্প ইত্যাদি) অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন করে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প হাতে নিয়ে অতিদারিদ্র্যের হার আরও দ্রম্নত কমিয়ে ফেলা সম্ভব। একেকটি পরিবারের জন্য বড়জোর ৫০০ ডলার বা চলিস্নশ-পঞ্চাশ হাজার টাকার অর্থ স্থানান্তর ও কিছু সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করলেই অতি-দরিদ্র মানুষগুলোকে তীব্র দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি দেয়া সম্ভব। আর এই অর্থ খরচের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। প্রয়োজন উদ্যোগের। বিশেষ করে, যেসব অঞ্চল মূল ভূ-খন্ড থেকে বহু দূরে (হাওর, চর, উপকূল) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে জর্জরিত সেদিকে আগে নজর দিতে হবে। সময়মতো স্বাস্থ্য সেবার অভাবেও অনেকেই দারিদ্র্যের গর্তে পড়ে যান। তাই কমিউনিটি হাসপাতলগুলোকে আরো আধুনিক ও সক্ষম করে তোলা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া অন্য কোনো সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের (যেমন নদীভাঙ্গন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মামলা মোকদ্দমা, খুন-খারাবি) কারণে যেসব মানুষ অতিদরিদ্র হযে যান তাদের দিকে সরকার ও সমাজকে যুগপৎ নজর দিতে হবে।

আমরা বিশ্বায়নের এই পরিবর্তনশীল সময়েও ম্যাক্রো-অর্থনীতির বিস্ময়কর অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানি আয়, রেমিটেন্স আয় বাড়ন্ত ছিল বলে দেশের ম্যাক্রো অর্থনীতি এতটা ভালো ছিল। এ দুটো জায়গায় এখন খানিকটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এখনই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দূরদর্শী নীতি হস্তক্ষেপ করে বহু কষ্টে অর্জিত ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি কৃষির আধুনিকায়ন ও বহুমুখীকরণের কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে।

সরকার নিঃসন্দেহে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকবে। কিন্তু পাশাপাশি ব্যক্তিখাত, এনজিও, সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের পোড়খাওয়া মানুষগুলোর ভাগ্যোন্নয়নে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার যেসব সুদূরপ্রসারী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকৌশল ও অর্থায়ন নীতি গ্রহণ করেছে তার ফলে সাধারণ মানুষ ও নেতৃত্বের মাঝে একটি সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবেশে কোনো মানুষ না খেয়ে মারা যাবে তা আর সম্ভব নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে নিমিষেই খবর চলে যাচ্ছে পুরো সমাজে। সমাজও তাই আগের চেয়ে সজাগ ও সোচ্চার। তাই জবাবদিহিতাও বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতি একদিনেই সৃষ্টি হয়নি। বাঙালি সমাজের অন্তর্নিহিত স্বাদেশিক অনুভূতি, একে অপরের দুঃখে সামিল হওয়া, একাত্তরের মতো অতি-সাধারণের মাঝে থেকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক হবার ঐতিহ্য আমাদের দীর্ঘ দিনের। সেই ১৯০৭ সালের ১৮ জুন চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাকে দেয়া সংবর্ধনার জবাবে সেদিন তিনি বলেছিলেন, 'প্রাচীন বা মধ্যপন্থি এবং নবীন বা উপগ্রপন্থি কোন দলই দেশের প্রকৃত কাজ করছেন না, কেননা দেশের অতি সাধারণ মানুষদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে এসে তাদের নিয়ে কাজ কোনো পক্ষই করছেন না, অথচ এটাই এখন সবচেয়ে জরুরী কাজ।' (বি. দ্র. : শিমুল বড়ুয়া, রবীন্দ্র জীবনে ও সাহিত্যে চট্টগ্রাম, অমিতাভ প্রকাশন, ২০১৬, পৃ. ২৫)। রবীন্দ্রনাথ নিজে শিলাইদাহ, পতিসর, শান্তিনিকেতনে এই অতি-সাধারণের মাঝে কাজ করেছেন বলেই এই উপলব্ধি তার হয়েছিল। আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই অতি-সাধারণ ঘেষা এক দূরদর্শী নেতা। চুয়ান্নর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি এক গরিব বৃদ্ধার ঘরে গিয়েছিলেন। তিনি তাকে এক গস্নাস দুধ খেতে দিলেন। আর চার আনা পয়সা। তার নির্বাচনের খরচের জন্য। বঙ্গবন্ধু তাকে ঐ পয়সাসহ আরো কিছু টাকা দেবার অনেক চেষ্টা করেও দিতে পারলেন না। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। দু'চোখে পানি নিয়ে বঙ্গবন্ধু বের হয়ে এলেন তার ঘর থেকে। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' (পৃ. ২৫৫-২৫৬) তাই তিনি লিখেছেন, সেই দিনই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, 'মানুষরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।' ধোঁকা তিনি দেননি। দিয়েছেন নিজের প্রাণ। আর দিয়েছেন এই মুক্ত বাংলাদেশ। তিনিও রবীন্দ্রনাথের মতোই অতি-সাধারণের মুক্তির কথা সর্বক্ষণ বলতেন। সেই মতো কাজও করতেন। 'কারাগারের রোজনামচা' গ্রন্থে (পৃ. ১৫৩) ১৯৬৬ সনের ৮ জুলাই তারিখে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, 'চুপ করে শুয়ে চিন্তা করতে লাগলাম গ্রামের কথা, বস্তির কথা। ... অভাবের তাড়নায়, দুঃখের জ্বালায় আদম সন্তান গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছে শহরের দিকে। অনেক্ষণ শুয়ে শুয়ে ছোটবেলার কত কাহিনীই না মনে পড়ল। কারণ আমি তো গ্রামেরই ছেলে। গ্রামকে আমি ভালবাসি।' গ্রামের ঐ দুঃখী মানুষের কথা তিনি কোনদিন ভোলেননি। বরং নিরন্তর চেষ্টা করেছেন কি করে তাদের দুঃখ দূর করা যায়।এই দুই শ্রেষ্ঠ বাঙালির অভিপ্রায় অনুযায়ী আমরা আমাদের এই প্রিয় স্বদেশ থেকে নিশ্চয় অতি-দারিদ্র্যের অভিশাপ নির্মূল করতে পারব। আমাদের রয়েছে যোগ্য নেতৃত্ব, অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রয়েছে তরুণ্যে ভরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং দারিদ্র্য নিরসনের বিপুল অভিজ্ঞতা। এসবের সমন্বয় ঘটিয়ে নিশ্চয় আমরা অতি-দারিদ্র্য নিরসনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হব। পুরো জাতির মনে এ আশাবাদ সঞ্চারিত হোক।

ড. আতিউর রহমান

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

ই-মেইল : ফৎধঃরঁৎ@মসধরষ.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে