logo
শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৬

  যায়যায়দিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে মো. আতাউর রহমান প্রধান   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

আমরা যে হারে আমদানি করছি, সে হারে রপ্তানি হচ্ছে না। এর সঙ্গে রেমিট্যান্স যদি তাল মেলাতে না পারে তবে হয়তো আমাদের ব্যাংকে ডলারের ঘাটতি হবে। কিন্তু কখনোই ডলার নেই এ কথা বলে এলসির পেমেন্ট বন্ধ করিনি। ডলার আমাদের কাছে না থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বা মার্কেট থেকে সেটা সংগ্রহ করে এলসির দায় পরিশোধ করেছি।

এক অংকে সুদে ঋণ দিচ্ছে রূপালী ব্যাংক

'২০১৬ সালে অনলাইন ব্যাংকিং ছিল না। কিন্তু এখন সব শাখাই অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র আমরাই ২০১৭ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা শিওরক্যাশ চালু করেছি। রূপালী ব্যাংকের এ সেবার মাধ্যমে ইতোমধ্যে এক কোটি ৩৬ লাখ মায়ের অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটা বড় ডেভেলপমেন্ট রূপালী ব্যাংকের জন্য বলে আমি মনে করি।' তিনি বলেন, 'করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে রূপালী ব্যাংক মহিলা ক্রিকেট স্পন্সর করেছে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যতগুলো খেলা হয়েছে, সবগুলোতে আমরা প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি। ভারতে অনুষ্ঠিত অটল বিহারি বাজপেয়ি কাপ জিতেছি।'

২০১৬ সালের আগস্টের কথা। মুনাফা অর্জন দূরের কথা, লোকসানের ঘানি টানছিল রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের রূপালী ব্যাংক লিমিটেড। অন্য আর্থিক সূচকেও ছিল নেতিবাচক অবস্থা। সংকটাপন্ন এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে যোগ দেন চৌকস ব্যাংকার মো. আতাউর রহমান প্রধান। তার দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বে ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক সূচকে উন্নতি হতে থাকে এবং ২০১৭ সালে রেকর্ড ৫০০ কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা অর্জিত হয়; যা ব্যাংকটির ইতিহাসে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর পর থেকে প্রতিবছরই পরিচালন মুনাফা অর্জন করে আসছে ব্যাংকটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়েছে ব্যাংকটি। তবে খেলাপি ঋণের কারণে গ্রাহকের সর্বোচ্চ তুষ্টি অর্জিত হওয়া নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে এই ব্যাংকারের। তাই গ্রাহকের সর্বোচ্চ তুষ্টি অর্জনে আগামী দিনে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও এক অঙ্কে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। দেশে শিল্পায়নের স্বার্থে ব্যাংকের অর্থায়ন সহজলভ্য হওয়া উচিত বলেও মনে করেন এই ব্যাংকার। পুরো ব্যাংক খাতে সুদহার এক অঙ্কে নামলে দেশের শিল্প খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলে মনে করেন রূপালী ব্যাংকের এমডি।

সম্প্রতি যায়যায়দিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সেই পরিকল্পনাসহ ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার আহমেদ তোফায়েল।

আতাউর রহমান প্রধান বলেন, 'আগামীতে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টিই হবে রূপালী ব্যাংকের মূল চাওয়া। আমরা ব্যাংকটিকে সেই পর্যায়ে নিতে চাই যেখানে গ্রাহক বলবে, আমরা তুষ্ট। এটা অর্জন করতে খেলাপি ঋণ কিভাবে এক অঙ্কে নামিয়ে আনা যায় সেই প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।' খেলাপি ঋণ এক অঙ্কে নেমে এলে গ্রাহকের সর্বোচ্চ তুষ্টি অর্জন করা যাবে বলেও মনে করেন তিনি।

গত মার্চ প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমার নেপথ্যে কী ধরনের পদক্ষেপ ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ সবার জন্যই কনসার্ন। এটা যত কমে আসবে ততই ব্যাংকের অন্য সূচক ভালো অবস্থানে থাকবে। কারণ খেলাপি ঋণ হলো মূল অনুঘটক। তিনি বলেন, 'রূপালী ব্যাংক প্রথম থেকেই চেষ্টা করছে যে কত ভালোভাবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা যায়। ফলে আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শুধু শাখা পর্যায় নয়, শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ের শীর্ষপর্যায় পর্যন্ত দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া আছে এবং দায়িত্ব অনুযায়ী নিয়মিত কাজও হচ্ছে বলে মনে করি। আমাদের পরিচালনা পর্ষদ থেকেও এটা মনিটরিং করা হচ্ছে। আমাদের যে ঝুঁকি কমিটি আছে, সেই ঝুঁকি কমিটিও প্রতি প্রান্তিকে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলছে। এভাবে সবার প্রচেষ্টায় খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এবং বর্তমানে খেলাপি ঋণ অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় কম।'

উচ্চ আদালতে রিট মামলা ঋণের টাকা আদায়ে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হয়েছে উলেস্নখ করে রূপালী ব্যাংকের এমডি বলেন, 'এ কারণে আমাদের অনেকগুলো টাকা আটকে রয়েছে। এ রিট মামলাগুলো যাতে তাড়াতাড়ি শেষ করা যায়, সে জন্য আমাদের আইনজীবীদের নিয়ে বিশেষ টিম করেছি।'

সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সরকারি ব্যাংকগুলো কার্যকর করলেও বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক করেনি। এটি কার্যকর করতে মূল সমস্যা কোথায় জানতে চাইলে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, 'এখানে মূল সমস্যা হলো মানসিকতা। আমাদের মুনাফা অর্জনই মূল লক্ষ্য নয়। আর্থ-সামাজিক অন্য কাজগুলো করাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেই দায়িত্ব থেকেই আমরা সুদের হার কমিয়ে এনেছি। মানসিকতার দিক থেকে আমি মনে করি এটা করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেটা সবারই মানা উচিত। আমি মনে করি, সুদের হার কমিয়ে আনলে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। এতে বেশি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। আর বেশি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে কী হবে কিছু বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। গোটা জাতি উপকৃত হবে। আমার লাভ কম হলেও ক্ষতি নেই এ চিন্তা করে যদি এসব কাজ করা যায়, তবে প্রকৃতপক্ষে দেশের উন্নয়ন হবে এবং দেশের উন্নয়নে ব্যাংকের অবদান বাড়বে।'

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ডলার সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে। এর কারণ কী জানতে চাইলে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, 'আমরা যে হারে আমদানি করছি, সে হারে রপ্তানি হচ্ছে না। এর সঙ্গে রেমিট্যান্স যদি তাল মেলাতে না পারে তবে হয়তো আমাদের ব্যাংকে ডলারের ঘাটতি হবে। কিন্তু কখনোই ডলার নেই এ কথা বলে এলসির পেমেন্ট বন্ধ করিনি। ডলার আমাদের কাছে না থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বা মার্কেট থেকে সেটা সংগ্রহ করে এলসির দায় পরিশোধ করেছি।'

ঋণ বিতরণে রূপালী ব্যাংক কোন খাতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানতে চাইলে এমডি বলেন, 'আমরা ছোট-বড় সব ঋণই আগে দিয়েছি। তবে এখন আমাদের মূল ফোকাস ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই)। শহর থেকে গ্রাম এবং জেলা-উপজেলা সব জায়গাতেই এসএমই বিস্তৃত করতে চাই। ফলে এসএমই ঋণ বিতরণে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারণ আমরা চাচ্ছি টেকসই একটি জায়গা ধরে রাখার জন্য। একই সঙ্গে আমরা কৃষিঋণ বিতরণেও গুরুত্ব দিচ্ছি।'

ব্যাংকের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, গত 'আড়াই বছরে ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। আমরা যখন দায়িত্ব নিলাম তখন নানা কারণে ব্যাংকের লোকসান ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সেই লোকসান ক্রমান্বয়ে কটিয়ে ২০১৭ সালে আমরা ৫৩৭ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছি। গত বছর করেছি ৩৭৫ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের প্রথমার্ধে করেছি ৭৭ কোটি টাকা। মুনাফা কম হওয়ার অন্যতম কারণ আমরা সুদের হার কমিয়ে এনেছি। আগে আমরা যেখানে ১৪-১৫ শতাংশ সুদ নিতাম, সেটা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের ১৪৪টি শাখা লোকসানে ছিল, সেটা গত বছর পর্যন্ত আটটিতে নামিয়ে আনা হয়। তবে মার্চে তা আবার বেড়ে ২৭টি হলেও জুনে তা আবার কমে ১৬টিতে নেমেছে।'

তিনি বলেন, '২০১৬ সালে অনলাইন ব্যাংকিং ছিল না। কিন্তু এখন সব শাখাই অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র আমরাই ২০১৭ সালে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা শিওরক্যাশ চালু করেছি। রূপালী ব্যাংকের এ সেবার মাধ্যমে ইতোমধ্যে এক কোটি ৩৬ লাখ মায়ের অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটা বড় ডেভেলপমেন্ট রূপালী ব্যাংকের জন্য বলে আমি মনে করি।' তিনি বলেন, 'করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে রূপালী ব্যাংক মহিলা ক্রিকেট স্পন্সর করেছে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যতগুলো খেলা হয়েছে, সবগুলোতে আমরা প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি। ভারতে অনুষ্ঠিত অটল বিহারি বাজপেয়ি কাপ জিতেছি।'

আতাউর রহমান বলেন, 'আমাদের ডবল বেনিফিট স্কিম ছিল, সেটা আবার চালুর চিন্তা করছি। এ ছাড়া আমাদের কোটিপতি ও মিলেনিয়াম স্কিম রয়েছে। সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য একটা স্কিম রয়েছে। শিওরক্যাশে মায়েদের জন্য যে অ্যাকাউন্টগুলো করেছি, সেখান থেকে কিছু মাকে ছোট ঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে